প্রধানমন্ত্রী বরাবর অভিযোগ, রাজাকারের নাতি নৌকা প্রতীকের মেয়র!

অন্যদৃষ্টি অনলাইন
মঙ্গলবার, ৩ মার্চ, ২০২০, ৯:৫৫ অপরাহ্ন

সরিষাবাড়ী (জামালপুর) সংবাদদাতা।।

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে চিহ্নিত রাজাকারের নাতি ও বিএনপির ‘ডোনার’ খ্যাত রুকুনুজ্জামান রোকন জামালপুরের সরিষাবাড়ী পৌরসভার মেয়র।

আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতীক নৌকার মনোনয়নে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তিনি দলের মধ্যে বিশৃঙ্খলা ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে নানা কারণে আলোচনা-সমালোচনায় শীর্ষে। গুম নাটক, নারী কেলেঙ্কারী, টে-ারবাজি, কমিশন ও নিয়োগ বানিজ্য, বিএনপিপন্থীদের নিয়োগ, প্রকাশ্য অস্ত্রের মহড়া ও সাংবাদিকদের হত্যার হুমকিসহ চার বছরে নানা কারণে বিতর্কিত হয়েছেন মেয়র রোকন।

এদিকে পৌরসভার নির্বাচনকে সামনে রেখে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে প্রধানমন্ত্রী বরাবর লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন স্থানীয় এক ছাত্রলীগ নেতা।

অভিযোগ সূত্রে প্রকাশ, সরিষাবাড়ী পৌরসভার সাতপোয়া উত্তরপাড়া গ্রামের মৃত ওবায়দুল্লাহর ছেলে মেয়র রুকুনুজ্জামান রোকন। তার দাদা মৃত আব্দুল গফুর মাস্টার ৭১’র মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে চিহ্নিত রাজাকার ও শান্তি কমিটির সংগঠক ছিলেন। যুদ্ধকালীন সময়ে তাঁর নেতৃত্বে উপজেলার ভাটারা ইউনিয়নের পারপাড়া গ্রামটি কয়েক দফায় ভস্মিভূত করা হয়। স্থানীয় সংখ্যালঘু ও স্বাধীনতাকামী অসংখ্য মানুষকে নির্যাতন-হত্যা, নারী ধর্ষণ, লুটতরাজ করে গফুর মাস্টারের নেতৃত্বাধীন বাহিনী। দেশ স্বাধীন হলে ৭১’র ১৬ ডিসেম্বর তিনি ঘাতক-দালাল আইনে গ্রেফতার হন এবং দীর্ঘদিন জেলহাজতবাস করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালে জেল থেকে মুক্ত হয়ে নিজবাড়িতে নীরবে-নিভৃতে বসবাস করতে থাকেন এবং মানুষের ঘৃণার মুখে মুক্তির কিছুদিন পর তিলেতিলে মৃত্যুবরণ করেন বলে এলাকায় জনশ্রতি রয়েছে।

এ ব্যাপারে সরিষাবাড়ী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সদ্য সাবেক কমা-ার মোফাজ্জল হোসেন জানান, ‘মেয়র রুকনের দাদা গফুর মাস্টার ট্রেনিংপ্রাপ্ত রাজাকার ছিলেন না; তবে রাজাকাররা তাঁর কথা মেনে চলতো। পারপাড়া গ্রামে তাঁর নেতৃত্বে ধ্বংসযজ্ঞ চলে।’

অভিযোগ রয়েছে, রাজাকার গফুর মাস্টারের ছেলে ও মেয়র রোকনের বাবা মৃত ওবায়দুল্লাহ্ বিএনপি সমর্থিত শ্রমিকদলের নেতা ছিলেন। রোকনের বড়ভাই সাইফুল ইসলাম টুকন যুবদলের প্রভাবশালী নেতা ও সদ্য সাবেক উপজেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক। পৌরসভার অধিকাংশ কাজই তাঁর পরামর্শে করা হয়। তাঁর পরিবারের সবাই বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত বলে জানা গেছে। এলাকায় মেয়র স্থানীয় বিএনপির ‘ডোনার’ ও ‘রাজাকারের নাতি’ হিসেবে পরিচিত। মেয়রের বাল্যবন্ধু ও বিএনপি নেতা রুহুল আমিন বলেন, ‘রোকন বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় ছিল ও নিয়মিত মোটা অঙ্কের অর্থ সহায়তা করতো।’

দলীয় সূত্র জানায়, রুকুনুজ্জামান রোকন ২০১৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। তারপর তাঁকে দেয়া হয় সরিষাবাড়ী পৌর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতির পদ। যোগদানের সাতমাসের মাথায় আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নামক ‘সোনার হরিণ’ হাতে পেয়ে নৌকা প্রতীকে প্রতিদ্বন্ধিতা করে মেয়র নির্বাচিত হন। তিনি মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই পাল্টে যান। বিএনপি-জামায়াতপন্থীদের সাথে ওঠাবাসা, নিজের ভাবিসহ বিএনপির নেতাকর্মীদের নিয়োগ, বিতর্কিত ও চিহ্নিত কিছু মাদকসেবীকে মাস্টাররোলে নিয়োগ দিয়ে মেয়রের ব্যক্তিগত মহড়ায় ব্যবহার, ঠিকাদারদের নামমাত্র কার্যাদেশ দিয়ে নিজেই নিম্ন মানের উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়ন করায় দলের মধ্যে চাপা ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নেতার পক্ষে অবস্থায় নেয়ায় তাঁর জন্য দলের মধ্যে বিশৃঙ্খলা বিরাজ করে। তাঁর দাপটে আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতাকর্মীরা মেয়রের ধারেকাছেও ঘেঁষতে চান না। টে-ারবাজি, কমিশন ও নিয়োগ বানিজ্য, প্রকাশ্য অস্ত্রের মহড়া ও সাংবাদিকদের হত্যার হুমকিসহ নানা কারণে চার বছরে তাঁকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে। নারী কেলেঙ্কারীর কিছু ফেসবুক বার্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে ২০১৭ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর নিজের ‘গুম নাটক’ সাঁজান মেয়র। যার রহস্য ঘটনার প্রায় আড়াই বছরেও উদ্ঘাটন হয়নি।

এদিকে সামনের পৌর নির্বাচনে ‘রাজাকারের নাতি’র হাত থেকে নৌকা প্রতীক রক্ষা ও মেয়রের দুর্নীতির বিচার দাবিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন সরিষাবাড়ী শহর ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুদুর রহমান। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পত্রটি গ্রহণ করে। প্রেরিত এ পত্রটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম, তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান, জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগ, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, সরিষাবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগ, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, জামালপুর প্রেসক্লাব ও সরিষাবাড়ী পৌরসভাকে অনুলিপি দেয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে সরিষাবাড়ী পৌরসভার মেয়র ও পৌর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি রুকুনুজ্জামান রোকনের বক্তব্য জানার চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও মুক্তযুদ্ধকালীন কমা-ার মুক্তিযোদ্ধা এম এ লতিফ বলেন, ‘মেয়রের দাদা রাজাকার ছিল; এটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত ও সকলেই জানে। তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত হওয়ায় দলের জন্য কতটুকু লাভ হয়েছে, তা তাঁর নিয়োগ থেকেই বুঝা যায়।’ তিনি আরো জানান, ‘পৌর কর্মচারী নিয়োগের সময় একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে নিয়োগের জন্য দলীয় নেতৃবৃন্দ ও মুক্তিযোদ্ধারা মেয়রকে সুপারিশ করেছিল, কিন্তু ১৩ লাখ টাকা উৎকোচ দাবি মেটাতে না পারায় সে নিয়োগ হয়নি। যাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে, তারা প্রত্যেকেই স্বাধীনতাবিরোধী পরিবারের সন্তান।’

সরিষাবাড়ী পৌর মেয়র রুকুনুজ্জামান রোকন

Facebook Comments
সংবাদটি শেয়ার করুন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

আরো সংবাদ