অন্যদৃষ্টি অনলাইনি।।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি নিয়ে হতাশ হয়ে পড়েছেন শিক্ষকরা। সরেজমিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে এমপিওভুক্তির নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু শনিবার পর্যন্ত এ সংক্রান্ত কোনো কার্যক্রম শুরু হয়নি। এছাড়া ইতোমধ্যে আবেদন করা সাড়ে নয় হাজার প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্তিতে প্রয়োজন অন্তত তিন হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এ অর্থের সংস্থান হয়নি। ফলে বর্তমান সরকারের মেয়াদে এমপিওভুক্তি নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাড়ে নয় হাজার প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করতে তিন হাজার কোটি টাকা দরকার। আর স্কুল-কলেজ এমপিওভুক্ত করতে বাজেটে ৪৩২ কোটি টাকার বরাদ্দ রয়েছে। নির্বাচনের আগে কিছু প্রতিষ্ঠানকে এমপিও দিলে বাকিদের মধ্যে অসন্তোষের আশঙ্কা রয়েছে। মন্ত্রী-এমপিরা ক্ষুব্ধ হবেন। এর প্রভাব নির্বাচনে পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে এমপিওভুক্তির কাজের গতি কৌশলে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব জানান, চলতি মাসের শুরুতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন সচিবের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন সচিবের আলাপ হয়েছে। এমপিওভুক্তির মতো বিষয় সরাসরি ঘোষণা দিয়ে স্থগিত করলে অসন্তোষ দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়। এ পরিস্থিতিতে যাচাই-বাছাইয়ের নামে এমপিওভুক্তির কাজে সময়ক্ষেপণের কৌশল অবলম্বনের সিদ্ধান্ত হয়। যে কারণে এমপিও যাচাই-বাছাই কমিটির সভা ২০ সেপ্টেম্বর ডেকে স্থগিত করা হয়। পরে ২৪ সেপ্টেম্বর ফের সভা ডেকে আবার স্থগিত করা হয়। মূলত পরিদর্শন ও ফিটলিস্ট তৈরির নামে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, সরেজমিন সারা দেশের সাড়ে নয় হাজার প্রতিষ্ঠান যাচাই-বাছাইর কাজ শেষ করতে অন্তত ছয় মাস সময় দরকার হবে। ভোটের হিসাব কষে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে এমপিওভুক্তির সুনির্দিষ্ট ঘোষণা থাকবে। নির্বাচন শেষে নতুন সরকার গঠনের পরপরই এমপিও দেওয়া হবে। এমপিওভুক্তির কাজ এগিয়ে রাখতে অনলাইনে ও সফটওয়ারের মাধ্যমে আবেদন প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। সাড়ে নয় হাজার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৫৩৭টি স্কুল-কলেজ, ৫০০ মাদ্রাসা এবং সাড়ে ৩০০ কারিগরি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির যোগ্যতা অর্জন করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে এমপিও দেওয়া হলে বঞ্চিতদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা একদিকে ভোটে প্রভাব পড়তে পারে। অপরদিকে শিক্ষকরা এমপিওর দাবিতে রাজপথে আন্দোলনে নামতে পারেন। এই দুই আশঙ্কা থেকেই নির্বাচনের আগে এমপিও না দেওয়ার ব্যাপারে সরকারের নীতিনির্ধারকরা নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে ননএমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে দেখা করে নির্বাচনের আগেই এমপিওও ঘোষণা দাবি করছেন। এমপিরাও সরকারকে এমপিওভুক্তির জন্য চাপ দিচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারে সরকার।
মন্ত্রণালয়ের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের আগে এমপিও দেওয়া হলেও যোগ্য প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হবে। তিনি যেসব প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি করতে সম্মত দেবেন সেটা বাস্তবায়ন করবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। আর সরেজমিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যাচাই-বাছাই করে এমপিওভুক্ত করা হলে আবেদনকারী যোগ্যপ্রতিষ্ঠা সরেজমিন যাচাই করতে স্থানীয় শিক্ষা কর্মকর্তার নেতৃত্বে একটি কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হবে। কমিটি বিধি মোতাবেক প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে কি না এবং প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত, পাসের হার, প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক অনুমোদনের বয়সসহ অন্যান্য বিষয় যাচাই করবে। মন্ত্রণালয় সঠিক সিদ্ধান্ত না দেওয়ায় ননএমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রায় লাখো শিক্ষক-কর্মচারী হতাশ হয়ে পড়েছেন।
জানতে চাইলে সংগঠনের সভাপতি অধ্যক্ষ গোলাম মাহমুদুন্নবী ডলার বলেন, ‘আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই নির্বাচনকালীন সরকার গঠন হবে। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় সরেজমিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যাচাই-বাছাই কাজ শুরু করেনি। আমরা গত সপ্তাহে সচিবের সঙ্গে দেখা করে দ্রুত কার্যক্রম শুরু করতে আবেদন করলেও বাস্তবে কিছুই হয়নি। বর্তমান সরকারের আমলে এমপিও হবে কি না, তা নিয়ে আমরা হতাশ।’ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আবেদনকারী সাড়ে নয় হাজার প্রতিষ্ঠানকে এমপিও দিলে বছরে কমপক্ষে তিন হাজার কোটি টাকা দরকার হবে। আর বাজেটে বরাদ্দ আছে ৪৩২ কোটি টাকা। সমপরিমাণ টাকা দিয়ে সাত-আটশত প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা যাবে। কিন্তু একবার কোনো প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হলে আজীবন তার ব্যয় বহন করতে হয়। প্রসঙ্গত, বর্তমানে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান প্রায় ২৮ হাজার। এ খাতে সরকারের ব্যয় বরাদ্দ বছরে ১৪ হাজার ১৮২ কোটি টাকা, যা বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাজেটের ৬৩ শতাংশের বেশি।
এমপিওভুক্তির বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন, ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিভুক্তির বিষয়ে সরেজমিন পরিদর্শন করে যাচাই-বাছাইয়ের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইতোমধ্যে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা এবং কারিগরি মিলে মোট নয় হাজার ৪৯৮টি আবেদন অনলাইনে জমা পড়েছে। এগুলো আমরা যাচাই-বাছাই করতেছি।’
নির্বাচনের আগে এমপিও দেওয়া হবে কি না, জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘এমপিওভুক্তির বিষয়টি একটি চলমান প্রক্রিয়া। এটি নির্বাচন কিংবা সরকারের মেয়াদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় নয়। আমরা মাঠ পর্যায়ে গিয়েও ফিজিক্যালি যাছাই করবো। যাচাই-বাছাইয়ের পর উপযুক্ত সময়েই এমপিও দেওয়া হবে। এটার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। এটা সরকারের সিদ্ধান্ত। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা।’ সংখ্যা কত হবে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অর্থপ্রাপ্তি সবকিছু মিলে সরকারের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে দেব। কী পদ্ধতিতে দেব, সেটাও সেখানে সিদ্ধান্ত হবে।’
২০১০ সালে সর্বশেষ সরকার এক হাজার ৬২৪টি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করে। এরপর থেকে শিক্ষকরা এমপিওভুক্তির জন্য আন্দোলন করে আসছেন। এমনকি সংসদ সদস্যরাও এমপিওভুক্তির জন্য জাতীয় সংসদে একাধিবার বলেছেন। জনপ্রতিনিধি ও শিক্ষকদের চাপে গত জুন মাসে এমপিও নীতিমালা ২০১৮ জারির পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় এমপিওভুক্তির আবেদন গ্রহণ ও যাচাই-বাছাই করতে দুটি কমিটি গঠন করে।
You must be logged in to post a comment.