মোঃ জিল্লুর রহমান।।
দীর্ঘ একমাস রোজাব্রত পালন শেষে আগামীকাল পবিত্র ঈদুল ফিতর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পবিত্র রমজানের শেষ দিনে চাদ দেখার সাথে সাথে অন এয়ার, অন লাইন বা অফ লাইনে, ঘরে বাইরে, গুনগুনিয়ে বা উচ্চকিত কন্ঠে অনুরণিত হয় আমাদের কবি, মানবতার কবি, সমাজের তথা সকলের কবি কাজি নজরুল ইসলামের অমর এবং কালজয়ী গান-“ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ”।
এবারের ঈদে নজরুল এবং নজরুলের এই কালোত্তীর্ণ গানটি ভিন্ন বিশ্ব প্রেক্ষাপটের মধ্যেও নি:সন্দেহে অন্য এক মাত্রা যোগ করেছে। কারণ আজ ২৪ শে মে যেমনভিাবে ঈদের চাদ আগামীদিনের খুশির দিনের বারতা নিয়ে উদিত হল এই একই দিন জাতীয় কবি নজরুলের জন্ম দিনও।বিষয়টি কাকতালীয় হলেও আমাদের সমাজের কতজনের বিষয়টি জানা তা পরিমাপ করা কঠিন হলেও ভার্সুয়ালি নানা বিষয় যেভাবে মুহুর্তের মধ্যে আমাদের মাঝে ভাইরাল হয়ে যায় এই ক্ষেত্রে তার ছিটেফোটাও লক্ষনীয় হয় নি।বিষয়টি এতটায় হতাশাজনক যে এর মধ্য দিয়েও আমাদের বর্তমান সমাজের অন্তঃসারশুন্যতা কিছুটা হলেও প্রমান করে।অবশ্য দু’একজনকে দেখেছি বিষয়টি তুলে ধরতে কিন্তু তা নিতান্তই ছিটেফোটা।মাঝে মাঝে অবাক হই এই ভেবে যে, একটি জাতি কিভাবে তার মেৌলিকত্বকে বাদ দিয়ে ভাসমান বিষয়সমূহ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। যারই ফলশ্রুতিতে সর্বখানে একধরনের লোক দেখানো কৃত্তিমতায় পরিপূর্ণ সহমর্মীতা বা সহযোগিতার প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
কবি কাজি নজরুল ইসলাম দেশের জাতীয় কবি হিসেবে কতটুকু চর্চিত না উপেক্ষিত সে বিষয়টি আলোচনার দাবি রাখলেও আজ ভিন্ন প্রসঙ্গে সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে ঈদ, নজরুলের বিশেষ এই ঈদ গানের সমসাময়িক আবেদন ও নজরুল সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করতে চাই।আমার উচ্চতর গবেষনার মেৌলিক অংশ হল নজরুল ও তার সাহিত্য কর্ম। সেই হিসেবে এ পর্যন্ত আমার গবেষনা অধ্যয়নে যতটুকু বুঝি আর তা হলো- প্রকৃত কবি এবং তার সাহিত্য কর্মের আবেদন ছাড়িয়ে যায় সময়, জাত, ধর্ম এমনকি দেশ। একজন প্রকৃত কবি তার সামনে বিরাজমান সকল বৈকল্য, অসামাঞ্জস্যতা, অবিচার, অনাচারকে তুলে ধরেন তার কাব্যিক কর্মের মধ্য দিয়ে।যেখানে কবির প্রতিটি কথা নিপীড়িত বা ভূক্তভূগী প্রতিটি মানুষ তার নিজের কথা মনে করে।এটি অবশ্য রোমান্টিক কবিদের অন্যতম বৈশিষ্ট। সেই আলোকে নজরুলকে তো আমরা রোমান্টিক কবি হিসেবে যতটুকু না চিনি তার থেকে বেশি তাকে চিনি বিদ্রোহী কবি হিসেবে।অথচ কবি নিজেই বলেছেন-“অযথা আমাকে বিদ্রোহী বলে খামোখা লোকের মনে ভয় ধরিয়ে দেয়া হয়েছে।” কবির নিজের এই কথা তার বহু কবিতা, বক্তব্য এমনকি গানে বিশেষ করে এই গানের মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে। কবি শুধু অন্যায় আর অনাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেই রোমান্টিক খ্যাতি পায় নি বরং রোমান্টিক কবি বা কবিতার অনন্য বৈশিষ্ট তা হলো প্রান্তিক অসহায় মানুষ ও তাদের দু;খ, কষ্ট অনুভব করা এবং তা তার কলমের খোচায় অত্যন্ত হ্রদয়গ্রাহীরুপে তুলে আনা। এমনকি অতিন্দ্রীয়বাদ (মিসটিসিজম) রোমান্টিক কবিদের কবিতা ও গানে প্রলক্ষিত হয় যার ব্যতিক্রম নজরুলও নিশ্চয় নন। যে কারনে হিন্দুদের শ্যামা সঙ্গীত রচনার পাশাপাশি ইসলামের মূল স্পিরিট ধরে অসংখ্য গান ও কবিতা তিনি রচনা করেছেন।ইসলামের মেৌলিক শিক্ষা আল্লাহর একত্ববাদ, রসুলের রেসালাত এবং চুড়ান্ত পর্যায়ে সাম্য, শান্তি নিশ্চিকরনের মাধ্যমে মানবতার সার্বিক কল্যাণ যা নজরুলের প্রতিটি ইসলামিক গান ও কবিতার পরতে পরতে ভাস্মর হয়ে আছে।এক্ষেত্রে বিশ্বসাহিত্যে নজরুলই একমাত্র কবি যে কিনা তার জাত, ধর্ম, সময়, স্রোত এমনকি দেশের গন্ডি পেরিয়ে এমনভাবে তার কাব্যধারার স্বত:স্ফূর্ত স্রোতধারার মধ্য দিয়ে বেরিয়ে এসেছেন, যেখান থেকে সমসাময়িক অনেক খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিকগণও বের হতে পারে নি। নজরুলের স্বকিয়তা এখানেই এবং এইজন্য তিনি নজরুল।
এবার নজরুলের রমজানের গান ও সমসাময়িক সময়ে এর প্রভাব কতটুকু তা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।এ বিষয়ে আলোচনার শুরুতেই নজরুলের এই গা্ন রচনার পটভুমি আলোচনা ব্যাতিরেকে অতিত নিকট এবং সমসাময়িক দু’একটি বিষয় তুলে ধরতে চাই।কর্পোরেট ইলেকট্রনিক মিডিয়ার পূর্বে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে প্রথম দিকে সাদাকালো এবং পরবর্তীতে রঙিন টেলিভিশনে ঈদুল ফিতরের আগের দিনে চাদ দেখার সাথে সাথে দেশের বিশিষ্ট সব শিল্পীদের নিয়ে সমবেত কণ্ঠের গান- “ও মোর রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশির ঈদ”- ছেলে বুড়ো সবাই দারুনভাবে উপভোগ করত।গানের ভাবার্থ কেউ বুঝুক আর না বুঝুক গানের কথা ও সুর এতটায় জীবন ঘনিষ্ট এবং ধর্মীয় অনুপ্রেরণার যে সবাই মন্ত্র মুগ্ধের মত শুনত। কালের পরিবর্তনে কর্পোরেট মিডিয়ার গুনে আজ সেই গানেই দেখলাম একঝাক তরুনীর বৈশাখী পোষাকে নৃত্য করতে গানের তালে তালে। দেখে শুধু অবাকই হলাম না দারুনভাবে মর্মাহত হলাম এইভেবে যে আজকে নজরুল যে আবেদন তৈরি করেছিল এই গানের প্রতিটি কথামালার মধ্য দিয়ে সেই গান নিয়েই এরা আধুনিকতার নামে রীতিমত ছেলে খেলা করছে। কোথায় গানের আবেদন আর কোথায় তার বহি:প্রকাশ।
এই গানের আবেদন কেয়ামাত পর্যন্ত মানুষের হ্রদয়ে সেইভাবেই থাকবে যেভাবে নজরুল বলতে চেয়েছেন। বর্তমান সমসায়িক চরম মুহুর্তে যখন আমরা বলছি এটি ভিন্ন ধরনের ঈদ ঠিক তখনই যদি আমরা নজরুলের এই গানের প্রতিটি লাইন ধরে পর্যালোচনা করি তাহলে সেখানেই সমসাময়িক এই মানবিক বিপর্যয়েও আমাদের মাঝে আগত ঈদে নজরুলের গানের আবেদনের যথাযথ প্রয়োগ নি:সন্দেহে একটি বড় ধরনের ঔষধ হিসেবে কাজ করতে পারে। ইসলামের মেৌলিক শিক্ষাকে সামনে রেখে রোজার আসল উদ্দেশ্য যখন ইসলামী পণ্ডিতগণ পাতার পর পাতা লিখে অথবা ঘন্টার পর ঘন্টা কথামালায় বর্নণা করেন, নজরুল ইসলাম মাত্র ৫ মিনিটের গানে তা অত্যন্ত নিখুদভাবে তুলে ধরেছেন।
গানের প্রথম ছত্রেই নজরুল রোজা শেষের খুশিকে নিছক খুশি নয় বরং রোজার যে শিক্ষা শারিরিক মানষিক, অর্থনৈতিক ত্যাগের খোদায়ী বিধান, তাকে তিনি আসমানি তাকিদ (হুকুম) হিসেবে বলেছেন। দ্বিতীয় ছত্রে এই খুশির দিনে সকলের খুশির জন্য ধনবানদের সম্পদে যে নি:স্বদের অধীকার আছে যা ইসলামে যাকাত অভিধানে অভিহিত, তা আল্লাহর রাহে দান করার জন্য বলেছেন। তৃতীয় ছত্রে পৃথিবীতে সত্য-ন্যায় প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অংশ নিয়ে যারা জীবন (শহীদ) দিয়েছেন অথবা বেচে (গাজি) গেছেন তাদের আত্নদানের প্রতি সম্মান দেখিয়েছেন। চতূর্থ ছত্রে, ইসলামের মেৌলিক শিক্ষা, সকল ভেদাভেদ ভুলে এক আল্লাহর বান্দা হিসেবে সহমর্মীতা, ভালবাসার বন্ধন গড়ার আহবান জানিয়েছেন। পঞ্চম ছত্রে, নজরুল, ইসলামের অন্যতম একটি হুকুম যা আল্লাহর কাছে অতিপ্রিয় সদকা (দান)করার আবেদন এমনভাবে করেছেন যা সত্যিই নির্মোহ।সবশেষে আবারো সবাইকে শত্রুতা ভুলে এক ছাতার নীচে আসার ব্যাকুলতা বা আহবান যা গানকে পরিপূর্ণতা দিয়েছে।
আমরা পুরা ৩০ দিন না খেয়ে অনেক শারিরিক ত্যাগ স্বীকার করেছি, অনেকে যাকাত, সদকা বা ফিদিয়া দিয়েছি এটা যেমন ঠিক তেমনি নজরুলের গানের প্রথম ছত্রের আলোকে ইসলাম নির্ধারিত উপায়ে যদি আসমানি তাকিদ হিসেবে আল্লাহর ওয়াস্তে (রাহে লিল্লাহ)সোনাদানা, বালা খানা বা সম্পদের যথাযথ হিসেব কষে যাকাত দিতে পারতাম তাহলে হতে পারত এই ঈদ আজকের কোভিড-১৯ সংকটে দিশাহারা, কর্মহীন, নি:স্ব, সহ্য়হীনদের মুখের এক চিলতে হাসি।আমরা কি তা পেরেছি? না পারে নি, কারণ আমরা যেমন ইসলামকে পরিপূর্ণভাবে ধারন করতে পারে নি, ঠিক তেমনিভাবে পারে নি আমাদের জাতীয় কবির অমর সৃষ্টি সকল গান ও কবিতার যথাযথ চর্চা বা মূল্যায়ন করতে। এমন কি কবি ও তার সৃষ্টিকে তুলে ধরতে পারে নি বা ধরিনি যেভাবে তুলে ধরা দরকার ছিল। এটা আমাদের দৈন্যতা না ব্যর্থতা সেটা মূল্যায়ন হওয়াও বাঞ্চনীয়। তবে শেষ কথা, যে কোন সমসাময়িক পরিস্থিতি মোকাবিলায় নজরুলই একমাত্র কবি, যার প্রতিটি সৃষ্টিই উদ্ভুত সমসাময়িক যে কোন সমস্যা সমাধানের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে যদি সত্যিকার অর্থেই নজরুলকে আমরা বুঝি এবং তার সাহিত্যকর্মকে লালন করি।
লেখক
সহযোগী অধ্যাপক
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
দুমকি, পটুয়াখালী।
You must be logged in to post a comment.