বুর্জোয়া আমলাতন্ত্রের রোষানলে বেসরকারি শিক্ষকরা

অন্যদৃষ্টি অনলাইন
শুক্রবার, ২৪ আগস্ট, ২০১৮, ১:১৩ অপরাহ্ন

মোঃ সাইদুল হাসান সেলিম।।

বৃটিশ উপনেবেশিক শাসনামল থেকে রাষ্ট্রীয় শাসন কার্যক্রম পরিচালনা করতে আমলাতন্ত্রের উদ্ভাবন। রাষ্ট্র পরিচালনায় কৌশল নির্মিত হয় রাজনীতিবিদদের হাতে, আর তা বাস্তবায়ন ঘটিয়ে থাকে আমলারা। সাধারণত আমলা বলতে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বোঝায়। পাকিস্তান আমলে সিএসপি ও ইপিসিএস বর্তমানে বিসিএস ক্যাডারের কর্মকর্তারা আমলা শ্রেণিভুক্ত। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এসব কর্মকর্তারাই রাষ্ট্রের ভালোমন্দ দেখা শুনা করে থাকেন। রাজনীতিবিদরা নীতির বাস্তবায়নে আমলাদের ওপরই নির্ভরশীল থাকেন। প্রভুত্ববাদী মানসিকতায় আমলারা রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন বলেই জনগণের দুঃখকষ্ট ও ভোগান্তির সৃষ্টি হয়।
জাতির দুর্ভাগ্য দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে আমলাতন্ত্র অতিমাত্রায় প্রভুত্ববাদী চেতনায় বিকশিত হতে শুরু করে। সেই সঙ্গে আমলাদের মধ্যে অবৈধ উপায়ে বিত্তশালী হওয়ার লিপ্সা, সিনিয়রদের পিছনে ফেলে জুনিয়রদের উচ্চ পদে রাজনৈতিক নিয়োগ দেয়ার ফলে আমলাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অপরদিকে বিধিবহির্ভূতভাবে সুবিধাভোগী আমলারা পদপদবি বা অতিরিক্ত সুবিধা লাভের আশায় রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় ব‍্যস্থ থাকে। এতে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা বিরাজ করে।
২০০৯ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশের দায়িত্বভার গ্রহণের পর বিপর্যস্ত শিক্ষার মানোন্নয়নে দৃষ্টি দিয়ে একটি স্থায়ী জাতীয় শিক্ষানীতি প্রনয়নের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তাই তিনি জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। কমিটি প্রায় এক বছর অক্লান্ত পরিশ্রমে, অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষার পর জাতীয় শিক্ষানীতি’২০১০ মহান সংসদে অনুমোদিত হয়।
দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার ৯৭.৫৪% শিক্ষার দায়িত্ব পালন করেন বেসরকারি ব‍্যবস্থাপনায়। সরকারি বেসরকারি পাঠ‍্যপুস্তক, কর্মঘন্টা, পাঠ‍্যক্রম, সিলেবাস, পরিক্ষা পদ্ধতি এক ও অভিন্ন, এতদসত্ত্বেও সরকারি বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্যে বেতন-ভাতা ও মর্যাদার বিশাল পার্থক্য। আমলাদের রোষানলে বেসরকারি শিক্ষকরা সরকারের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত হচ্ছে।

নিম্নে বুর্জোয়া আমলাতন্ত্র কর্তৃক বেসরকারি শিক্ষকদের বঞ্চনা ও বৈষম্য সৃষ্টির কিছু চিত্র তুলে ধরা হলো।
এক।
জাতীয় শিক্ষানীতি’২০১০ এর ২৫ অধ‍্যয়ে বলা হয়েছে, শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষায় সতন্ত্র বেতন স্কেল দেওয়া হবে। আমলাদের প্রবল বিরোধিতার কারণে দীর্ঘ আটবছরেও সতন্ত্র স্কেল নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। আমলাদের ভয় শিক্ষকদেরকে সতন্ত্র স্কেল দেওয়া হলে ক‍্যাডার ও শিক্ষকদের মর্যাদা ভারসাম্য রক্ষায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। প্রকারান্তরে মনে হচ্ছে শিক্ষকদের সতন্ত্র স্কেল বাস্তবায়ন আদৌও সম্ভব হবে না।
দুই।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় এমপিও নীতিমালা এবং জনবল কাঠামো’২০১৮ প্রকাশ করেছে। এই নীতিমালা মূলত নৈতিকতা বিবর্জিত স্বার্থান্বেষী আমলাদের তৈরিকৃত  শিক্ষকদেরকে বঞ্চিত ও বৈষম্য সৃষ্টির অভিপ্রায়ে একটি বিতর্কিত নীতিমালা। এতে শিক্ষকদের টাইমস্কেল পূর্বের ৮ বছরের অভিজ্ঞতা স্থলে ১০ বছর ও ১২ বছরের অভিজ্ঞতার স্থলে ১৬ বছর করা হয়। প্রভাষকদের ১০ বছর পর একটি টাইমস্কেল প্রাপ্ত হবেন যা মাত্র এক হাজার টাকা । সহকারী অধ্যাপকের ৫:২ বিধান রাখা হয়েছে এবং অধ‍্যক্ষ ও প্রধান শিক্ষকের যোগ‍্যতায় সহকারী অধ্যাপক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে।
তিন।
আমলাদের শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নে সুনির্দিষ্ট ভাবনা চিন্তা আছে বলে মনে হয় না। অথচ দেশের সবচেয়ে মেধাবী এই শ্রেণিটির উপর দেশকে শিক্ষায় এগিয়ে নেয়ার দায়ভারও ন‍্যস্থ ছিল। কিন্তু প্রভুত্ববাদী মানসিকতার কারণে আমলারা শিক্ষার প্রসার ও মানোন্নয়নে আশানুরূপ অবদান রাখতে পারেনি। দেশের বিপর্যস্ত শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নের জন্য মূলত আমলারা বিরোধী পক্ষের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।
স্বাধীনতা পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আমলাদের উদাসীনতার কারণে একটি স্থায়ী যুগোপযোগী জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা সম্ভব হয়নি। ডঃ কুদরত ই খুদা শিক্ষা কমিশনের সুপারিশকৃত শিক্ষানীতির আংশিক বাস্তবায়নে পরিচালিত হয় বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা। তখনও এই আমলারা কুদরত ই খুদা শিক্ষানীতির বাস্তবায়নে গুরুত্বের সাথে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।
চার।
সরকারের প্রবল সদিচ্ছা থাকার পরও আমলাদের রোষানলে পড়ে বিগত ৮ বছরে জাতীয় শিক্ষানীতির সুপারিশমালা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। আমলাদের অসহযোগিতার কারণে সরকারের বারবার তাগিদ দেওয়ার পরও একটি শিক্ষা আইন তৈরি করতে পারেনি আমলারা। বরঞ্চ আওয়ামী সরকারের ১০ বছরের শাসনামলে আমলাদের রোষানলে ও চাতুরিপনায় শিক্ষার মানের নিম্নমুখী প্রবণতা, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করা হয়েছে। এমনকি প্রশ্ন ফাঁস, দুর্নীতি, অনিয়ম ও জিপিএ 5+ বিক্রির দায়ে মন্রনালয়ের কর্মকর্তা জড়িত থাকায় জেল হাজতে প্রেরণ করার নজির স্থাপন করেছে।
পাঁচ।
২০১৫ সালে জাতীয় পে-স্কেল করা হয়, এ সময় পে-কমিশন বলে, এরপর বাংলাদেশে আর কোন পে-কমিশন গঠন করা হবে না, বাজার মূল্যস্ফীতির উপর ভিত্তি করে বার্ষিক সর্বনিম্ন ৫% প্রবৃদ্ধি প্রদান করা হবে। অথচ ২০১৬ থেকে তিন বছর যাবত বেসরকারি শিক্ষকদেরকে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি দিচ্ছেনা আমলাদের কারসাজিতে। এতে শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি হয়েছে এবং এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষার মানোন্নয়নে।
ছয়।
২০১৮-২০১৯ প্রাক-বাজেট আলোচনায় মাননীয় অর্থমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষা বাজেট প্রনয়নে আমাকে যথাযথ সহযোগিতা করছে না। এ থেকেও প্রতিয়মান হয় যে, আমলারা শিক্ষার মানোন্নয়নে ও শিক্ষকদের সচ্ছল জীবন মান উন্নয়নে মোটেও আগ্রহী নন।
সাত।
বেসরকারি শিক্ষকদের বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা বৃদ্ধির দাবি উত্থাপন করা হলে, আমলারা সুকৌশলে প্রহসনের ৫গুন ভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রণালয়ে। যেখানে পূর্বে ছিল বাড়িভাড়া ২০০ টাকা তা ৫গুন বৃদ্ধিতে হয় ১ হাজার টাকা ও চিকিৎসা ভাতা ১ শত টাকা তা ৫গুন বৃদ্ধিতে হয় ৫’শ টাকা। এই হলো আমলাদের জগন‍্যতম তামাশা আর প্রহসনের  বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা বৃদ্ধির নমুনা।
আঁট।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশের সকল সরকারি বেসরকারি কর্মচারিদের বেতন স্কেলের ২০%  বৈশাখী ভাতা প্রদানের ঘোষণা দেন এবং তদানুযায়ী বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারি ব‍্যতিত সবাইকে বৈশাখী ভাতা প্রদান করা হয়েছে। এখানেও আমলাদের কুটিল কারসাজি রয়েছে। বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারিরা বৈশাখী ভাতার দাবিতে প্রতিবাদ করে, তখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমার টেবিলে প্রস্তাব না আসলে আমি কি করতে পারি”।
মাননীয় অর্থমন্ত্রী বলেন, “বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারিরা যে বৈশাখী ভাতা পায় না, এটা আমার জানা ছিল না”। এখানে সহজেই অনুমেয় যে, সরকারের মন্ত্রী এমপিরা অঢেল ক্ষমতাশালী আমলাদের কাছে কতটা অসহায়।
নয়।
বেসরকারি শিক্ষকদের  উৎসবভাতা ২৫%, যা অত্যন্ত অমর্যাদাকর এবং সামাজিক বাস্তবতায় অসামঞ্জস্য। শিক্ষক সংগঠনগুলোর বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের পরও আমলারা কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেয়নি।
দশ।
বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর-কল্যাণে ৬% কর্তনের পরেও অতিরিক্ত ৪% কর্তনের প্রজ্ঞাপন জারি করে আমলারা। আমলারা বেসরকারি শিক্ষকদের উপর যে কতটা ক্ষুব্ধ তার জলন্ত প্রমাণ দিয়েছেন। দেশে একজন পিয়নের চেয়ে একজন শিক্ষকের বেতন-ভাতা কম তা সত্ত্বেও আমলাদের রোষানলে শিক্ষকরা।
একাদশ
২০১৫ পূর্ববর্তী সময়ে বেসরকারি শিক্ষকরা একটি ইনক্রিমেন্ট পেয়ে আসছিল, বর্তমান সরকারের আমলে সেই ইনক্রিমেন্ট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অথচ আমলারা সরকারকে বুঝিয়েছেন যে, বেসরকারি শিক্ষকদের বেতন ভাতা ১২৩ গুন বৃদ্ধি পেয়েছে।
দ্বাদশ
বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারি ফোরাম বিগত ১০ জানুয়ারি থেকে ২৯ জানুয়ারি জাতীয়করণের দাবিতে অনশন কর্মসূচি পালন করে। উক্ত কর্মসূচিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুই আমলা অবিলম্বে শিক্ষকদের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি, পূর্ণাঙ্গ উৎসবভাতা ও বৈশাখী ভাতা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেন। অতীব দুঃখের বিষয় আট মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পথে আমলারা প্রতিশ্রুতি রক্ষায় দৃশ‍্যমান কোন ব‍্যবস্থা গ্রহণ করেনি।
দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার ৯৭% দায়িত্বে নিয়োজিত বেসরকারি শিক্ষকদের বঞ্চনা, বৈষম্য ও অভুক্ত উদরে রেখে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। শিক্ষকদের আকর্ষণীয় বেতন-ভাতা এবং যথাযথ সম্মান মর্যাদা ও আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করতে হবে।
বারংবার ঘুরেফিরে একই কথা চলে আসে, তা হলো
“সকল নাগরিকের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিতকরণ, একমাত্র সমাধান এমপিওভূক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ”।
শিক্ষার নিয়ন্ত্রণ ও দায়িত্বভার রাষ্ট্রকেই পালন করতে হবে। আমরা জানি শিক্ষাহীন মানুষের আবির্ভাবে সমাজের কোনো কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। আমলারা তো মেধাবী উচ্চশিক্ষিত, তাদের দ্বারা জাতির কতটা কল্যাণ হয়েছে তার পরিসংখ্যান প্রয়োজন। ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, আমলারা নিজেদের কল্যাণ ব‍্যতিত জাতীয় উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান দেখাতে পারেনি কখনোই। ভালো হোক, মন্দ হোক জাতীয় কল‍্যাণ যতটুকু অর্জিত হয়েছে, তার সবটুকুই রাজনৈতিক নেতাদের দ্বারাই সম্ভব হয়েছে। আমার মনে হচ্ছে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের আমলাতান্ত্রিক নির্ভরশীলতা দূর করা উচিত। বুর্জোয়া আমলাতন্ত্রের রোষানল থেকে শিক্ষাব্যবস্থার উত্তরণ এবং মানোন্নয়নে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে এগিয়ে এসে, মহান সংসদে সুনির্দিষ্ট কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

লেখক
সভাপতি
বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারি ফোরাম
ঢাকা বাংলাদেশ।

Facebook Comments
সংবাদটি শেয়ার করুন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

আরো সংবাদ