জেনে নিন সমাজে নারীর অবস্থান

অন্যদৃষ্টি অনলাইন
মঙ্গলবার, ৯ জুলাই, ২০১৯, ৫:৫৮ পূর্বাহ্ন

অন্যদৃষ্টি ডেস্ক।। 
ইউরোপে আধুনিক যুগের সূচনালগ্নে যে উদারনৈতিক, মানবতাবাদী ও যুক্তিবাদী এবং গণতান্ত্রিক চিন্তাধারার উন্মেষ ঘটেছিল তার পূর্ণতা পেয়েছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর ফরাসি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে। ১৭৮৯ সালে ফরাসির বৈপ্লবিক সরকার জাতীয় সংসদে ঘোষণা করেছিল যে, ‘সকল মানুষ স্বাধীন হয়ে জন্মেছে এবং সকল মানুষের সমান অধিকার রয়েছে।’ ফরাসি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ইউরোপে নারীর অধিকার জাগ্রত হয়। ইতিহাসে কোনো পরিবর্তন সম্ভব হয় না যতক্ষণ সমাজের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব না করে, পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন না হয়। শিশু বয়স থেকে শুরু করে কিশোর, যৌবন, বিবাহ পরবর্তী জীবনে নারীকে সহ্য করতে হয় মানসিক, শারীরিক নির্যাতন। পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে নারীর নেই কোনো স্বাধীনতা। অথচ মানব সভ্যতার সূচনালগ্নে পুরুষেরা যখন মাঠে বা বনে শিকারের সন্ধানে ঘুরে বেড়াত আর নারী তখন বিভিন্ন কৃষিপণ্যের বপন করত বাড়ির আঙিনায়। তাদের হাত ধরেই মূলত আমাদের কৃষি কাজের সূচনা। আজ সেই নারী ঘরকোণে আবদ্ধ।
নারী জাগরণের পথিকৃত্ বেগম রোকেয়া নারীর কঠোর পর্দাপ্রথার পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার নিকট নারী স্বাধীনতার লক্ষ্য ছিল স্বাধীনভাবে জীবিকা অর্জন করে পুরুষের সক্ষমতা অর্জন। তাই তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতা অর্থে পুরুষের ন্যায় উন্নত অবস্থা বুঝিতে হইবে। পুরুষের সমক্ষতা লাভের জন্য আমাদিগকে যাহা করিতে হয়, তাহাই করিব। আবশ্যক হইলে আমরা লেডী কেরানী হইতে আরম্ভ করিয়া লেডী ম্যাজিস্ট্রেট, লেডী ব্যারিস্টার, লেডী জজ-সবই হইব!…উপার্জন করিব না কেন? আমাদের কি হাত না পা নাই, না বুদ্ধি নাই, কি নাই? যে পরিশ্রম আমরা ‘স্বামীর’ গৃহকার্যে ব্যয় করি, সেই পরিশ্রম দ্বারা কি আমরা স্বাধীনভাবে ব্যবসা করিতে পারিব না।’ বেগম রোকেয়ার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, মানব সমাজের সার্বিক উন্নতি ও কল্যাণ কেবল পুরুষদের দ্বারা সম্ভব নয়; পুরুষ ও নারীর যৌথ প্রচেষ্টার দ্বারাই সেটা সম্ভব হতে পারে। আজ যেসব নারী তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন। পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক প্রভৃতি ক্ষেত্রে সে তার অধিকার আদায় করে নিচ্ছে। নারী, মহাকাশ ভ্রমণে যাচ্ছে, এভারেস্ট এর সর্বোচ্চ চূড়ায় আহরণ করছে। জজ, ম্যাজিস্ট্রেট, আইনজীবী, প্রফেসর সবই হচ্ছে। সমাজ, রাষ্ট্রের সকল দিকে পুরুষের পাশাপাশি নারীর অবস্থান তৈরি করে দিলে তারাও পারবে সর্বোচ্চ স্থানটা দখল করতে।
ঊনবিংশ শতাব্দীর ইংরেজ দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল ছিলেন নারীমুক্তি আন্দোলনের বড় সমর্থক। ১৮৬৯ সালে তার রচিত ‘দি সাবজেকশন অব উইমেন’ বইটিতে তিনি নারীদেরকে নিকৃষ্ট হিসেবে গণ্য করার জন্য পুরুষদের নিন্দা করেন। তার মতে, ‘আইনগতভাবে নারীকে পুরুষের অধীনে রাখা ঘোরতর অন্যায় এবং এর ফলে মানব সমাজের অগ্রগতি চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এই প্রথার অবসান ঘটিয়ে কোনো পক্ষকে কোনো বিশেষ সুবিধা না দিয়ে এবং কোনো অধিকার থেকে বঞ্চিত না করে পুরুষ ও নারীর সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করা একান্ত আবশ্যক।’
নারীর অধিকার সম্পর্কে একথা জোর দিয়ে বলা যায় যে, যতদিন পর্যন্ত নারীরা নিজেদের মর্যাদা ও দায়িত্ব সম্পর্কে অধিকতর সচেতন না হবে, ততদিন কেবল আইনের দ্বারা তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না। বস্তুত মানবজীবন সুখী, সমৃদ্ধ এবং অর্থবহ হবে তখনই যখন নারী-পুরুষের মধ্যে সম্পর্ক দেওয়া-নেওয়া ও সমঝোতা এবং পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও মমতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে। একটা সমাজ কতখানি উন্নত তা নির্ভর করবে এই সমাজের নারীর অবস্থান কতটুকু উন্নত তার ওপর।
লেখক :শিক্ষার্থী, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।
অন্যদৃষ্টি/ এস.খাঁন
Facebook Comments
সংবাদটি শেয়ার করুন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

আরো সংবাদ