ভয়ঙ্কর যাত্রা (১ম পর্ব)

অন্যদৃষ্টি অনলাইন
মঙ্গলবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ১২:১৪ পূর্বাহ্ন

ভয়ঙ্কর যাত্রা (১ম পর্ব)

খন্দকার ফিরোজ আহম্মেদ।।

যখন টেকনাফ বাসস্ট্যান্ডে নামলাম, তখন বিকাল চারটা বাজে। বাস থেকে নেমে কার সাথে যোগাযোগ করবো ভাবছি, তখন একটা লোক এগিয়ে এসে বললো, তুমি কি মিরাজের লোক?
আমি বললাম, হ্যাঁ। আপনার নাম?

লোকটা বললো, আমার নাম বাবু। মিরাজ তোমাকে আমার কাছে পাঠিয়েছে। এসো আমার সাথে।
বাসস্ট্যান্ডের পাশেই মসজিদ। মসজিদের পাশে একটা চায়ের দোকানে নিয়ে বাবু আমাকে চা বিস্কুট খাওয়ালো। কথা বার্তায় লোকটা ভালোই মনে হলো। এখান থেকে ছয় কিলো দূরে সাগরের পাড়ে একটা গ্রামে লোকটা বাড়ি। ভ্যানে করে যখন তার বাড়িতে গেলাম, তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। সেখানে গিয়ে দেখলাম আমার মতো আরো নয়জন লোক বাবুর বাড়িতে উপস্থিত হয়েছে।

বাড়িটা টিনের তৈরী। বেড়া চাটাইয়ের। একটা ঘরে আমাদের রেস্ট করতে দিলো। এই গ্রামের দুইতিনটা বাড়ি বাদে সবই টিন আর চাটাইয়েন তৈরী। বাড়িগুলো অস্থায়ী, সাগরের আক্রোশে যে কোন সময় এগুলো সরিয়ে নিতে হতে পারে।

রাত বারোটার দিকে বাবুর লোক আমাদের নিয়ে রওনা হলো সাগরের দিকে। বাবু নেই সাথে। লোকগুলো বললো, আজ রাতেই তোমাদের শীপে তোলা হবে। সাগর দেখিনি কোনদিন, আজ দেখবো। সাগরে থাকতে হবে কয়েকটা দিন। একটা উত্তেজনা কাজ করছিলো মনে। আবার অজানা একটা ভয় মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলছিলো।

সাগরের যতো কাছে যাচ্ছি, সাগরের গর্জন ততো বেশি কানে বাজছে। বুকের মধ্যে ভয় তোলপাড় করছে। একসময় পৌঁছে গেলাম সাগরের তীরে। বাড়ি থেকে অবশ্য খুব বেশি দূরে নয়। রাত অনমান হয়তো একটা বাজতে পারে।

ট্রলারে করে আমাদেরকে শীপে নেয়া হবে। সেই আশায় বসে আছি সাগরের পাড়ে, কিন্তু ট্রলারের কোন খোঁজ নেই। হঠাৎ বিডিআরের আগমন বোঝা গেলো। আমাদের যারা নিয়ে গেছিলো, তারা গরু তাড়ানোর মতো করে আমাদের দ্রুত তাড়িয়ে বাবুর বাড়ি নিয়ে আসলো। সে রাতে আর জাহাজে উঠা হলো না। এই বাড়িতে এসেই উঠোনে দুটো বড় বড় মুরগির ঘর দেখেছিলাম, কাঠের তৈরী। লোকগুলো আমাদেরকে ঐদুটো ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে দরজা দিয়ে দিলো। ঘরের সামনে ছালা টাঙিয়ে দিলো। এমনভাবে ছালা টাঙানো হলো, যাতে দেখে মনে হবে মুরগির গায়ে যাতে শীতের কুয়ালা না লাগে, সেজন্য এই ব্যবস্থা।

মুরগির ঘর হলেও মাথাটা একটু নিচু করে বসে থাকা যায়। কিন্তু এভাবে কতোক্ষণ বসা যায়?
পরদিন সকালে ঘর থেকে বের করে রুটি দিলো নাস্তা করতে। দূপুরে গরুর মাংস রান্না করে খাওয়ালো বাবুর বৌ। খাওয়ার এক ফাঁকে বাবুর বৌ বললো, পেটপুরে শান্তি করে খেয়ে নেও। কী আছে তোমাদের কপালে, কে জানে!
মহিলার কথা শুনে খুব ভয় ধরলো মনে। কী আছে কপালে- এই কথার মানে কী? তাহলে কি খুব খারাপ কোন কিছু আসছে সামনে? মনটাকে শক্ত করলাম। মাত্র একলাখ বিশ হাজার টাকায় মালেশিয়া যাওয়া, একটু কষ্ট তো হবেই। পাটপোর্ট ভিসা করে যেতে যেখানে তিন থেকে চারলাখ টাকা লাগে, সেখানে অর্ধেকেরও কম টাকায় কি আরামে যাওয়া যায়? এর আগে একবার ভিসা নিয়েই মালেশিয়া গেছিলাম। কিন্তু বাড়ির মায়া, কাজের কষ্ট সহ্য করতে পারিনি, একবছর থেকে চলে এসেছিলাম। বাড়ি এসে বুঝতে পেরেছিলাম যে কী ভুলটা করেছি। মালেশিয়ার চেয়ে হাজারগুণ কষ্ট করেও দেশে ভালো কিছু করতে পারিনি। মা, বৌ বাচ্চা নিয়ে খুব কষ্ট করেছি। বাড়ির লোকের, গ্রামের লোকের লাথিঝাটা খেয়ে জীবনের উপর ঘেন্না ধরে গেছে। শেষে অর্ধেক টাকায় মালেশিয়া যাওয়ার এই লাইনটার সন্ধান দেয় বাস কাউন্টারে থাকা মিরাজ। আমি তখন একটা বাসের সুপার ভাইজার। নগদ টাকা মাত্র ত্রিশ হাজার দিতে হবে, বাকি টাকা মালেশিয়া গিয়ে দিতে হবে। না দিতে পারলে ছয়মাসের বেতনের সব টাকা নিয়ে দেবে দালালরা।

সন্ধ্যায় আবার সেই মুরগির ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলো আমাদের।

চলবে-

Facebook Comments
সংবাদটি শেয়ার করুন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

আরো সংবাদ