মোঃ সাইদুল হাসান সেলিম।।
শিক্ষা যে কোন রাষ্ট্রের মানবসম্পদ উন্নয়নের মৌলিক উপাদান। তাই শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সবাইকে নজর দিতে হবে শিক্ষার মানোন্নয়নে এবং জাতি গড়ার কারিগরদের আর্থিক সুযোগ সুবিধার প্রতি। নতুন প্রজন্মকে চৌকষ ও দক্ষ করে গড়ে তোলা প্রয়োজন। আমরা এটা পারছি না বলেই কর্মক্ষেত্রে যথোপযুক্ত স্থানে সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে পারছিনা। আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় কেন এত বৈষম্য? এমন প্রশ্ন অবান্তর নয়। বেসরকারি পর্যায়ের একজন শিক্ষক বেতন-বাড়ি ভাড়া-চিকিৎসা ভাতা মিলে সর্বমোট অনুদান পান ১৩ হাজার ৩ শত টাকার কাছাকাছি। কিন্তু সরকারি সকল নিয়ম কানুন মেনে, নির্ধারিত একই কর্ম ঘন্টা, পাঠ্যপুস্তক, পাঠ্যক্রম, পরিক্ষা পদ্ধতি ও সিলেবাস হওয়া সত্ত্বেও সরকারি বিদ্যালয়ের সম-স্কেলের একজন শিক্ষককের বেতন-ভাতা প্রায় দ্বিগুণ। অর্থাৎ সরকারি একজন পিয়নের বেতন-ভাতা একজন বেসরকারি শিক্ষকের বেতন ভাতার চেয়ে বেশি। আমাদের ভুলেগেলে চলবে না সামাজিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক অবস্থা নিবিড় ভাবে জড়িত। পরিত্রাণের উপায় একটাই জাতীয়করণের মাধ্যমে শিক্ষার দায়িত্ব ও নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।
সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয় শিক্ষকদের বেতন দেওয়া হয় একই স্কেলে। কিন্তু সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা মূল স্কেলের ৩৫ – ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ি ভাড়া পান। সরকারি শিক্ষকরা ৫% থেকে ৮% বার্ষিক প্রবৃদ্ধি, বৈশাখী ভাতা, নির্ধারিত ১৫ শত টাকা চিকিৎসা ভাতা, দুই সন্তানের শিক্ষা ভাতা, বছরে মূল বেতনের সমপরিমাণ দুটি উৎসব ভাতা, বিনোদন ভাতা, পূর্ণাঙ্গ অবসর ভাতা পেয়ে থাকেন। এ সবই সামাজিক বাস্তবতায় যৌক্তিক এবং প্রয়োজনে আরও বাড়ানো উচিত বলে মনে করি।
অন্যদিকে, সেই সুলতানী আনা কড়ির নিয়মে শিক্ষকদের বঞ্চিত করা হচ্ছে পদে পদে। বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় বেসরকারি শিক্ষকদের সম্মানজনক বেতন-ভাতা দেয়া উচিত। শিক্ষা ক্ষেত্রে সকল বৈষম্য নিরসনে শিক্ষার দায়িত্ব ও নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রীয়ভাবে বহন করতে হবে।
বিঃদ্রঃ (২০১৫ পে-কমিশনের পর দেশে আর কোন পে- কমিশন গঠন করা হবে না) এতদসত্ত্বেও বেসরকারি শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য তুলে ধরা হলো।
বার্ষিক প্রবৃদ্ধি নাই।
টাইম স্কেল —- নাই।
উচ্চতর স্কেল নাই।
মাতৃত্ব ভাতা নাই।
অবকাশ ভাতা নাই।
পদোন্নতি নাই।
ঈদুল ফিতরের বোনাস ৭৫% নাই
ঈদুল আজহার বোনাস ৭৫% নাই।
বাড়িভাড়া নির্ধারিত ১,০০০/- টাকা।
চিকিৎসা ভাতা নির্ধারিত ৫,০০/- টাকা।
কল্যানের টাকা পাওয়ার কোন নিশ্চয়তা নাই।
অবসর ভাতা পাওয়ার নিশ্চয়তা নাই।
মাস শেষে বেতনের পরিবর্তে অনুদান সহায়তা প্রদান।
মাস শেষে অনুদান পাওয়ার নির্ধারিত দিনক্ষণ নাই।
আর এই না পাওয়ার বেদনা ও ক্ষোভ নিয়াই ৯৭% বেসরকারী শিক্ষকের জীবন চলছে। শিক্ষকদের অভুক্ত উদরে রেখে মানসম্মত শিক্ষার প্রত্যাশা কাল্পনিক। যেখানে শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড, আর শিক্ষক জাতি গড়ার কারিগর, সেখানে শিক্ষকদের মেরুদণ্ড সোজা নেই, আর বাঁকা মেরুদন্ডের শিক্ষক দিয়ে চলছে জোড়াতালির শিক্ষাব্যবস্থা।
স্কুল-কলেজে মেধাবী শিক্ষকের অভাব প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। এ বিষয়টির দিকে কারো খেয়াল আছে বলে মনে হয় না। মেধাবী শিক্ষক ছাড়া স্কুল কলেজে মেধাবী শিক্ষার্থী আশা করা কঠিন। শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ করা না হলে, মেধাবী প্রজন্ম আমরা কোথায় পাব? মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করার বিষয়ে রাষ্ট্রীয় কোন উদ্যোগ নেই। উল্টো শিক্ষকের ন্যায্যতার দাবি দাওয়া থেকে বঞ্চিত করার জন্যে যা যা করনীয় তাই করছে সরকার। সর্বত্র শিক্ষকদের অপমান ও লাঞ্ছনার শিকার হতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। শিক্ষার্থী, অভিভাবক কিংবা ম্যানেজিং কমিটির হাতে শিক্ষক লাঞ্ছিত হবার বিষয়টি আমাদের দেশে এখন আর নতুন কোন খবর নয়।
দেশের ৯৭ শতাংশ ছাত্রছাত্রী শিক্ষা লাভ করছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে। সবার জন্য শিক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিত করা যে সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য। তাই সরকারকেই শিক্ষাব্যবস্থার বৈষম্য দূর করতে বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করতে হবে। বেসরকারি শিক্ষকরা ও শিক্ষা সচেতন মহলও মনে করেন, সকল সমস্যার সমাধান শিক্ষাব্যবস্থার জাতীয়করণের মাধ্যমে সম্ভব।
সকল বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সেশন ফি ছাত্র বেতন, পরীক্ষা ফি ও অন্যান্য সূত্র থেকে যাবতীয় আয় জমা পড়বে সরকারি কোষাগারে। আর এই কোষাগার থেকেই সরকার মিটাবে শিক্ষকদের যৌক্তিক আকর্ষনীয় বেতন-ভাতা ও অন্যান্য ব্যয়। শিক্ষকরা মনে করে, এই উপায়ে শিক্ষা জাতীয়করণ করা হলে, সরকারের রাজস্ব থেকে অতিরিক্ত ব্যয় হবে না। সবার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে, নতুন প্রজন্মকে যুগের চাহিদা অনুযায়ী যোগ্য ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে হলে শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া উচিত ছিল। এটা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত, যেকোন দেশের শিক্ষা খাত, সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রাপ্ত খাত। আমরা অতীব দুঃখের সাথে লক্ষ্য করেছি যে, বিগত তিন বছর ধারাবাহিকভাবে বাজেটে শিক্ষায় বরাদ্দ কমেছে। বিগত ২০১৮- ২০১৯ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেয়া উচিত ছিল ৮০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। যদি তাই হতো, এর ফলে বেসরকারি শিক্ষকদের আরও বেশি বেতন-ভাতা প্রদান সম্ভব যেতো। সরকার তখন শিক্ষকদের আকর্ষণীয় বেতন-ভাতা প্রদানের মাধ্যমে মেধাবীদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে পারতো। মেধাবীরা যেন বিসিএস ক্যাডার, পুলিশ, প্রশাসন কিংবা কাস্টমস পেশায় না গিয়ে, শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট হতে পারে। যৌক্তিক কারনেই শিক্ষকতাকে আকর্ষনীয় করে মেধাবীদের আকৃষ্ট করতে হবে। নিম্ন মানের শিক্ষক দিয়ে উচ্চ মানের শিক্ষার প্রত্যাশা কাল্পনিক।
আমরা লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি উন্নত বিশ্বের সাথে প্রতিযোগিতায় নামতে। এর প্রথম শর্ত হচ্ছে মধ্যম আয়ের দেশের সারিতে উন্নিত হওয়া। আমাদের সে লক্ষ্য কি পুরোপুরি অর্জিত হয়েছে? আমারা শর্ত সাপেক্ষে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হতে পেরেছি এটা সত্যি। তবে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি বাঁ ধরে রাখতে হবে ২০২৪ সাল পর্যন্ত। দেশে এখন যেভাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের বেশি অর্জিত হচ্ছে, একইভাবে অগ্রসর হলে উন্নত দেশের সারিতে পৌঁছানো অসম্ভব নয়। উন্নত রাষ্ট্রের ভাবনায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বরাদ্দ রাখতে হবে শিক্ষা খাতে। অন্যথায় উন্নত বিশ্বের সারিতে আসন মেলা কষ্টসাধ্য ও দূরহ হবে।
শিক্ষকরা শিক্ষার মানোন্নয়নে পাঠদানে মনোযোগী তখনই হবেন, যখন তাদের যথাযথ সম্মান মর্যাদা ও আর্থিক দুর্দশা লাঘব করা হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় অদক্ষদের অবাধ বিচরণ থাকুক এটা কারো কাম্য নয়। মেধাবী ও সেরাদেরই শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে হবে। সমাজের অন্য সকল প্রশাসনেও যোগ্যদের আসন দিতে হবে, এমনটাই সকলের কাম্য। আমরা যদি মানসম্মত শিক্ষাক্ষেত্র এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারি তবেই যোগ্যতর মানসম্মত দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে পারবো।
উদ্বেগজনক চিত্র হলো, যত বেশি শিক্ষিত জনগোষ্ঠী, তত বেশি বেকারত্ব। এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। আমাদের এখনই খতিয়ে দেখতে হবে যে, তবে কি আমরা মানসম্মত শিক্ষা প্রদানে ব্যর্থ হচ্ছি কিনা? বনিক সমিতির সভাপতি বলেন, আমাদের দেশে যোগ্য দক্ষ মানসম্মত শিক্ষিত কর্মীর অভাব হেতু হাজার হাজার বিদেশি ইংরেজি পারদর্শী ও পরামর্শক কর্মীরা আমাদের দেশ থেকে প্রতিবছর কোটি কোটি ডলার নিয়ে যাচ্ছে। আমরা প্রতিযোগিতার উন্নত বিশ্বের সারিতে যেতে হলে, আমাদের আগামী প্রজন্মকে আধুনিক বিজ্ঞান মনস্ক ও বিশ্ব মানের শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। আর মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে, উন্নত রাষ্ট্রের ভাবনা নিরর্থক হতে বাধ্য। শিক্ষা নিয়ে গলাবাজি, ধাপ্পাবাজি ও মিথ্যাচার করা চলে না। আধুনিক উন্নত বিশ্বের সাথে পাল্লা দিয়ে, নিজেদের আসন প্রতিষ্ঠিত করতে হলে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিনিয়োগ করতে হবে শিক্ষা খাতে।
দেশ স্বাধীনতা লাভ করেছে ৪৭ বছর হতে চলছে, এখনো যাঁরা বলেন রাতারাতি সব কিছু সম্ভব নয়। তাদের উদ্দেশ্য বলছি, আর কত যুগ সময় দেয়া হলে আমরা সুখী সমৃদ্ধ উন্নত সোনার বাংলা গড়তে পারবো? আমরা কি শুধু মাত্র স্বপ্নের রাজ্যেই বিচরণ করতে থাকবো? রাজনীতি আর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আর স্বার্থান্ধতার নির্লজ্জ হানাহানি থেকে কবে আমরা মুক্তি পাবো? এই দেশের সহজ-সরল সাধারণ মানুষেরা জীবনে কি কখনোই একটু শান্তিতে বাঁচার আশা করতে পারে না? পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা। আজকে দেশের ক্ষমতালোভী হায়েনাদের হিংস্র আক্রমণে রক্তাক্ত বাংলার প্রান্তর, এর থেকে মুক্তি পাওয়া প্রয়োজন।
পরিশেষে শিল্পীর সুরে বলি, “আমি চিৎকার করিয়া কাঁদিতে চাহিয়া, করিতে পারিনি চিৎকার। বুকের ব্যথ্যা বুকে চাপিয়ে, নিজেকে দিয়েছি ধিক্কার। ———— নির্মমতা আর কতদূর হলে জাতি হবে নির্লজ্জ।
–লেখক
সভাপতি
বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারি ফোরাম
ঢাকা বাংলাদেশ।
৩১/০৭/২০১৮
You must be logged in to post a comment.