‘মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই’ গানের বাণীর আকাঙ্খা ভোলেনি বাংলাদেশ

এম এ কবীর
শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২০, ৪:৫৬ অপরাহ্ন
‘মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই’ গানের বাণীর আকাঙ্খা ভোলেনি বাংলাদেশ

পৃথিবী বৈচিত্রময়! মানুষের জীবন তার চেয়েও বেশি। নশ্বর এ পৃথিবী সবকিছু তার গর্ভে ধারণ করে। সবকিছুই চলে নিয়মতান্ত্রিকভাবে। জীবন চলে জীবনের গতিতে। তবে কারো জীবন চলে একেবারেই গতিময়তায়। কারো বা মন্থর। অনেকের আবার জীবনের গতি স্থবির করে দেয় দারিদ্র্য।

জ্যৈষ্ঠের ঝড় হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন তিনি, আর বিদায় নিয়েছিলেন নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা ভাসা শরতের দিনে। কিন্তু অনন্তকালের জন্য মানুষের মনে তিনি স্থান করে নিয়েছেন চির বিদ্রোহী মানুষ রূপে। বাংলাদেশে তিনি অভিষিক্ত হয়েছেন জাতীয় কবির মর্যাদায়।

ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসন-শোষণ থেকে উপমহাদেশের মানুষের মুক্তির আন্দোলনে, বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রাম ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে নজরুলের কবিতা ও গান ছিল অফুরন্ত প্রেরণার উৎস।  অঙ্কের হিসাবে তার জীবনকাল ৭৭ বছরের। কিন্তু সৃষ্টিশীল ছিলেন মাত্র ২৩ বছর। নজরুলের এই ২৩ বছরের সাহিত্য জীবনের সৃষ্টিকর্ম বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।

পৃথিবীর উপাদান রোদ, ঝড়, বৃষ্টি, চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ-তারা। এসব কিছুই ¯্রষ্টা সৃষ্টি করেছেন সবার জন্য। কিন্তু উপভোগে ভিন্নতা বিদ্যমান। শত সহ¯্র উপাদানের মধ্যে বর্ষার মৌসুমে বৃষ্টির কথা ধরা যাক। এ বৃষ্টিই কারো জন্য আনন্দের! কারো জন্য দুঃখের।

সবাইকে চমকে দিয়ে বাংলার সাহিত্যাকাশে কবিরূপে নজরুলের অভ্যুদয় কেবল ধূমকেতুর সঙ্গেই তুলনীয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার সম্পর্কে যথার্থই বলেছেন, ‘আয় চলে আয়রে ধূমকেতু/আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু, দুর্দিনের এই দুর্গশিরে উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।’

নজরুলের সাহিত্যকর্মে প্রাধান্য পেয়েছে ভালোবাসা, মুক্তি এবং বিদ্রোহ। ছোট গল্প, উপন্যাস, নাটক লিখলেও তিনি মূলত কবি হিসেবেই বেশি পরিচিত। একদিকে ইসলামী সঙ্গীত তথা গজল,অন্যদিকে শ্যামা সঙ্গীত লিখে তিনি বাঙালি মানসের চেতনাকে আরও সুগভীর করেন। তিনি প্রায় তিন হাজার গান রচনা ও সুর করেছেন। শোষিত, বঞ্চিত ও নিপীড়িত মানুষের আর্তি বিশেষভাবে প্রকাশ পায় তার রচনায়।

সফল ব্যক্তিত্বদের সাফল্যগাঁথা শুনতে গিয়ে দারিদ্রতার কথা হরহামেশা শোনা যায়। জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের বিশেষ কিছু লেখায় জীবনবোধ ও দারিদ্র্যের চিত্র ফুটে ওঠেছে। এই কবিকে নিয়ে যত পড়ি, ততই জীবনবোধের চিত্র ফুটে ওঠে। জীবনবোধ বা জীবন থেকে নেয়া ছাড়া সাহিত্যের বড় কোনো উৎস যে নেই।

এটা কবি নজরুলের সব লেখায় স্পষ্ট ফুটে ওঠে। নজরুল রচনাবলীতে এমন কিছু রয়েছে; যা জীবন পরিচালনায় বাস্তবতার সাদাকালো চশমা হিসেবে কাজ করে। আবেগের রঙিন চশমায় পৃথিবী দেখা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করবে। চলার পথের পাথেয় হিসেবে পথ দেখাবে।

ধরা যাক, সকাল থেকে অঝরে বৃষ্টি ঝরছে। শহরের মস্ত বড় ফ্ল্যাটে থাকা সাবের চৌধুরী ছোট্ট মেয়ে মৌরী পুলকের আবেশে ডিজিটাল ক্যাসেটে চলা হিন্দীগানের সঙ্গে নৃত্য করছে। বিদেশি চকলেট খাচ্ছে। বৃষ্টির ছন্দ বলে কথা! সোফায় বসে থাকা সাবের সাহেব তার স্ত্রী নীহার কে উদ্দেশ্য করে বলছেন,‘মেয়ের দিকে খেয়াল টেয়াল রাখো? বড্ড শুকিয়ে যাচ্ছে মেয়েটা! ভালো নৃত্য শেখার জন্য পড়ালেখা, ড্রয়িং-এর পাশাপাশি গান ও নৃত্যের জন্য একটা মাস্টার রাখো।’

অন্যদিকে উপকূলে বাস করা দিনমজুর ছব্দুলের ছোট মেয়ে কইতুরি অনাহারে বসে খুপড়ি ঘরটির একপাশে রান্নাবাটি খেলছে। মাটির ভাত রান্না করে নিজেই খাচ্ছে। আনন্দ পাচ্ছে। পাশেই বসে থাকা চুলোয় আগুন না দিতে পারা ছব্দুলের স্ত্রী ছপুরা চাপাকান্নায় মুখে মলিন কাপডের আঁচল টেনে দিচ্ছে। আল্লাহর কাছে বন্যা থেকে পরিত্রাণ চাচ্ছে। আর ছব্দুল তা দেখে অশ্রুসিক্ত দুই চোখে জীবনবোধের ছবি আঁকছে। ঠিক সাবের সাহেব ও ছব্দুলের মতো বৈষম্যময় জীবন সৃষ্টিকূলের প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে। সৃষ্টির ভেদ রহস্যময়। বড়ই বিচিত্র!

নজরুল তার বিভিন্ন লেখায় দ্রোহের ও সাম্যের কথা বলেছেন। কিছু লেখায় প্রেম,কিছু লেখায় বলেছেন ধর্মের কথা। ধর্মের পথে মনুষ্যত্বের স্বাদ আস্বাদনের কথা বলেছেন। কিছুটা বাস্তবতার রং,রূপ,রেখায় মিলেমিশে একাকার। আবার কিছু লেখায় প্রকাশ পেয়েছে অসহায়ত্ব। দারিদ্র্যের নির্মমতার হাত থেকে পরিত্রাণ পেতে করেছেন আর্তনাদ।

কবি নজরুল দারিদ্র্যের কষাঘাতে পিষ্ট হয়ে এসব বলেছেন। অসহায়ত্বের নোঙর বাঁধা তার পায়ে। তবুও জীবন চালনা করেছেন জীবনের মতো। দিয়েছেন জীবনবোধের শিক্ষা। সেই শিক্ষা অনাদিকাল বাঁচিয়ে রাখবে তাকে শত কোটি পাঠকের হৃদয়ে।

ছব্দুলদের মুখে থাকবে না হাহাকারের ছাপ। অন্তত দুবেলা দুমুঠো খেয়ে বেঁচে থাকার জন্য মানুষ হয়ে জন্মগ্রহণ করে গর্ব করবে তারা।

মসজিদের পাশে তাকে কবর দেয়ার কথা তাঁর একটি কবিতায় আছে। তাই তাকে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের মসজি প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয়। এ থেকে কারো মনে হতে পারে নজরুল বুঝি খুব ধর্মপ্রাণ মানুষ ছিলেন অথবা তার সাহিত্যের মূল উপজীব্য বুঝি ছিলো ধর্ম।

ধর্ম বিশ^াস দিয়ে নয়, তিনি মানুষকে দেখতেন মানুষ হিসেবে। তিনি লিখেছেন : নদীর পাশ দিয়ে চলতে যখন দেখি একটি লোক ডুবে মরছে, মনের চিরন্তন মানুষটি তখন এ প্রশ্ন ভাবার অবসর দেয় না যে, লোকটা হিন্দু না মুসলমান, একজন মানুষ ডুবছে এইটেই– সবচেয়ে বড়ো, সে ঝাঁপিয়ে পড়ে নদীতে — মন বলে আমি একজন মানুষকে বাঁচিয়েছি।

না, নজরুল মোটেও ধর্মীয় কবি ছিলেন না। এটা সত্য যে তিনি হামদ, নাত, গজলসহ ইসলামি সঙ্গীত রচনা করেছেন, তার লেখায় আরবি-ফারসি শব্দও প্রচুর ব্যবহার করেছেন। আবার তিনি শ্যামা সঙ্গীত, ভজন, কীর্তনও লিখেছেন। হিন্দুদের দেব-দেবী তার লেখায় স্থান পেয়েছে। প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন উদার একজন মানুষ। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মচর্চায় তার আগ্রহ দেখা যায়নি। তিনি বিয়ে করেছিলেন হিন্দু নারী প্রমিলা দেবীকে। সন্তানদের নাম রেখেছিলেন কৃষ্ণ মোহাম্মদ, অরিন্দম খালেদ, কাজী অনিরুদ্ধ ইসলাম এবং কাজী সব্যসাচী ইসলাম।

তিনি লিখেছেন : হিন্দু না মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোন জন? / কান্ডারি বলো, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার।

যারা হুকোর জল আর ভাতের হাঁড়িতে জাতের মান নির্ধারণ করেন তাদের তিনি ‘বেকুব’ বলে তিরস্কার করেছেন।

আক্ষেপ করে তিনি বলেছেন :’ কেউ বলেন আমার বাণী যবন, কেউ বলেন,কাফের। আমি বলি ও দুটোর কিছুই নয়। আমি মাত্র হিন্দু-মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডশেক করবার চেষ্টা করেছি, গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি। সে হাতে হাত মেলানো যদি হাতাহাতির চেয়েও অশোভন হয়ে থাকে, তাহলে ওরা আপনি আলাদা হয়ে যাবে, আমার গাঁটছাড়ার বাঁধন কাটতে বেগ পেতে হবে না। কেননা একজনের হাতে আছে লাঠি, আর একজনের আস্তিনে আছে ছুরি।

বর্তমানে সাহিত্য নিয়ে ধূলোবালি, এতো ধোঁয়া, এতো কোলাহল উঠছে যে ওর মাঝে সামান্য দীপবর্তিকা নিয়ে পথ খুঁজতে গেলে আমার বাতিও নিভবে, আমিও মরবো।

তিনি তার কবিতায় বলেছেন : তোমাদের পানে চাহিয়া বন্ধু আর আমি জাগিবো না,সারাদিনমান কোলাহল করি কারো ধ্যান ভাঙিবো না। – নিশ্চল-নিশ্চুপ আপনার মনে পুড়িবো একাকী গন্ধবিধুর ধূপ।

কাজী নজরুল ইসলাম, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম দিকপাল, লেখালেখিতে সক্রিয় ছিলেন মাত্র ২৩ বছর। এই অল্প সময়ে তিনি কবিতা গান গল্প নাটক উপন্যাস প্রবন্ধ কতো কিছুই না লিখেছেন। অতি দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করা নজরুলের জীবন ছিলো একদিকে ছন্নছাড়া, অন্যদিকে ধূমকেতুর মতো। বেঁচে থাকার জন্য জীবনে তাকে কতো কি না করতে হয়েছে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতা লিখে তিনি প্রথম সাড়া ফেলেন। এই কবিতায় তিনি যেমন ভৃগু ভগবান বুকে পদচিহ্ন এঁকে দিতে চেয়েছেন, তেমনি খোদার আসন আরশ ছেদিয়া ওঠার কথাও বলেছেন। তিনি বিদ্রোহী কবি হিসেবে যেমন খ্যাতি পেয়েছেন, তেমনি প্রেমের কবি, সাম্যের কবি, মানবতার কবি হিসেবেও তাকেই গণ্য করা হয়। দ্রোহ আর প্রেম তার কাছে অভিন্ন ছিলো। তিনি বলেছেন : মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরি আর হতে রণতূর্য।

তাকে সাম্য ও মানবতার কবি বলা হয়। কারণ তার কলম থেকেই বেরিয়েছে : গাহি সাম্যের গান / যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান। অন্যায়, অসাম্যের বিরুদ্ধে, অত্যাচার-নিপীড়নের বিরুদ্ধে তার কলম ছিলো ক্ষুরধার। তিনি লিখেছেন : মানুষের চেয়ে বড়ো কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান / নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি / সব দেশে, সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি। তার কলম থেকেই বেরিয়েছে : মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান /মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ/ এক সে আকাশ মায়ের কোলে / যেন রবি শশী দোলে / এক রক্ত বুকের তলে, এক সে নাড়ির টান। আবার সমাজের বৈষম্যের বিরুদ্ধেও তিনি ছিলেন সমান সোচ্চার। লিখেছেন : দেখিনু সেদিন রেলে / কুলি বলে এক বাবুসাব তারে টেনে দিলো নিচে ফেলে / চোখ ফেটে এলো জল / এমনি করে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?

 

নজরুল বাংলা সাহিত্যে এক বিস্ময়ের নাম। তার সৃষ্টিকে আগামী প্রজন্মের জন্য রক্ষা করা জাতি হিসেবে আমাদের কর্তব্য। এ জন্যই খুঁজে বের করতে হবে সেইসব নজরুল প্রেমিকদের যারা নজরুলকে সত্যিকারভাবে ভালোবাসেন। তার সৃষ্টিকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করেন। নজরুলকে নিয়ে ভাবা এখন সময়ের দাবি। রাষ্ট্রকে এ ভাবনাটা ভাবতে হবে।

‘চরণ ফেলিও ধীরে ধীরে প্রিয়

আমার সমাধি পরে।’

আমার প্রিয় একটি গান। বারবার শুনেও তৃষ্ণা মেটে না যেসব গানে এটা তেমনই একটা গান আমার কাছে।

ফিরোজা বেগম,সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের অ্যালবামে এ গানটি আছে। কিশোর বয়স থেকে বেতারে, টেপ রেকর্ডারে গানটি শুনে আসছি।

অর্ধশত বছর পার করেও গানটির ভালো লাগা একটুও কমেনি।

নজরুল গীতি হিসেবে এতদিন জেনে এসেছি যে গানটি হঠাৎ করে সে গানটি গুগল বলছে প্রণব রায়ের লেখা। একই গান ইউটিউব বলছে কোথাও নজরুল গীতি আবার কোথাও প্রণব রায়ের লেখা।

এটা কি করে হয়?

ফিরোজা বেগমের কণ্ঠে আর কমল দাশ গুপ্তের সুরে সব গানই যেন নজরুল গীতি হয়ে উঠে।

‘এমনই বরষা ছিল সেদিন

শিয়রে প্রদীপ ছিল মলিন।’

এ গানটি আমার মতো অনেকেই জানতো এটা নজরুল গীতি। কিন্তু গুগলে গিয়ে দেখা গেল কোথাও লেখা প্রণব রায় আবার কোথাও লেখা পুলক বন্দোপাধ্যায়।

নজরুলের সময়ে তাকে নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রুপ কিছু কম হয়নি। তাকে তুচ্ছ করার জন্য ‘বালক প্রতিভা’ বলা হয়েছে। অর্থাৎ তার পরিণতি আসেনি। কিন্তু যারা এসব করেছে তারা হারিয়ে গেছে বিস্মৃতির অতলে, নজরুল আছেন উজ্জ্বল দেদীপ্যমান। নজরুল বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিভা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সমর্থন ও অকাতর স্নেহ পেয়েছেন। ১৯৪১ সালে এক সাহিত্য সভায় তিনি বলেছিলেন : ‘যদি আর বাঁশি না বাজে- আমি কবি বলে বলছি না- আমি আপনাদের ভালোবাসা পেয়েছিলাম, সেই অধিকারে বলছি- আমায় ক্ষমা করবেন- আমায় ভুলে যাবেন। বিশ^াস করুন আমি কবি হতে আসিনি-আমি প্রেম দিতে এসেছিলাম, প্রেম পেতে এসেছিলাম- সে  প্রেম পেলাম না বলে আমি এই প্রেমহীন নিরস পৃথিবী থেকে নীরব অভিমানে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলাম’।

নজরুল বাংলাসাহিত্যে ধূমকেতু। সাইক্লোনের মতো পূর্বের সব উড়িয়ে দিয়ে আপন আলোয় উদ্ভাসিত। বহুকাল যাবত একই গতিতে চলে আসা সবকিছু লন্ডভন্ড করে খোদার আসন আরশ ছেঁদিয়া উঠবার মতো দৃঢ়তা নিয়ে

নজরুল স্বপ্রতিভায় বিকশিত।

কথাশিল্পী সুরেন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে গল্প শুনেছিলেন নজরুল। শরৎচন্দ্র নাকি তার বইয়ের সমস্ত আয় দিয়ে কুকুকরদের জন্য একটা মঠ তৈরি করে যাবেন। খেতে না পেয়ে পথে ঘুরে বেড়ায় যেসব কুকুর,

তারা আহার-বাসস্থান পাবে এই মঠে। ফ্রী অব চার্জে।

শরৎচ›ন্দ্র নাকি জানতে পেরেছেন, ঐ সমস্ত কুকুর পূর্বজনমে সাহিত্যিক ছিল। মরে কুকুর হয়েছে। কবি নজরুল শুনে আক্ষেপ নিয়েই বলেছিলেন, ‘সত্যিই আমরা সাহিত্যিকরা কুকুরের জাত। কুকুরের মতই আমরা না খেয়ে কামড়াকামড়ি করে মরি।’ তাই তার প্রার্থনা, যদি পরজন্ম থেকেই থাকে। তবে আর যেন এদেশে কবি হয়ে না জন্মাই। যদি আসি বরং শরৎচন্দ্রের কুকুর হয়ে আসি। নিশ্চিন্তে দু’মুঠো খেয়ে বাঁচব।

জীবনের বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত, দরিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করা নজরুল জীবন থেকেই চয়ন করেছিলেন আগুন দীপ্ত শব্দ। গান,কবিতা, গল্প সব কিছুতেই আলাদা তেজ নিয়ে জ্বলে উঠেছিলেন তার সময়ে। নজরুল নিজেই বলেছিলেন, গানের জন্য তাকে মনে রাখতে হবে।

নজরুল কখনোই গুছানো স্বভাবের ছিলেন না। তাৎক্ষণিকভাবে বহু গান কবিতা লিখেছেন। যে চেয়েছে তাকেই দিয়েছেন তার রচনা। নজরুলের কাছের বন্ধু কমরেড মোজাফফর আহমদ তার কিছু গান, কবিতা উদ্ধার করেছিলেন।

একবার নজরুলের একটি পান্ডুলিপি হারিয়ে গিয়েছিল। গানগুলো তখন অন্য একজনের নামে প্রচার হয়ে গেছে। নজরুলের এক ভক্ত এই পান্ডুলিপি উদ্ধার করে নিয়ে এলো। নজরুল তাকে বিষয়টি চেপে যেতে বলেন। কারণ কথাটা প্রকাশ করে তিনি ওই ব্যক্তিকে লজ্জা দিতে চাননি। বরং তিনি বলেছিলেন, ‘সাগর থেকে দুফোটা জল কেউ নিয়ে গেলে সাগর শুকিয়ে যায় না।’

নজরুলের জীবদ্দশায়ই তার অনেক গান কবিতা অন্যের নামে প্রকাশিত হয়েছে। আমরা এই সহজ,সরল অথচ প্রতিবাদী,প্রেমময় মানুষটির জীবন সুন্দর করতে, তার দরিদ্রতাকে দূর করে নিশ্চিন্ত একটা জীবন তাকে দিতে পারিনি।

একজন মানুষ কতটা অসহায় হলে ছেলের মৃত দেহ বাড়িতে রেখে প্রকাশকের কাছে পাওনা টাকার জন্য যেতে হয়। তা কি ভেবে দেখেছি?

আবার একটা সমাজে মানুষ কতটা নির্দয় হলে বাড়িতে পুত্রের লাশ রেখে আসা পিতাকে টাকা দেয়ার জন্য লিখতে কাগজ এগিয়ে দেয়া হয়?

নজরুলের হৃদয়ের রক্তক্ষরণে, বেদনার কালিতে, একজন পিতার হাহাকার হয়ে লেখা হয়েছে সেই অমর গান

‘শ্রান্ত হয়ে ঘুমিয়ে গেছে

আমার গানের বুলবুলি।’

আমাদের দেশে নজরুল গবেষণা ইনস্টিটিউট আছে। অতি আড়ম্বরের সঙ্গে তার জন্ম এবং মৃত্যু দিবস পালন করা হয়। অথচ তার যে সব সৃষ্টি হারিয়ে গেছে, অন্যের নামে প্রচারিত হচ্ছে তা কেন উদ্ধার করে সংরক্ষণ করা হচ্ছে না?

নজরুলকে ভালোবেসে তাকে নিয়ে এ দেশের অনেক মেধাবী গবেষণা করছে। তারা নীরবে নিভৃতে তাদের কাজ করে যাচ্ছে কোনো প্রচার ছাড়াই। এদের কাজে লাগানো, এদের জনসম্মুখে নিয়ে আসা উচিত।

নজরুলের বিখ্যাত একটা গানের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলা হয়েছে,  ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী দেবো খোঁপায় তারার ফুল।’

কবি বিশেষ একজনকে রাণী সম্বোধন করতেন। তাকে কবি প্রিয়া হওয়ার আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন। প্রিয়া হলে তাকে কী কী উপহার দেবেন তারই বর্ণনা পুরো গান জুড়ে।

মজার বিষয় হচ্ছে কবির দেয়া কোনো উপহারই টাকা দিয়ে কেনা যাবে না। একাধারে উপমা,উৎপ্রেক্ষা, রূপক, প্রতীক ইত্যাদি অলঙ্কারে এ এক অসাধারণ প্রদর্শনী, অসাধারণ কাব্যালংকার প্রয়োগ করেছেন কবি।

আকাশে অজ¯্র তারা, এই তারাদের কবি তারাফুল মনে করেন। কবি বলেছেন, প্রিয়া হলে খোঁপায় সেই তারারফুল গুঁজে দেবেন।

তৃতীয় চরণ হলো- ‘কর্ণে দোলাবো তৃতীয়া তিথির চৈতি চাঁদের দুল।’

অর্থাৎ একটা বিশেষ লগ্ন বা সময়ের চাঁদ। এই সময়ের চাঁদকে বাঁকানো মনে হয়। অনুষঙ্গ হিসেবে এনেছেন চৈতি অর্থাৎ বিশেষ ধরনের চৈতি ফুল। যে ফুল অবিকল কানের দুলের মতো। বাঁকানো চাঁদের সঙ্গে চৈতি ফুল যুক্ত করে কবি যে অলঙ্কারের জন্ম দিয়েছেন তা এক কথায় অভিনব ও চরম বিস্ময়কর।

এখানে তিথি, চৈতি ও চাঁদ শব্দের ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যা গানটিকে ব্যতিক্রম মাত্রা দান করেছে। জগতের আর কোনো প্রেমিক পুরুষ এতটা ব্যতিক্রম উপহার প্রিয়তমাকে দিয়েছেন বলে জানা যায়নি।

এভাবে সম্পূর্ণ গানের প্রতিটি শব্দের বিশ্লেষণ করে নান্দনিক দিকটি তুলে ধরেছেন।

আমরা বিশাল বাজেটের নজরুল জয়ন্তী উদযাপন করেই যদি দায়িত্ব শেষ করি তাহলে নজরুলের হারিয়ে যাওয়া গান, কবিতা কখনো খুঁজে পাওয়া যাবে না। বরং তথ্য বিভ্রাট দেখা দেবে।

আমাদের নজরুল গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। এই গবেষণা কেন্দ্রের উচিত নজরুল সংগীত নিয়ে তথ্যের যে ভুল তা ঠিক করে বিভ্রান্তি দূর করা। নজরুলের হারিয়ে যাওয়া, চুরি হওয়া, সৃষ্টিকে খুঁজে বের করা।

তার সৃষ্টিকে আগামী প্রজন্মের জন্য রক্ষা করা জাতি হিসেবে আমাদের কর্তব্য।

কবি,সাহিত্যিক শঙ্খ ঘোষ নজরুলের মৃত্যু নিয়ে লিখেছেন, নজরুলের কথা আজ যখনই মনে পড়ে আমাদের, মনে পড়ে মিলনগত এই অসম্পূর্ণতার কথা। আর তখন মনে হয়, বাক শক্তিহারা তার অচেতন জীবনযাপন যেন আমাদের এই স্তম্ভিত ইতিহাসের এক নিবিড় প্রতীকচিহ্ন। যে সময়ে থেমে গেলো তার গান, তার কথা, তার অল্পকিছু আগেই তিনি গেয়েছিলেন, ‘ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবিরে, জাগায়োনা জাগায়োনা।’

রবী›ন্দ্রনাথকে উদ্দেশ্য করে তার এই কথাগুলো নজরুলকেই ফিরিয়ে দেয়ার কথা বলে শঙ্খ ঘোষ বলেন, ‘ তার কথাগুলো আমরা যেন ফিরিয়ে দিতে পারি তাকেই,‘যেন আমরাই ওগুলি বলছি নজরুলকে লক্ষ্য করে।

১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ অবিভক্ত বাংলার বর্ধমান জেলার চুরুলিয়ায় যে কবির আবির্ভাব ঘটেছিল ‘জ্যৈষ্ঠের ঝড়’ হয়ে, সে ঝড় চিরতরে থেমে গিয়েছিল ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালের কেবিনে ১৩৮৩ বঙ্গাব্দের ১২ ভাদ্রে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনেন তাকে। বিদ্রোহী কবি নতুন করে মহিমান্বিত হন বাংলাদেশের ‘জাতীয় কবি’ হিসেবে। তার ‘মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই’ গানের বাণীর আকাঙ্খা ভোলেনি বাংলাদেশ।  সে আকাঙ্খাই পূরণ করা হয় ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় মসজিদ প্রাঙ্গণে তাকে সমাহিত করে।

 

লেখক

সাংবাদিক. কলামিষ্ট, গবেষক, সমাজচিন্তক

Facebook Comments
সংবাদটি শেয়ার করুন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

আরো সংবাদ