মে দিবস : প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ

অন্যদৃষ্টি অনলাইন
শুক্রবার, ১ মে, ২০২০, ১২:৪১ অপরাহ্ন

তোফায়েল হাসান রুপক।।

পৃথিবীর আজ শরীর ভাল নেই। অবাধ্য সময়ের বিশুদ্ধ বিষন্নতায় আড়ষ্ট। শরীরের প্রতিটা কোষের এক একটা নিউক্লিয়াসের ধারাবাহিক নিথর হয়ে যাওয়া প্রত্যক্ষ করছে জীবন্ত কোষগুলো। মৃত্যুই এখানে মৃত্যুর কারন। দুনিয়াজুড়ে মৃত্যুর বন্দনা।

শরীর ছেড়ে পালাতে না পারলেও কোষগুলো নিরাপদ দুরত্ব রক্ষা করে স্বেচ্ছা কারাবাসের প্রানান্তর প্রচেষ্টায় মত্ত। এরই মাঝে শূণ্য পাকস্থলিতে কিছু কোষের নিরস্ত্র বেঁচে থাকার আন্দোলন। তাদের বিদ্রোহ নোটের সেলাইয়ে মোড়া দেহলোভী বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে। কোন প্রত্যশা নেই তাদের, নেই কোন প্রাপ্তি, আছে বহু দাবী দাওয়া। আর তাদেরই ঘামের দামে আজ পালিত হচ্ছে মহান মে দিবস আভিজাত্যময় কলা।

প্রচলিত অর্থে শ্রমের বিনিময়ে যারা মজুরি পায় তাদের শ্রমিক বলে। ২০০৬ সালের বাংলাদেশ শ্রম আইনের ২(৬৫) ধারা অনুযায়ী – শ্রমিক অর্থ শিক্ষাধীনসহ কোন ব্যক্তি, তাহার চাকুরীর শর্তাবলী প্রকাশ্য বা উহ্য যেভাবেই থাকুক না কেন, যিনি কোন প্রতিষ্ঠানে বা শিল্পে সরাসরিভাবে বা কোন মাধ্যমে মজুরী বা অর্থের বিনিময়ে কোন দক্ষ, অদক্ষ, কায়িক, কারিগরী, ব্যবসা উন্নয়নমূলক অথবা কেরানীগিরি কাজ করার জন্য নিযুক্ত হন। তবে বাসা বাড়িতে কাজ করা গৃহকর্মী, দিনমজুর, পাহারাদার, রেমিটেন্স যোদ্ধা কথা প্রবাসী শ্রমিক, শিশু-কিশোর শ্রমিক অথবা নির্মাণ শিল্পের সব স্তরের শ্রমিকদের শ্রমঘন্টা জাতীয় শ্রম বিনিয়োগে বিশেষ ভূমিকা রাখলেও তা আজও আইনের যথাযথ স্বীকৃতি পায় নি। এখন প্রশ্ন হলো, প্রতিষ্ঠান বা শিল্পে জড়িতরাই কি শুধু শ্রমিক? নাকি ঘামের দামে যারা শ্রম অদল বদল করে তারা সবাই শ্রমিক?

ইতিহাসের ক্যানভাস বলে, যুক্তরাষ্ট্রে অনধিক ১০ ঘণ্টার শ্রমঘণ্টা নির্ধারণের দাবিতে কয়লা খনির শ্রমিকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে পেনসেলভেনিয়ার আন্দোলন করলে তাতে ১০ শ্রমিক নিহত হন। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের ১ মে আমেরিকার শিকাগো শহরে উল্লিখিত অনধিক ১০ ঘণ্টা শ্রমঘণ্টা নির্ধারণের দাবিতে শ্রমিকদের একটি মিছিল বের হয়। মিছিলটি শহরের কেন্দ্রস্থল হে মার্কেটের কাছে পৌঁছলে সৈনিকরা বাধা দেয় এবং সংঘর্ষ বেধে যায়। সৈনিকদের গুলিতে বহুসংখ্যক শ্রমিক নিহত ও আহত হন। গ্রেফতার হন শত শত শ্রমিক। পরবর্তীকালে যাদের অনেককেই মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘ ১ মে-কে সার্বজনীন শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯১৯ সালের ১৯ এপ্রিল ভার্সাই চুক্তির মাধ্যেমে ILO( International Labour Organisation) প্রতিষ্ঠিত হয় যা ১৯৪৬ সালে জাতিসংঘের সহায়ক সংস্থার স্বীকৃতি পায়। ১৯৭২ সালের ২২ জুন বাংলাদেশ ILO এর সদস্যপদ লাভ করে। এর প্রায় ৩৪ বছর পর বাংলাদেশ প্রবল আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০০৬ সালে প্রায় ডজন খানেক আইনের সংকলন হিসেবে ১১ অক্টোবর একটা শ্রম আইন প্রনয়ন করেন।এরপর ২০১৫ সালে শ্রম বিধিমালা এবং ২০১৮ সালে সংশোধিত শ্রম আইন প্রনীত হয়।

কর্মে নিযুক্ত একজন শ্রমিকের জীবনের মূল্য কত বা শ্রমিকের দেহ চিরস্থায়ী অক্ষম হলে তার মূল্যই বা কত হবে এর হিসাব-নিকাশ রানা প্লাজা বা তাজরীন গার্মেন্টস এর মালিকদের মত এত ভাল কেউ কষতে পারবে না। বাংলাদেশের জাতীয় শ্রমনীতি আজ ব্যবচ্ছেদ করে খাচ্ছে কিছু বিশেষজ্ঞ পেশাদার বুর্জোয়ারা। শ্রম আইনে [ধারা ২(৪৭),২(৪৮),৩১৭-৩১৯]”শ্রম পরিদর্শক” বা “শ্রম কর্মকর্তা” নামের যে কাগুজে বাঘের কথা শিল্পকারখানা পরিদর্শণের জন্য লেখা আছে তারা এ পর্যন্ত মালিকদের সামনে কবে তার স্বকীয়রূপে আবির্ভুত হয়েছিল তা হয়তো হাতে গুনে দেখা যাবে। শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও কল্যানে আইনে অনেক সূচক নির্ধারিত থাকলেও বাস্তবতা অধিকাংশ ক্ষেত্রই ভিন্ন। শিল্প কারখানার পরিদর্শন বইতে (Inspection Book) কোন মন্তব্য না লিখেই পরিদর্শকরা তাদের দ্বায় প্রচলিত অর্থে পরিশোধ করে থাকেন। আর নূন্যতম মজুরী বোর্ডের সুপারিশ! সে তো হাতুড়ে ডাক্তারের চিকিৎসাপত্রের মত।(ধারা ১৩৮-১৪৫)। সারাদেশে পূর্বে ছিল ০৭ টা অধুনা ০৩ টা মিলে সর্বসাকুল্যে ১০ টা শ্রম আদালত (ঢাকা-৪টা , চট্রগ্রাম-২টা, খুলনা-১টা, বরিশাল-১টা, সিলেট-১টা ও রংপুর-১টা) এবং ০১ টা মাত্র শ্রম আপীল ট্র্যাইব্যুনালের অস্তিত্ব তো শিল্প বিরোধ নিরসনে দৈন্যতার অন্যতম স্বারথী হয়ে আছেই।

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু প্রথম মে দিবসের আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও শ্রমিকদের আত্মত্যাগের গুরুত্ব বিবেচনায় এ দেশে ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করেন।বাংলাদেশে মে দিবসে সরকারি ছুটির সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠন দিনটি পালন করতে শোভাযাত্রা, শ্রমিক সমাবেশ, আলোচনা সভা, সেমিনার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা কর্মসূচি পালন করে থাকে। এছাড়া কেতাদুরস্ত শ্রমিক নেতাদের বাহারি টকশো এর পাশাপাশি ফকির আলমগীর ও কাঙ্গালিনী সুফিয়ার গণ সংগীতের বাহুল্য চর্চা তো মিডিয়া জুড়ে থাকেই। তবে সব কর্মসূচিই থাকে কিন্তু শ্রমিকদের কল্যানকামী বিবিধ দাবী দাওয়া আদায়ের লক্ষ্য নিয়ে। তারপর দিন শেষে আবার যে যার কর্মে, আবার পরের বছরের জন্য প্রস্তুতি।

শ্রমিককে বা মালিকদের কেন্দ্র করেই জন্ম নেয় হয় সিবিএ (Collective Bargaining Agent) বা যৌথ দরকষাকষি প্রতিনিধি। আর সিবিএ নির্বাচনের মাধ্যমেই নির্ধারিত ট্রেড ইউনিয়ন পরবর্তীতে ফেডারেশনে রুপ নেয়। এ কথাগুলো বলার অন্যতম কারন হলো, মালিকদের সাথে দরকষাকষির পরিধি যতই বড় হোক না কেন, কেন্দ্রে কিন্ত সেই সাধারন শ্রমিকরাই থাকে। যারা অবুঝ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তাদের নেতার ইঙ্গিতের দিকে। আর নেতার কথা তো তথৈবচ। ক্ষেত্রমতে শ্রমিক নেতা-মালিক ভাই ভাই হয়ে গেলে বা মালিকের আলো আধিয়ার জীবনের সঙ্গী হয়ে গেলে, অদৃশ্য আকর্ষনে তখন তাদের দরকষাকষির দোলক (Pendulum) দুলতে থাকে। সুবিধামত এ ইউনিয়ন রাষ্ট্রযন্ত্রকেও বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাতে কার্পণ্য করে না। যে যার সুবিধামত শ্রমিকদের নিজ স্বার্থে ব্যবহার করে। তবে এর বিপরীত চিত্রও যে একেবারেই নেই তা কিন্তু নয়।

দিবস যায় দিবস আসে কিন্তু কেন্দ্র (শ্রমিক) তার অবস্থানে অবিচল থাকে। বরং কেন্দ্রের স্বার্থকে অবিকৃত রেখে কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যসার্ধের অন্তরালে শুধু মালিকদেরই পরিধি বাড়ে। শ্রমিকের উনুন কিন্ত সেই মধ্য বিরতিতেই জ্বলে। কখনও বা বিরতি দীর্ঘ আবার কখনও নাতিদীর্ঘ। শ্রমিকের স্বার্থ দেখার কাজে নিয়োজিতরা তবু কানে সীসা আর মুখে কুলুপ এটে পরের বছরের মে দিবসের অপেক্ষায় বসে থাকে। এ বিপুল পরিমান শ্রমিকদের ন্যায়বিচারে অপ্রতুল আদালত ব্যবস্থা অনুসঙ্গ হিসাবে অধিকার না পাওয়ায় বিশেষ মাত্রা যোগ করেই চলেছে। কারা শ্রমিকের সংজ্ঞায় পড়বে এ নিয়েই বিতর্কের টেবিল প্রতি বছর গরম হলেও জন প্রতি গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন সর্বসাকুল্যে সেই ৮০০০/-টাকা (মূল বেতন ৪১০০/-)টাকাতেই ঠাই দাঁড়িয়ে থাকে। তবে লাভের লাভ যা হয় তা হল, প্রতি বছর কিছু মানুষ নতুন করে শ্রমিক নেতা হিসেবে মিডিয়া পরিচিতি লাভ করে।

মানব সভ্যতার এ চরম বিপদকালীন সময়ে সরকার হাজার হাজার কোটি টাকার প্রনোদনা /ভর্তুকি দিয়ে সংকট উত্তরণের প্রানান্তর চেষ্টা করলেও কারো কারো পেট তো কিছুতেই ভরানো যায় না। তাদের অর্থকামী বুভুক্ষু পেট তো পারলে সমগ্র বাংলাদেশই গিলে খেতে চায়। শ্রমিকদের মজুরি না দেওয়ার জন্য কতশত অর্থশাস্ত্র প্রকৌশলী, বুর্জোয়াদের রক্ষাকল্পে তাদের আবার কত শত ফর্মুলা! তবে কি শ্রমিকের দাবী দাওয়া শুধু আলোচনার বিষয়বস্তুই হয়ে থেকে যাবে? শ্রমিকরা কি পাবে না ন্যায্য অধিকার? জন হেনরীর সেই গণশ্রমিকের হাতুড়ি কি বলবে না কোনদিন শ্রমিক অধিকারের কথা? আইন থাকা স্বত্বও শিশুশ্রম কি কোনদিনই বন্ধ হবে না? শ্রমজীবি এক বিশাল শ্রেণীর মানুষরা কি আইনের চোখে সারাজীবন উপেক্ষিতই থাকবে? তাই ভাবনার পাদটীকায় এ হোক আমাদের সভ্য উচ্চারণ-

“প্রশ্নের কুয়াশা তিরোহিত হোক
আসুক সোনালী সূর্যোদয়,
শ্রম অধিকার বলবৎ হোক
আছি মোরা সেই প্রতীক্ষায়………।”
(স্বতত্বানুসন্ধান: পর্ব-১)

————————————————————————————–

লেখক

অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জাজ

Facebook Comments
সংবাদটি শেয়ার করুন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

আরো সংবাদ