শিক্ষক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন জরুরি

অন্যদৃষ্টি অনলাইন
শনিবার, ২৮ জুলাই, ২০১৮, ১০:৫১ অপরাহ্ন

মোঃ সাইদুল হাসান সেলিম।।

আজকে আমাদের সমাজে শিক্ষকতা পেশা সবচেয়ে অবহেলিত, বঞ্চিত আর নির্যাতিত এবং অপমানিত সম্প্রদায়ের নাম। পূর্বে শিক্ষকতাকে একটি সম্মানজনক পেশা হিসেবে বিবেচনা করা হত। এই পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের সর্বক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে শিক্ষকদের যে কোনো কাজ, কথা মানুষ শ্রদ্বার সাথে মান‍্য করতো এবং বিশ্বাস করত। কিন্তু বর্তমানে মানবিকতা ও আদর্শহীনতার এ সমাজের বিকৃত রূপ প্রকাশিত হচ্ছে বিশ্ব দরবারে। যার ফলে পিতৃতুল্য শ্রদ্বেয় শিক্ষকদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, শিক্ষকদের উপর বর্বরোচিত, নিষ্ঠুর হামলা, স্বামীকে বেঁধে শিক্ষিকাকে ধর্ষণ, খুন, শারীরিক-মানসিকভাবে নির্যাতন, মতামতকে দমিয়ে রাখা, আর্থিকভাবে অসচ্ছল করে রাখা, সামাজিকভাবে অবমূল্যায়ন করা, লাঞ্ছিত করে শিক্ষকদের সামাজিক জাতীয় উন্নয়নের মূল স্রোতধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার অপচেষ্টা চলছে। অনেক নির্যাতনের ঘটনা শিক্ষকরাই চাকরিচ্যুতি বাঁ মান সম্মান হারানোর ভয়েও  প্রকাশ করেন না। শিক্ষকদের ক্ষেত্রে আত্মহত্যা করারও যে উপায় নেই, কেননা নৈতিকতা আর আদর্শের স্লোগান যে, আত্মহত্যা মহাপাপ।

দেশে একজন সাধারণ শ্রমিকদেরও অধিকার, নিরাপত্তার সুরক্ষা আইন রয়েছে অথচ জাতি গড়ার কারিগরদের নেই কোন সুনির্দিষ্ট সুরক্ষা আইন। তাই শিক্ষকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আইন ও বিধিবিধান প্রনয়ন জরুরি। শিক্ষকরা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হতে হতে এখন সাধারণ মানুষের কাছেও অর্বাচীন হয়ে পড়েছে। তাই দিন দিন শিক্ষকরা ম‍্যানেজিং কমিটি, গভর্নিং বডি, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের দ্বারা অত্যাচারিত নির্যাতিত হয়েই চলেছে। এখনই শিক্ষকদের বঞ্চনা ও সম্মান মর্যাদা রক্ষায় কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রেখে শিক্ষক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করা জরুরি। শিক্ষকদের অভিনব কায়দায় মনুষ্য মল ঢেলে লাঞ্চিত করা, কান ধরে উঠাবসা করা, বিভিন্ন মিথ্যা অভিযোগে বহিষ্কার করা, চাকরিচ্যুতি করা, ম‍্যানেজিং কমিটি, গভর্নিং বডি কর্তৃক শারীরিক, মানুষিক নির্যাতন করা এমনকি হত‍্যার মতো ঘটনা শিক্ষাব্যবস্থায় ও শিক্ষার মানোন্নয়নের মহা বিপদসংকেত।

শ্রমিকদের অধিকার, নিরাপত্তায় শ্রম আইনের দ্বাদশ অধ্যায় ও ১৫০ ধারায় শ্রমিকের দূর্ঘটনা জনিত ক্ষতি পুরনের কথা বলা হয়েছে। শ্রমিকদের শ্রম আইনে নিরাপত্তা বিষয়ক আইন রয়েছে। শ্রম আইনের ১৯৫ ধারায় মালিকের পক্ষের অসদাচরণের বিষয়ে আইন রয়েছে।
শ্রম আইনের ১৩২ ধারায় শ্রমিকদের মজুরি মাস শেষ হওয়ার ৭ দিনের মধ্যে প্রদানের নির্দেশ রয়েছে।
অথচ বেসরকারি শিক্ষকদের জনবল কাঠামোতে শিক্ষকদের আর্থিক সুবিধা বঞ্চিত করা এবং ম‍্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির আচরণের বিষয়ে কিছুই বলা হয়নি। পরিচালনা পর্ষদের কোনো আদেশ অমান্য করা মানেই অসদাচরণ, যার শাস্তি অনেক ক্ষেত্রে থেকে বরখাস্ত করণ, চাকরিচ্যুতি, অত‍্যাচার ও শারীরিক নির্যাতন।

উপরোক্ত আলোচিত জঘন্য ঘটনার প্রতিরোধে এখনই কঠোর হস্তে ব‍্যবস্থা নেয়া না হলে ভবিষ্যতে জাতিকে চরম মূল্য দিতে হবে । বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থার দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে এবং শিক্ষকদের নিরাপত্তায় সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করতে হবে। শিক্ষকদের নির্যাতিত ও নিগৃহীত করে, মনে ক্ষোভের সৃষ্টি করা হয়েছে। শিক্ষকদের মধ্যে পূঞ্জীভূত ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি করে শ্রেনী কক্ষে মানসম্মত পাঠদান অসম্ভব। যেই জাতি জ্ঞানী গুণীদের সম্মান মর্যাদা ও কদর করতে জানে না, সেই জাতি কখনো উন্নতি করতে পারে না। তাই অনতিবিলম্বে শিক্ষক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করতে হবে। শিক্ষকদের সম্মান মর্যাদা রক্ষায় সর্বাগ্রে সরকারকেই সচেষ্ট হতে হবে। এটা দুঃখজনক যে, একটি শিক্ষা আইন তৈরিতে ৮ বছর সময় অতিক্রান্ত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

শিক্ষক নির্যাতনরোধে শিক্ষক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন জরুরি। ইদানীং দেশে বিচ্ছিন্নভাবে শিক্ষক হয়রানী ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে যথেচ্ছা ভাবে, তবুও টনক নড়ছেনা নীতি- নির্ধারকদের। বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচন ও বিদ্যালয় কেন্দ্রিক আর্থিক সুবিধা হাতিয়ে নিতে স্থানীয় রাজনীতিতে আধিপাত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে শিক্ষকরা প্রতিনিয়ত শারীরিক মানুষিক নির্যাতন ও হয়রানীর শিকার হচ্ছে। সমাজের দর্পণ, জাতির বিবেক,দেশ গড়ার কারিগররা আজ সর্বত্র মার খাচ্ছে। তাই এর থেকে পরিত্রাণ পেতে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে জাতির কলংঙ্ক ধুয়ে মুছে দিতে হবে। শিক্ষক সমাজ  নির্বাক, শুধু নিন্দা জ্ঞাপন বা মানববন্ধন করে নয়,  শিক্ষকদের এই দুর্দশা লাঘবে শিক্ষক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। আর এ দাবি বাস্তবায়নে দেশের সকল শ্রেনী পেশার মানুষ কেই এগিয়ে আসতে হবে।

-লেখক
সভাপতি
বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারি ফোরাম
ঢাকা বাংলাদেশ।

Facebook Comments
সংবাদটি শেয়ার করুন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

আরো সংবাদ