মোঃ সাইদুল হাসান সেলিম।।
উন্নত সমৃদ্ধশালী ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম শর্ত, মানসম্মত শিক্ষার মাধ্যমে টেকসই মানবসম্পদ উন্নয়ন। আমাদের শক্তিশালী একটি জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়োপযোগী ও যৌক্তিক দাবি। একথা বলার অবকাশ নেই যে, দেশের বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থা ভবিষ্যতে জাতীয় উন্নয়ন অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখবে না।
দেশের নিম্নমানের শিক্ষা ও বিশৃঙ্খল শিক্ষাব্যবস্থার কারণে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে পুরো শিক্ষাকাঠামো। আগামী প্রজন্মকে গুনগত মানের শিক্ষায় দক্ষ মানবসম্পদে পরিনত করতে অবিলম্বে শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করতে হবে। দেশের ৯৭ শতাংশ শিক্ষাব্যবস্থা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া আত্মঘাতী হতে বাধ্য। শিক্ষা কোন পণ্য নয়। সাংবিধানিক ভাবে মানুষের মৌলিক শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। আর শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের মাধ্যমেই বিদ্যমান সকল সমস্যার সমাধান নিহিত রয়েছে।
দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে কতিপয় সুপারিশ
** দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সন্তানদের স্বল্প খরচে শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টিতে অবিলম্বে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করতে হবে।
** শিক্ষকদের যথাযোগ্য মর্যাদা ও আকর্ষণীয় বেতন-ভাতা প্রদানের মাধ্যমে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব।
** শিক্ষকদের জবাবদিহিতা ও শিক্ষার মানোন্নয়নে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত আলাদা শিক্ষা অধিদপ্তর স্থাপন করতে হবে।
** শিক্ষার মানোন্নয়নে জেলা উপজেলার শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান প্রধান ও শিক্ষকদের নিয়ে তদারকি কমিটি গঠনের প্রস্তাব করছি।
** শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নে গুনগত মানের মেধাবীদের প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
** শিক্ষকদের ধারাবাহিক যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
** শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
** ম্যানেজিং কমিটিতে অশিক্ষিত ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে হবে।
**কমিটিতে সমাজে সর্বজন স্বীকৃত সৎ ও সুশিক্ষিত ব্যক্তিদের মনোনয়ন দিতে হবে।
** শিক্ষক নিয়োগে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের আদলে পৃথক শিক্ষক নিয়োগ কমিশন গঠন করতে হবে।
** প্রতিটি ক্লাসের পাঠ্যবইয়ে নৈতিক শিক্ষার একটি অধ্যায় সংযোজন করার প্রস্তাব করছি।
** ঢালাওভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের অনুমতি দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। যে সব এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনানুসারে সরকার স্থাপন করার প্রস্তাব করছি।
** অবিলম্বে শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠান বদলির জন্য একটি স্বচ্ছ নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। বদলির ক্ষেত্রে কোন দুর্নীতির বিস্তার না ঘটে, এমনি গ্রহণযোগ্য নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
** শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপকহারে ঘুষ বাণিজ্যে ও দুর্নীতির প্রসার ঘটেছে। সৎ, মেধাবী ও যোগ্য কর্মকর্তাদের নিয়ে কমিটি গঠনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রকল্পে শিক্ষা খাতের অর্থ ব্যয় নিশ্চিত করতে হবে।
** শিক্ষার মানোন্নয়নে সর্বাগ্রে শিক্ষকদের জীবন মানোন্নয়নে আকর্ষণীয় বেতন-ভাতা দিতে হবে। জাতীয় শিক্ষানীতির আলোকে সতন্ত্র বেতন-ভাতা প্রদান করতে হবে।
** আসন্ন ২০১৯/২০২০ অর্থবছরে বাজেটে নূন্যতম জিডিপির ৪ শতাংশ বাঁ মোট বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দ দিতে হবে।
** যুগোপযোগী শিক্ষার মানোন্নয়নে জেলা উপজেলার শিক্ষা অফিসে শিক্ষকদের মধ্যে থেকে কর্মকর্তা নিয়োগের মাধ্যমে তদারকির জন্য জনবল বৃদ্ধি করতে হবে।
** কাম্য ছাত্র ছাত্রী নেই, রেজাল্ট নেই এমন অপ্রয়োজনীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো বন্ধ করে শিক্ষক কর্মচারীদের পার্শ্ববর্তী প্রতিষ্ঠানে সমন্বয় করতে হবে।
** অনৈতিকভাবে জাল জালিয়াতির নিবন্ধন ও জাল সনদধারীদের সনাক্ত করে চাকুরিচ্যুত করতে হবে।
** কোচিং বাণিজ্য ও প্রশ্নফাঁসের সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
** বিভিন্ন মন্ত্রণালয়েে অপ্রয়োজনীয় শিক্ষা প্রকল্পের নামে দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। শিক্ষার উন্নয়নে সকল প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ অনুমোদন বাস্তবায়ন শুধুমাত্র শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের হাতে ন্যস্ত করতে হবে।
** শিক্ষকদের যুগোপযোগী পেশাগত মানোন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদী বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে উন্নতমানের একটি শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপন করতে হবে।
** দলীয় পরিচিতি নয়, স্বচ্ছতার সাথে জাতীয় বিভাগীয় জেলা ও উপজেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের বার্ষিক প্রণোদনার ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। এতে শিক্ষার মানোন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করা হবে।
** কর্মরত শিক্ষকদের রাজনৈতিক দলের পদপদবি গ্রহণ বন্ধ করতে হবে।
** দেশের বাস্তবতায় শিক্ষাবিদ ও শিক্ষক নেতৃবৃন্দের সাথে রাউন্ড টেবিল আলোচনা করে মানন্নোত শিক্ষার কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।
শিক্ষার মান উন্নয়নে যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন এবং বিশ্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে আমরা পিছিয়ে যাব। শিক্ষকরা শিক্ষার মানোন্নয়নে পাঠদানে মনোযোগী তখনই হবেন, যখন তাদের যথাযথ সম্মান মর্যাদা ও আর্থিক দুর্দশা লাঘব করা সম্ভব হবে। মেধাবী ও সেরাদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে হবে। আমরা যদি মানসম্মত শিক্ষাক্ষেত্র এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারি তবেই যোগ্যতর মানসম্মত দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে পারবো। উদ্বেগজনক বিষয় দেশে যত বেশি শিক্ষিত তত বেশি বেকারত্ব, এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। এর পিছনের কারন হচ্ছে আমাদের শিক্ষার নিম্নমান।আমাদের দেশে যোগ্যতর শিক্ষিত কর্মীর অভাব হেতু হাজার হাজার বিদেশী পরামর্শক কর্মীরা দেশ থেকে প্রতিবছর কোটি কোটি ডলার নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের আগামী প্রজন্মকে আধুনিক বিজ্ঞান ভিত্তিক ও বিশ্ব মানের শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। আমাদের শিক্ষা মানসম্মত ও যুগোপযোগী করা সম্ভব না হলে, উন্নত রাষ্ট্রের স্বপ্ন ও শতবর্ষের মেগা প্রকল্প নিরর্থক হতে বাধ্য। শিক্ষা নিয়ে গলাবাজি, ধাপ্পাবাজি ও মিথ্যাচার করা চলে না। আধুনিক উন্নত বিশ্বের সাথে পাল্লা দিয়ে, নিজেদের আসন প্রতিষ্ঠিত করতে হলে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ও গুরুত্ব দিয়ে বিনিয়োগ করতে হবে শিক্ষা খাতে। যখনই শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের দাবি উত্থাপন করা হয়, তখন একশ্রেণীর রাজনিতিক ও আমলারা বলছেন, রাতারাতি সব কিছু সম্ভব নয়। দেশ স্বাধীনের ৪৮ বছর পরে আর কত সময় দেয়া হলে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ এবং সুখী সমৃদ্ধ উন্নত সোনার বাংলা গড়তে পারবো? মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা শুধু মুখে নয়, বুকে ধারণ করা প্রয়োজন। শিক্ষা যে কোন জাতিকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যায়। প্রকৃত দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে অনতিবিলম্বে বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করুন।
লেখক
সভাপতি
বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারি ফোরাম
You must be logged in to post a comment.