প্রচলিত সনদ নির্ভর শিক্ষা কী জাতীয় উন্নয়ন অগ্রগতির অন্তরায়?

অন্যদৃষ্টি অনলাইন
সোমবার, ২৬ নভেম্বর, ২০১৮, ৭:৫১ অপরাহ্ন

মোঃ সাইদুল হাসান সেলিম।।

বিজ্ঞানের বিষ্ময়কর কল্যাণে পৃথিবী আজ আধুনিকতার সর্বোচ্চ শিখরে অবস্থান করছে। তথ্য প্রযুক্তির অগ্রসরতার যুগে বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যখন জনগণের চাহিদা, এবং আকাঙ্ক্ষাকে গুরত্ব দিয়ে রাষ্ট্রকে অধিকতর উন্নতির পথে, তখন বাংলাদেশ উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের কাতারে যুক্ত হলো মাত্র। কালক্রমে রাষ্ট্রযন্ত্রের চালকরা সুকৌশলে দেশের মানুষের মৌলিক চাহিদায় চরম বৈষম্য সৃষ্টি করে দিয়েছে। একটি দেশের উন্নয়ন অগ্রগতির মূল চালিকা শক্তি হচ্ছে সেই দেশের শিক্ষাব্যবস্থা। শিক্ষাব্যবস্থা উন্নত হলে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা সহজতর হয়। মানোন্নত শিক্ষায় জাতি আত্ননির্ভরশীলতার দিকে ধাবিত হয়, এতে সামগ্রিক জনগোষ্ঠীর জীবনে আসে সাচ্ছন্দ্য জাতীয় উন্নয়ন অগ্রগতি ত্বরান্বিত করে। অথচ দ্বিমুখী শিক্ষানীতিতে বেসরকারিকরণের মাধ্যমে আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজো অবহেলিত, বিপর্যস্ত।

আমাদের দেশে শিক্ষার্থীর সংখ্যা সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে আনুমানিক পাঁচ কোটি। শিক্ষাব্যবস্থার ৯৭% বেসরকারি, সেই হিসেবে প্রতিবছরে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় শিক্ষালাভ করছে ৪ কোটির বেশি শিক্ষার্থী। সরকার যদি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলো রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সঠিকভাবে পরিচালনা করে, তাহলে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না বিশ্বের কোন দেশ। পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রগুলো যখন শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে প্রচুর পরিমাণে বিনিয়োগ করছে, তখন বাংলাদেশ শিক্ষাকে বেসরকারিকরণ করে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব এড়িয়ে চলছে। আমাদের লেখাপড়ার মান নিয়ে আমরা কখনোই সন্তুষ্ট ছিলাম না, এখনো নই। ব্যবসায়িক মনোভাবাপন্ন রাজনীতিকরা আর আকাশ ছোঁয়া উচ্চাভিলাসী আমলাদের বিদ্বেষী মনোভাব আজকে বিপর্যস্ত শিক্ষাব্যবস্থার। এদেশের মানুষের মধ্যে বিপুল সম্ভাবনা, সুপ্ত প্রতিভা বা উপাদান রয়েছে। এমনি প্রতিভাবান জাতির দ্বিমুখী নীতিতে  জোড়াতালি দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা।

বিস্ময়কর উন্নয়ন আর সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশ। প্রকৃতিগত ভাবেই উপকুলীয় অঞ্চলের মানুষ প্রচুর পরিশ্রমী, সাহসী ও প্রখর মেধাবী হয়ে থাকে। মানোন্নত শিক্ষায় অন-গ্রসরতার কারণে আজো দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি পরিশ্রমী খেটে খাওয়া মানুষ। এই পরিশ্রমী শ্রমজীবী মানুষের পাশে যদি মেধা সম্পন্ন আধুনিক মানসম্মত শিক্ষায় শিক্ষিত নতুন প্রজন্ম দাঁড়ায়, তাহলেই আমরা দৃঢ় অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করণের মাধ্যমে সোনার বাংলা বিনির্মাণ করতে পারবো বলে বিশ্বাস করি। প্রচলিত সনদ নির্ভর শিক্ষার চেয়ে দক্ষ শ্রমিক তৈরি করা দেশের জন্য কল্যাণকর নয়কি? বিপর্যস্ত শিক্ষাব্যবস্থার কারণেই সনদ নির্ভর শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে দেশের উন্নয়ন অগ্রগতির পথে মূল অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। এখনই সময় শিক্ষার মানোন্নয়নে সকলকে আন্তরিকতার সাথে এগিয়ে আসতে হবে।

আন্তর্জাতিক শিক্ষা সম্মেলনে বাংলাদেশ অঙ্গীকার করেছিল, বাংলাদেশ জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষায় ব্যয় করবে। অথচ শিক্ষায় সরকার ব্যয় করছে জিডিপির ২.৪ শতাংশেরও কম। শিক্ষায় এত কম টাকা বিনিয়োগ করে পৃথিবীর কোনো দেশ এত বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীর লেখাপড়ার কথা চিন্তাও করতে পারবেনা। শিক্ষা যে কোন জাতির উন্নতির মূল চাবিকাঠি। শিক্ষায় বিনিয়োগ অধিক লাভজনক। এতদসত্ত্বেও জাতীয় বাজেট প্রস্তুতকালে দেখা যায়, শিক্ষায় বরাদ্দে যতটা কমিয়ে দেয়া যায়, অন্যথায় কারো কারো ভাগে কম পরে যায় কিনা। যাঁরা বাজেট প্রস্তুত করেন তাঁদের মনে রাখা প্রয়োজন, শিক্ষায় যদি অতিরিক্ত খরচ হয়, তবে তার মুনাফা শতগুণ পাওয়া যায়। আগামী বছরগুলোতে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নে জিডিপির নূন্যতম ৪.৬ শতাংশ বরাদ্দ দিতে হবে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনী ইশতেহারে স্পষ্টভাবেই ‘এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ’ ঘোষণা থাকতে হবে। আমাদের আগামী প্রজন্মকে আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর,গুনগত মানের শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে, দেশ উন্নয়ন অগ্রগতির দিকে দৃঢ় পদক্ষেপ ধাবিত হবে সেই প্রত্যাশায়।

লেখক
সভাপতি
বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারি ফোরাম
ঢাকা বাংলাদেশ।

Facebook Comments
সংবাদটি শেয়ার করুন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

আরো সংবাদ