জামায়াত কি পুরোনো ভুলের বৃত্তে?

মইনুল হক
বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬, ৮:০৩ পূর্বাহ্ন

গত নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আমি যত ভাবছি, ততই মনে হচ্ছে—বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত আমরা হয়তো চোখের সামনে দেখেও পুরোপুরি বুঝতে পারছি না। বিশেষ করে জামায়াত ও এনসিপি’র ১১ দলীয় জোটের ভোটের অংকটা খুব মনোযোগ দিয়ে পড়া দরকার।

গত নির্বাচনে এমন অনেক ভোটার দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিয়েছেন, যারা জামায়াতের স্থানীয় প্রার্থীকে ভালো করে চিনেনও না। এমন লাখ লাখ ভোট জামায়াত পেয়েছে, যারা জীবনে কখনো চিন্তাও করেননি যে তারা কোনোদিন জামায়াতকে ভোট দেবেন। একই সঙ্গে এমন লাখ লাখ নতুন ভোটার মোটামুটি সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছেন—এখন থেকে বিএনপি ও আওয়ামীলীগের বাইরে অন্য কোনো দলকে ভোট দেবেন। এদের বড় একটি অংশ এবার জামায়াত কিংবা ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন।

বাংলাদেশে ঐতিহাসিকভাবে জামায়াতের ভোট কখনোই পাঁচ শতাংশের ওপরে ছিলো না। তাহলে ১১ দলীয় জোট প্রায় ৩৬% ভোট পেলো কিভাবে? আবার একইভাবে, এককভাবে বিএনপি’র ভোট গত ত্রিশ বছর কখনোই ৪০% এর ওপরে ছিলো না। কিন্তু এবার বিএনপি প্রায় ৫০% ভোট পেলো কিভাবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুব জটিল নয়। কিন্তু এই সহজ অংকের ভেতরেই লুকিয়ে আছে আগামীর বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণ।

দৃশ্যতই বিএনপির জনপ্রিয়তা কমেছে। তাহলে তারা ৫০% ভোট পেলো কিভাবে? আমার কাছে এর সহজ ব্যাখ্যা হলো—আওয়ামীলীগ ও হিন্দু ভোটগুলোর বড় অংশ বিএনপি’র বক্সে জমা পড়েছে। কিন্তু তাহলে তো বিএনপি’র ভোট প্রায় ৭৫% হবার কথা ছিলো। সেটা হলো না কেনো? কারণ আওয়ামীলীগের নিয়মিত ভোটারদের একটি অংশ ভোট দিতে যায়নি, আর বিএনপি ও সুইং ভোটারদের ভোটের একটি বড় অংশ জামায়াত ও ১১ দলীয় জোটের দিকে সরে গেছে।

এটা হলো ভোটের আপাত চিত্র। ভোট কারচুপি, জাল ভোট, নারী ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে যেতে ভীতি প্রদর্শন—এই অভিযোগগুলো আপাতত পাশে রেখে, শুধুমাত্র নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত পরিসংখ্যান দিয়ে আলোচনা করলেও অনেক অংকের জট খুলে যায়।

চলুন একটি দৃশ্যপট কল্পনা করা যাক। এ নির্বাচনে যদি আওয়ামীলীগ অংশগ্রহণ করতে পারতো, বিএনপি যেভাবে জোট করেছে সেভাবেই নির্বাচন করতো এবং জামায়াতও ১১ দলকে নিয়ে নির্বাচন করতো—তাহলে ফলাফল কী হতো? আওয়ামীলীগ ও তার জোটের ২৫% এর নিচে ভোট পাবার কোনো সম্ভাবনা ছিলো? তখন বিএনপি জোটের ভোটের হার কত শতাংশ হতো? আর জামায়াত জোটের?

বিতর্ক এড়াতে আমি উত্তর দিচ্ছি না। শুধু আরেকটি দিক উন্মোচন করলাম।

আমার আজকের আলোচ্য বিষয় বিএনপি’র ভোটের শতাংশ নয়। বরং জামায়াত ও ১১ দলীয় জোটের ভোটের অংক, জনপ্রত্যাশা এবং সামনে তাদের রাজনৈতিক পথ কোন দিকে যাচ্ছে—সেটাই আমার ভাবনার জায়গা।

এবারের নির্বাচনে বিএনপি’র কৌশল ছিলো আওয়ামীলীগের ভোটগুলো নিজেদের বাক্সে ভরা। এই আওয়ামী ভোটগুলো পাবার জন্যে নীতি ও আদর্শ বিসর্জন দিয়ে যা যা করার দরকার ছিলো, বিএনপি তার সবটুকুই করেছে। বিএনপি তার সেন্টার রাইট পজিশন থেকে কার্যত সেন্টার লেফটে চলে গেছে। অর্থাৎ বিএনপি তার নিজস্ব রাজনৈতিক পরিসর ত্যাগ করে ইন্দো-আওয়ামী বয়ান ও বলয়ের ভেতরে ঢুকে পড়েছে।

এই কারণেই বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও জুলাই বিপ্লবের ভোটের বড় একটি অংশ জামায়াত ও এনসিপি’র ১১ দলীয় জোটে গেছে। কেনো গেছে? কারণ তারা মনে করেছেন, বর্তমান বিএনপি আর তাদের প্রতিনিধিত্ব করে না।

এখানে একটু পেছনে ফিরে তাকানো দরকার।

২০১০/১১ সালে খালেদা জিয়া চীন থেকে ফিরে কিছু দিন পরেই দিল্লী গেলেন। তারপর ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তার কন্ঠ ক্রমশ ক্ষীণ হতে লাগলো। তখন অনেকের কাছেই এটাকে political suicide বলে মনে হয়েছিলো। বাস্তবে হয়েছেও তাই। ভারত বিএনপি ও খালেদা জিয়ার Achilles heel চিহ্নিত করে ফেলেছিলো। তারপর ধীরে ধীরে জাল গুটিয়ে এনেছিলো।

প্রথমে জামায়াত নেতাদের ফাঁসিতে ঝুলানো হলো। তারপর ক্রমে বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব খালেদা জিয়াকে প্রায় বিনা বাধায় ক্যান্টনমেন্টের বাড়ী থেকে উৎখাত করা হলো এবং পরে জেলে ঢুকিয়ে ফেলা হলো।

তারেকের জন্যেও ভারতের রেসিপি তৈরী আছে। তবে বাংলাদেশের মতো ১৮ কোটি মানুষের দেশে বড় কোনো বিপর্যয় নেমে এলে ভারতের সেভেন সিস্টার্সের সমীকরণ পাল্টে যেতে পারে। চীনের সাথে বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারত কোনো ঝুঁকি নেবার অবস্থানে নেই। অন্যদিকে মার্কিন সমর্থন না থাকার কারণে মিলিটারী টেইক ওভারও করানো যায়নি।

এবার জামায়াতের আলোচনায় ফিরে আসি।

জামায়াত ও এনসিপি’র ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে তারা কতটুকু প্রো-বাংলাদেশী অবস্থান ধরে রাখতে পারে এবং জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষাকে কতটুকু ধারণ করতে পারে তার ওপর। এই ধারার অনিবার্য সংঘাত হলো ভারতীয় আধিপত্যবাদের সাথে।
হাসিনার ১৬ বছরে বাংলাদেশের সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রে ভারতের প্রভাব ছিলো অবাধ ও সীমাহীন—এটা এখন আর কোনো গোপন আলাপ নয়।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, লেফটেন্যান্ট জেনারেল অবসরপ্রাপ্ত চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দীকে নিয়ে নেত্র নিউজ ১৮ জুলাই ২০২০ সালে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলো। সেখানে সারওয়ার্দী তাঁর সাক্ষাৎকারে ভারতের বিরুদ্ধে গুরুতর সমালোচনা করেন এবং দাবি করেন যে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ—যেমন intelligence agencies, Chief of Army Staff appointments, এবং secretaries’ transfers—ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার দ্বারা “manipulated” হয়।

এখন জামায়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্ট্রাটেজি হলো এই সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলা। এর অংশ হিসেবেই জামায়াত সুশীল সাজতে চায়, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের সাথে ব্যাকডোর চ্যানেল তৈরী করতে চায়। আবরার ফাহাদের খুনীদের পক্ষের আইনজীবী শিশির মনির যখন ডেইলি স্টারের বিরাট বড় ‘পাংখা’ হতে চান, তখন বুঝে নিতে হবে—এটা নিছক ব্যক্তিগত পছন্দের ব্যাপার নয়। এটা একটি রাজনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ।

আমার আশঙ্কা হলো, জামায়াতের এই প্রচেষ্টা আত্মঘাতী হতে বাধ্য।

বিএনপি তার রাজনৈতিক পরিসর ত্যাগ করে আওয়ামী ভোট বাক্সবন্দি করেছে। কিন্তু জামায়াত যা করছে, তাতে ‘আম-ছালা দু’টোই যাবে’। জাতীয়তাবাদী ঘরানার যে ভোটগুলো জামায়াত পেয়েছিলো, সেগুলোতে ভাটার টান লাগবে। সামগ্রিকভাবে জনগণের কাছে খুবই খারাপ বার্তা যাবে। একই সঙ্গে আওয়ামীলীগকে ফিরিয়ে আনতে ভারত ও বাংলাদেশে ভারতীয় এসেটদের যে আয়োজন, সেটাকেও আরো বেগবান করবে।

খেয়াল করে দেখুন, নাহিদ ও আসিফদের নিয়ে কতো শত শত কোটি টাকার দুর্নীতির গাল-গল্পে দেশ সয়লাব হয়ে গিয়েছিলো। নির্বাচন হয়ে গেলো, কিন্তু শত শত কোটি টাকা দুর্নীতির হদিস কেউ দিলো না, কেউ আর স্মরণও করলো না। আসিফ মাহমুদ নিজ থেকেই সকল ব্যাংকের হিসাব অবমুক্ত করলেন। দুর্নীতির কোনো চিহ্ন পাওয়া গেলো না। কিন্তু ক্ষতি যা করার, তা অনেক আগেই করে ফেলে ছিলো—যারা জুলাই বিপ্লবীদের বিতর্কিত করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চেয়েছিলো।

ঠিক একই প্লেবুক অনুসারে জামায়াতকে সুশীল বানিয়ে চিৎ পটাং করার আয়োজন চলছে খুব জোরেশোরে। কিন্তু জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বের অনেকেই ‘এলিট ক্লাব’এ ঢুকে ক্ষমতায় যাবার শর্টকাট খুঁজছেন। ডেইলি স্টারের ‘বিরাট পাংখা’ শিশির মনিররা তাদেরই প্রতিনিধিত্ব করেন।

সমস্যা হলো, গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্ত নেয়া অনেকটা জামায়াতের ঐতিহ্যগত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির বিরোধিতা করা, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্বাধীনতার সংগ্রামে সঠিক ভূমিকা পালনের ব্যর্থতা, ১৯৯৬ এ আওয়ামীলীগের সাথে মিলে বিএনপি’র বিরুদ্ধে অবস্থান—এই সবগুলোই জামায়াতের ঐতিহ্যগত ভুলের ধারাবাহিকতা।

তবে এটাও সত্য, প্রথম বারের মতো জন-আকাঙ্ক্ষার সঠিক ও সর্বোচ্চ প্রতিনিধিত্ব করেছে জামায়াত ২০২৪শের বর্ষা বিপ্লবে। বাংলাদেশের মানুষ বিনিময়ে জামায়াতকে উজাড় করা ভালোবাসা দিতে কার্পণ্য করেনি।

তাহলে জামায়াত কিসের আশায় মতি-মাহফুজ গংদের খপ্পড়ে পড়তে যাচ্ছে?

তারেকের মেরুদন্ড ভাঙ্গার বৈধতা যারা উৎপাদন করেছিলো, তারেক তাদেরকেই বুকে টেনে নিলেন। তবে কি জামায়াতও তাদের সাথেই সখ্যতার পথ বেছে নিচ্ছে, যারা জামায়াত নেতাদের ফাঁসিতে ঝুলানোর বৈধতা উৎপাদন করেছিলো?

এই প্রশ্নটা খুব সহজ নয়। কিন্তু এড়িয়ে যাওয়ার মতোও নয়।

কারণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে এবার যে নতুন ভোট-সমীকরণ দেখা গেলো, সেটা কেবল নির্বাচনী ফলাফল নয়; এটা জনমনের একটি বিরাট পরিবর্তনের বার্তা। মানুষ পুরনো দুই দলের বাইরে তাকাতে শুরু করেছে। তারা বিকল্প খুঁজছে। তারা প্রতিনিধিত্ব খুঁজছে। তারা এমন শক্তি খুঁজছে, যারা প্রো-বাংলাদেশী অবস্থান থেকে ভারতীয় আধিপত্যবাদ, ইন্দো-আওয়ামী বয়ান, এলিট ক্লাব এবং পুরনো বন্দোবস্ত—সবকিছুর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবে।

জামায়াত যদি এই জায়গাটা বুঝতে পারে, তাহলে তাদের সামনে ঐতিহাসিক সুযোগ আছে। আর যদি তারা আবারও ভুল সময়ে ভুল দরজায় কড়া নাড়ে, তাহলে ইতিহাস হয়তো আরেকবার তাদের সামনে সুযোগ এনে দিয়েও ফিরিয়ে নেবে।

মইনুল হক
ডেট্রয়েট, মিশিগান।

Facebook Comments
সংবাদটি শেয়ার করুন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

আরো সংবাদ