কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিস সনদের আইন চূড়ান্ত

অন্যদৃষ্টি অনলাইন
শনিবার, ২১ জুলাই, ২০১৮, ১০:৪৬ পূর্বাহ্ন

স্টাফ রিপোর্টার।।

কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিস বা মাস্টার্স ডিগ্রি সনদের আইন চূড়ান্ত করেছে সরকার। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ স্তর ‘দাওরায়ে হাদিস’কে স্নাতকোত্তর (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি) সমমানের স্বীকৃতি দিতে প্রস্তাবিত আইনের খসড়া চূড়ান্ত করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বর্তমানে আইনটি যাচাই-বাছায়ের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে তোলা হচ্ছে। সেখান থেকে অনুমোদনের পর মন্ত্রিপরিষদের সভায় তোলা হবে। আগামী এক মাসের মধ্যে এ আইন কার্যকর হতে পারে।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা সচিব সোহরাব হোসেনকে আইনটি মন্ত্রিপরিষদে পাঠাতে নির্দেশ দিয়েছেন। আগামী সপ্তাহে এ আইন মন্ত্রিপরিষদের সভায় তোলা হতে পারে বলেও জানা গেছে।

এ বিষয়ে কারিগরি ও মাদরাসা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (মাদরাসা) রওনক মাহমুদ বলেন, ‘আমরা আইনের খসড়া চূড়ান্ত করেছি। চলতি সপ্তাহে এটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হচ্ছে। সেখানে বাছাই কমিটি যাচাই-বাছাই করে আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠাবে। ভেটিং শেষ হলে মন্ত্রিসভায় উত্থাপন করা হবে অনুমোদনের জন্য। মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিলে তারপর সংসদে যাবে।’

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগের তৈরি করা খসড়াতে পরিচালন কমিটির অধীনে ছয়টি কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড গঠিত হবে। এসব শিক্ষা বোর্ডের নাম দেয়া হয়েছে- বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ, বেফাকুল মাদারাসিল কওমিয়া গওহরডাঙ্গা বাংলাদেশ, আঞ্জুমানে ইত্তেহাদুল মাদারিস বাংলাদেশ, আযাদ দ্বীনি এদারায়ে তালীম বাংলাদেশ, তানযীমুল মাদারিসিদ দ্বীনিয়া বাংলাদেশ এবং জাতীয় দ্বীনি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড বাংলাদেশ।

জানা গেছে, সর্বোচ্চ ১৫ সদস্যবিশিষ্ট এসব বোর্ডের পরিচালন কমিটিতে বেফাকের চেয়ারম্যান, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ছাড়াও পাঁচজন সদস্য থাকবেন। এছাড়া অন্য পাঁচটি বোর্ড থেকে পদাধিকারবলে চেয়ারম্যান অথবা বোর্ড কর্তৃক মনোনীত হয়ে দুজন করে মোট ১০ জন সদস্য থাকবেন।

পরিচালন কমিটি বা আল-হাইআতুল উলিয়ার প্রধান কার্যালয় হবে ঢাকায়। এ কমিটি নিবন্ধিত মাদরাসাগুলোর দাওরায়ে হাদিসের সনদ মার্স্টাস (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি) সমমানে বিবেচিত হবে। এ কমিটির অধীনে ও তত্ত্বাবধানে দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। দাওরায়ে হাদিসের সিলেবাস প্রণয়ন, পরীক্ষা পদ্ধতি, পরীক্ষার সময় নির্ধারণ, অভিন্ন প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, উত্তরপত্র মূল্যায়ন, ফলাফল ও সনদ তৈরিসহ আনুষঙ্গিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এক বা একাধিক উপকমিটি গঠন করতে পারবে। কমিটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ওই বিষয়গুলো অবহিত করবে।

কওমি আইনের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, কওমি মাদরাসা এবং দারুল উলুম দেওবন্দের আদর্শ, মূলনীতি ও মত-পথের অনুসরণে মুসলিম জনসাধারণের আর্থিক সহায়তায় ওলামায়ে কেরামের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত ইলমে ওহির শিক্ষাকেন্দ্র। কওমি মাদরাসার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও স্বকীয়তার অর্থ একমাত্র আল্লাহর ওপর নিরঙ্কুশ ভরসা, রাসুলুল্লাহ (স.) এর মতাদর্শ অনুসরণে জীবনযাপন; চার মাজহাবের প্রতি শ্রদ্ধা ও পরমতসহিষ্ণুতার সঙ্গে হানাফি মাজহাব অনুসরণ করা; আধ্যাত্মিক চার তরিকা (চিশ্তিয়া, সোহরাওয়াদিয়া, নক্শন্দিয়া-মুজাদ্দিদিয়া ও কাদিরিয়া) সব হকপন্থী ধারার প্রতি সহনশীল ও উদার মনোভাব পোষণ করা।

স্বীকৃতির দাবিতে কওমি আলেমরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছিলেন। সর্বশেষ ২০১২ সালের ১৫ এপ্রিল বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়। আল্লামা শাহ আহমদ শফী ওই কমিশনের চেয়ারম্যান মনোনীত হন। কমিশন এক বছর ধরে আলোচনা, পর্যালোচনা ও জনমত যাচাই করে পরের বছর সরকারের কাছে একটি রিপোর্ট দাখিল করে। ওই রিপোর্টের ভিত্তিতে সরকার আগের খসড়া আইনটি বাতিল করে স্বকীয়তা অক্ষুণ্ন রেখে একটি গ্রহণযোগ্য আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়। এরপরই ওই কমিশন বিলুপ্ত হয়। এছাড়া আগের কমিটিতে সরকারের মনোনীত দুই কর্মকর্তাকে রাখা হয়।

বর্তমানে দেশে আলিয়া মাদরাসা, কওমি মাদরাসা ও স্বতন্ত্র মাদরাসা- এ তিন ধারার মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা চালু আছে। আলিয়া মাদরাসায় সরকার নিয়ন্ত্রিত বোর্ড রয়েছে এবং এ ধারার দাখিল (এসএসসি সমমান) ও আলিম (এইচএসসি) পাস করে মূল ধারার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে কওমিতে এ সুযোগ নেই।

উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বছরের ১১ এপ্রিল ‘দাওরায়ে হাদিস’ পরীক্ষাকে মাস্টার্স সমমানের মর্যাদা দেয়ার ঘোষণা দেন। এরপর একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে এ বিষয়ে কোনো আইন না থাকায় ‘সনদের মান’ দেয়া সম্ভব হচ্ছিল না। এ কারণে দ্রুত আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

 

Facebook Comments
সংবাদটি শেয়ার করুন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

আরো সংবাদ