শিক্ষাব‍্যবস্থা জাতীয়করণে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা নয়, যথার্থ আন্তরিকতা এবং সদিচ্ছার অভাব

অন্যদৃষ্টি অনলাইন
বুধবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ৬:৫৯ পূর্বাহ্ন

মোঃ সাইদুল হাসান সেলিম।।

বৃটিশ উপনিবেশিক শাসনামলে শিক্ষার দায়িত্ব পালনের দাবির প্রেক্ষিতে সর্বপ্রথম বৃটিশ রাজ লর্ড কার্জন বেসরকারি শিক্ষাব‍্যবস্থায় এক লাখ টাকা অবকাঠামো ও শিক্ষকদের বেতন ভাতা খাতে বরাদ্দ করেছিলেন। অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অগ্রসরতা বলতে সেই তিমিরেই।

স্বাধীনতার ৪৭ বছর পেরিয়েও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, জাতির চাহিদা আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ । যেখানে প্রভুত্ববাদী প্রেতাত্মারা, দুর্নীতি আর মিথ্যা আশ্বাসের বসবাস, সেখানে অধিকার মানবিকতা ন‍্যয় ও সত্যের সহাবস্থান অনাকাঙ্ক্ষিত। সমুদ্র তীরবর্তী এ জনপদের মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই সহজ সরল, মেধাবী, শান্তি প্রিয় ও শান্ত প্রকৃতির। পরাধীনতার দীর্ঘ পরিক্রমায়, সত্য ও ন‍্যয়ের যৌক্তিক প্রতিবাদের ভাষা, শক্তি ও সাহস হারিয়েছি আমারা বংশ পরস্পরায়।

গুণীজনদের বাণী, স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন। দেশ স্বাধীনতা পরবর্তীকালে কতিপয় অপ্রকৃতিস্থ ক্ষমতালোভী দানব হায়েনাদের হিংস্রতায় মহান স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নিষ্ঠুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে এদেশের জাতীয় উন্নয়ন অগ্রগতিকে স্তব্ধ করে দেয়া হয়েছিল। অতঃপর রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অতি অল্প সময়ের মধ্যে সরকারগুলোর পালা পরিবর্তনে, জাতীয় শিক্ষা সংস্কৃতি সহ সকল উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ব্যাপক সংকট ও প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। রাজনৈতিক সরকারগুলো নিজেদের ক্ষমতার অবস্থান সুসংহত ও সুদৃঢ় করার মানসে সুদূরপ্রসারী কোন পরিকল্পনা গ্রহণ না করে স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে জনগণের আস্থা ও সমর্থন লাভের চেষ্টা করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। অপরদিকে একটি সরকারের পরিবর্তনের সাথে সাথে পূর্বের সরকারগুলোর ভালো হোক বা মন্দ, সকল নীতি ও পরিকল্পনা বাতিল বা স্থগিত করে নুতন নুতন পরিকল্পনা নেয়া হয়। এতে শিক্ষাসহ জাতীয় উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

দেশ স্বাধীনতার মূলমন্ত্র ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি, শোষণহীন, বৈষম্যহীন দুর্নীতিমুক্ত সমাজ বিনির্মাণ ও সকলের সমান অধিকার নিশ্চিতসহ সুখী সমৃদ্ধ সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার। জাতির জনকের, সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন আজো অধরাই রয়ে গেছে।

যে কোন জাতির উন্নতির শিখরে অবস্থান নিশ্চিত করতে পারে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে। শিক্ষায় বিনিয়োগ অধিক লাভজনক। অথচ সরকারগুলো শিক্ষার বিনিয়োগকে, অলাভজনক ব‍্যয় হিসেবে চিহ্নিত করে, শিক্ষা ব‍্যয় সংকোচন নীতি অনুসরণ করেছে। এদেশের শিক্ষার অগ্রসরতা ও মানোন্নয়নে রাজনৈতিক নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। মাননীয় অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিও ভুক্তি একটি বাজে পদ্ধতি। নিম্নোক্ত কারণে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য সমর্থন যোগ্য। কারণ সরকার এমপিওভুক্ত শিক্ষা  প্রতিষ্ঠানের কর্মরত শিক্ষক কর্মচারিদের জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী শতভাগ বেতন ও  আংশিক ভাতা প্রদান করে থাকে। অথচ-
১। সরকার বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সঠিক কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত করতে পারে না।
২। বেসরকারি এমপিও ভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থনৈতিক ভাবে কোন সহযোগিতা পাচ্ছেনা সরকার।
৩। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নিয়োগ সহ অঢেল ক্ষমতা গভর্নিং বডি ও ম‍্যানেজিং কমিটির উপর ন‍্যাস্ত থাকে। শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে আদায়কৃত অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা হয়না।
৪। শিক্ষক কর্মচারীদের চাকরিতে নিয়োগ, শাস্তি, বহিষ্কার ও অপসারণের কর্তৃত্ব কমিটির হাতে থাকে।
৪। সরকার সময়ে সময়ে যে সমস্ত নির্দেশনা জারি করে তারও সঠিক বাস্তবায়ন করা হয়না।
৬। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আয় কমিটি ও প্রভাবশালী মুষ্টিমেয় কয়েকজন ভোগ করে থাকে। এতেও বঞ্চিত শিক্ষকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে আন্তরিকতার সাথে পাঠদানে মনোনিবেশ করেনা। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
৭। সরকারের নিয়ন্ত্রণ না থাকায় শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকারের ভালো পরিকল্পনাগুলো সঠিক বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না।
৮। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কারণে অকারণে শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে অধিক হারে ফি নির্ধারণ করে থাকে। ফলে অসচ্ছল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সন্তানদের শিক্ষার ব‍্যয় নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পরে এবং লেখা পড়া বন্ধ করতে বাধ্য হয়। এতে সরকারের দুর্নাম সৃষ্টি হয়, ফলে সরকারের প্রশংসনীয় উন্নয়নমূলক কাজগুলোরও স্বীকৃতি পাওয়া যায় না।
৯। পাবলিক পরীক্ষার ফি সরকার ও বোর্ড কর্তৃক নির্ধারণের পরও প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন খাত দেখিয়ে দ্বিগুণ তিনগুণ ফি আদায় করে, এতেও অভিভাবকদের শিক্ষা ব‍্যয় বাড়ছে ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
১০। প্রতিষ্ঠানের আয় ব্যয়ে সরকারি নির্দেশনা যথাযথ অনুসরণ হয় না, বিধায় ব‍্যপক অনিয়ম দুর্নীতির সুযোগ থাকে।
উল্লেখিত সমস্যা হতে পরিত্রাণের সমাধান হচ্ছে, সরকার বেসরকারি শিক্ষকদের জাতীয় বেতন স্কেলের শতভাগ + চিকিৎসা ভাতা ৫’শ টাকা + বাড়ি ভাড়া ১ হাজার টাকা + বছরে দুটি উৎসব ভাতা যা স্কেলের ২৫% দিচ্ছে। সরকার প্রদত্ত বেতন-ভাতার সাথে প্রতিষ্ঠানের আয় রাস্ট্রীয় কোষাগারে জমা নিয়ে সঠিক সমন্বয় করা হলে, সকল এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা সহজতর হবে। এতে শিক্ষার মানোন্নয়ন সহ সরকারের সুনাম সুখ‍্যাতি ও অসচ্ছল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
২০১৫ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণে কি পরিমান অর্থের প্রয়োজন? তা জানতে চেয়েছিলেন। সঠিক হিসাব উপস্থাপন করা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছিল। এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা বর্তমানে সরকারি ভাবে যে হারে বেতনভাতা পেয়ে থাকেন তা-ও সমন্বয় করে দেখানো প্রয়োজন ছিল। এমপিও ভুক্ত শিক্ষকদের বেতন ভাতা বাবদ বার্ষিক কত টাকা খরচ হচ্ছে? জাতীয়করণ করা হলে সমপরিমাণ শিক্ষক কর্মচারীদের অতিরিক্ত বা বাড়তি কত টাকা প্রয়োজন? এবং প্রায় দুই কোটি শিক্ষার্থী হতে প্রতিষ্ঠানের আয় বার্ষিক কত টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হবে? তার সঠিক পরিসংখ্যান উপস্থাপন করা হয়েছে কিনা? তা আজো অজানা রহস্য।
আন্তরিকতার সাথে জাতীয়করণের বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট সঠিক তথ্য উপাত্ত উপস্থাপন করা হলে, সকল এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের ঐতিহাসিক ঘোষণা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে সহজতর হতো। যে সরকার বিশ্ব ব্যাংকের সাথে চ‍্যলেন্জ মোকাবেলা করে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে পারে, বিভিন্ন উন্নয়নের ব‍্যপকতায় জাতি মুগ্ধ,  সেই সরকার সামান্য টাকার জন্য শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করতে পারে না এটা অকল্পনীয় ও অবিশ্বাস্য।
সরকারি তথ্য মতে, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন ভাতা বাবদ বার্ষিক ১৩,০২৫/- কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। শেয়ার মার্কেট লুটেরা ও ব‍্যাংক ডাকাতদের কথা নাইবা বললাম, শুধুমাত্র বাংলাদেশ রেলওয়ের বার্ষিক লোকসানের পরিমাণ ১৮ হাজার কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক লোকসানের পরিমাণ ২১- ২৪ হাজার কোটি টাকা মাত্র। এর একটি মন্ত্রনালয়ের লোকসান বন্ধ করা সম্ভব হলে, সকল এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করেও উদ্বৃত্ত থাকবে হাজার হাজার কোটি টাকা। আমারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি সরকার আন্তরিক হলে, সকল এমপিও ভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা এখনই সম্ভব। শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা নয়, যথেষ্ট আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।
যেখানে বেসরকারি শিক্ষকদের চাকরির নিশ্চয়তা নেই, সেখানে শিক্ষকদের নিকট থেকে সর্বোচ্চ সেবা পাওয়ার প্রত্যাশা অমূলক। বিএড, এমএড, অনার্স, মাস্টার্স, এমফিল, পিএইচডি, ডক্টরেট ডিগ্রিধারী অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এবং মেধাবী প্রশিক্ষিত শিক্ষক দিয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করা হলেও, কেন শিক্ষার মান বাড়ছে না? এমন প্রশ্ন অনেকেরই। মূলত সামাজিক বাস্তবতায় শিক্ষকদের অমর্যাদা, অর্থনৈতিক পিছুটান ও অভুক্ত উদরে রেখে মানসম্মত শিক্ষার প্রত‍্যাশা কাল্পনিক।

রাষ্ট্রের সকল স্তরেই মানবিক বিবেকবোধ সম্পন্ন দক্ষ জনশক্তির বিকল্প নেই। এদেশে মেধার প্রকৃত মূল্যায়ন নেই বলেই প্রশাসনের প্রায় সকল স্তরে মেধাহীন ও অযোগ্যদের অবাধ বিচরণ। ব্রিটেনের অলিখিত সংবিধান, তারা আজকে আইন প্রণয়ন করে, পরের দিন থেকেই কার্যকর করা শুরু করে। আমাদেরও স্বীকৃত কোন শিক্ষা আইন নেই, পদস্থ কর্মকর্তারা ইচ্ছেমতো লিখে সীল মেরে প্রকাশ করে দিলে সেটিই আইন। অথচ মন্ত্রণালয়ের উদাসীনতায় ৮ বছরেও একটি স্থায়ী শিক্ষা আইন প্রণয়ন করতে পারেনি সরকার। দেশের সীমাহীন দুর্নীতি, নানাবিধ অসংগতির কারণেই, মানবিক গুণাবলী সম্পন্ন বিবেকবান মানুষ তৈরি হচ্ছে না। যারা সমাজের ত্রুটি বিচ্যুতি পরিবর্তনে চিল্লাচিল্লি করে, তাদের কথায় কেউ কর্ণপাত করছে না। সংবিধান বা আইনের নিজস্ব ক্ষমতা নেই। আইন প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী এবং সরকার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়। মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন আদর্শ মানুষ তৈরি ও শিক্ষার মানোন্নয়নে সকল এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা জরুরি। শিক্ষাব্যবস্থার শৃঙ্খলা ফিরাতে এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকারকেই পালন করতে হবে দায়িত্বশীল অভিভাবকের ভূমিকা।

ভূপেন হাজারিকার সুরেই বলি – মানুষ মানুষের জন্য।
বল কি তোমার ক্ষতি———-জীবনের অথৈ নদী,
পার হয় তোমাকে ধরে————দূর্বল মানুষ যদি?
মানুষ যদি বাঁ হয়না মানুষ, দানব কখনো হয় কি মানুষ?

লেখক
সভাপতি
বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারি ফোরাম
ঢাকা বাংলাদেশ।

Facebook Comments
সংবাদটি শেয়ার করুন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

আরো সংবাদ