দেখা থেকে লেখা

অন্যদৃষ্টি অনলাইন
সোমবার, ২১ জানুয়ারী, ২০১৯, ৭:২০ অপরাহ্ন

আমি কবি, সাহিত্যিক, লেখক, গল্পাকার, প্রাবন্ধিক, কলামিষ্ট, ঐতিহাসিক কিছুই নই। খ্যাতি অর্জন করা কিংবা বিখ্যাত হওয়ার কোন গোপন ইচ্ছাও আমার নাই।  মানুষ মাত্রই নাম এবং সুনামের নীড় তৈরী করে তার  মাঝে বসবাস করতে চায়। মানুষের  এই আকাঙ্খা অন্যায় নয়। মানুষ হিসাবে আমিও এই আকাঙ্খা পোষণ করি। ব্যাক্তি হিসাবে আমার সেই ধরনের আকাঙ্খা মনের অজান্তেই তৈরী হয়েছে। আমি পেশাজীবি হিসাবে কর্মজীবন শুরু করি। আমার কর্মক্ষেত্রে ন্যায়-অন্যায়ের মাপকাঠি নির্ধারনের মানদন্ড দন্ডায়মান থাকায় সমাজ সংসারের অপরাধী ও নিরাপরাধ মানুষের সমাগম হয়ে থাকে। অসহায় মানুষের আর্তনাদ, নিষ্ঠুর মানুষের ক্ষমতার দাপট,নির্যাতিত নারীর কণ্ঠরুদ্ধ চিৎকারের প্রতিধ্বনী, খুন, হত্যা, সন্তান হারানো মায়ের কান্নার রোল,নিরাপধার মানুষের আকুতির সমাজ দর্পন আদালত পাড়া। চিন্তাশীল উপলব্দি প্রবন অনুভূতি নিয়ে আমি নিজের মত সমস্যসংকুল ঘটনাবলি হৃদয় দিয়ে অনুভব করি।

হাসপালের  কর্মচারীগন অসুস্থ মানুষের অসহায়ত্বকে এবং মানুষের মৃত্যুকে যেমনি ভাবে আমলে নিতে চায় না তেমনি ভাবে কোর্ট আঙ্গিনায় সংশ্লিষ্ট মানুষেগুলো মানুষের জেল জুলুম নিপিড়ন ও নির্মমতাকে আমলে নিতে চায় না। এই পেশার শুরুতে আমার কোন ক্লাইন্ট জেল হাজতে কিংবা কোন ফরিয়াদী ক্লাইন্ট ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হলে আমি ব্যাক্তিগত ভাবে মর্মাহত হয়েছি অনেক সময় আবেগে আপ্লুত হয়েছি। বাবা বলতেন অন্যের অনুভূতির সাথে নিজকে সম্পৃক্ত করতে পারা নাকি মহানুভবতার লক্ষন। ক্রমান্বয়ে আমিও পরিবেশের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ি। মানুষের পারিবারীক বিরোধ,দাম্পত্য বিরোধ,সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধ,আইন অমান্যের প্রবনতা,ভয়ঙ্কর অপরাধীদের দাপট,সমাজ বিরোধী রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, পরজয় ও শাস্তির ঘটনাবহুল এক একটি ঘটনা যেন রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্পের মত উদ্দীপক। প্রতিটি গল্পই আমার সন্মুখের দৃশ্যমান জীবনের গল্প। জীবনের গল্প শুনার চাইতে নিজ চোখে দেখা গল্প বেশী হৃদয়স্পর্শী।

ছাত্রজীবনে অসম্পূর্ণতার মাঝেই আমার লেখাপড়া চলমান ছিলো। কিভাবে ভালোছাত্র হওয়া যায় এবং ভালোছাত্র হলে ভবিষ্যতে কি হয় এমন কিছুই জানা ছিলো না। ভালো ছাত্রের শ্রেনীভূক্ত না হলেও রনজিৎ বি এস সি স্যার বাবার খাতিরে বলতেন আমার ভিতরে নাকি ভালো কিছু একটা আছে।আমি বুঝতে পারতাম স্যার বাবাকে নিরাশ হওয়া থেকে রক্ষার জন্য একথা বলতেন। আমি অনেক চেষ্টা করে একা একা আমার ভীতরে কি সত্ত্বা আছে তাহা জাগ্রত করার চেষ্টা করে লজ্জিত হয়েছি। দু’লাইন কবিতা গল্প লিখে কাগজ ছিঁড়ে দুরে নিক্ষেপ করেছি। কোন দিন আমার ভালো কিছুর সাথে আমার পরিচয় হয়নি।একদিন ক্লাশের ছাত্রকে বেত্রঘাত করায় দীঘলদী গ্রামের ছাত্রের বাবা স্বদলবলে বিজয় মহাজন স্যারকে মারতে আসে আমি একা বুকপেতে সামনে দাঁড়িয়েছি। শিক্ষক তাঁর ছাত্রকে সন্তানের মত আদর করবে আবার শাসন করবে এটাই স্বাভাবিক।আমি স্কুলের পাশের জোতদার পরিবারারের সন্তান হওয়ায় সব চুপসে যায়। স্যারেরা মূলত এসবের কারনেই আমি পরীক্ষায় নাম্বার কম পেলেও আমাকে টেনে নিতেন।

অকারনে প্রশ্ন করার প্রবনতা আমার বেশী ছিলো। কেন? কে? কিজন্য? এইসব প্রশ্নগুলো থেকে আমি সত্যগ্রহ এক আলোর উত্তাপ অনুভব শুরু করি। আমার চেতনায় সন্নিবেশিত হতে থাকে এক সিঁড়ি থাকে অন্য সিঁড়ি। বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র হওয়ায় প্রকৃতির অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য্য অনুসন্ধানের যাত্রাপথের একজন যাত্রী হিসাবে সংযুক্ত হই। মানুষের বেঁছে থাকার জন্য পাঁছটি মৌলিক উপাদান ছাড়াও আরো একটি শক্তিশালী আত্বিক উপাদানের প্রয়োজন। আত্ত্বার জন্যও একটি খাদক প্রয়োজন আর সেই খাদ্য হলো জ্ঞান ও বিশ্বাসের আত্ত্বিকরন। মানুষের সংক্ষিপ্ত জীবনের জন্য আত্ত্বার প্রশান্তুি খুবই প্রয়োজন। অতিমানবীক মানুষেরা এই অন্বেষণকে মৌলিক প্রয়োজনীয় উপাদানের মতই গুরুত্ব দিয়েছেন। সত্যানুসন্ধানে বাতিঘর কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত নয় তাহা আমি অনেক পরে জীবন থেকে জানতে পেরেছি।

বিতর্কপ্রতিযোগিতা থেকে মুখের জড়তা কাটতে শুরু করে। রাজনৈতিক প্লাটফর্ম থেকে কথার সাথে যুক্তি সংযোযিত করার কৌশল রপ্ত করতে থাকি। বই পড়া থেকেই মূলত কথা বলার বাচনভঙ্গীর সাথে ফিলসফি যোগ করে মানুষের দৃষ্টিকে আকর্ষন করতে শিখি। ছাত্রজীবনে বাবা স্টুপিডের সঙ্ঘা শিখিশেছেন “অল্প শুনা (half hearing) চার ভাগের এক ভাগ বুঝা (quarter understanding) অধিক বলা (double telling) আমাকে বুঝার জন্যই এভাবে সঙ্গায়ীত করা হয়েছিলো। বিষয়টি শারীরীক ভাবে আঘাত জনিত না হওয়ায় আমি আমলে নিতে চাইতাম না। মানুষের মতাদর্শের ভিন্নতা বিস্মিত হওয়ার মত।ধর্ম,অধর্ম,বিধর্ম,রাজনীতি জীবন দর্শন, বিশ্বাসের বৈচত্রতা মানব জীবনকে নান্দনিক করে তুলেছেন। মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশে জ্ঞান ও বিজ্ঞানের অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা এবং মানবীক মূল্যবোধ মানুষের জীবনকে সহজলভ্য করে তুলেছেন।

আমার লেখা পড়ে কোন একজন মানুষের উপকার হওয়ার কথা নয় একথা আমি নিশ্চিত ভাবে বলতে পারি। কিন্তুু আমি নিজকে প্রকাশ করে ভারমুক্ত হওয়ার প্রশান্তুি লাভ করে থাকি। এই নিপিড়নের জন্য আমি অহত মানুষের কাছে চির দিন ঋনী থাকবো। হৃদয় ভাঙ্গা  একটি আবেগ থেকেই  আমার হাতের চেয়েও বুকের জোরে লেখার মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করা শুরু করি। দুই হাজার তের সালের এপ্রিল মাসের নয় তারিখে বাবার মৃত্যু আমাকে দারুন ভাবে আহত করে।আমার আর্থিক দৈন্যতা  ও লজিষ্টিক সাফোর্ট না থাকায় বাবার মাথার টিউমার মেট্রোপলিটন হাসপাতালে ডা: রশিদ উদ্দিন এর মাধ্যমে অপারেশন হলেও যা পরে সফল হয়নি। নেতা বা ধনী হলে ব্যাঙ্কক কিংবা সিঙ্গাপুরে এই অপারেশন করাতে  পারতাম । আমার বুকের আঘাতটা  হয়ত অনেকটা কম লাগতো। অনেক চেষ্টা করেও বাবাকে পি জি হাসপাতালে ভর্তি করাতে ব্যার্থ হই। আমি বড় নেতা কিংবা কোন গুরুত্বপুর্ন ব্যাক্তি না হওয়ায়  দায়ীত্ববান ব্যাক্তিগন আমাকে সহানুভূতি করার জন্য  আন্তরিক ছিল না। একটি রাজনৈতিক দলের কর্মী হিসাবে দল ও রাষ্ট্রের  কাছে আর আমার ন্যায্যতা  চাওয়ার থাকলেও তাহা থেকে বঞ্চিত হই। আর কোন প্রাপ্তি আমার বুকের ভীতরের এই অসম্পুর্নতাকে পূর্নতা  দিতে পারবে না।

বাবার মৃত্যুর পরে আমার হৃদয় গাঁথা স্মৃতি আমাকে ব্যাকুল করে তোলে।চাঁদপুর সরকারী  কলেজে পড়াকালীন সময়ে বাবা আমাকে নিয়মিত ছিঠি লিখতেন তাও ইংরেজীতে। ডিকশেনারী ছাড়া আমার পড়তে অনেক কষ্ট হতো। অনেক কষ্টে মাকে রাজী করালাম বাবা যেন বাংলায় ছিঠি লেখেন।কারন ইংরেজীতে আমি বাবার  গায়ের গন্ধ খুজে পাই না। মা বললেন ছিঠিতে গন্ধ থাকে নাকি?। বাবা শুনে অনেক্ষন চিন্তা করে মাকে বললেন তোমার ছেলে ধনী কিংবা প্রতিষ্ঠিত না হতে পারলেও মানুষ হবে। আমি  জানি না বাবার কল্পনায় দেখা সেই মানুষের বৈশিষ্ট আমি অর্জন করতে পেরেছি কিনা? বাবার দোয়াই আমার চলার পাথেয় হয়ে থাকবে। বাবার  মৃত্যুর পরে আমি বাবার হাতের ইংরেজীতে লেখা পুরাতন ছিঠিগুলো খুজতে থাকি। ফাইলের কোথাও এমন একটা ছিঠি খুজে পেলাম না। লক্ষীপুর চেম্বারের  ড্রয়ারে একটি বাংলায় লেখা ছিঠি পেয়ে আমি  খুব ইমোশনাল হয়ে যাই। সমগ্র জীবনের স্মৃতিপটে থাকা কোন দৃশ্যমান স্মৃতি না থাকায় আমি কষ্ট অনুভব করি। তখনই  আমার চিন্তায় একটি দিক উন্মোচিত হয়। প্রিয় ও ভালো লাগা আপন মানুষদের জন্য স্মৃতি বিজড়ীত পদ চিহ্ন রেখে যাওয়া উচিত। তার পরিসর যাহাই  হউক না কেন। সেই বিবেচনা থেকেই আমার  নিজ ধারনা এবং উপলব্দির অভিজ্ঞতার দু’চার কলম লিখে প্রজন্মের সাথে সম্পৃক্ত হওয়া এবং আমার সন্তানদেন কাছে পদচিহ্ন  রাখার বাসনা থেকেই আমার অভিজ্ঞতার বিষয়বস্তুু লেখার মাধ্যমে শেয়ার করা শুরু করি। আমার সন্তান ও পরবর্তি প্রজন্ম যেন তাদের পূর্বপুরুষ সম্পর্কে ধারনা নিতে পারে।

আমার লেখা কিছু বন্ধু পড়ে, আবার কেউ দেখে। কেউ পছন্দ করে কেউ করে না। যারা  আমাকে এবং আমার লেখাকে পছন্দ করেন  না তারা আমার শত্রু  নয়, তারাও আমার জীবনের অভিজ্ঞতার অংশ। অল্প বিদ্ব্যান হওয়ায়  আমার লেখালেখির কোন বৈশিষ্ট  নাই। এটা আমার জ্ঞান বিতরনের  লেখা  নয় শুধু অনুভুতি প্রকাশ মাত্র।আমার স্বচ্ছতা হলো এই , আমি  যা বিশ্বাস করি  তাই লেখি। অনেক চেষ্টা করি  কোন লেখা যেন আত্মজীবনী মুলক না হয়,  কিন্তু  হয় না। কেননা  আমার দেখা এবং আমার উপলব্দি,  জীবনের সাথে সম্পর্কিত  ঘটনা ব্যাতিত আর কোন কাল্পনিক জ্ঞানশক্তি  আমার নেই।  যেমন ছোট পুকুরে বড় মাছ থাকে না  আমারও তাই। এজন্য আমার লেখায় আমিত্ব ভাব বেশী থাকে। আমি তাদেরকেই   আমার সন্মুখে ভাবি যারা  প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের এই তথ্য প্রযুক্তির আওতাভূক্ত এবং সামান্য হলেও আমার লেখা পড়বে। বোধ ও বোধগম্য জীবন ধারা নিজ চোখের সামনে উদ্ভাসিত হলে নিজের মত জীবনকে ভাবতে পরবে।

যে কোন একটি ধারনাই মানুষের জীবনকে পাল্টে দিতে পারে। কোন কিছু লেখা আমার পেশা নয়। আইন পেশাই আমার জীবনের ব্রত। এক জন ডাক্তার  যেভাবে মানুষের শরীরের সকল সমস্যা ও সমাধান সম্পর্কে অবগত তেমনি আমিও  এই মহান  আইন পেশায়  সংযুক্ত হয়ে সমাজের সকল শ্রেনী পেশার মানুষের ভালো ও খারাপ দিক অবগত  হওয়ার  সুযোগ হয়েছে। সকলের সাথে আমার অনুভূতি শেয়ার করাই আমার অভিপ্রায়।আমি কোন লেখকও নই  কলামিষ্টও নই। সাহিত্যিকও নই। আমি কোর্টে আইনি যুক্তিতর্ক দিয়ে সত্য ও প্রাসঙ্গীগ বিষয়ে কথা বলা ও দেখার অভিজ্ঞতাকে লেখার মাধ্যমে  প্রকাশ করার চেষ্টা করছি মাত্র।

 

লেখক

এড মিজানুর রহমান

এম, এস – সি, এল, এল, বি

জজ কোর্ট, লক্ষ্মীপুর।

Facebook Comments
সংবাদটি শেয়ার করুন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

আরো সংবাদ