নোটিশ :
সংবাদকর্মী নিচ্ছে অন্যদৃষ্টি। আগ্রহীগন সিভি পাঠান- 0nnodrisrtynews@gmail.com
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৪:০৫ অপরাহ্ন

যুবসমাজকে  বাঁচাতে হলে মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর হতেই হবে

মোঃ হায়দার আলী, রাজশাহী
শুক্রবার, ২ জুলাই, ২০২১, ৭:৩১ অপরাহ্ন

করোনার কারনে লুকিয়ে থাকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সংস্থার তালিকাভুক্ত মাদ্রক মাদক ব্যবসায়ী ও সম্রাটরেরা এলাকায় ফিরে এসে বীর দাফটে তাদের অবৈধ মাদক কারবার শুরু করেছেন। সে যাই হউক ওই শিক্ষক  বন্ধুর কথা শুনে লেখার মাদক সম্পর্কে আল্লাহর নাম নিয়ে লিখা শুরু করলাম।

বর্তমানে  মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীর তালিকা  দিনে দীর্ঘ হচ্ছে। কোন ভাবে থামানো যাচ্ছেনা এ অবৈধ মাদককারবার। ফলে সব চেয়ে ক্ষতি গ্রস্থ হচ্ছে যুব সমাজ। দেশে মাদকের বিস্তৃতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। তরুণ ও যুবসমাজ ব্যাপক হারে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। মাদকে আক্রান্ত তরুণ ও যুবসমাজ ধ্বংসের পথে। বর্তমান সমাজে মাদক জন্ম দিচ্ছে একের পর এক অপরাধ। শুধু মাদকের কারনে ছেলের হাতে বাবা মা ভাই ও খুন স্ত্রী হাতে স্বামী, স্বামীর হাতে স্ত্রী, প্রেমিকের হাতে প্রেমিকা, প্রেমিকার হাতে প্রেমিক খুন হওয়ার কথা পত্র পত্রিকায় খবর বের হয়েছে। মাদকের ছোঁয়ায় সম্ভাবনাময় তারুণরা অধঃপতনের চরম শিখরে উপনীত হচ্ছে। মাদক এখন সহজলভ্য। রাজধানী শহর-নগর, গ্রামসহ মফস্বল এলাকায়ও হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়। আশির দশকের শেষ দিকে ফেনসিডিলের আবির্ভাব হয়। পর্যায়ক্রমে এটার ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটে। নব্বইয়ের দশকে মাদকের জগতে সংযোজন হয় ইয়াবা। এ ছাড়া গাঁজা, আফিম, চরশ, বাংলা মদ, গুল, মরফিন, কোকেন, বিয়ার, ওয়াইন, হেরোইন, প্যাথেলিন, মারিজুয়ানা, ডেক্রপরটেন, প্যাথেডিন কোকেন চোলাইমদসহ রকমারি মাদকের প্রতি তরুণদের আসক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বিধ্বংসকারী মাদকের বিস্তার সমাজে যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে সচেতন অভিভাবক মহল উদ্বিগ্ন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় পরিচালিত এক জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৮ বছরের ওপরে শূন্য দশমিক ৬৭ শতাংশ মানুষ মাদকাসক্ত। মাদকাসক্তদের মধ্যে ৮৫ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। না বুঝেই অনেক তরুণ এ পথে পা দিয়ে বিপথগামী হয়ে যাচ্ছে। একটি পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে, মাদক সেবনের কারণে বিশ্বে প্রতি বছর ৮০ লাখ মানুষ এবং বাংলাদেশে প্রতি বছর ১ লাখ ২৬ হাজার মানুষ মারা যায়। বাস্তবে এই সংখ্যা আরো বেশি। মাদকাসক্ত সন্তানের কারণে এক একটি পরিবার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। মাদকাসক্ত সন্তানকে নিয়ে পরিবারগুলো দিশেহারা হয়ে পড়ছে। পথশিশুরাও আজ ভয়াবহ নেশায় আসক্ত হচ্ছে।

সমাজসেবা অধিদফতরের এক গবেষণায় দেখা যায়, শহর, গ্রাম থেকে নিয়ে স্কুল-কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও মাদকাসক্ত হচ্ছে। যত্রতত্র চলছে মাদকের রমরমা বাণিজ্য। প্রতিনিয়িত বসছে নেশার আড্ডা। অনেকে নেশার টাকা জোগাড় করতে নেমে পড়ছে অপরাধ জগতে। মাদকের চাহিদা মেটাতে তরুণ-তরুণীরা ক্রমেই অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠছে। অনেক শিক্ষার্থী নেশার মোহে পড়ে সম্ভাবনাময় জীবনকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে একজন মানুষ যখন অপরাধজগতে পা বাড়ায়, প্রথম সিঁড়িটি হলো মাদকদ্রব্য। সিগারেট হলো মাদকাসক্তির মূল কারণ। একজন মানুষ প্রথমেই কিন্তু মাদক সেবন করে না। প্রথমে যেটা করে সেটা হলো সিগারেটের নেশা। এই নেশা থেকে আস্তে আস্তে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ে। মাদকের নেশায় আসক্ত বেশির ভাগই শুরু হয় বন্ধুবান্ধবের সাহচর্যে। মাদক গ্রহণের ফলে প্রাথমিক সাময়িক স্বস্তি পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু এই ক্ষণস্থায়ী স্বস্তির আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়ংকর মরণ ফাঁদ। এই মরণ ফাঁদে একবার পড়লে স্বাস্থ্যহানি ঘটে, সৃজনীশক্তি শেষ হয়ে যায়। স্বাস্থ্যহানি বলতে কেবলই দৈহিক স্বাস্থ্যের কথা বলা হচ্ছে না। দেহের পাশাপাশি বিশৃঙ্খলা ও বিধ্বস্ত হয় মনের স্বাস্থ্য, ক্ষয় হয় নৈতিক মূল্যবোধ, মাদক কেড়ে নিচ্ছে তরুণদের একাংশের সুবুদ্ধি ও সুবিবেচনা। যার ফল সমাজ-জীবনে দুর্যোগ নেমে আসে। মাদকাসক্তি দেশে সংঘটিত অপরাধের একাংশের প্রধান নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পারিবারিক বিপর্যয়গুলো বিশেষজ্ঞদের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছে। এই সর্বনাশ মাদক ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট চক্রকে মোটেও বিচলিত করে না। তারা কেবলই বোঝে ব্যবসা। তরুণ প্রজন্মের হাতে তুলে দিচ্ছে মরণনেশার উপকরণ মাদক। তরতাজা তরুণদের মেধা, বিবেক, লেখাপড়া, মনুষ্যত্ব সবকিছু ধ্বংস করে দিচ্ছে ইয়াবার ভয়াবহ নেশা। বিনষ্ট করে দিচ্ছে স্নেহ, মায়া, ভালোবাসা, পারিবারিক সুবন্ধন। মাদকাসক্ত সন্তানের হাতে অহরহ বাবা-মা, ঘনিষ্ঠ স্বজন নির্মম হত্যার শিকার হচ্ছে। নেশাখোর বাবা মাদক সংগ্রহে ব্যর্থ হয়ে কান্ডজ্ঞান হারিয়ে প্রিয় সন্তানকে খুনও করছে অবলীলায়। নেশার টাকা না পেয়ে স্ত্রীকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা, মাকে জবাই করা, আদরের সন্তানকে বিক্রি করে দেওয়ার মতো জঘন্য ঘটনাও ঘটছে।

এক নজরে বাংলাদেশে মাদকের পরিসংখ্যান বাংলাদেশে প্রায় ৭.৫ মিলিয়ন মানুষ মাদকাসক্ত। দেশের বেকার জনসংখ্যারও বেশ বড় অংশ মাদকাসক্ত। মোট মাদকাসক্তদের ৪৮ শতাংশ শিক্ষিত এবং ৪০ শতাংশ অশিক্ষিত। মাদকাসক্তদের প্রায় ৫৭ শতাংশ যৌন অপরাধী, যাদের ৭ শতাংশ হলো এইচআইভি ভাইরাস দ্বারা সংক্রামিত। সারা দেশে প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার মাদক ব্যবসায়ী তাঁদের ব্যবসা পরিচালনা করছেন, যাঁদের মধ্যে ২৭ হাজার ৩০০ জন মহিলা।

২০১৯ সালে গড়ে প্রতিদিন ১১৪ জন রোগী সরকারি ও বেসরকারি পুনর্বাসন কেন্দ্রে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ১০৪ এবং ২০১৭ সালে ৬৯। এটাও অবাক করার মতো বিষয় যে ২০১৯ সালে মহিলা মাদকসেবীদের সংখ্যা চার গুণ বেড়েছে। ২০১৮ সালে ৯১ জন মহিলা সরকারি সুযোগ-সুবিধায় চিকিৎসা পেয়েছিলেন। এই সংখ্যা বেড়ে ২০১৯ সালে ৩৬০ হয়েছে। (১৩ জানুয়ারি, ২০২০-এ দ্য  ফিন্যানশিয়াল এক্সপ্রেসে প্রকাশিত)।

র‌্যাবের সূত্রমতে, দেশে বর্তমানে প্রায় ৬০ লাখ মাদকসেবী রয়েছে। মাদকসেবীদের শতকরা ৯১ ভাগই কিশোর ও তরুণ। এরমধ্যে ৪৫ দশমিক ৭৪ ভাগ বেকার, ৬৫ দশমিক ১ ভাগ আন্ডার গ্র্যাজুয়েট, ১৫ ভাগ উচ্চ শিক্ষার্থী, ২২ দশমিক ৬২ ভাগ ব্যবসায়ী, ১০ দশমিক ৬৭ ভাগ চাকরিজীবী, ৬ দশমিক ৬৭ ভাগ ছাত্র এবং ৬ দশমিক ৮০ ভাগ শ্রমিক। এর পেছনে ব্যয় হওয়া টাকার অংশও কম নয়। ৬০ লাখ মাদকসেবীর পেছনে খরচ করে ৯১,১২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। তন্মধ্যে কেবলমাত্র ফেনসিডিলই বছরে আমদানি হয় ১৭০০ কোটি টাকার, যা সীমান্ত পথে, যশোর, রাজশাহী, বেনাপোল, সাতক্ষীরা, চুয়াডাঙ্গা, কুমিল্লা, আখাউড়া ও সিলেট হয়ে দেশে ঢুকছে।

মাদকাসক্তির বহু কারণের মধ্যে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় অন্যতম। ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক অস্থিরতা, দারিদ্র্যের কষাঘাত, বেকারত্বের নৈরাশ্যও কম দায়ী নয়।

মাদক ব্যবহারকারীরা একাধিক উৎস থেকে মাদক সংগ্রহ করে। তাদের বেশির ভাগকেই বন্ধুবান্ধব-সহপাঠী মাদক সরবরাহ করে। কেউ কেউ মাদক ব্যবসায়ী-চোরাচালানকারীদেরই উৎস

হিসেবে ব্যবহার করে। অল্পসংখ্যক পথশিশু-টোকাইয়ের মাধ্যমে মাদক সংগ্রহ করে এবং অনেকে ডমেস্টিক হেল্পের (সার্ভেন্ট, সিকিউরিটি গার্ড ইত্যাদি) মাধ্যমে ও মাদক পেয়ে থাকে।

মাদকের ভয়াবহতা মাদকের হাতছানি সারা দেশে। শুধু শহরেই নয়, গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে মাদক। তার বিষাক্ত ছোবল শেষ করে দিচ্ছে তারুণ্যের শক্তি ও সম্ভাবনা। সর্বনাশা মাদক ধ্বংস করে একটি মানুষের শরীর, মন, জ্ঞানবিবেক ও তার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা তার পরিবারের সব স্বপ্নকে এবং তার উজ্জ্বল ভবিষ্যেক।

শুধু পরিবারকে নয়, মাদকের কালো থাবা ধ্বংস করে একটি সমাজকে, একটি জাতিকে এবং পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে এটি বৃহৎ আকার ধারণ করে একটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। তরুণ তাজা প্রাণের অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়ায় পিছিয়ে পড়ছে সমাজ। বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন পথে, মাদক ঢুকে পড়ছে আমাদের সমাজে। আর ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনের অবক্ষয়, প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির অসামঞ্জস্যতা, হতাশা এবং মূল্যবোধের অভাবের সুযোগ নিয়ে মাদক তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে তরুণসমাজের প্রতি।

মাদকে তরুণসমাজ ধ্বংস বিভিন্ন গণমাধ্যমসহ অন্যান্য সূত্রে আমরা প্রতিনিয়ত খবর পেয়ে থাকি, রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান, বনানী ও বারিধারায় সর্বনাশা ইয়াবা সেবনের ফলে ধনী শ্রেণির দুলাল-দুলালিরা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। গুলশান, বনানী, বারিধারায় মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সর্বনাশা ইয়াবা সেবনের ফলে তাঁদের সন্তানরা পৌঁছে যাচ্ছে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। শুধু গুলশান, বনানী নয়, মিরপুর. টোলারবাগ, মালিবাগ, যাত্রাবাড়ী, মহাখালী, গাবতলী, সায়েদাবাদসহ বেশ কিছু এলাকায় দেখা যাচ্ছে মাদকের করাল গ্রাস। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এখন পর্যন্ত ২৪ ধরনের মাদক উদ্ধার করেছে। আর এসব মাদকের মধ্যে রয়েছে—ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন, গাঁজা, চোলাই মদ ও বিদেশি মদ, প্যাথেড্রিন, ডিনেচার্ড স্পিরিট, ভাং, বিয়ার, তাড়ি, বুপ্রেনরফিন (টিডি জেসিক ইঞ্জেকশন), কোডিন ট্যাবলেট, ফার্মেন্টেড ওয়াশ (জাওয়া), বুপ্রেনরফিন (বায়োজেসিক ইঞ্জেকশন), মরফিন, আইস পিল, ভায়াগ্রা, সানাগ্রা, টলুইন, পটাসিয়াম পারম্যাংগানেট ও মিথাইল-ইথাইল কিটোন।

পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে সীমান্ত পথে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক দেশে ঢুকছে অভিনব পদ্ধতিতে। পেঁয়াজের ভেতরে ইয়াবার চালান আনা হচ্ছে কুমিল্লা থেকে। দীর্ঘদিন ধরেই সীমান্তে মৌসুমি ফল বহনকারী পরিবহন ফেনসিডিল, ইয়াবাসহ মাদকদ্রব্য চোরাচালানের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তরমুজ ও মোটা বইয়ের মধ্যে মাদক আনা নেযা হচ্ছে।

নতুন এক উদ্বেগের বিষয় হলো, মাদকের অপব্যবহার ও চোরাচালানের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ ব্যবহার হচ্ছে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সন্ত্রাসের প্রসারে। বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার সীমান্তে ছোট-বড় কারখানা গড়ে উঠেছে। ফান্ড সংগ্রহে এখন জঙ্গিরা মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, ডাকাতি ইত্যাদিতে জড়িয়ে পড়ছে।

বর্তমানে প্রেসক্রিপশন ড্রাগ একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে উঠেছে। প্রেসক্রিপশন ড্রাগ একটি ফার্মাসিউটিক্যাল ড্রাগ, যা আইনিভাবে একটি মেডিক্যাল প্রেসক্রিপশনের মাধ্যমে বিতরণ করার নিয়ম। প্রেসক্রিপশন ড্রাগগুলো মদ্যপান এবং গাঁজার পরে (কোকেইন, হেরোইন এবং মেথামফেটামিনের আগে) তৃতীয় সবচেয়ে বেশি ব্যবহূত মাদক। এই ওষুধের অপব্যবহার করে সহজেই যে কেউ আসক্ত হয়ে উঠতে পারে। অনেকেই আরেকজনের প্রেসক্রিপশন ব্যবহার করে বা নির্ধারিত ডোজের বেশি গ্রহণ করে এতে আসক্ত হয়ে পড়ে।

মাদকের বিস্তারে নারী ও শিশুদের ব্যবহার ক্রমাগত বাড়ছে। মাদক ব্যবসায়ীরা ইয়াবার আমদানি, সরবরাহ ও বেচাকেনার জন্য নিরাপদ হিসেবে নারী ও শিশুদের বেছে নিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে পুরুষরা ব্যর্থ হওয়ায় তাদের পরিবারের ভাড়া করা নারী ও শিশুদের নামাচ্ছে এ ব্যবসায়। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারের নারী ও শিশুরা অর্থনৈতিক সচ্ছলতার জন্য জড়াচ্ছে মাদক ব্যবসায়।

বর্তমানে দেশে ইয়াবার প্রভাব বেড়ে যাওয়ায় নারী মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এর অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে নারীরা একসঙ্গে অনেক ইয়াবা তাদের দেহের বিভিন্ন স্পর্শকাতর অংশে সহজেই বহন করতে পারে। কিছুদিন ধরে নারীরা ইয়াবার বিশেষ ধরনের থলে পেটের মধ্যে বহন করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। শিশুদের স্কুলব্যাগে করেও পাচার করা হচ্ছে মরণনেশা ইয়াবার চালান।

মাদক নির্মূল কৌশল ও সফলতা  মাদক নির্মূলে সাধারণত তিনটি পদ্ধতিতে মাদকবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়—চাহিদা হ্রাস, সরবরাহ হ্রাস ও ক্ষতি হ্রাস। চাহিদা হ্রাস কৌশলের অংশ হিসেবে মাদকবিরোধী ডিজিটাল প্রচারের নতুন সংযোজন এলইডি কিওস্ক ডিসপ্লে ডিভাইস, যা প্রতিটি জেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য তিনটি করে স্থাপন করা হচ্ছে। মাদকদ্রব্যবিরোধী সরকারি বা বেসরকারি যাবতীয় কাজের সমন্বয় সাধন, তত্ত্বাবধান, পরামর্শ প্রদান ও মাদকবিরোধী জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য জাতীয় জেলা-উপজেলা পর্যায়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ ও প্রচার কমিটির রয়েছে। সব কমিটির কার্যক্রম জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বোর্ড পবীবিক্ষণ ও মূল্যায়ন করে থাকে। জাতীয় মাদকবিরোধী কমিটির জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে জেলা পর্যায়ে জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ প্রচারণা কমিটি রয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সভাপতিত্বে উপজেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কার্যক্রম পর্যালোচনা সমন্বয় সাধনের জন্য প্রতি তিন মাস পর পর মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে প্রধান কার্যালয়ে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

ক্ষতি হ্রাসের অংশ হিসেবে দেশের প্রতিটি জেলায় পর্যায়ক্রমে সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্র নির্মাণ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। মাদকাসক্তদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারিভাবে দেশের চারটি নিরাময়কেন্দ্র আছে। এ ছাড়া ২০১৯ সালের মে পর্যন্ত বেসরকারি পর্যায়ে ৩০৪টি মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র পরিচালনার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে, যাতে তিন হাজার ৭৯০টি বেড রয়েছে।

টেকসই মাদক নিয়ন্ত্রণ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আন্তর্জাতিক ড্রাগ কনভেনশনগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করা এবং মাদক নিয়ন্ত্রণে জনস্বাস্থ্য, মানবাধিকারসহ জাতিসংঘের কার্যপরিকল্পনা অনুসারে অভ্যন্তরীণ মাদক পলিসি প্রবর্তন করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক দেশ ও সংস্থার সঙ্গে বেশি বেশি আলোচনা ও সহযোগিতার মাধ্যমে টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ ফলপ্রসূ হতে পারে। দেশের সীমান্তসহ মাদক প্রবেশের যত রুট রয়েছে তা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। বাংলাদেশের উদ্যোগে ভারত-মিয়ানমার-বাংলাদেশকে নিয়ে ত্রিপক্ষীয় মাদক নিয়ন্ত্রণ আঞ্চলিক কাঠামো করা মাদক নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নতুন করে যেন কোনো শিশু-কিশোর কিংবা উদ্বেলিত তরুণ-তরুণী মাদকের জালে জড়াতে না পারে, তারা যেন কৌতূহল কিংবা এক্সপেরিমেন্টেশন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে পারে এবং বন্ধুবান্ধব নির্বাচনে যেন সজাগ থাকে, এ জন্য মাদকের পরিণতি সম্পর্কে আগেই খোলামেলা আলোচনা করতে হবে। এ ছাড়া খেলাধুলাসহ শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সৃজনশীল বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে এখন থেকেই সব অভিভাবক তথা আমাদের সবাইকে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে।

মাদকের ছোবল থেকে দেশের তরুণ ও যুব সমাজকে বাঁচাতে সমাজে নৈতিক মূল্যবোধ তৈরি ও মটিভেশনাল প্রোগ্রামসহ মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক সভার আয়োজন করতে হবে। তরুণ ও যুবসমাজের মনে মাদকের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করতে হবে। ইসলামী জীবন যাপনের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে হবে। পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা আরো বাড়াতে হবে। মাদকের আগ্রাসন প্রতিরোধে মাদক পাচারের সাথে সংশ্লিষ্ট ও ব্যবসায়ীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। মাদক পাচার রোধ ও মাদকের সহজপ্রাপ্যতা বন্ধ করতে হবে। আইন প্রয়োগের মাধ্যমে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কার্যকর করতে হবে। দেশের অভ্যন্তরে মাদকের উৎপাদন এবং পার্শ্ববর্তী দেশের মাদক চোরাচালানের সব পথ বন্ধ করতে হবে। অভিভাবকদের তাদের সন্তানদের প্রতি যত্নশীল হতে হবে। শিক্ষার সর্বস্তরে ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। কেবল রাষ্ট্রীয়ভাবে নয়, সামাজিক ও পারিবারিকভাবেও সচেতন হতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে পরিবার থেকে রাষ্ট্র পর্যায় পর্যন্ত সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।  মাদকের হাত থেকে তরুণদের মুক্ত করা সমাজের দায়িত্ব। আর এজন্য যথাযথ পদক্ষেপের বিকল্প নেই। আমাদের সবাইকে নৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে।

মুক্ত করতে হবে দেশের যুবসমাজকে। মাদকাসক্তি শুধু ব্যক্তির শারীরিক অবস্থারই অবনতি ঘটায় না বরং একটি সমাজের প্রচলিত মূল্যবোধ, নীতি-নৈতিকতা, সংস্কৃতি ও সভ্যতাকেও ঠেলে দিচ্ছে অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে। তাই আমাদের উচিত মাদকবিরোধী তীব্র আন্দোলনে সোচ্চার হওয়ার মধ্য দিয়ে যুবসমাজকে মাদকের হাত থেকে রক্ষা করা। নয়ত মাদকের ভয়ঙ্কর থাবায় ধ্বংস হবে আমাদের সমাজব্যবস্থা সর্বোপরি রাষ্ট্রব্যবস্থা।

 

লেখক: প্রধান শিক্ষক, মহিশালবাড়ী মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়

সভাপতি, জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা, গোদাগাড়ী উপজেলা শাখা, রাজশাহী।

Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email
সংবাদটি শেয়ার করুন


এ জাতীয় আরো সংবাদ