এম. ওয়াজির হোসেন।।
আমি যখন দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ি সেই ১৯৮৫ সালে জেএন এসোসিয়েটসের মালিক আব্দুল্লাহিল কাফি ভাইয়েরা কুষ্টিয়ায় প্রথম কম্পিউটার নিয়ে গিয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু করলেন। ১৫০০ টাকার মতো ফিস।
ঐ সময় অতো টাকা জোগাড় করার সামর্থ্য ছিলোনা, তাই শেখা হয়নি। তবে তখনই মনে মনে পণ করি, একদিন না একদিন কম্পিউটার চালানো শিখবোই। ওইসময়ই আমার সহপাঠী বন্ধুদের বলতাম, কম্পিউটার আর ইংরেজি এই দুটো শিখবো তারপর দেখি আমার চাকরি ঠেকায় কে!
খুব একটা ভাল ছাত্র ছিলাম না, তাছাড়া দারিদ্র্যতার কারণে HSC পরীক্ষার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির চিন্তা বাদ দিয়ে ওই অবসর সময়ে সামান্য কিছু টাকা জোগাড় করে কুষ্টিয়া কমার্শিয়াল কলেজে শর্টহ্যান্ড আর টাইপিং প্রশিক্ষণ নিই। এরপর কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ থেকে (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে) অর্থনীতিতে অনার্স শেষ করে ১৯৯০ সালে ঢাকা চলে আসি। ফকিরাপুলে একটা একচালা ঘরের মেসে একমাত্র চাচার ওখানে উঠলাম। চাচা বিয়ে শাদি করেননি। পুরান পল্টনে একটা জুতার দোকানের ম্যানেজার। উনার কাছেই থাকতাম আর খেতাম। এছাড়া সপ্তাহে ২০ টাকা দিতেন হাতখরচের জন্য। ঢাকায় এভাবেই থেকে চাকরি খুঁজতাম। মুখস্থ বিদ্যায় পারদর্শী থাকার পরিবর্তে হাতেকলমে টেকনিক্যাল কাজগুলো ভাল ধরতে পারতাম তাই সেদিকেই নজর ছিল। ঢাকায় কিশোরগঞ্জের এক সদ্য পাস করা ডাক্তার ওমর ফারুক (মরহুম, আল্লাহ উনাকে জান্নাত দান করুন) ভাইয়ের সাথে কুষ্টিয়ার এক বড় ভাই পরিচয় করিয়ে দিলেন। উনারা তখন ঢাকার শাহজাহানপুরে হোটেল রাজদূত ভাড়া নিয়ে ইসলামি ব্যাংক হাসপাতাল চালু করার কাজ করছিলেন। উনার কাছে যাতায়াত করতে করতে একদিন উনি পরামর্শ দিলেন কম্পিউটার শিখেন, ভবিষ্যতে কাজে লাগবে। কোথায় শিখবো, টাকা পাবো কোথায়, এইসব চিন্তা করতে করতে উনি আমাকে বললেন, ২০০০ টাকা লাগে তো, আপনি কত জোগাড় করতে পারবেন? আমি লজ্জার খাতিরে বলে ফেললাম ৫০০ টাকা। যদিও ওই টাকা জোগাড়ের সামর্থ্যও তখন আমার ছিলোনা। তবে উনি আশ্বস্ত করলেন, ট্রেনিং সেন্টারের পরিচালককে বলে ব্যবস্থা করা যায় কিনা দেখবেন।
ইস্কাটন রোডে আমার এক দূর সম্পর্কের ফুফু থাকতেন। ওইসময়কার বেশ ভাল ধনী ছিলেন। উনার ফ্ল্যাটে প্রায়ই বেড়াতে যেতাম। আমাদের খুব ভালবাসতেন। একদিন ফুফু ৫০০ টাকা দিয়ে বললেন, তুমিতো নামাজ কালাম পড়ো সিনেমা দেখো না। জোনাকি হলে ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ সিনেমাটা চলছে, বেশ ভাল সিনেমা, যাও দেখে এসো। আমিতো ৫০০ টাকা পেয়ে মহাখুশি। কীসের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ দেখা! সেই টাকা দিয়ে কম্পিউটার শিখলাম। DOS, WordPerfect, Lotus & dBase. ইসলামি ব্যাংক হাসপাতালে চাকরিটাও পেলাম! ডা. ফারুক ভাই হাসপাতালের পরিচালনার দায়িত্বে। সেখানে কম্পিউটার কিনলেন। প্রথম প্রথম ওয়ার্ড পারফেক্ট আর লোটাসে কাজ করতাম। এরপর যখন উইন্ডোজ আর এমএস অফিস আসলো, সেটাও শিখে ফেললাম, একজনের সহযোগিতা নিয়ে। এরপর নিজে নিজে দক্ষতা অর্জন করলাম…………….একদিন প্রোগ্রামিংও শিখলাম……!
তারপর…….. স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটা প্রকল্পে কম্পিউটার প্রোগ্রামার হিসেবে চাকুরি পেলাম। প্রকল্পটা শেষে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে PROMOTE প্রকল্পে যোগ দিলাম। এখন সেই প্রকল্প শেষে রাজস্বখাতের ৬ষ্ঠ গ্রেডে কম্পিউটার অপারেশন সুপারভাইজার! তারপর…!
বি.দ্র.: ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ সিনেমাটা কিন্তু আজও দেখা হয়নি!
You must be logged in to post a comment.