১৯৯০ ইংরেজিতে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট আইন ১৯৯০ সালের ২৮ নং আইন। ১৯৯৯ সালে সেই আইনের অনুবলে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট প্রবিধানমালা প্রণয়ন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।২০০২ সালে ২৬ নং আইন দ্বারা উক্ত প্রবিধানমালা তে সংশোধনী আনা হয়।
(ক)- ১৯৯০ সালের প্রণীত আইনের ১০(১) উপধারা মতে; বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোন শিক্ষক বা কর্মচারী ইচ্ছা হইবে, যথা ট্রাস্টের তহবিলে চাঁদা প্রদান করিতে পারিবে; এইরূপ চাঁদা চাঁদা প্রদানকারীর বেতন-ভাতার উৎস হইতে প্রবিধান দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে ও পরিমানে কর্তন করিতে হইবে।
উক্ত আইনের অনুবলে ১৯৯৯ সনে প্রণীত প্রবিধানমালার ৬(২) অনুচ্ছেদে শিক্ষকদের কাছ থেকে প্রতিমাসে ২% হারে এবং৬ (৩) অনুচ্ছেদে ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে বাৎসরিক ৫ টাকা হারে চাঁদা নির্ধারণ করা হয়।
অন্যদিকে ১৯৯০ সালের ২৮ নং আইন অনুসারে ১০(২) উপধারা মতে কোন শিক্ষক ও কর্মচারী চাঁদা প্রদান না করিলে তিনি বা তার পরিবারের কেউ এই আইনের অধীনে সুবিধা পাওয়ার অধিকারী হবেনা বলে স্পষ্ট বিধি প্রণয়ন করা হয়।
উক্ত আইন ও প্রবিধানমালা অনুযায়ী কোন শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টে চাঁদা দিতে বাধ্য নয়। চাঁদা প্রদান করলে সুবিধা পাওয়ার অধিকারী হবেন অন্যথায় হবেন না। এই আইনের উপর ভিত্তি করে শিক্ষক ও কর্মচারী ২% চাঁদা প্রদান করে চাকরি শেষে ২৫ মাস মূল বেতনের সম-পরিমাণ সুবিধা পেয়ে আসছেন।
সুতরাং কোন শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট চাঁদা দিতে অনিচ্ছুক হলে তার কাছ থেকে চাঁদা আদায় করতে পারবেনা। কল্যাণ ট্রাস্ট প্রবিধানমালা জারির পর থেকে শিক্ষক ও কর্মচারীদের মাসিক বেতন থেকে ২% করে কেটে রেখে দেয় সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর। যেটি একটি রেওয়াজে পরিণত হয়েছে।যার মাধ্যমে শিক্ষক ও কর্মচারী চাঁদা দিতে ইচ্ছুক বলে প্রতীয়মান হয়।
(খ)-ইতিপূর্বে কল্যাণ ট্রাস্টে অতিরিক্ত ২% চাঁদার প্রজ্ঞাপন জারি করলে শিক্ষক ও কর্মচারীর তীব্র প্রতিবাদের মুখে অতিরিক্ত কর্তন স্থগিত রাখে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ডিসেম্বর ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে অতিরিক্ত চাঁদা প্রজ্ঞাপন নিয়ে আবারো প্রজ্ঞাপন জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষকদের অসন্তোষ দেখে ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮ সালে শিক্ষা সচিব জনাব সোহরাব হোসেন অতিরিক্ত চাঁদা কর্তন হচ্ছে না বলে ঘোষণা দেন। অতিরিক্ত চাঁদার প্রজ্ঞাপন টি ভুলক্রমে হয়েছে বলে তিনি মিডিয়ার মাধ্যমে ক্ষুদ্ধ শিক্ষকদের জানিয়ে দেন।
৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় নিয়ে আওয়ামী লীগ টানা তৃতীয়বারের সরকার গঠন করেন। ৪র্থ বারের মত প্রধানমন্ত্রীর শপথ গ্রহন করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একাদশ নির্বাচনে কৃতিত্ব ও দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করায় শিক্ষকদের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
অথচ কয়েকদিন পর জানুয়ারি ২০১৯ সালে অতি উৎসাহী কারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে অতিরিক্ত ৪% চাঁদা কর্তন করার প্রজ্ঞাপন জারি করে। কোন শিক্ষা বোর্ডের অতিরিক্ত কর্তন নিয়ে পরিপত্র জারি করার কোন নৈতিক অধিকার থাকেনা। শিক্ষা বোর্ড কোন শিক্ষক ও কর্মচারী বেতন ভাতা প্রদান করেনা। তাই তারা কর্তন করার কতৃপক্ষ নেয়।বেতন দেওয়ার দায়িত্ব অধিদপ্তরের কাজ শিক্ষা বোর্ডের নয়। ফলে জানুয়ারি/১৯ থেকে কারিগরি শিক্ষকদের বেতন থেকে বেআইনি চাঁদা কর্তন শুরু হয়।
১৫ এপ্রিল ২০১৯ তারিখে মাধ্যমিক ও উচ্চ বিভাগ উপসচিব কামরুল হাসান স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এপ্রিলের বেতন থেকে অতিরিক্ত ৪% কর্তন করে অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টে জমা দানের নির্দেশ প্রদান করে। প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার পরই বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী ফোরাম ও বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি প্রজ্ঞাপন বাতিলের দাবি জানিয়ে মানববন্ধন ও প্রেসক্লাবে অবস্থান কর্মসূচি পালন এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সহ বিভিন্ন দফতরে স্মারকলিপি পেশ করে।
শিক্ষকদের দাবির প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে এক রকম ধৃষ্টতা দেখিয়ে মাউশি ও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর ১০% অতিরিক্ত চাঁদা কর্তন করে এপ্রিলের বেতন ছাড় করে। অথচ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা সচিব জনাব সোহরাব হোসেন অতিরিক্ত চাঁদা আদায় করা হবেনা বলে কথা দিয়েছেছিলেন। তথাপি চাঁদা কর্তন নিয়ে সচিব মহোদয়ের দ্বৈত ভুমিকা প্রশ্নবিদ্ধ!
কল্যাণ ট্রাস্ট প্রবিধানমালা অনুযায়ী কাউকে চাঁদা দিতে বাধ্য করা যায় না। ২% কর্তন করে যেখানে শিক্ষকরা ২৫ মাস মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ পায়।সেখানে অতিরিক্ত ২% কর্তনে ৫০ মাসের বেতনের সমপরিমাণ সুবিধা হওয়া বাঞ্ছনীয়। সেখানে অর্থ সংকটের ধোঁয়া তুলে কল্যাণ ট্রাস্ট আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অতিরিক্ত চাঁদা আদায়ে জোর-জবরদস্তি অন্যায় ও অনৈতিক।
যেখানে শিক্ষকরা চাকুরি শেষে কল্যাণের টাকা যথাসময়ে পায়না। এই কল্যাণের টাকার জন্য অপেক্ষা করতে করতে অনেকের জীবন প্রদীপ নিভিয়ে যায়।তবে কল্যাণ ট্রাস্টের সদস্য সচিব শাহজাহান আলম সাজু চেক বিতরণের নামে দেশব্যাপী প্রমোদ ভ্রমণ করে অর্থের অপচয় করে যাচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত ডিআইএর প্রতিবেদনে বিভিন্ন সময়ে কল্যাণ ট্রাস্টের শতকোটি টাকা লুটপাটের চিত্র প্রকাশ আরো অস্থির করে তুলেছে শিক্ষকদের।
বলাবাহুল্য যে, কল্যাণ ট্রাস্ট আইনে অর্থ সংকট মেটানোর জন্য বিকল্প অর্থ সরবরাহ করার বিধান রয়েছে। তন্মধ্যে সরকারি অনুদান,ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে বার্ষিক ৫ টাকা হারে চাঁদা অথবা অন্য কোন উৎসের কথা বলা হয়েছে। অন্য কোন উৎস হিসেবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের টাকা সরকারি কোষাগারে জমা রেখে অর্থ সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। যা ফরাস উদ্দিন কমিশনের সুপারিশে ছিল।
প্রতিষ্ঠানের আয় সরকারি কোষাগারে জমা রাখা হলে শিক্ষকদের ৪৫%বাড়ি ভাড়া, পূর্ণ ঈদ বোনাস, স্থানী পেনশন সহ যাবতীয় সুবিধা দেওয়া সম্ভব হত। এর ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ হয়ে যেত। শিক্ষক ও শিক্ষার মান উন্নয়নে অনন্য ভুমিকা পালন করত। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় ট্রাস্ট আইনের বিধান লঙ্ঘন ও ড: ফরাস উদ্দিন কমিশনের সুপারিশকে ডিপ ফ্রিজে রেখে শিক্ষকদের বেতনের টাকা কর্তন করার কালো আইন জারি করল। যা সাংবিধানিক আইনের সাথে সাংঘর্ষিক।
(গ)-উক্ত আইনের ৭ ধারায় ট্রাস্টের কার্যাবলির আলোচনা কয়েকটি উপধারায় উল্লেখ আছে। তার একটি বাতিল হলেও ১৯৯৯ সনে সংশোধনী এনে প্রবিধানমালার ৮ অনুচ্ছেদে মোট ৮ টি উপ-অনুচ্ছেদ সংযোজন করা হয়।
উক্ত অনুচ্ছেদের ৭ নং উপ-অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে যে, কোন শিক্ষক বা কর্মচারী চাকুরিকালিন দুর্ঘটনায় গুরুতরভাবে আহত হইলে অথবা কোন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হইলে তাহার চিকিত্সার জন্য তাহার অনধিক দুই মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ তাহাকে প্রদান করা হইবে।
কল্যাণ ট্রাস্টের সাথে জড়িত কর্মকর্তাদের পরিচিত ছাড়া অন্য কোন অসুস্থ শিক্ষক ও কর্মচারী চাকুরি জীবনে এই খাতের সুবিধা পেয়েছে এমন নজির একেবারে নগণ্য। ফলে অসহায় শিক্ষক সমাজ এই সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হয়।
মূল কথা হল, শিক্ষকদের উপর অন্যায় চাপ সৃষ্টি না করে ট্রাস্ট আইনের বিধান অনুসরণ করে বিকল্প অর্থের উৎস থেকে সংকট মোকাবিলা করা হবেই বিচক্ষণতা। সেক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের আয় সরকারি কোষাগারে জমা রাখার সুপারিশ বাস্তবায়ন করলে সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় সে আইনী পথে না হেটে শিক্ষকদের মূল বেতন কেটে ৯০% এ অবনমিত করে।
শিক্ষক সমাজ সরকারের সব দপ্তরে ঘুরাঘুরি করেও কোন আলোর আশা না দেখে অবশেষে আদালতের শরণাপন্ন হতে বাধ্য হল। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে বিষয়টি দ্রুত সমাধানের পথে হাঁটলে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি ও সরকারের ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বল হবে। গুণগত উন্নত শিক্ষা নিশ্চিতে অগ্রণী ভুমিকা পালন করবে।
লেখক
আবদুল মান্নান, বিএ (সম্মান), এলএলবি
You must be logged in to post a comment.