মোঃ সাইদুল হাসান সেলিম।।
অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে জাতীয় শিক্ষানীতি -২০১০ প্রণয়ন সরকারের অবশ্যই প্রশংসনীয় অবদান। তবে যে কোন নীতিমালার আইনি কাঠামো ব্যতিত তা ব্যর্থ হতে বাধ্য। অত্যান্ত পরিতাপের বিষয়, জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য কোন অগ্রগতি হয়নি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের চরম উদাসীনতা ও উদ্যোগের অভাবে দীর্ঘ ৮ বছরেও শিক্ষা আইন তৈরি করা সম্ভব হয়নি। দায়িত্ব পালনে নিষ্ক্রিয়তা, আমলাদের অদূরদর্শিতা, দূর্নীতি ও জবাবদিহিতার অভাবে শিক্ষাব্যবস্থার বিরাজমান বিশৃঙ্খলা ও শিক্ষার মানের নিম্নমুখীতা।
সরকার শিক্ষার মানোন্নয়নে গুরুত্ব দিচ্ছে, তবে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে এ বিষয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে। কারণ জাতিসংঘ ইউনেসকোর মতে, একটি উন্নয়নশীল দেশের শিক্ষা খাতে জাতীয় বাজেটের ২০% ও জিডিপির ৬% ব্যয় করার অংগীকার রয়েছে। অথচ এ খাতে আমাদের দেশ ব্যয় করে থাকে বাজেটের ১৪% ও জিডিপির মাত্র ২ শতাংশ। দেশে সংখ্যাগত ভাবে শিক্ষিতের হার বাড়লেও গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষিতের সংখ্যা বাড়ছে এমন কথা কেহই স্বীকার করেন না।
দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নে শিক্ষাবিদ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের নিরবতায় নানা প্রশ্নের উদ্রেক করে। আমাদের ভাবতে হবে মেধাবী দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে মানোন্নত শিক্ষায় করনীয় বিষয়ে। আমাদের আগামী প্রজন্মকে যোগ্য মানবসম্পদ তৈরি করতে হলে এখনই সকলকে সোচ্চার হতে হবে। এগিয়ে আসতে হবে শিক্ষক অভিভাবক শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সহ সকল শ্রেনী পেশার মানুষের। আতংকের ও বিবেচ্যবিষয় প্রচলিত সনদ সর্বস্ব শিক্ষা কি জাতির জন্য বোঝা হয়ে যাচ্ছে না?
এর একটি দৃষ্টান্ত মাননীয় অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে বলেছেন দক্ষ কর্মীর অভাবে বিদেশি কর্মীরা বেতন-ভাতা ও কমিশন ফি বাবদ প্রতি বছর ৬০০ কোটি ডলারের বেশি বাংলাদেশ থেকে নিয়ে যায়। সামান্য সংখ্যক বিদেশি কর্মীরা এই বিপুল অঙ্কের অর্থ তাদের নিজ দেশে নিয়ে যাচ্ছে। দেশে দক্ষ তথা গুণগত মানসম্পন্ন কর্মীর অভাবে এই বিশাল অঙ্কের টাকা বিদেশ নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতা এবং ইংরেজি ভাষায় পারদর্শিতার অভাবে তাদের নিয়োগ দেয়া যাচ্ছে না। এই মুহূর্তে আমাদের শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা প্রদানের নিশ্চয়তায় গভীর ভাবে ভাবতে হবে সকলকে।
প্রতি বছর দেশে বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে বের হচ্ছে। তাদের একটি ভালো অংশ চাকরি পাচ্ছে না। অন্যদিকে হাজার হাজার বিদেশি ব্যবস্থাপক, পরামর্শক, প্রকৌশলী ইত্যাদি কর্মীকে আমাদের নিয়োগ দিতে হয়। কারণ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা মানসম্পন্ন নয়। আর মানসম্পন্ন না হওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে গুনগত মানসম্পন্ন শিক্ষকের অভাব। শিক্ষার সকল স্তরের মানোন্নয়নে সংশ্লিষ্টদের চরম উদাসীনতা দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা। কেবল বিদেশি পদ্ধতির নামে উন্নতমানের পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসূচি তৈরি করলেই উন্নতমানের শিক্ষা হয় না। কাগজে লিখিত এসব পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসূচিকে জীবন্ত ও অর্থপূর্ণ করেন সম্মানিত শিক্ষকরা। উপযুক্ত তথা গুনগত মানসম্পন্ন শিক্ষক শুধু যথাযথ শিক্ষা দানই করেন না, শিক্ষার্থীদের গুনগত শিক্ষায় আগ্রহী করে তোলেন এবং উন্নত ও মহৎ জীবনাদর্শে উদ্বুদ্ধ করেন। সে কারণেই শিক্ষককে বলা হয় জাতি বা মানুষ গড়ার কারিগর। আর মানবিকতা মূল্যবোধ, জ্ঞান ও গুণে সমৃদ্ধ মানুষই হল জাতীয় উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি।
আমাদের শিক্ষা যে মানসম্পন্ন হচ্ছে না, এর একটি বড় কারণ মানসম্পন্ন ও গুনগত শিক্ষকের অভাব। যে কোনো পেশার মতো শিক্ষকতা একটি পেশা তথা জীবিকা অর্জনের একটি উপায়ও বটে। কিন্তু এ পেশাটি খুবই অবহেলিত ও নিগৃহীত। তাই মেধাবীরা শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নিতে আকর্ষণ বোধ করে না। ফলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে স্বল্প মেধাবীরা শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে। তাও অনেক ক্ষেত্রে তারা করে নিরুপায় হয়ে। দেশে সেইসব চাকরি আকর্ষণীয়, যাতে যথেষ্ট অর্থ ও ক্ষমতা আছে। সেই পেশা অধিক আকর্ষণীয় সেখানে তারা আকর্ষিত হয়। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমল থেকেই সরকারি চাকরি আকর্ষণীয় হওয়ার কারণ ছিল উপরোক্ত দুটি বিষয়। সেই ঔপনিবেশিক ধারাবাহিকতা এখনো বাংলাদেশেও বহুলাংশে বহাল আছে। বাংলাদেশ সময়ে সরকারি চাকরিতে অনৈতিকতা ‘উপরি’ তথা অবৈধ অর্থ রোজগারের সুবিধা বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারি অফিসগুলোতে সাধারণ মানুষ এখনও ভয় ও আতংকের সঙ্গে ঢোকে। সেখানে ন্যায্যতার সেবা বা সম্মান পাওয়া এক কষ্টসাধ্য ব্যাপার।
বর্তমান বাস্তবতায় দেশে সেসব চাকরি আকর্ষণীয়, যেখানে বেতনের বাইরে মিলে সহনীয় মাত্রা। শিক্ষকতায় সেই অবৈধ পথে আয়-রোজগারের সুযোগ নেই। যদিও ইদানীং কিছুসংখ্যক শিক্ষক কোচিং ও টিউশনির মতো অনৈতিক কাজে নিয়োজিত হয়েছেন। এর কারণও আছে সামাজিক বাস্তবতায় দুর্মূল্যের বাজারে একজন শিক্ষকের পক্ষে বোধহয় শতভাগ সৎ ও নিষ্ঠাবান থাকা অসম্ভব। বেসরকারি শিক্ষকরা সরকার থেকে যে যৎসামান্য আর্থিক অনুদান পায়, তা দিয়ে একটি পরিবার মাসের ১৫ দিন পরিচালনা করা সম্ভব। ৯৭% শিক্ষার দায়িত্ব বেসরকারি শিক্ষকরা পালন করে থাকে। তাই সরকারের উচিত বেসরকারি শিক্ষা জাতীয়করণের মাধ্যমে শিক্ষার নিয়ন্ত্রণ নেয়া। শিক্ষা ব্যয় প্রান্তিক অসচ্ছল জনগোষ্ঠীর সীমাতিরিক্ত হওয়ায় লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। আশংকার বিষয় এই ঝরে পড়া শিক্ষার্থীরাই পরবর্তীতে সামাজে নানাবিধ অন্যায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।
শিক্ষা আদান-প্রদান একটি জটিল প্রক্রিয়া। মানোন্নত শিক্ষায় গুনগত মেধাবীদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে হবে। শিক্ষকদের অবমূল্যায়ন করে, অমর্যাদা করে, নির্যাতন বঞ্চনা বৈষম্যের শিকার করে কাংখিত শিক্ষার আশা করা যায় না। মানবিক গুণাবলী সমৃদ্ধ শিক্ষিত দক্ষ জাতি গঠনে শিক্ষকদের আকর্ষণীয় বেতন-ভাতা ও সম্মান মর্যাদা দিতে হবে। আপনার আমার স্নেহের সন্তানদের শিক্ষার দায়িত্ব যাদের, তাদের সম্মানিত করা জরুরি।
সৈয়দ মুজতবা আলী শিক্ষকদের দৈন্যদশার ব্যাপারে তার স্বভাবসুলভ রসালো ভাষায় উল্লেখ করেছিল যে, চার পা বিশিষ্ট এ জন্তুটির পেছনে মাসে যে টাকা খরচ হয়, একজন স্কুল শিক্ষকের মাসিক বেতন তার সিকিভাগ। সময়ের বিবর্তনে এতটা না হলেও শিক্ষায় বর্তমানে এ অবস্থার যে বড় ধরনের পরিবর্তন হয়েছে তা বলা যাবে কি? পত্র পত্রিকায় দেখা গেল, সচিব বা জ্যেষ্ঠ সচিবরা গৃহকর্মী ও দারোয়ান রাখার জন্য মাসে ১৬ +১৬ মোট ৩২ হাজার টাকা ভাতা পাবেন। আরও পাবেন মোবাইল কেনার জন্য ৭৫ হাজার টাকা। অথচ বেসরকারি এমপিওভুক্ত গ্রাজুয়েট একজন শিক্ষকের মাসিক বেতন বাবদ সরকার সর্বসাকুল্যে প্রদান করেন ১৩.৬৫০/- টাকা। এমতাবস্থায় সকলের আবেগ নয়, বিবেক বুদ্ধি দিয়ে বিচার করতে হবে শিক্ষকদের মর্যাদা কতটুকু।
যৌক্তিক কারনেই ন্যায় ও যুক্তিসঙ্গত আকর্ষণীয় বেতন-ভাতা দিতে হবে শিক্ষকদের। তা না হলে শিক্ষকদের নিকট থেকে যথাযথ সেবা পাওয়া যাবে না, বরং উল্টো শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ অসন্তোষ, বিভক্তি সৃষ্টি হবে। শিক্ষকদের যথেষ্ট সম্মান, মর্যাদা ও আকর্ষণীয় বেতন-ভাতা দেয়া না হলে, মানসম্পন্ন, গুনগত ও উন্নত মেধাবী শিক্ষক পাওয়া দুষ্কর হবে। মানসম্পন্ন শিক্ষাও হবে দুরূহ। উপযুক্ত বেতন-ভাতা এবং কর্মজীবনে পদোন্নতি ও আয়-উন্নতির যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা শিক্ষকদের দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, শিক্ষকের মান ও শিক্ষার মানোন্নয়ন একই সূত্রে গাঁথা। যারা বলেন আমাদের সীমিত সম্পদ বা সম্পদের অভাব, আমি বলবো বোধের অভাব। প্রতিষ্ঠানের আয় রাস্ট্রীয় কোষাগারে নিয়ে ও একটি মাত্র মন্ত্রণালয়ের দূর্নীতি অনিয়ম বন্ধ করা যায়, তবে সকল স্তরের শিক্ষাব্যবস্থা সরকারি করা সম্ভব।
পরিশেষে একটি প্রস্তাবঃ মানোন্নত শিক্ষায় গুনগত মেধাবীদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে, শিক্ষার দায়িত্ব ও নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। এই বোধদয় যত দ্রুত সংশ্লিষ্টদের উদ্ভব হবে, জাতীয় উন্নয়নও ততোই গতিশীল ও তরান্বিত হবে।
মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে, সোনার বাংলা বিনির্মাণে অন্তত শিক্ষার উন্নয়নে সকলকে এগিয়ে আসার বিনম্র অনুরোধ।
-লেখক
সভাপতি
বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারি ফোরাম
ঢাকা বাংলাদেশ।
১৭/০৭/২০১৮
You must be logged in to post a comment.