১০ বছরেও মোংলা পোর্ট পৌরসভায় নির্বাচন হয়নি, দ্রুত নির্বাচন দেবার দাবি আমজনতার

বায়োজিদ, বাগেরহাট
বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ৩:০৪ অপরাহ্ন
১০ বছরেও মোংলা পোর্ট পৌরসভায় নির্বাচন হয়নি, দ্রুত নির্বাচন দেবার দাবি আমজনতার

মেয়াদ উত্তীর্ণের প্রায় ৫ বছর অতিবাহিত হলেও দেশের অন্যতম প্রথম শ্রেণির মোংলা পোর্ট পৌরসভার এখন পর্যন্ত সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোন খবর নেই।

নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন না হওয়ায় ৫ বছরের জন্য মেয়র নির্বাচিত হলেও আরো অতিরিক্ত প্রায় ৫ বছর ধরে মেয়র ও কাউন্সিলরা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। মেয়রসহ অধিকাংশ কাউন্সিলর বিএনপি’র নেতা কর্মী হওয়া সত্বেও প্রভাবশালী মহলের নেপথ্যের ছত্রছায়ায় নির্বাচন ছাড়াই মেয়র ও কাউন্সিলরা অতিরিক্ত ক্ষমতা ভোগ দখল করে চলেছেন। এ নিয়ে পৌরবাসীর মধ্যে চলছে নানা ক্ষোভ, হতাশা আর গুঞ্জন।

দীর্ঘদিন অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করায় মেয়র ও তার কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তবে মেয়র জুলফিকার আলী তার ও কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগসমুহ অস্বীকার করেছেন।

এদিকে, মেয়াদ উত্তীর্ণ এ পৌরসভার মেয়রকে অপসারণ করে অবিলম্বে প্রশাসক নিয়োগের দাবিসহ তার দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় নাগরিক সচেতন সমাজ ও মোংলার বিভিন্ন শ্রেণি পেশাসহ সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ।

সর্বশেষ ২০১১ সালের ১৩ জানুয়ারী দেশের অন্যান্য স্থানের সাথে মোংলা পোর্ট পৌরসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে মেয়র পদে মোংলা পৌর বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক মো. জুলফিকার আলী মেয়রসহ বিএনপি’র অধিকাংশ নেতা-কর্মী কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। অভিযোগ উঠেছে, মেয়াদ শেষে ২০১৬ সালে এ পৌরসভায় পুনরায় নির্বাচনের তফসীল ঘোষণার পূর্বে মেয়াদ উত্তীর্ন হওয়া সত্বেও বর্তমান মেয়র তার নিজস্ব লোক দিয়ে স্বেচ্ছায় পরিকল্পনা করে একবার মিথ্যা ও ভুয়া সীমানা জটিলতা, আরেকবার ওয়ার্ড ভিভাজন চেয়ে আবুল কালাম আযাদ, আরেকবার আ. কুদ্দুস মোল্লাকে বাদী বানিয়ে হাইকোর্টে মামলা করান, যেনো মোংলা পৌরসভার নির্বাচন না হয়। বর্তমানে হাইকোর্ট এ সকল মামলাগুলো খারিজ করে দিয়েছে।

মোংলা উপজেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি উচ্চ আদালতে সীমানা সংক্রান্ত জটিলতার মামলাগুলো খারিজ করে দেয়া হয়। এতে অনেকটাই এখানকার পৌর নির্বাচনের জটিলতা নিরসন হয়। এরপর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে এখানে ওয়ার্ড সিমান্ত জটিলতা নিরসন করে চুড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য উপজেলা প্রশাসনকে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করতে বলা হয়। সর্বশেষ ৪নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর বিএনপি নেতা মেয়র জুলফিকার আলির আস্থাভাজন আ. রাজ্জাক ফকিরকে দিয়ে মোংলা ইউএনও বরাবরে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। বিষয়টা হলো- তার ওয়ার্ডে ভোট সংখ্যা বেশি, ৪নং ওয়ার্ডকে ভাগ করা হোক এবং ৪নং ওয়ার্ডের আরো ২০ জনের ভুয়া স্বাক্ষর দেখিয়ে আরো একটি দরখাস্ত ৪নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আ. রাজ্জাক ফকিরকে দিয়ে করানো হয়েছে, কিন্তু সেটাও ইউএনও আমলে না এনে যাচাই বাচাই করে আইনানুগ মতামত পেশ করেছেন।

মোংলা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আল মামুন জানান, গত মাসে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন যাচাই বাচাই শেষে এ বিষয়ে গেজেট প্রকাশ করার জন্য নির্বাচন কমিশনে প্রতিবেদন পাঠায়। প্রতিবেদন পাওয়ার পর সেখান থেকে গেজেট পাঠানোর পর নির্বাচন কমিশনের ভোট অনুষ্ঠানের পরবর্তি প্রক্রিয়া শুরু করার কথা রয়েছে।

এদিকে, মোংলা পোর্ট পৌরসভার নির্বাচিত মেয়র বিএনপি নেতা জুলফিকার আলীর মেয়াদ প্রায় ৫ বছর আগে উত্তীর্ণ হওয়ায় অবিলম্বে প্রশাসক নিয়োগ করে দ্রুত নির্বাচন দেয়া, মেয়রের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণসহ মেয়রের গ্রেফতারের দাবীতে সংবাদ সম্মেলন করেছে মোংলা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক সহকারী কমান্ডার মো. ইস্রাফিল ইজারাদার। গত ১ সেপ্টেম্বর দুপুরে বাগেরহাট প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে মুক্তিযোদ্ধা ইস্রাফিল ইজারাদার তার লিখিত বক্তব্যে বলেন, মোংলা পোর্ট পৌরসভার নির্বাচিত মেয়র বিএনপি নেতা জুলফিকার আলীর মেয়াদ মেয়াদ প্রায় ৫ বছর আগেই উত্তির্ণ হয়েছে। সে সময় তিনি তার লোকদের দিয়ে সীমানা সংক্রান্ত বিরোধে উচ্চ আদালতে মামলা করে নির্বাচন স্থগিত করে ক্ষমতায় থেকে যান। কিন্তু সে মামলা খারিজ হওয়ার পর তিনি আবারো তার সমর্থকদের দিয়ে মিথ্যা অভিযোগ করে যাতে মোংলা পোর্ট পৌরসভার নির্বাচন না হতে পারে সেজন্য তিনি নতুন করে ষড়যন্ত্র শুরু করেছেন।

বাগেরহাট জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ফরাজি বেনজির আহম্মেদের সাথে এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, মোংলা পোর্ট পৌরসভার নির্বাচন মামলা সংক্রান্ত জটিলতায় আটকে থাকলেও সম্প্রতি উচ্চ আদালত থেকে সে মামলা প্রত্যাহার হওয়ার পর ওয়ার্ড সীমানা নির্ধারনের চুড়ান্ত সিদ্ধান্তও স্থানীয় প্রশাসন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে গেজেটের জন্য প্রেরণ করেছে। এ গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হলেই এখানে ভোট অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। তবে কবে নাগাদ গেজেট পাশ হতে পারে সে সম্পর্কে তিনি কিছুই বলতে পারবেন না বলে জানান।

এদিকে দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর ধরে এ পৌরসভায় কোন নির্বাচন না হওয়ায় স্থানীয় সুশীল সমাজসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের মধ্যে এক ধরনের হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচন আদৌ হবে কিনা তা নিয়ে এদের মধ্যে এক ধরনের গা’ছাড়া ভাব ও অনিশ্চিয়তা দেখা দিয়েছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) মোংলার সাধারণ সম্পাদক মো. নূর আলম শেখ বলেন, গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার স্বার্থে সব জটিলতা নিরসন করে দ্রুত মোংলা পোর্ট পৌরসভার নির্বাচন দেয়া উচিত। তিনি আরো বলেন, গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত না থাকলে নেতৃত্ব বিকাশের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। নিয়মিত নির্বাচন না হলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এক নায়কতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। সেটাতো কোনভাবেই গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং পন্থা নয়। তিনি বলেন, গত ১০ বছরে অন্তত প্রায় ৫ হাজার নতুন এবং তরুণ ভোটার হয়েছে। নতুন ভোটার হয়ে পৌর নির্বাচনের ভোট দিতে না পারার আক্ষেপ আছে তাদের মধ্যে। তার মতে, মেকানিজম করে ষড়যন্ত্র করে জনপ্রতিনিধি থাকতে চাওয়া কোন সত্যিকারের গণতান্ত্রিক পন্থা নয়। এটি হচ্ছে অন্ধকারের পথ। মোংলা পৌরবাসী নির্বাচনের মাধ্যমে এই অন্ধকারের পথ থেকে পরিত্রাণ চায়।

স্থানীয় প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও দুর্নীতি দমন প্রতিরোধ কমিটির মোংলা শাখার সাবেক সভাপতি সুদান হালদার বলেন, গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখা ও নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টিতে মোংলা পোর্ট পৌরসভার নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিকল্প নেই। তা না হলে মানুষের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে উৎসাহে ভাটা পড়বে, সেই সাথে দেখা দিবে হাতাশা। তিনি সব জটিলতা নিরসন করে দ্রুত সময়ের মধ্যে এ পৌরসভার নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানান।

পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান জানান, মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পরপরই তিনি নতুন নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এরপর মামলা জটিলতায় নির্বাচন বানচাল হওয়ায় তিনি নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষে বেশ তৎপরতা চালিয়েছেন। নির্বাচনের তফশীল ঘোষণা ও প্রশাসক নিয়োগের দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করলেও তাতে কিছুই হয়নি। এতে তিনি উল্টো আরো মেয়রের বিরাগভাজন হয়েছেন।

মোংলা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক ইজারাদার জালাল আহম্মেদ বুলবুল জানান, নির্বাচনের প্রায় ১০ বছর পার হলেও মেয়র ও তার কাউন্সিলদের পৌরবাসীর কাছে কোন জবাবদিহি নেই। মানুষের বড় বড় সমস্যা বিশেষ করে গরীব মানুষের উপকারে তেমন এগিয়ে না এসে এরা নিজেদের আখের গোছাতে মরিয়া থাকে। দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ায় জনপ্রতিনিধিরা গা’ছাড়া ভাবে চলছেন বলে অভিযোগ তার।

মোংলা পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মো. সরোয়ার হোসেন বলেন, মামলা জটিলতার অজুহাত দিয়ে এ নির্বাচন বানচালের চেষ্টা চালাচ্ছে প্রভাবশালী মহল। তিনি এসব জটিলতা নিরসন করে অবিলম্বে মোংলা পৌরসভায় নতুন নির্বাচনের দাবি জানান।

মোংলার ভাসানী সড়কের বটতলা এলাকার একটি বিদেশী কোম্পানীতে কর্মরত ভোটার ভিভিয়ান ম্যান্ডেজ বলেন, গত ৫ বছর ধরে পৌর ভোট দিতে না পারায় এক ধরণের হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। এ নিয়ে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছি। এতে গণতান্ত্রিক ধারা ব্যাহত হচ্ছে।

মোংলার ৪নং ওয়ার্ডের নারী নেত্রী ও মানবাধিকার কর্মী শিউলী ইয়াসমীন অভিযোগ করে বলেন, প্রভাবশালী মহলের ইন্ধনে একটি কুচক্রি মহল মামলার অজুহাত দিয়ে মোংলা পৌরসভার নির্বাচন বানচালের অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। এতে করে বিনা ভোটে দীর্ঘ সময় ধরে মেয়র ও কাউন্সিলর ক্ষমতায় থেকে সাধারণ মানুষের কল্যাণে তেমন এগিয়ে আসছেন না। তিনিও দ্রুত নির্বাচনের দাবি জানান।

মোংলার ৮ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা এনজিও কর্মী মুক্তা বেগম জানান, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় পৌর জনপ্রতিনিধিরা ক্ষমতা কুক্ষিগত রেখে জনগণের সাথে যাচ্ছে-তাই করে চলেছেন।

মোংলার আরাজি মাকরঢোন এলাকার নতুন ভোটার ফেন্ড্রশ স্পোটিং ক্লাবের অধিনায়ক শফিকুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, নতুন ভোটার হয়েও পৌরসভায় এখন পর্যন্ত পছন্দের কোন প্রার্থীকে ভোট দেয়ার সুযোগ হয়নি। এতে করে তিনি ছাড়াও তার মতো অসংখ্য নতুন ভোটার হতাশা আর ভোট প্রদানে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন।

এ বিষয়ে বর্তমান মেয়র জুলফিকার আলী বলেন, আমি নির্বাচনে বিশ্বাসী। নির্বাচন করেই জনগণের রায়ের জনপ্রতিনিধি হয়েছি। স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা একের পর এক মিথ্যে অভিযোগ দিয়ে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন। মামলা দিয়ে নির্বাচন বানচালের ঘটনার সাথে তিনি কোনভাবে জড়িত নন বলে দাবি করে বলেন, বর্তমান সরকার যেকোন সময় নির্বাচন দিলে আমি নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করব।

Facebook Comments
সংবাদটি শেয়ার করুন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

আরো সংবাদ