নুসরাতের বাঁচার আশা ক্ষীণ। ভাবছি, ঠিক কী করলে নুসরাত বাঁচতে পারতো!

অন্যদৃষ্টি অনলাইন
মঙ্গলবার, ৯ এপ্রিল, ২০১৯, ১১:২৫ পূর্বাহ্ন

হেলেন রেজা।।

অধ্যক্ষের প্রস্তাব মেনে নিলে? তার কাছে শরীর সমর্পণ করলে? তার বিরুদ্ধে করা মামলা উঠিয়ে নিলে? অধ্যক্ষ ও তার অনুসারীদের কথামত চললে? ঠিক কী কী করলে একটি নারী একটি বীভৎস সমাজে বেঁচে থাকতে পারে? পুরুষকে কতটা তৃপ্তি দিয়ে, কতটা আত্মসমর্পণ করে? কতটা বিকিয়ে দিয়ে? নিজেকে কতটা নিঃস্ব করে আর জড়’তে পরিনত করে?

নিজেকে কীভাবে বিকিয়ে দিয়ে?

চিকিৎসকরা বলছেন, নুসরাতের জীবন এখন চরম সংকটাপন্ন। আমি বুঝিনা ডাক্তাররা কেন এখন এটি বলছেন! নুসরাতের জীবন তো সেই আঠারো বছর আগেই সংকটাপন্ন অবস্থায় যাত্রা শুরু করেছে। ঠিক যেমন আমার যাত্রা শুরু হয়েছে আমার জন্মমুহুর্ত থেকে। যেমন আমার মায়ের, আমার বোনের, আমার আত্মীয়, বন্ধু সহকর্মী প্রতিটি মেয়ের। এই দেশে মেয়ে তো মৃত্যু মুখে নিয়ে জন্মায়। এই দেশে মৃত্যুই সত্য প্রত্যেক মেয়ের জীবনে। জীবন বলে তাদের জীবনে প্রকৃত অর্থে কিছু নেই।

নারী নির্যাতন আর নারী অবমাননার একের পর এক ঘটনা আমাকে ক্লান্ত করে। বিষাদিত করে। অবসাদে পায়। সাদা ব্যান্ডেজে মোড়ানো নুসরাতের শরীর দেখে আমি শ্বাস ফেলি। তারপর ভুলে যাবার চেষ্টা করি। বিচারহীনতার সংস্কৃতি আর অপশাসন যে দেশে নির্যাতক, শোষক, দুষ্কৃতিকারীকে একের পর এক ঘটনা ঘটিয়ে যাবার দুঃসাহস দিয়ে সমাজে অধিষ্ঠিত থাকার সুযোগ করে দিয়েছে, আমাদের প্রতিবাদ যেখানে দুর্নীতির দেয়ালে গিয়ে বারবার আছড়ে পড়ে, সে দেশে আর কতবার লিখতে হবে এইসব প্রতিবাদলিপি? কী হবে লিখে? নুসরাতের সাদা ব্যান্ডেজ আর শতকরা আশি ভাগ পোড়া শরীরের মতই আমাদের মূল্যহীন প্রতিবাদের পাতাগুলো ঢেকে গেছে পোড়া দাগে। আমাদের প্রতিবাদ শুয়ে আছে মুমুর্ষু। আমাদের আত্মা আজ মৃতপ্রায়। আর কটা দিন পরেই মৃত্যু এসে ডেকে নিয়ে যাবে।

প্রকাশ্য দিবালোকে একটি মাদ্রাসার ছাদে তুলে একটি আঠারো বছরের মেয়েকে গায়ে কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে দেয়া আজ এত সহজ- এই কথাটিই বারবার আজ অবসন্ন করে দিচ্ছে। এর আগে খাদিজা, এর আগে তনু, এর আগে পূজা, এর আগে রত্না, এর আগে সাবিহা…আহা কত কত নাম। কত কত রক্তপাত। ঝরেই যাচ্ছে। কার অলক্ষ্যে? কার অগোচরে? সূর্যের নিচে! সতেরো কোটির ঘনজঙ্গলে! আমাদের ঘিরে থাকা এই মানুষেরা তবে কারা? এই শাসকের দল তবে কাদের? এই গণতন্ত্র তবে কার কথা বলে? এই সুশাসনের গল্প তবে কে রচনা করে?

নুসরাতের জন্য প্রার্থণা করি, যেন সে শান্তিময় মৃত্যুর ওইপাড়ে চলে যায় দ্রুত। বেঁচে থেকে লাভ নেই। প্রয়োজনও নেই। এই পোড়া দেশে শরীরময় তীব্র আগুন সমেত আমরাও খুব শিগগির মিলিত হব তার সাথে। জন্মমুহূর্তে পাওয়া এ আগুন নিয়ে জীবন জুড়ে বারবার আগুনের ট্রায়াল দিয়েই চলেছি। কোন না কোন দিন এর শেষ তো হবেই। নুসরাতের মত করেই।

 

লেখক

প্রধান শিক্ষক

সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়।

Facebook Comments
সংবাদটি শেয়ার করুন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

আরো সংবাদ