রিজিয়া রহমানের গল্প-ভুবন : বিষয় ও শৈল্পিক প্রকরণ

অন্যদৃষ্টি অনলাইন
রবিবার, ১৮ আগস্ট, ২০১৯, ৯:২৩ অপরাহ্ন

ড. মোঃ আব্দুর রশীদ।।

রিজিয়া রহমানের কথাসাহিত্য ইতিহাস, অধিকার প্রতিষ্ঠার নিরন্তর সংগ্রাম, যাপিত জীবন, নারী-নিগ্রহ, মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধোত্তর সমাজবাস্তবতা, গ্রামীণ ও নাগরিক জীবনসংকটের নতুন মাত্রাচেতনায় বিশিষ্ট। তাঁর সাহিত্যে ইতিহাসের চোরা¯্রােত, গ্রামীণ মৃত্তিকামূলস্পর্শী মানুষের সুখ-দুঃখ, জীবন-সংগ্রাম, ঘটনার ঘনঘটা, নগরজীবন-অন্তরালবর্তী বহুমুখী সমস্যা-সংকট শিল্পরূপ লাভ করেছে। রিজিয়া রহমানের ছোটগল্পে পরিবেশ সৃজনে ও কাহিনিবিন্যাসে মুখ্য হয়ে উঠেছে লেখকের বাস্তবোধসম্পন্ন পর্যবেক্ষণশক্তি, ঔচিত্যবোধ এবং সচেতন বর্ণন বৈশিষ্ট্য। শৈল্পিক সৃজন-আকাক্সক্ষার সঙ্গে সামাজিক দায়িত্বচেতনার সমন্বয় তাঁর অধিকাংশ রচনার বৈশিষ্ট্য। সৃজনশীলতার এবং মননশীলতার মাত্রাগত পার্থক্য তাঁর সাহিত্যকর্মে নতুন তাৎপর্যে অভিব্যক্ত হয়েছে। লেখক গল্পের কাহিনি-বিন্যাসে ঘটনাধর্মিতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন, ক্ষেত্রবিশেষে ঘটনাধর্মিতাকে বর্জন করে গল্পকে অন্তর্মুখী ও ইঙ্গিতময় করে তুলেছেন। তাছাড়া রিজিয়া রহমানের অধিকাংশ গল্পের পরিচর্যারীতি বিবরণধর্মীÑ ক্ষেত্রবিশেষ তাঁর গল্পের পরিচর্যারীতি ঘটনাধর্মী এবং ক্ষেত্রবিশেষ তথ্যধর্মী। তাঁর গল্পে ইতিহাসের স্বরূপ উন্মোচনে, অবরুদ্ধ সময়-সমাজকাঠামো এবং ব্যক্তিক জটিলতা উন্মোচনে ঘটনাধর্মী পরিচর্যারীতিই গল্পে অনিবার্যভাবে বিন্যস্ত হয়েছে। কাহিনি বিন্যাসে, ঘটনা-চরিত্র এবং পরিবেশের বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ পরিচয় প্রতিপাদনে ঘটনা ও তথ্যের ব্যবহার-বৈশিষ্ট্যের সরলীকরণ রিজিয়া রহমানের গল্পে বিশেষভাবে প্রতীকায়িত। গল্পকার গল্পের মৌলিক বোধ, অভিপ্রায় কিংবা পরিণামী বাস্তবতাকে দ্যোতিত করার তাগিদে প্রতীকতার আশ্রয় নেন। গল্পের বিষয়বৈচিত্র্যের সাথে রচনারীতির শৈল্পিক-প্রকরণ-বৈশিষ্ট্যের কারণেই রিজিয়া রহমান বাংলা ছোটগল্পে পৃথকভাবে চিহ্নিত হয়ে আছেন।

 

রিজিয়া রহমান জন্মসূত্রে [জন্ম ২৮ ডিসেম্বর, ১৯৩৯, পশ্চিমবঙ্গ, কলকাতাÑ মৃত্যু ১৬ আগস্ট ২০১৯ ঢাকা, বাংলাদেশ] অবিভক্ত বাংলার [পশ্চিম]; কিন্তু আবাসসূত্রে [ঢাকা] তিনি বিভক্ত বাংলার [পূর্ব]। ‘ত্রিভুজ’ পত্রিকায় সম্পাদক হিসেবে তাঁর পেশাজীবনের সূচনা। এরপর দায়িত্ব পালন করেছেন জাতীয় জাদুঘরের পরিচালনা বোর্ডে ট্রাস্টি ও জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের কার্যপরিচালক এবং বাংলা একাডেমির কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য হিসেবে। তাঁর জন্ম, কর্ম এবং আবাসের মধ্যেই ইতিহাস সন্তরণশীল। লেখক হিসেবে তাঁর বিচরণ ছিল জীবন-ইতিহাসের বিচিত্র পটে। আর একারণেই তাঁর সাহিত্যের বিষয়-বিন্যাস, শৈল্পিক প্রকরণে ইতিহাস প্রবহমাণ থাকবে এটাইতো স্বাভাবিক। তাঁর “রক্তের অক্ষর” [১৯৭৮] উপন্যাসের বিষয় বিন্যস্ত হয়েছে প্রান্তিক নারী-জীবনের অন্ধকার দিকগুলোকে কেন্দ্র করে। বাঙালির দীর্ঘ-জীবনের আখ্যান উপস্থাপিত হয়েছে “বং থেকে বাংলা” [১৯৭৮] সাহিত্যকর্মে। এছাড়াও তিনি “আবে রওয়াঁ” [২০০৬] উপন্যাসে ফুটিয়ে তুলেছেন অতীত শাড়ির কারিগরদের গবেষণালব্ধ জীবন-ইতিহাস। এছাড়াও তিনি “ঘর ভাঙা ঘর’ [১৯৭৪], “উত্তর পুরুষ” [১৯৭৭], “অরণ্যের কাছে” [১৯৮০], “অলিখিত উপাখ্যান” [১৯৮০], “শিলায় শিলায় আগুন” [১৯৮৬], “একটি ফুলের জন্য” [১৯৮৬], “নিঃশব্দ শব্দের খোঁজে” [২০০৫], “সুপ্রভাত সোনালি দিন” [২০০৬], “চন্দ্রাহত” [২০০৮], “সীতা পাহাড়ে আগুন” [ ২০১০], “পবিত্র নারীরা”সহ [২০১০] অসংখ্য উপন্যাস রচনা করেন। তাছাড়া আত্মজীবনী [নদী নিরবধি, প্রাচীন নগরীতে যাত্রা] , শিশুসাহিত্য [আজব ঘড়ির দেশে, ঝিলিমিলি তারা, মতিশীলের বাড়ি ও অন্যান্য] রচনায়ও পারদর্শিতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি একাধিক উপন্যাস, আত্মজীবনী, শিশুসাহিত্য রচনা করলেও তাঁর ভালোলাগায় জায়গা বাংলা ছোটোগল্প। তবে তাঁর গল্পে ঘটনার ইতিহাস অপেক্ষা মানুষের ইতিহাসই বেশি ক্রিয়াশীল। গল্পগ্রন্থের হিসাবে তাঁর মলাটবদ্ধ  গ্রন্থের সংখ্যা চার : “অগ্নিস্বাক্ষরা” [১৯৬৭], “নির্বাচিত গল্প” [১৯৭৮], “দূরে কোথাও” [২০০৪], “খাওয়া-খায়ির বাঙালি” [২০১০] এবং “চার দশকের গল্প” [২০১১]। তাঁর পাঁচটি গ্রন্থে মোট সন্নিবেশিত গল্পের সংখ্যা যথাক্রমে ১০টি, ১২টি, ১৩টি, ১২টি, ১৭টি; মোট ৬৪টি। তাঁর গল্পের বিষয়-বিন্যাসে অভিনবত্ব লক্ষণীয়। অনেক গল্পেই গল্পকার ইতিহাসকে গল্পের পরিপ্রেক্ষিত হিসেবে নির্বাচন করেছেন। তবে তাঁর গল্পে সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং সমকালীন জীবনভাবনাও বড় একটি স্থান জুড়ে আছে। আর এ-জাতীয় গল্পগুলো যে পরিবেশ বা আবহ ধারণ করে আছে তা থেকে সহজেই বৃহত্তর জীবন-সমাজভাবনার বৃহত্তর পরিসরে সেগুলোকে সহজেই উপন্যাসে রূপদান করা সম্ভব ছিল।

১. রিজিয়া রহমানের “অগ্নি-স্বাক্ষরা” দশটি গল্পের সমন্বয়ে প্রকাশিত প্রথম গল্পগ্রন্থ। গল্পগ্রন্থের প্রধান বিষয় হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে ইতিহাস-ঐতিহ্য, জমিদারি শাসন, পাহাড়ি জীবন-ব্যবস্থা, নরনারীর সম্পর্ক, মধ্যবিত্তের সংকট, রোম্যান্টিক ভাবাবেগ প্রভৃতি। এ-গ্রন্থের অধিকাংশ গল্প আয়তনগত বিচারে দীর্ঘÑ ‘অগ্নি-স্বাক্ষরা’ গল্পের আয়তন ৪০ পাতা, ‘সিন্ধু পতন’ গল্পের আয়তন ১৭ পাতা, ‘অনন্যা পৃথিবী’ গল্পের আয়তন ১৭ পাতা, ‘নির্জন প্রহর’ গল্পের আয়তন ১৯ পাতা, ‘এক কান্নার স্বাদ’ গল্পের আয়তন ২৭ পাতা, ‘লালটিলার আকাশ’ ২৯ পাতা। বর্ণনাত্মক এসব গল্পের বিস্তার দীর্ঘ হলেও একটি নির্দিষ্ট সময়-পরিপ্রেক্ষিত কিংবা ঘটনাক্রমের অথবা জনগোষ্ঠীর সমাজকাঠামো, জীবনায়তন ও জীবনাবেগ রূপায়ণে এ জাতীয় কাহিনি-বিন্যাস লেখকের গল্পপ্রকরণ-সতর্কতার সাক্ষ্য বহন করে।

‘অগ্নি-স্বাক্ষরা’ গল্পগ্রন্থের নামগল্পÑ গল্পের ‘মোটিফ’ নীলকুঠিয়ালদের অত্যাচার, জমিদারি শোষণ-শাসন। এ-গল্পটিকে লেখক সাতটি অনুচ্ছেদে বিভক্ত করে গল্পের আখ্যানভাগকে এগিয়ে নিয়েছেন, তবে অনুচ্ছেদগুলোর মধ্যে গল্প-ঘটনার এবং কালের পারম্পার্য রক্ষিত। গল্পের মূল কাহিনিতে প্রবেশের পূর্বে প্রথম বর্ণনধর্মী অনুচ্ছেদে লেখক গল্পের প্রেক্ষাপট রচনা করেছেন। নীলকরদের অত্যাচার, জমিদারি শোষণ, ইংরেজ ও সামন্তদের বিরুদ্ধে তীতুমীরের অভিযান, কুঠিয়ালের অত্যাচারে গুলনাহারের পিতা সৈয়দ আক্কাস সাহেবের মৃত্যু, গুলনাহারের প্রতিশোধপরায়ণ মনোবৃত্তি, মাতৃভূমি রক্ষাহেতু হায়দারে সংগ্রাম। সবকিছু মিলিয়ে ইতিহাসের একটি সংঘাতময়রূপ গল্পের পটভূমি হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।

গল্প-কাহিনি থেকে জানা যায় গুলনাহার তার বাবার অসুস্থতার সংবাদের গরুর গাড়ি করে স্বামী-সংসার মেহেরপুর থেকে বাঁশবাড়ী পিতৃলায়ে গমন করে। লেখক গুলনাহারের গমনপথের সূত্র ধরে ইংরেজদের কঠোর দমননীতি, ওহাবীআন্দোলন, নীলকর-জমিদারদের অত্যাচারের টুকরো টুকরো সংবাদ পরিবেশন করেছেন : ‘আজকাল পথে ঘাটে চলতে কুঠিয়াল সাহেবদের চাবুক হামেশা খেতে হয়। এই ওয়াহাবীআনার হিড়িক এসে সাহেবগুলোকে আরও ক্ষেপিয়ে তুলেছে। যাকে তাকে ওয়াহাবী সন্দেহ করে মারধর করছে।’ গুলনাহার যতক্ষণ বাড়ি পৌঁছায় ততক্ষণে অন্যায় দাবীর প্রতিবাদ করায় কুঠিয়ালদের নির্যাতনে সৈয়দ সাহেবের মৃত্যু হয়। বাবার মৃত্যুতে গুলনাহারের বুকে প্রতিহিংসার আগুন জ্বলে ওঠে; সে নীলকুঠি ধ্বংস না করা পর্যন্ত স্বামী সংসারেও না ফেরা প্রতিজ্ঞায় দৃঢ়রূপ ধারণ করে। গুলনাহার হাজার মানুষের মৃত্যুর প্রতিশোধ এবং ইংরেজদেরকে এদেশে থেকে তাড়াতে যোগাযোগ করে সংগ্রামী হায়দার ও তীতুমীরের সাথে। কিন্তু গুলনাহারের স্বামী দেবলগঞ্জের হিন্দু জমিদারের নায়েব মেশের আলী নিজ-স্বার্থসিদ্ধির জন্য হাত মেলায় কুঠিয়াল সাহেব, কৃষ্ণকান্ত জমিদার, গোবরডাঙার জমিদার কালিপ্রসন্নর সাথে। নারীলোলুপ জমিদার কৃষ্ণকান্তুও গুলনাহারকে ভোগের সামগ্রী করার জন্য উন্মত্ত হয়ে ওঠে। কুঠিয়াল সাহেবদের লাঠিয়াল, জমিদারের লোকজনের মিলিত শক্তির কাছে গুলনাহাররা পরাজিত হয়, হায়দার মৃত্যুবরণ করে। গল্পকার জানাচ্ছেন :

কুঠিয়াল সাহেবের লোকেরা যোগ দিয়ে নিষ্ঠুর উন্মাদনায় একের পর এক গ্রাম জ্বালিয়ে দিল। মানুষের ওপর চলল অমানুষিক অত্যাচার।           সাত দিন ধরে বাঁশবাড়ি, লাউহাটি, বেড়াচাপা গ্রামের উপর কাক পক্ষীও ডানা মেলতে ভুলে গেল ভয়ে। আগুন, ধ্বংস,           নিষ্ঠুরতা…….অত্যাচার…….আর মৃতের আহুতিতে ইংরেজ শাসনের ইতিহাসের প্রথম অধ্যায় কলঙ্কময় হয়ে উঠল।

 

গুলনাহার বন্দি হয় কৃষ্ণকান্ত জমিদারের হাতে; নেশাগ্রস্ত কৃষ্ণকান্তের চোখে গুলনাহার হয়ে ওঠে নেশার পাত্র। কিন্তু অগ্নি-স্বাক্ষরা গুলনাহারের অভিব্যক্তিতে প্রকাশ পায় আগুনের লেলিহান শিখা; সে আগুনে সে শুধু নিজেই জ্বলে নাÑ জ্বালিয়ে দিয়ে যায় কৃষ্ণকান্ত এবং কৃষ্ণকান্তের জমিদার বাড়ি। গল্পের ভাষায় :

 

লোভে উন্মাদ হয়ে হাত বাড়িয়েই সাপের ছোবল খেয়ে যেন পিছিয়ে এলেন রাজকান্ত রায়। একি ভৌতিক কা-।…গুলনাহারের সমস্ত     শরীর বেয়ে আগুনের লকলকে শিখা বেড়ীর মত ঘিরে রেখেছে। গুলনাহার ছুটে গিয়ে ঝাড়বাতি থেকে আরও কয়েকটা মোমবাতি তুলে           রূপোর থালায় সাজান মহার্ঘ্য রেশমী বস্ত্রে ঘরের অন্যান্য সব জিনিসে ছুটে ছুটে আগুন ধরিয়ে চলল উন্মাদের মত। মাতাল কৃষ্ণকান্ত     অসহায়ভাবে চীৎকার করতে লাগলেনÑ ‘আগুন’! ‘আগুন’! মতি! বাহাদুর! কোথায় তোরা সব? বাঁচা! আমাকে বাঁচা!

পরদিন তীতুমীর যখন এসে পৌঁছলেন তখন অগ্নি-স্বাক্ষরা মেয়ের শেষ চিহ্নটুকু কৃষ্ণাকান্ত রায়ের বাগানবাড়ির উদ্ধত কাঠ কড়ি-বরগার    খ-গুলো ভগ্নাবশেষের সঙ্গে মিশে গেছে। অগ্নি-স্বাক্ষরা মেয়ের আগুনের অদৃশ্য স্ফূলিঙ্গ ছড়িয়ে গেল বাঙলার আকাশে বাতাসে।

 

আসলে অগ্নি-স্বাক্ষরা কন্যার দেখানো পথেই এসেছে স্বাধীনতা, আবারও জেগেছে স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সেনারা, দেশ-উদ্ধারে রক্তগঙ্গা বয়েছে তীতুমীরের বাঁশের কেল্লায়, সেই অগ্নি-স্ফূলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়েছে ব্যারাকপুর, মীরাট, দিল্লি, ঝাঁসী, রাজপুতনা, মহারাষ্ট্র, গুজরাট, মধ্য প্রদেশ, বাংলা, বিহার, উত্তর প্রদেশ দিগি¦দিক।

 

সর্বজ্ঞ দৃষ্টিকোণে বর্ণিত ‘অগ্নি-স্বাক্ষরা’ গল্পের পরিচর্যায় একই সাথে আবেগধর্মিতা-ঘটনাধর্মিতা এবং নাটকীয়তার মেল-বন্ধন লক্ষ করা যায়। গল্পের অবয়ব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়Ñ নানাদিক থেকে গল্পটিকে দীর্ঘ করার প্রবণতা রয়েছে গল্পকারের। এ-প্রবণতাবশেই যুক্ত হয়েছে তীতুমীরের বীরত্বের ঘটনা, গ্রাম্য নারীদের নানা ধরনের গল্পালাপ, গল্পশেষে ওহাবীআন্দোলনের বিস্তারের ইতিহাস প্রভৃতি। এ-গল্পে ঘটনাধর্মী পরিচর্যা কখনও গল্প-কাহিনিকে আবার কখনও গল্প-চরিত্র-চিত্রকে বাঁক পরিবর্তনে যোগসূত্র স্থাপনে সহায়ক ভূমিকায় অবতীর্ণ। উপমা, কাব্যধর্মী বাক্য ব্যবহার এবং সুচিন্তিত ও সুপ্রযোজ্য শব্দ প্রয়োগে ‘অগ্নি-স্বাক্ষরা’ গল্পটি শিল্পসার্থক হয়ে উঠেছে।

 

রিজিয়া রহমান ‘সিন্ধু-পতন’ গল্পে সিন্ধু সভ্যতার ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাথে আধুনিক রোম্যান্টিক অনুভূতির সমন্বয় ঘটিয়ে গল্পটিকে অনবদ্য করে তুলেছেন। সিন্ধু নগরীর বাঁধ-দুর্গ প্রহরী শিবার্ক এবং নগরীর বারবনিতা ইনলার প্রেমকাহিনির বিয়োগাত্মক পরিণতিকে গল্পকার প্রতীকী অর্থে সিন্ধু-পতনের সাথে তুলনা করেছেন। ইনলা দীর্ঘদিন থেকে বিদেশি জাহাজে আসা অতিথিদের মনোরঞ্জন করে আসছে; শিবার্ক সব জেনেই ভালোবেসেছিল ইনলাকে। কিন্তু এবার শিবার্ক সূক্ষ্ম ঈর্ষার প্ররোচনায় বিদেশি পুরুষদের সামনে থেকে সরিয়ে আনতে ইনলাকে কটূবাক্যবাণে জর্জরিত করে। ইলনাও শিবার্কের কথায় ব্যথিত হয়ে প্রমোদতরীতে বিদেশি নাবিক মায়ুনের মনোরঞ্জনে বেরিয়ে পড়েÑ এরমধ্যে জলোচ্ছ্বাসের গর্জন শোনা যায়; সেই গর্জনে বাঁধ-দুর্গ প্রহরী শিবার্কও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেÑ কেটে দেয় বন্যা নিয়ন্ত্রণবাঁধ; রাশি রাশি পর্বতপ্রমাণ জলের ক্রুদ্ধা ঢেউ ভাসিয়ে নিয়ে যায় ইনলাকে-ভাসিয়ে নিয়ে যায় শিবার্ককে। যে-পূর্ণিমাতে শিবার্ক এবং ইনলা সারাজীবনের জন্য একে অপরের হয়ে সিন্ধুর জলে ভালোবাসার তরী ভাসাতে চেয়েছিলÑ সেই পূর্ণিমাতে তাদের প্রেমের তরী সিন্ধুর জলোচ্ছ্বাসে চিরতরে নিমজ্জিত হয়। গল্পকার তাদের নাটকীয় পরিণতির কথা জানাচ্ছেন এভাবে-

 

জলের সহ¯্র লোলুপ বাহু ছুটে এসে ইনলাকে ছিনিয়ে নিল শির্বাকের কাছ থেকে। …দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ জল¯্রােত ক্ষুধিত অজগরের           মত গ্রাস করে ফেলল শিবার্ককে। গ্রাস করল সিন্ধু নগরকে। শেষরাতে চাঁদ মৃত্যুনেশা বিহ্বল সিন্ধুর বুক আঁধার করে মেঘের আড়ালে       অস্তু গেল।

 

‘সিন্ধু-পতন’ গল্পটিকে গল্পকার তিনটি অনুচ্ছেদে বিভক্ত করে কখনো সর্বজ্ঞ দৃষ্টিকোণে আবার কখনো চরিত্রের সংলাপে শিবার্ক এবং ইনলার প্রেমকাহিনির পাশাপাশি প্রাচীন ইতিহাসকেও গল্পে সজীব করেছেন। গল্পকার পরিশীলিত গদ্যে ঐতিহাসিক চিত্রার্পণে অতীত ইতিহাস-ঐতিহ্য-সময়ের প্রতিরূপ নির্মাণ করেন। এ-গল্পে গল্পকারের রীতিকৌশলের সাথে ইতিহাস যেন দেহলতায় জড়িয়ে গেছে :

প্রতিবছর উর নাবিকেরা পণ্যদ্রব্যে জাহাজ বোঝাই করে বাণিজ্য করতে আসে সিন্ধুনগরে। তৎপরিবর্তে নিয়ে যায় সিন্ধুর তূলা। উরদের       বাণিজ্য বোঝাই হয়ে সিন্ধুর বিখ্যাত তূলা যায় দূর-দূরান্তেÑ মিশরে সুমেরিয়ার অন্যান্য রাজ্যে, গ্রীসে এমন কি ক্রীট দ্বীপে।

 

উত্তর পুরুষের বর্ণিত ‘প্রেম একটি নদী’ গল্পটি সম্পূর্ণই রোম্যান্টিকতার মোড়কে জড়ানো। গল্পে সরল বর্ণনার সাথে গল্পকার পরিচর্যা হিসেবে শুধু একটি স্বপ্নকে ব্যবহার করে পাঠককেও প্রেমের নদীতে অবগাহন করিয়েছেন। ঘুমের রাজ্যে প্রবেশ করে অ্যানথ্রোপলজির ছাত্রী রোকসানা হয়ে ওঠে প্রস্তর যুগের লাস্যময়ী-তন্বী-তরুণি ইমা; পাহাড়ির পরিবেশের মনোমুগ্ধকর পরিবেশে ইমা খুঁজে পায় তার ভালোবাসার মানুষ ইরিচকে- যদিও সে ভিন্ন গোত্রের। ইরিচ-ইমা ভালোবাসার সাম্পানে পাল উড়িয়ে ভেসে চলে ভালোলাগার জগতে-ভালোবাসার জগতে। গল্পকার ইমার হয়ে সে-কথা  জানাচ্ছেন এভাবে : ‘ওর কথা মনে হলেই আমার বুকে যেন ঝড়ো হাওয়ার উন্মত্ততা শুরু হয়। ইরিচকে ভাবতে আমার এত তীব্রভাবে ভালো লাগে কেন?’ ইমাদের গোত্রের যুবক ভলগা ইমাকে রানি বানাতে চাইলে ইরিচ নিজের বীরত্বের পরীক্ষা দিয়ে তাকে পরাজিত করে জয় করে ইমাকে; যদিও ইরিচ আগে থেকেই জয় করেছিল ইমার মন এবং ভালোবাসাকে। গল্পের যেখানে সমাপ্তি সেখানে স্বপ্নচারী রোকসানা আবার ফিরে এসেছে বাস্তবভূমিতেÑ কিন্তু তার মন থেকে যায় সেই প্রেমের নদীতেই : ‘আমার কল্পনার জগত থেকে এক টুকরো প্রেমের গানের সুর ভেসে এসেছিল। শাশ্বত চিরন্তন সেই প্রেমের নদী থেকে।’

“অগ্নি-স্বাক্ষরা” গল্পগ্রন্থের অন্যতম শিল্পসফল রচনা ‘লালটিলার আকাশ’ রচনাটি। উত্তম পুরুষের বর্ণিত, নয়টি অনুচ্ছেদে বিভক্ত গল্পে লেখক একই সাথে নর-নারীর প্রণয়-সম্পর্ক, দৈশিকবোধ এবং স্বার্থপর শ্রেণি-চরিত্রের ছবি এঁকেছেন। গল্পের উত্তম পুরুষ আরিফ পেশাগত ডাক্তারি-জীবনে লালটিলার কোলিয়ারিতে যোগদান করে; এখানেই কোলিয়ারি ম্যানেজার হ্যারি সিং ন্যাথানিয়েলের কন্যা রোজার সাথে তার প্রণয়-সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এখানে একটি বিষয় স্মরণীয় যে। হরি সিংহ পাঞ্জাবের ঝং জেলার এক অখ্যাত গ্রাম থেকে উঠে এসে ইংরেজ তোষণের মাধ্যমে কুলিয়ারি সর্দার থেকে ম্যানেজারের পদ দখল করে। অর্থ আর সামাজিক সম্মানে প্রলুব্ধ হ্যারি তার স্ত্রীর ওপর অমানষিক আচরণ এবং নিজেকে খাঁটি ইউরোপীয় ক্রিশ্চান ভাবতে আরম্ভ করে; যদিও সে তার গায়ের কালো রঙ বদলাতে ব্যর্থ হয়। এ-পদের জন্য ‘হার্টলেস হ্যারি’, ‘শয়তানরূপী মানুষ হ্যারি’ সিং নিজপতœী রোজানাকে ইংরেজ মিলার সাহেবের মনোরঞ্জনে বাধ্য করে এবং নিজধর্ম বিসর্জন দিয়ে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণের মাধ্যমে হ্যারি সিং ন্যাথানিয়েলে পরিণত হয়। হ্যারি সিং তার স্ত্রীকে যেমন ওপরে ওঠার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেছিলÑ এবার তার মেয়ে রোজাকেও অডিট পার্টির সদস্যদের মনোরঞ্জনে একইভাবে ব্যবহার করতে চায়। কিন্তু রোজা ছোটবেলা থেকেই ঘৃণা করতো হ্যারিকে। আরিফ হ্যারি সিং-এর নিকট থেকে রোজার জন্মইতিহাসের তথ্যে, জন্মের বৈধতার প্রশ্নে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে এবং শেষে মধ্যবিত্তসুলভ কাপুরুষতায় রোজাকে নিজের করে গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়; হ্যারি সিং তার স্বার্থসিদ্ধির জন্যে আরিফকে লালটিলার কোলিয়ারি থেকে কিল্লাবাগ কোলিয়ারিতে বদলি করে। অন্যদিকে দৈশিকচেতনায় উজ্জীবিত রোজা হ্যারির কথামতো কাজ করতে অস্বীকৃত হওয়ার কারণে হ্যারি তাকে গলাটিপে হত্যা করে। বিচারে হ্যারির যাবজ্জীবন কারাদ- হয়Ñ কিন্তু ততদিনে হ্যারির স্বার্থপর মানসিকতায়, আরিফের মেরুদ-হীন কাপুরুষতার বলি হতে হয় রোজাকে। গল্পের কথক পাঠককে সে তথ্য জানিয়েছেন এভাবে :

আমার রোজা। তোমাকে আমিও বঞ্চনা করলাম। লালটিলার বাতাস হু হু করে আমার বুকের মধ্যে বয়ে গেল।…লালটিলার বৃষ্টি না          সেই মেয়ের অতৃপ্ত নয়নের কান্না। যে ট্রুথ আর অরিজিনিল্যাটি খুঁজে পাবার আশায় উ™£ান্ত হয়ে ঘুরছে।

‘লালটিলার আকাশ’ গল্পের মূল-বিষয়কে রিজিয়া রহমান চিত্রিত করেছেন গল্পের কথক আরিফের দৃষ্টিকোণ থেকে। এ-গল্পের রোজা চরিত্রটি জীবনযন্ত্রণার জতুগৃহে বেড়ে উঠেছে। সত্য এবং স্বাদেশিকতার স্বরূপ সন্ধানে সে হ্যারি সিং-এর বিরুদ্ধে অস্তিত্বের পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছে। তার চরিত্রের মানসিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া উন্মোচনে নাটকীয় পরিচর্যার সাথে বিশ্লেষণাত্মক পরিচর্যা (ধহধষুঃরপধষ ঃৎবধঃসবহঃ) এ-গল্পে অনিবার্যতা পেয়েছে। এছাড়া রোজার মা সুজানার বিপর্যস্ত জীবনের কথা চিত্রিত হয়েছে উত্তম পুরুষের দৃষ্টিকোণে। হ্যারি সিং অনেকটা টাইপ চরিত্র বা একরৈখিক চরিত্র। যার একমাত্র লক্ষ্য নৈতিক কিংবা অনৈতিক উপায়ে সম্পদের পাহাড় গড়া। অন্যদিকে কথক চরিত্র আরিফের ওপর মধ্যবিত্তের বৈশিষ্ট্য আরোপ করে গল্পকার তাকে প্রথাগত চরিত্রে রূপ দিয়েছেন।

“অগ্নি-স্বাক্ষরা” গল্পের অধিকাংশ গল্পের ঘটনাবিন্যাস, প্লট নির্মাণ, চরিত্রায়ণ কৌশল, দৃষ্টিকোণ ব্যবহার, গল্পের পরিণাম নির্দেশে রিজিয়া রহমান প্রায়ই ভিক্টোরীয়রীতির ব্যবহার করেছেন। তাই এ-পর্বে রচিত গল্পগুলোতে বর্ণনধর্মিতার ব্যবহারে গল্প-ভাষা রচিত হয়েছে।

 

২. রিজিয়া রহমানের “নির্বাচিত গল্প” গ্রন্থে মোট গল্পের সংখ্যা বার। এ-গ্রন্থের অধিকাংশ গল্পে দারিদ্র্যক্লিষ্ট মানুষ জীবনচিত্রের অনুপুঙ্খরূপ বর্ণনা, নবজাত যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের বহুবিধ অস্থিরতা, নাগরিক মধ্যবিত্ত ও নি¤œবিত্তের জীবন, মধ্যবিত্তের কৃত্রিমতা, অতৃপ্তি, আত্মদ্বন্দ্ব, অসহায়ত্ব, রাজনৈতিক নেতাদের হঠকারিতা, রাজনৈতিক সংকট, সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র উঠে এসেছে। দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের ক্ষুধাজনিত যন্ত্রণা এ-গ্রন্থে নতুন মাত্রায় উদ্ভাসিতÑ বিশেষ করে ‘জামালপুরের চিঠি’, ‘মাধ্যকর্ষণের সীমানায়’ এবং ‘ইজ্জত’ গল্পে আছে তার প্রমাণ-বৈশিষ্ট্য। এছাড়া নারী-নিগ্রহ-লাঞ্ছনার ছবিও অঙ্কিত হয়েছে সমকালীন সময়-পরিবেশের আলোকে। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিকায় রচিত হয়েছে ‘জামালপুরের চিঠি’ এবং ‘ইজ্জত’ গল্পদুটি; ‘জন্ডিস’ গল্পে বাংলাদেশের রাজনৈতিক চিন্তাধারার প্রকাশ ঘটেছে।

“নির্বাচিত গল্প” গ্রন্থের কিছু গল্পে লেখক বর্ণনার মধ্যে সংলাপের ব্যবহার করেছেনÑ এ কারণে গল্পের পরিবেশ-প্রতিবেশ যেমন ব্যঞ্জিত হয়েছেÑ তেমনি ফুটে উঠেছে চরিত্রের মনোজাগতিক অবস্থা। চরিত্রের আত্মকথন, স্মৃতিচারণ, চেতন থেকে অবচেতনে যাওয়া আসার প্রক্রিয়া সক্রিয় থেকেছে গল্পের অন্তর ও বাহ্যিক বুননে। সেই সাথে যুক্ত হয়ে তীক্ষ্ম-ঝকঝকে ভাষার গাঁথুনি, ক্ষেত্রবিশেষ আঞ্চলিক ভাষার নিপুণ প্রয়োগ। যেমন ‘জামালপুরের চিঠি’ থেকে তার একটি উদ্ধৃতি স্মরণযোগ্য :

ঘাড় বাঁকা করেছে হাতেমÑ ক্যান, কিয়ের লাইগ্যা? আমি যুদ্ধ করছি আমার মা বইনেগো ইজ্জত বাঁচাইতে। অত্র দ্যাশে থনে দুষমন      খেদাইবার। আমাগো শেখ সাবেরে ফিরাইয়া আনবার। আমি বড় ট্যাকার লোভে চাকরির লালচে যুদ্ধ করছি নিকি? কি কাম শহরে আমাগো এই গেরামই ভালো।

‘জামালপুরে চিঠি’ গল্পে গল্পকার বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিকে বর্ণনা করেছেন মুক্তিযোদ্ধা হাতেমের দাদীর দৃষ্টিকোণ থেকে; এর পাশাপাশি নি¤œবিত্ত-আশাবাদী মানুষের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে শিল্পের সততায়।

‘জন্ডিস’ গল্পে স্বাধীনতা-উত্তর সমাজবাস্তবতার বিবিধ চিত্র সন্নিবেশিত হয়েছে। লেখকের তীক্ষ্মদৃষ্টিভঙ্গির বর্ণনায় একজন আদর্শবাদী রাজনীতিবিদের চালচিত্র, মিটিং-মিছিল, স্বজনপ্রীতি, নি¤œবিত্ত মানুষের দৈনন্দিন জীবনজিজ্ঞাসার প্রতিচ্ছবি এবং গল্পের প্রধান চরিত্র হাবীব সাহেবের স্ত্রীর কথাতে বৈষয়িক-বিষয়সমূহ গল্পে আলোকিত হয়েছে :

তুমি ওর খবর কিছুই রাখো না দেখছি। ওর বাবার বেশ কয়েকখানা বাড়ি আছে। তাছাড়া উত্তরবঙ্গে ওদের হাজার বিঘের ওপরে     ধানের জমি। বড় দুটো ভাই আমেরিকায় সেটেলড। শুধু আদর্শের জন্য ও নিজে সংগ্রামে নেমেছে।

‘মাধ্যকর্ষণের সীমানায়’ গল্পে যন্ত্রসভ্যতার প্রতি নির্ভরতা, দৈশিক মূল্যবোধের সঙ্গে পাশ্চাত্য মূল্যবোধের সংঘর্ষের স্বরূপটি স্পষ্ট। তাছাড়া সমাজস্থ মানুষের মানসিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত সাবের সাহেবের স্ত্রীর সংলাপে উপস্থাপিত হয়েছে। দৈশিক মূল্যবোধের যে পতন ঘটেছে বা আমাদের নিজস্ব মূল্যবোধের সীমানা ছেড়ে যে অনেক দূরে চলে গেছে তা মিনির আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন। বিজ্ঞান-নির্ভর সভ্যতার ইতিবাচক দিক থেকে নেতিবাচক দিকগুলো যে পৃথিবীকে অস্থির এবং অনিরাপদ করে তুলছে তা মিনির আত্মভাবনায় প্রকাশিত। উচ্চবিত্ত এবং নি¤œবিত্ত মানুষের মধ্যে নানা ধরনের ব্যবধানের সাংঘর্ষিক রূপ, নিস্তরঙ্গ জীবনচিত্র মিনির বাবা [প্রেসের কম্পোউজিটার], মিনির মা [মেসের ঝি] চরিত্রের মধ্যে দিয়ে লেখক এঁকেছেন। গল্পটি আত্ম-বিলুপ্তি নি¤œবিত্ত মানুষের আত্ম-অস্তিত্ব আবিষ্কারের ফল; জীবন ঘূর্ণিপাকে হারিয়ে যাওয়া মিনির জীবন-ইতিহাসের মধ্যে দিয়ে গল্পে প্রস্ফুটিত। যেমন :

এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকার অর্ধেকের বেশি লোক অর্ধভুক্ত অনাহারী। পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ শিশু পুষ্টিহীনতায় পঙ্গু। লক্ষ লক্ষ       বেকার কাজের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছে। অগণিত নারী ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য দেহ বিক্রি করছে। একি আপনারা জানেন? জানতে চান?     তাহলে কেন বলছেন, অজানাকে জানাই জ্ঞান-বিজ্ঞানের ধর্ম?

‘ইজ্জত’ লেখক গল্পে হালিমনের জীবনসংগ্রাম এবং পরিণতিতে তার ভিতর ও বাহির নিঃস্ব হওয়ার কাহিনি উপস্থাপন করেছেন। যুদ্ধকালীন পরিবেশে হালিমন পাকহানাদার সৈন্যদের হাত থেকে- নারী-নির্যাতনের অবমাননকার পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পেতে আগুন ঝাঁপ দিয়েছিল। দেশ স্বাধীন হলে রিলিফের লোকেদের সহযোগিতায় দুপা-পোড়া হালিমন গোলপাতা দিয়ে ঘর তুলে লালসা-উন্মত্ত লোকেদের নজর থেকে; বিরূপ বিশ্ব থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রামে লিপ্ত হয়। কিন্তু জঠরজ্বালা তাকে দিনদিন অস্তিত্বহীনতার দিকেÑ সম্ভ্রম হারানোর পথে ঠেলে দেয়। মুক্তিযুদ্ধ তাকে শারীরিকভাবে পঙ্গু করেছিলÑ কিন্তু ক্ষুধা-বন্যা তাকে পঙ্গু করেছিল মানসিকভাবে। নিজের অস্তিত্বরক্ষায় তাকে বিকিয়ে দিতে হয়েছিল ইজ্জত।

বিভিন্ন অবস্থার প্রেক্ষিতে হালিমনের সাথে সম্পৃক্ততায় নানা পটভূমি-পরিবেশ নির্মাণে লেখকের পরিচর্যারীতি ক্ষেত্রবিশেষ চিত্রধর্মী, শ্রাব্যকল্পময়। প্রথাগত বর্ণনার সঙ্গে সঙ্কেতময়তা ও চিত্রধর্মের সমন্বয়ে গল্পকার গল্পের প্রান্তিক পরিণতিকে দ্যোতিত করেছেন। বন্যার পানিতে বস্ত্র ভেসে যাওয়ার সমান্তরালে লেখক হালিমনের ইজ্জত ভেসে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিত রচনা করেন ইঙ্গিতময়তায়। চরিত্র রূপায়ণের ক্ষেত্রে লেখক সরল প্রতীকায়নের আশ্রয় নিয়েছেন :

অসহায় চোখে তাকিয়ে দেখল তার-শরীর-আবরণী শতছিন্ন ন্যাকড়ার টুকরোটা বানের পানি ভাসিয়ে নিয়ে গেছে অনেক দূর। ক্ষুধায় শরীর সাঁতরে সেটা ধরা আর সম্ভব নয়। সে কি এখন ডুবে মরবে? কিন্তু অভুক্ত শরীরে মনের সে জোর কোথায়? বরং শূন্য জঠরে যে বাঁচারই আকুলি-বিকুলি।

‘সেই যন্ত্রণা’ গল্পে লেখক আলম এবং শীলার জীবন-ভাবনার মধ্য দিয়ে বিবর্তনশীল সমাজকাঠামো এবং তার অন্তর্গত ব্যক্তিক ও সামূহিক যন্ত্রণার দ্বন্দ্বজটিলতা, স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য জীবনের মানসিক দ্বন্দ্ব বা যন্ত্রণাকে উদ্ভাসিত করেছেন। একটি সমস্যা থেকে উত্তরণের পর আরেকটি নতুন সমস্যা কীভাবে জীবনের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় তা দুটির চরিত্রের মনোজগতের বিশ্লেষণে লেখক স্পষ্ট করেছেন :

যখন সে জীবনে কোন অফিসের সিঁড়ি পর্যন্ত মাড়ায়নি রান্না ঘরই ছিল তার জগৎ, তখনকার দিনে এ যন্ত্রণা কোথায় ছিল? এর জবাবে     শীলা কিন্তু ভাবতে পারল না যে, এ যন্ত্রণা ছুরির দ্বিমুখী ফলার মতÑ বস্তুবাদী যন্ত্রণা হয়তো।

আসলের আধুনিক সমাজ ও সময়স্বভাবের এবং ব্যক্তির মানসিকজগতের রূপান্তরধর্মিতার নিগূঢ় উপলব্ধি রিজিয়া রহমানের শিল্পরীতিকেও করেছে প্রাগ্রসর ও নবমাত্রিক।

“নির্বাচিত গল্প” গ্রন্থে বিষয়-বিন্যাসের গভীরতা, বিষয় অনুসারে ভাষা ব্যবহারের নিপুণতা, তীক্ষè পর্যবেক্ষণ শক্তির অভিব্যক্তি একজন বলিষ্ঠ লেখক হিসেবে রিজিয়া রহমানকে পরিচয় করিয়ে দেয়।

 

৩. রিজিয়া রহমানের তেরটি গল্প-সম্বলিত “দূরে কোথাও” গ্রন্থে চলমান বাস্তবতার নানা ঘটনাপ্রবাহ, নাগরিক জীবন-জটিলতা, চরিত্রের অন্তর্দ্বন্দ্ব, ব্যক্তির স্ফূরণের বহুবর্ণিল চিত্র, প্রণয়-সম্পর্ক প্রভৃতি উঠে এসেছে। এ-গ্রন্থের গল্পগুলোতে লেখকের সর্বজ্ঞ দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক ও অবচেতনাগত নিগূঢ় সংকটের উন্মোচন ঘটলেও চরিত্রের প্রেক্ষণবিন্দু স্বগতকথনের ভঙ্গিতে বিমিশ্র হয়েছে লেখকের সর্বজ্ঞার সাথে। ফলে একই সাথে যেমন বহির্বাস্তবতার চিত্র ফুটে উঠেছেÑ তেমনি উন্মোচিত হয়ে ঘটনা-চরিত্রের অন্তর্বাস্তবতা। এ-গ্রন্থের অধিকাংশ গল্পের চরিত্রায়ণ কৌশল প্রতিনিধিত্বমূলক, কৃত্রিমতাবর্জিত ও আত্মানুসন্ধানী।

 

গল্পকার ‘দূরে কোথাও’ গল্পে বাস্তবিক ঘটনাচিত্র, জাগতিক আলোড়ন, চিন্তা, প্রতিক্রিয়া ও অনুভবকে গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র আশরাফ উল মখলুকাত বিন্দু-চরিত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে উন্মোচন করেছেন। লেখকের সর্বজ্ঞ দৃষ্টিকোণের সঙ্গে চরিত্রের প্রেক্ষণবিন্দুর সমন্বয়ে বহির্জগৎ হয়ে উঠেছে দৃশ্যমান, রূপময়Ñ যেখানে স্পষ্টভাবে প্রতীকায়িত হয়েছে তিরিশ বছরের দিগভ্রান্ত যুবক বিন্দুর নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া। জীবনযুদ্ধে পরাস্ত আশরাফ নিজের অক্ষমতা-ব্যর্থতা থেকে পালাতে চায় দূরে কোথাও; কিন্তু সেই পালানোর ঠিকানা তার জানা নেই। প্রথাগত সমাজব্যবস্থায় আশরাফ তার আদর্শ-মেধার কোনো মূল্যই পায়নি। বরং হারিয়েছে বাবা-মায়ের ভালোবাসা, তার আশরাফ [শ্রেষ্ঠ] নামের মর্মার্থ; তাই স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় সে হারিয়ে গেছে মনোবিকাররাজ্যে। সে প্রত্যক্ষদৃশ্যে জেনেছে তার বোন এবং ভাইয়ের অধঃপতনের অন্ধকার জগতে হারিয়ে যাওয়ার  ঘটনা। গল্পের ভাষায় :

তারপর বিষণ্ণ কণ্ঠে কথা বলে-ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় বলেই আজমল আর বুলা হারিয়ে গেল। ওদের পূর্ণিমার চাঁদে ঝলসানো    পোড়া রুটির দুর্গন্ধ। কবিতা ওদের বাঁচতে দেয়নি। আমাকেও না।

লেখক গল্পটি শুরু করেছেন বর্তমান থেকেÑ তবে লেখক ধীরে ধীরে তার মধ্যে প্রবেশ ঘটিয়েছেন চেতনাপ্রবাহরীতি। তাছাড়া ফ্ল্যাশব্যাক রীতি ব্যবহার করেও আশরাফের পারিবারিক অবস্থা-স্বজন, শিক্ষাজীবন, ভালোলাগা নারী বায়নার স্মৃতি, তার চাকরিজীবী বাবার আদর্শবাদীজীবনচেতনা প্রভৃতি। বাস্তবের সাথে আদর্শের যোগসূত্র স্থাপনে ব্যর্থ আশরাফকে তাই পেয়ে বসেছে মনোবিকার। জীবন থেকে পালিয়ে আশরাফ হারিয়ে যেতে থাকে অন্তর্গত কোনো স্মৃতির প্রান্তরে। কিন্তু তার সেই পালানো দূরের ঠিকানা অজানা থাকার কারণে এখানেও সে চরমভাবে ব্যর্থ হয়। তাই তখনো পালানো ছাড়া তার আর গত্যন্তর থাকেনা :

পালাতে থাকে আশরাফ। প্রান্তর, নদী, বাজার, লোকালয় পেরিয়ে যায়। ধেয়ে আসছে হিংস্র সমুদ্র, পুলিশের গাড়ি, সশস্ত্র যত বিকৃত,                  ঘৃণ্য, পঙ্গু মানুষেরা। ছুটতে ছুটতে শ্রান্ত ভয়ার্ত যুবকটি প্রশ্ন করে মনকে।কোথায় পালাব বল?

দূরে। দূরে কোথাও। অনন্তকাল ধরে পালাতে থাক।

…পলকে সে এক হাল্কা পালক হয়ে ভেসে যায়। পার হয় গ্রাম-শহর, নগর, বন্দর, দেশ-মহাদেশ। পেরিয়ে যায় সময়ের ঘড়ি, পৃথিবীর    সীমানা ছাড়িয়ে দূরে কোথাও।

 

‘অন্ধরাতের রেলগাড়ি’ গল্পের আখ্যান রচনা, ঘটনার বিস্তার, চরিত্রের ভাবনা-চিন্তা গল্পকারের সর্বজ্ঞ দৃষ্টিকোণ থেকে বর্ণিত হলেও নানা শ্রেণি-পেশার চরিত্রের প্রেক্ষণবিন্দুই প্রধান হয়ে উঠেছে। গল্পকথক কমলাপুর স্টেশন থেকে ছেড়ে যাওয়ার ‘ফকিরণী’ রেলগাড়ির যাত্রী হিসেবে যাত্রাপথে শুনেছেন বিভিন্ন মানুষের কথোপকথন; এবং তাতেই ফুটে উঠেছে গ্রাম্য হাটের ক্যানভাসার, ছোটদের ‘হুটোপুটি’, দিনমজুরের পরিবারের চালচিত্র, পাটকলের ছাটাই করাই শ্রমিকের জীবনভাবনা, রিক্সা চালকের স্ত্রী ফাতেমা বিবির দিনলিপি,  হকার, হুজুর, চাঁদবিবির বিভিন্ন প্রতিচ্ছবি।

“দূরে কোথাও” গ্রন্থের অন্যতম শিল্পসফল গল্প ‘জামিলা হাসানের পতন’। উত্তমপুরুষে বর্ণিত বর্ণনধর্মী এ-গল্পে গল্পকার ফ্ল্যাশব্যাক রীতি এবং একইসাথে চেতনাপ্রবাহরীতির চমৎকার ব্যবহারের মাধ্যমে জামিলা হাসানের পতনের মধ্য দিয়ে আমাদের সমাজ-সংসার, পারস্পরিক সম্পর্ক, শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, ভালোবাসার পতনকেই প্রতীকায়িত করেছেন। এ-গল্পে সমাজ-ব্যক্তির-সময়ের পতনের কথা নির্মাণে লেখকের ভাষা হয়ে উঠেছে নির্মোহ-নির্মেদ।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে স্বামী হারা-কলেজ শিক্ষক জামিলা হাসান বারো কাঠা জমির ওপর দেয়াল ঘেরা বাড়িতে স্বামীর স্মৃতি দুহাতে জড়িয়ে রেখেছিল; সে নিজেকে পাড়াপ্রতিবেশী-স্বজনদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজের মতো করে বাঁচতে চেয়েছিল একমাত্র মেয়েকে কেন্দ্র করে। বিমূর্ত শিল্পের মতো একধরনের ‘দুর্বোধ্য সম্ভ্রমের ইমেজ জড়িয়ে গিয়েছিল তার সাবেকী বাড়ির বাতাসে।’ বাইরের মানুষের কাছে জামিলা হাসানের বাড়ি এবং জামিলা হাসান ছিল এক অনতিক্রম্য রহস্য। কিন্তু তার মেয়ে একাত্তরের এক ঘাতকের ছেলেকে বিয়ে করে হাওয়াইতে চলে যায়Ñ জামিলা হাসান ভিতর এবং বাহির উভয় জায়গাতেই শূন্য হয়ে পড়ে। তবে তাকে নিয়ে পাড়ার নারী ও পুরুষ মহলে নানা ধরনের ইতিহীন মুখরোচক-কল্পকথার প্রচলন ছিল। সময়ের প্রয়োজনে পাড়ার অধিকাংশরা নিজেদের বাড়ি ভেঙে নতুন বাড়ি নির্মাণ করলেও শুধু ব্যতিক্রম ছিল জামিলা হাসান। জামিলা হাসানের বাড়িতে ফাটল ধরেছিল; কিন্তু সে যেমন নিজেকে অন্যদের থেকে লুকিয়ে রেখেছিল। তেমনি লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিল বাড়ির ফাটলকে। কিন্তু ভয়াবহ-মহাদুর্যোগ কবলিত এক অকাল বর্ষণে জামিলা হাসানের ফাটল ধরা বাড়িটি ধ্বসে পড়ে; বাড়ির গভীর খাঁদের এক অতল অন্ধকারে চিরতরে হারিয়ে যায় জামিলা হাসান।

জামিলা হাসানের পতনের অনেকদিন পরে গল্পকথক কোনো এক বৃষ্টিভেজা রজনীতে অদ্ভুতভাবে নষ্টালজিক হয়ে দাঁড়ায় জামিলা হাসানের সেই পুরোনা বাড়ির সামনে। কথক চেতনাজগতে দেখতে পায় জামিলা হাসানকে, জানতে পেরেছিলেন তার একাকিত্বজীবন-যাপন, পরবর্তীতে পতনের কারণ। জামিলা হাসান জানাচ্ছেন :

তোমরাই। তোমাদের ভাঙন আমার চারপাশে, আমার বাড়িতে, আমার চেতনায় ফাটল ধরিয়েছিল। অসহায় আমি কেবলই     চারদিক শুনছিলাম তোমাদের ভাঙনের শব্দে। আমি নিঃসঙ্গ হয়ে গিয়েছিলাম। কেউ ছিল না আমার পাশে। কেউ না।…

তুমি, তোমরা, তোমরা সবাই সবকিছু ভাঙছো। ভেঙে চলেছো অবিরাম। আমার বিশ্বাস, অতীত, আমার ইতিহাস সবই এখন ভাঙনের           কবলে। শুনতো পাচ্ছো চারদিকে অবিরত ভাঙনের শব্দ!

আসলে প্রথাগত সমাজ-প্রতিবেশ, সমাজস্থ মানুষ একাত্তরের যুদ্ধে স্বামী হারানো-আরও পরে মেয়ে হারানো একটি নিঃসঙ্গ নারীর অবদমিত বেদনাকে বুঝতে পারেনি; দেখতে পায়নি তার অন্তর্যন্ত্রণা। আলোচ্য গল্পের জামিলা হাসান চরিত্রের অন্তর্ময়-বাস্তবতা, সঙ্কট ও যন্ত্রণার রূপায়ণে লেখক বাড়ির প্রতীকী ফাটলের মাধ্যমে তার চরিত্রের স্বরূপ তুলে ধরেছেন। এ-গল্পের ঘটনাবিন্যাস বর্ণনধর্মী কিন্তু গল্পের পরিণতি লাভ করেছে প্রতীকীমূলে।

সর্বজ্ঞ দৃষ্টিকোণে বর্ণিত স্বল্প আয়তনের ‘জ্যোৎ¯œার পোস্টার’ গল্পটি ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটকে ধারণ করে আছে। এ-গল্পে নর-নারীর প্রেম-ভালোবাসা, ভাষার প্রতি ভালোবাসা যেন একই সূত্রে গল্পকার গেথে তুলেছেন। ভাষা আন্দোলনের পোস্টার বিতরণের জন্যই মাহফুজ সবার কাছে ‘পোস্টার বয়’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। মাহফুজ শেষ পর্যন্ত জীবন দিয়ে প্রমাণ করে যায় ‘মায়ের ভাষা’, ‘মুখের ভাষা’, ‘মানুষের ভাষা’, ‘বাঙালির ভাষা’র প্রতি গভীর ভালোবাসার তীব্রতা। কিন্তু মাহফুজকে হারিয়ে রাণুর যে আর্তনাদ তা যেন জ্যোৎ¯œার আলোয় মা, ভাষা এবং ভালোবাসা একই রূপে প্রকাশ পায় :

হাওয়া শুধু উড়িয়ে আনছে বিশাল গর্জনের ধ্বনিÑ ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। ভেসে আসছে মাহফুজের পোস্টারের শ্লোগান। মায়ের     ছবিটাকে দু’হাতে আঁকড়ে ধরল রাণুÑ মা। কথা বলছ না কেন তুমি? আমি যে ওকে ভালবাসি মা! ও তো অন্যায় করেনি মা। ও      আমাকে ভালবেসেছে। ও ভালবেসেছে ওর মায়ের ভাষাকে…আমার মতই।

এ-গল্পের মানসদ্বন্দ্বের উৎসমূলে ক্রিয়াশীল দৈশিকচেতনা-ভাষাচেতনা এবং একই সাথে রোম্যান্টিক অনুভবময়তা। ফলে প্রতীকী ভাবনায় এবং দৈশিকচেতনার আলোকে ধরা পড়েছে রাণু-মাহফুজ-মাজেদ চরিত্রের অন্তঃস্বরূপ।

৪. রিজিয়া রহমানের “খাওয়া-খায়ির বাঙালি” গ্রন্থে ১২টি গল্পের সন্নিবেশ ঘটেছে। এ-গ্রন্থটি মূলত রম্যরচনা-প্রকৃতির কিংবা হাস্যরসপ্রধান। গল্পকার এ-রচনায় জীবন ও সমাজকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে অসঙ্গতিগুলোকে হাস্যরসের আধার করে তুলেছেন। এ-অসঙ্গতি প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে কখনও বেছে নিয়েছেন ব্যঙ্গ আবার কখনও কৌতুকরস। লেখকের লেখনীতে কৌতুক ঝলসে ওঠে না, কিন্তু গোপন ইঙ্গিতময়তা ছলকে ওঠে স্বচ্ছন্দ ভঙ্গিতে। তাঁর এ কৌতুকরস বা ব্যঙ্গরস তাঁর রচনাতে কখনও নির্ভেজাল আনন্দদান করেছে আবার কখনও তা সমাজ বা ব্যক্তিশোধনার্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

“খাওয়া-খায়ির বাঙালি” গ্রন্থের প্রারম্ভিক গল্প ‘সংস্কৃতির ঢেঁকি’। গল্পতথ্য থেকে জানা যায় হেকমত আলী অল্পবেতনের চাকুরে। সে সুখীদাম্পত্যের আশায় বিয়ে করে নাইনপাশ-অল্পবয়সী কিশোরীকে। হেকমত আলী ভেবেছিল অল্পবয়সী হওয়ার কারণে অন্যান্য নারীদের মতো তার চাওয়া-পাওয়া থাকবে নাÑ সংসারে মনোযোগী হবে। কিন্তু দেখা গেল অন্যান্য নারী বা বউদের মতো সেও হয়ে ওঠে উচ্চাকাক্সক্ষীÑ তারও চায় দামী গয়না-শাড়ি-চূড়ি। হেকমত আলী তার এক বন্ধুর পরামর্শে বউকে উপন্যাসের বই পড়তে দেয়Ñ কিন্তু তাতে কাজ হলেও হেকমতের স্ত্রী নিজেকে দেখতে চায় নায়িকার মতো এবং স্বামীকে দেখতে চায় নায়কের মতো; তাতে সৃষ্টি হয় নতুন বিপত্তি। এবার বন্ধুর পরামর্শে প্রবন্ধ পড়তে দেয়Ñ তাতে আবারও নতুন বিপত্তিÑ বউ পুরোনো সংস্কৃতি-ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে তৎপর হয়ে ওঠে। বাড়িতে আসে ঢেঁকি, কুলা, সরা, মাটির পাত্রÑ পুরোনা যা কিছু সব। পরিশেষে অপসংস্কৃতির মধ্যেই ঢুকে যায় বউÑ এভাবে অতীষ্ট হয়ে ওঠে হেমকত আলীর জীবনÑ জীবন হয়ে ওঠে যন্ত্রণাময়।

‘ইতস্তত সংলাপ’ গল্পে হাস্যরস থাকলেও তার অন্তরালে যে ইঙ্গিতময়তায় বড় হয়ে উঠেছে। গল্পটি শুরু হয়ে খালা-বোনঝির ‘মহামারী’র ব্যাকরণগত দিক আলোচনার মাধ্যমে। শুরুতে সরস হাস্যরস প্রধান্য পেলেও তা ধীরে ধীরে উজ্জ্বল সংলাপে রূপ লাভ করে। হাস্যরসের মধ্য দিয়েই দ্বন্দ্বজটিল বিষয়গুলো সামনে এসে যায়Ñ “… মহা আকারে বাংলাদেশে মানুষ মরছে অন্যভাবে। আর ডায়রিয়া মহামারীর তো চিকিৎসা আছে। এর তো চিকিৎসা নেই। কী সাংঘাতিক ভেবে দেখেছ।” বাস্তবিক অর্থে ডায়রিয়া, প্লেগ, কলেরয়া বা কোনো রোগই প্রকৃতঅর্থে যে মহামারী তা নয়। তার কয়েকশত গুণ বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করে যুদ্ধের কারণে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে, দুর্ঘটনার কারণে। সত্যিকার অর্থেই এগুলোই মহামারী হওয়া উচিত বলে লেখকের অভিমত।

‘খাওয়া-খায়ির বাঙালি’ গল্পে বাংলা ভাষাতে খাওয়ার বিষয়টাকে ব্যাপক অর্থে ব্যবহার করে হাস্যরসের সৃষ্টি করা হয়েছে। প্রকৃতঅর্থে বাংলা ভাষাতে খাওয়া যায় নাÑ এমন বিষয় নেই। বাঙালির শেকড় থেকে শুরু করে বর্তমানকাল পর্যন্ত এক ধরনের দার্শনিক ব্যাখ্যা আছে গল্পেÑ যা রসাত্মকভাবে পাঠকের সামনে লেখক উপস্থাপন করেছেন। এছাড়া গ্রন্থের ‘ইয়ংবেঙ্গল’, ‘হাবিব মায়ের গ্রিন হাউস’, ‘সাফাই আলীর অগস্ত যাত্রা’, ‘বিভ্রান্ত উৎসব’, ‘চট-জলদি-ফট’, ‘হালের চাল’, ‘দুর্মুখোক্তি’, ‘দুর্মুখোক্তি-২’ প্রভৃতি গল্পগুলোতেও হাস্যরস প্রযুক্ত হয়েছে। গ্রন্থের ‘হাস্যরস তরল নয়, স্থূল নয়, বেশ তীক্ষ্ম।  সামাজিক সমস্যার, ব্যীক্তক সমস্যা বা অসঙ্গতির গাঁয়ে সূঁচালো ফলার মত ফুটে যায়’।

৫. ভাষা ছোটগল্পের শৈলীবিচারে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত। কেননা, গল্পের বিষয় বিন্যাস, চরিত্রায়ণ কৌশল, পরিচর্যারীতিকে স্পষ্ট করে তোলে ভাষা। রিজিয়া রহমানও গল্পের ভাষা ব্যবহার সম্পর্কে একটি নিজস্ব চিন্তা-চেতনা ধারণ করেন। রিজিয়া রহমানের কথাসাহিত্যের ভাষা একাধারে বৈদগ্ধ্যপূর্ণ ও অলঙ্কারবহুল। গল্পকারের শব্দ ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রে আভিধানিক অর্থ ছাড়িয়ে অনেকটা অলঙ্কারম-িত ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে যার মধ্য দিয়ে কল্পনার বিস্তার ঘটেছে পাঠকমনে। তাঁর বাক্য কখন সরল, কখনবা জটিল ও চাতুর্যপূর্ণ। বিষয় ও বর্ণনার প্রয়োজনে শব্দ নিয়ে তিনি ইচ্ছে মত খেলতে পারেন। তিনি তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ “অগ্নিস্বাক্ষরা” থেকে “চার দশকের গল্প” গ্রন্থের প্রায় প্রতিটি গল্পেই কমবেশি কাব্যিক ভাষার ব্যবহার করেছেন। তাঁর গল্পে গীতধর্মী-কাব্যিক পরিচর্যা উপমা-উৎপ্রেক্ষা-সমাসোক্তি অলংকার-আশ্রয়ী। ক্ষেত্র বিশেষ জীবন-প্রতিরূপের অনিবার্য অনুষঙ্গ হিসেবে স্থান করে নিয়েছে কাব্যিক বর্ণনা। ফলে, তাঁর অধিকাংশ গল্প-শরীর উপমা, উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্পের রঙে রঙিন। কিন্তু সে রঙ কখনও কবিতার কাল্পনিক রঙে রাঙানো নয়, বিষয়কে স্পষ্টতর ব্যঞ্জিত করাই তার লক্ষ্য। এ-জাতীয় অলঙ্কার ব্যবহার কখনও প্রকৃতি, কখনও চলমান ঘটনা আবার কখনও ব্যক্তির যাপিত জীবনের প্রতিচ্ছবি থেকেই রংধনুর মতো রং ছড়িয়েছে। যেমন:

উপমা

ক. মাঠের মাঝে নিঃসঙ্গ প্রহরীর মত দাঁড়িয়ে থাকা বাবলার হলদে ফুলে চৈতালী হাওয়ার অন্তহীন উতরোল। [অগ্নি-স্বাক্ষরা]

খ. তার গৌর আননে রক্তিম আগুনের মত একটা গনগনে আভা ছড়িয়ে পড়েছে। [অগ্নি-স্বাক্ষরা]

গ. সম্মুখে রাশি রাশি পর্বতপ্রমাণ জলের ঢেউ ক্রুদ্ধা নাগিণীর মত গর্জ্জন করে ছুটে আসছে। [সিন্ধু-পতন]

ঘ. আমার শরীর জলের ঢেউয়ের মত শিহরিত হল। [প্রেম একটি নদী]

ঙ. ইরিচের স্পর্শে আমার সর্বশরীর বন্য বাতাসের মত গান গেয়ে উঠল। [প্রেম একটি নদী]

চ. কথাটা রূপকথার মত শোনাল। [লালটিলার আকাশ]

ছ. যন্ত্রণা আমাকে শিকারী বাজের মত ছিঁড়ে খায়। [দূরে কোথাও]

জ. দীর্ঘ টানা লোহার ব্রিজ অতিকায় খাঁচার মত ঝুলে আছে নদীর ওপরে। [অন্ধরাতের রেলগাড়ি]

ঝ. নারকেল ডালের চিরল পাতার জাফরিতে ঝলমলিয়ে উঠল সোনার থালার মত চাঁদ। [জ্যোৎস্নার পোস্টার]

ঞ. নিশ্চিন্ত নিরাপত্তার আবেশ খোঁজার মত ব্যাকুলতায় মায়ের ছবিতে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে উঠল রাণু। [জ্যোৎস্নার পোস্টার]

ট. আকাশটা শীতকালের বিশাল হাওরের মতো স্তব্ধ। [কপালেরই দুঃখ]

উৎপ্রেক্ষা

ক. প্রত্যেকটি অলিন্দে উজ্জ্বল প্রদীপ যেন চাঁদের আলোর কাছে লজ্জা পেয়ে আঁধারে মুখ লুকিয়েছে। [সিন্ধু-পতন]

খ. ঢেউয়ের তালে অসংখ্য আঁকাবাঁকা রেখা ঝলসে উঠছে। অনেকটা যেন ইনলার নৃত্যভঙ্গীমার মত। [সিন্ধু-পতন]

গ. তারাভরা রাতের আকাশ আমাকে যেন কোন এক রহস্যের ইশারা খুলে দিল। [প্রেম একটি নদী]

ঘ. এই নির্জন আলোছায়ার পরিবেশে রোজার কথা কটি যেন কি এক করুণ বিষণ্ণ রাগিণীর মত আমার মনের মধ্যে বেজে উঠল।    [লালটিলার আকাশ]

ঙ. জামিলা হাসানের স্নিগ্ধ মনোরম ঘরটি যেন এখন রায়ের বাজারের বধ্যভূমি। যেন সেখানে দাঁড়িয়েই শুনছি কোনো অশরীরী     হাহাকার। [জামিলা হাসানের পতন]

চ. উড়ন্ত রেলগাড়ির পাশে নক্ষত্রের আলোকিত ‘মার্চপাস্ট’, যেন গার্ড অব অনারের অভিবাদন জানিয়ে স্যালুট দিচ্ছে আশুকে।    [অন্ধরাতের রেলগাড়ি]

ছ.  যেন তালিমারা বিশাল এক মশারির ঝালর গিলে ফেলছে দিনের সজীবতাকে। [ছেঁড়া মশারি আর পুরনো মানুষ]

সমাসোক্তি

ক. চতুর্দিকে ক্ষুধার্ত আগুন লক্ষ লেলিহান জিহবা বিস্তার করেছে। [অগ্নি-স্বাক্ষরা]

খ. ইনলার কথা মনে হতেই একটা রক্তের ঢেউ উছলে উছলে উঠল শিবার্কের বুকে। [সিন্ধু-পতন]

গ. শুকতারা ব্যঞ্জনা ভরা কৌতুকের দৃষ্টি মেলে দেখছে আমাকে। [প্রেম একটি নদী]

ঘ. মাঝে মাঝে অবরুদ্ধ সিন্ধু প্রবল বেগে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাঁধ ভেঙে ফেললে। [সিন্ধু-পতন]

ঙ. বাইরে বাতাসের শব্দটা জানালার সার্সিতে করুণ আকুতি নিয়ে মাথা কুটছিল। [লালটিলার আকাশ]

চ. দুপুরের রোদ ধারালো কামড় বসিয়েছে। [দূরে কোথাও]

ছ. ঝরাপতার ঝুঁটি চেপে অট্টহাসি হাসল হাওয়া। [দূরে কোথাও]

জ. অন্ধকারে আশ্বাস ছড়িয়ে হাসছে ওর হাতে ধরা মোমবাতি। [জামিলা হাসানের পতন]

ঝ. অনধিকার প্রবেশের শাস্তি দিতে খোদ শহরই যাত্রীদের মুখে ঠাস ঠাস করে আলোর চড় মেরে চলেছে। [অন্ধরাতের রেলগাড়ি]

ঞ. এইমাত্র আকাশ তার লোভী লোমশ হাত বাড়িয়ে দিল নিচে। [মধ্যরাতের কালপুুরুষ]

ট. রমনা মাঠের ধূ-ধূ সবুজ  যেন দপ করে জ্বলে উঠল। [জ্যোৎস্নার পোস্টার]

ঠ. আকাশের চাঁদোয়ায় অসংখ্য ছেঁড়া মেঘের টুকরো দিয়ে তালিমারা আকাশ শুষে নিচ্ছে রোদের আলো। [ছেঁড়া মশারি আর পুরনো     মানুষ]

কাব্যিক-চিত্রধর্মী ভাষা

ক. এক চিলতে চাঁদের অপর্যাপ্ত জ্যোৎস্নার চারিদিকে অস্পষ্টতার ছায়া। আকাশে অসংখ্য তারার ঝিলমিল, বাতাসে উন্মনা সুর। মধ্য      রাতের স্তব্ধতাকে চমকে দিয়ে দূরে কোথায় কোকিল ডাকছে। বাঁশ গাছের ডাল-পালার আাড়ালে সরু চাঁদটা নেমে গেল। [অগ্নি-স্বাক্ষরা]

খ. সন্ধ্যার পূর্ণচন্দ্র সিন্ধুর বুক প্লাবিত করে ভেসে আসবে নীলাকাশে, চাঁদের গয়না পরে ফেনিল ঢেউরা সহ¯্র রূপসী মেয়ের মত নেচে    উঠবে। তখন ফুল আলোয় নৌকা সাজিয়ে আমার ভেসে পড়ব সিন্ধুর বুকে। রাত গভীর হবে। শুধুমাত্র ঢেউয়ের গান ছাড়া আর কিছু    শোনা যাবে না। তখন জল-পরীর মত নাচবে তুমি ঢেউয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। চাঁদের সঙ্গে সারা রাত ভাসব দু’টি রঙিন জলবুদ্বুদ    হয়ে। [সিন্ধু-পতন]

গ. সেই শ্বাপদ সঙ্কুল বন, আকাশ, আলোভরা রাত্রি শাশ্বত আনন্দের গান গেয় উঠল আমার মনে। [প্রেম একটি নদী]

ঘ. দিগন্ত ছোঁয়া সবুজ ঘাসের গালিচা পরতের পর পরত খুলে ধরে। হাজার পাখি আনন্দের গান গেয়ে ওঠে। রূপোর ছুরির ধারে ঝলসে     ওঠে আঁকাবাঁকা ছোট্ট এক নদী। [দূরে কোথাও]

ঙ. সেই মুহূর্তে বিকেলের নরম আলো ঝলক দিয়ে উঠল বাগানের ঝুমকো জবা, কামিনী, হা¯œুহানার ঝাড়ে, জামিলা হাসানের শঙ্খ-শুভ্র      কপালে। সেই বৈকালি মৃদু রোদে লনের সবুজ ঘাসে মূর্ত হলো জীবনানন্দ দাশ… সব পাখি ফিরে আসে নীড়ে, সব নদী সাগরে      মিলায়…। স্তিমিত সৌন্দর্যে ঝিকমিক করছেন তিনি, যেন সন্ধ্যার প্রথম তারাটি। [জামিলা হাসানের পতন]

চ. ধীরে ধীরে আকাশ জুড়ে চাঁদ মেলে দিল জ্যোৎস্নার বিশাল আঁচল, তন্দ্রাচ্ছন্ন রাণুর চারপাশে জ্যোৎস্নায় লেখা হল মাহফুজের     পোস্টার ‘কাল দেখা হবে।’ [জ্যোৎস্নার পোস্টার]

তাছাড়া বেশ কিছু গল্পে লেখক বিষয় এবং চরিত্রানুযায়ী ইংরেজি ভাষার ব্যবহার করেছেন।  যেমন :

ক. আমি কোনদিনই ফ্রাস্ট্রেটেড নই। আই অ্যাম ইন সার্চ অব ট্রুথ এন্ড অরিজিন্যালিটি। আই ওয়ান্ট টু হ্যাভ সাম থিং এজ মাই ও-ন।     [লালটিলার আকাশ]

খ. পরক্ষণেই রজোর তীক্ষ্ম কণ্ঠস্বর শুনলাম। ইউ সাট আপ ব্ল্যাক ফুল। ইউ ডার্টি ক্রিশ্চিয়ান। [লালটিলার আকাশ]

সাধারণভাবে যে কোন গল্পের নাম তার বিষয়-ভাবকে ধারণ করে। কেন্দ্রীয় ভাববস্তু বা গল্পের পরিণতি কোন না কোনভাবে গল্পের নামে জড়িয়ে যায়। কখনো ভাববস্তু ব্যঞ্জনায় নামে ছায়া-কায়ার সম্বন্ধে য্ক্তু থাকে, কখনো চরিত্রের ব্যক্তিত্বের উদ্ভাসন গল্পের নামে অমোঘ সম্পর্কের অর্থদ্যোতনা সৃষ্টি করে। রিজিয়া রহমানের গল্পের নামকরণ কখনও বিষয় বা ঘটনাশ্রয়ী, কখনও প্রতীকের আশ্রয়-অন্বেষী, আবার কখনও ইতিহাস-ঐতিহ্যের পথ ধরেছেন। গল্পের অন্তর্নিহিত বক্তব্যের সঙ্গে এবং পরিণতির গভীর সম্পর্কসূত্রে রিজিয়া রহমান গল্পের নামকরণেও সৃষ্টি করেছে চমৎকারিত্ব। তবে তাঁর অধিকাংশগুলোর গল্পের নামকরণ হয়েছে গল্পের ভাব কিংবা বিষয়-পরিণতি বিচারে। এ-জাতীয় গল্পগুলোর মধ্যে “অগ্নি-স্বাক্ষরা” গ্রন্থের ‘অগ্নি-স্বাক্ষরা’, ‘সিন্ধু-পতন’, ‘অন্যন্যা পৃথিবী’, ‘সমুদ্র প্রিয়া’, ‘মৌন আকাশ’; “নির্বাচিত গল্প” গ্রন্থের ‘মাধ্যকর্ষণের সীমানায়’, ‘সেই যন্ত্রণা’, ‘ইজ্জত’; “দূরে কোথাও” গ্রন্থের ‘দূরে কোথাও’, ‘অপেক্ষা সেই কাল বৈশাখীর’, ‘জামিলা হাসানের পতন’, ‘জ্যোৎস্নার পোস্টার’, ‘মধ্যরাতের কালপুরুষ’, ‘মানুষ আসবে’, “খাওয়া-খায়ির বাঙালি” গ্রন্থের  ‘সাফাই আলীর অগস্ত যাত্রা’, ‘হালের চাল’ এবং “চার দশকের গল্প” গ্রন্থের ‘সোনার হরিণ চাই’, ‘দূর্বাঘাসের আকাশ’, ‘সামনে যুদ্ধ’, ‘অন্ধকারে ফেরা’, ‘বিন্দু এবং বৃত্ত’ ‘বিপন্ন সময়ের বন্দিরা’, ‘অভিজাত’, ‘রাজা রাজা খেলা’ অন্যতম।

রিজিয়া রহমানের গল্পের কাহিনি বিন্যাসের কালানুক্রমিক পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়, তিনি ক্রমশ বহির্বাস্তবতা থেকে অন্তর্বাস্তবতা থেকে ধাবিত হয়েছেন; তবে তিনি কখনো বাস্তবতাকে ছেড়ে যাননি। ভাষার আলঙ্কারিক-মুগ্ধতা ছড়িয়ে আছে তাঁর অধিকাংশ গল্পেই। ভাষার কারুকাজে আবেগময়তাকে বেঁধেছেন শিল্পের সৌন্দর্যে। জীবনের খ- খ- মুহূর্ত, মানুষের খ- খ- বিশ্বাস, ইতিহাসের অলিগলি, রাষ্ট্রযন্ত্রের খ- খ- ঘটনাপুঞ্জকে তিনি ছোটগল্পের শিল্প-শরীরে বেঁধে দিয়েছেন। তাছাড়া তিনি গল্পে প্রথাগত জীবনবোধ, আধুনিক জীবনপ্রবাহ, ব্যক্তিক জীবনজটিলতাকে যেমন তুলে এনেছেনÑ তেমনি সেই জীবনের ভালো-মন্দ, হিংসা-বিদ্বেষ, ত্রুটি-বিচ্যুতি নানা অভিঘাতে পর্যুদস্ত মধ্যবিত্ত-নি¤œবিত্ত-প্রান্তিক মানুষের জীবনচিত্রের রূপায়ণও ঘটিয়েছেন। জীবনের প্রতিটি বাঁকে তিনি ক্রমাগত আরও উদার, সাহসী এবং আধুনিক হয়ে উঠেছিলেন, সেই সঙ্গে তাঁর সৃষ্টিধারাকেও রেখেছিলেন অবিরাম-অব্যাহত।

 

সহায়ক গ্রন্থ

রিজিয়া রহমানের “অগ্নিস্বাক্ষরা” [১৯৬৭], “নির্বাচিত গল্প” [১৯৭৮], “দূরে কোথাও” [২০০৪] “খাওয়া-খায়ির বাঙালি” [২০১০] এবং “চার দশকের গল্প” [২০১১]। গ্রন্থগুলো।

 

লেখক

সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, বাংলা বিভাগ

সরকারি আদর্শ মহিলা কলেজ, চুয়াডাঙ্গা

মুঠোফোন : ০১৯৬-৬৬৩১০৪২

Facebook Comments
সংবাদটি শেয়ার করুন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

আরো সংবাদ