জেনারেল থেকে প্রেসিডেন্ট এরশাদ, সামরিক বাহিনী, বেসামরিক প্রশাসন ও দেশের অগ্রগতি

অন্যদৃষ্টি অনলাইন
শুক্রবার, ২৬ এপ্রিল, ২০১৯, ৮:৪৯ পূর্বাহ্ন

কর্নেল মোহাম্মদ আবদুল হক

-পিএসসি (অবঃ)।।

☆ সামরিক বাহিনীতে যখন যোগদান করি অর্থ উপার্জন করে ধনী হওয়ার কোন চিন্তাই মাথায় ছিল না । শুধু দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে সম্মান ও মর্যাদার কথা মাথায় রেখেই এ পেশায় নিয়োজিত হয়েছিলাম । কেননা, জানতাম আমাদের সময়ে মিলিটারি একাডেমীতে জেন্টলম্যান ক্যাডেটের ভাতা দেয়া হতো ১৫০ টাকা । সেনাবাহিনীতে কমিশন পাবার পর ১৯৮৩-৮৪ সালে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে বেতন ছিল ৭৫০ টাকা মাত্র । বিভিন্ন ভাতাদিসহ হাজার খানেক টাকা পেতাম মাসের শেষে । মেস বিল হতো ১২ থেকে ১৫শ টাকা যা পরিশোধের জন্য ব্যাংক হতে ওডি অথবা বাড়ি হতে মানি অর্ডার, আর তা না হলে বকেয়া রাখা ছাড়া উপায় ছিল না । তিন মাস অন্তর অন্তর মেস মিটিং-এ মেস বিলের বকেয়া তালিকায় প্রায়ই অর্ধেক অফিসারের নাম নথিভুক্ত হয়ে যেতো, যা উর্ধ্বতন অফিসে প্রেরণ করার বিধান ছিল । আর ধূমপায়ী অফিসারগণের তো ছিল নিতান্তই করুণ অবস্থা । শুধু মেস বিলই নয়, পায়ের বুট হতে শুরু করে মাথার ক্যাপ পর্যন্ত প্রতিটি সামরিক গ্যাজেটস অফিসারগণকে কিনে পরিধান করতে হতো । অধিনায়ক থেকে শুরু করে সকলের যাতায়াতের জন্য পদযুগল ও বাই সাইকেলই ছিল ভরসা । তবে ওডি-র জন্য ব্যাংক ম্যানেজারগণের সহৃদয় সহযোগিতার কারণেই আমরা সে যাত্রায় পার পেয়ে যাই । আর্থিক কষ্ট কিছুটা লাঘব হয় ১৯৮৬ সালে জেনারেল এরশাদ কর্তৃক নতুন পে-স্কেলে বেতন বাড়ানোর মধ্যে দিয়ে । এ পে-স্কেলে সামরিক-বেসামরিক সকলেই লাভবান হয়েছিলেন ।

☆ রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারের নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে ২৪ মার্চ ১৯৮২ সালে সেনাপ্রধান লেঃ জেনারেল হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। আমরা তখন বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে জেন্টলম্যান ক্যাডেট। ১৯৮৩ সালের ২২শে ডিসেম্বর আমাদের ৯ম বিএমএ লং কোর্স-এর পাসিং আউট প্যারেডের প্রধান অতিথি হিসেবে আগমন করেন তিনি। আমরা তাঁকে কাছে থেকে দেখে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়ি । আমাদের সেনাপ্রধান ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক কত সুন্দর দীর্ঘদেহী, ফর্সা, স্মার্ট, হ্যান্ডসাম জেনারেল ! আমরা তো অতশত রাজনীতি বুঝি না । কমিশন অফিসার হয়েই মার্শাল ‘ল’ ডিউটি করতে যাবো । তাই টানটান উত্তেজনা ও আনন্দ বিগলিত শিহরণ সবার মধ্যে।

☆ কমিশন পাওয়ার পর মোমেনশাহী সেনানিবাসে আমার বদলী হয় । ইউনিট ছিল ৪২ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং আমাদের অধিনায়ক লেঃ কর্ণেল খালেকুজ্জামান (মরহুম) ছিলেন নেত্রকোনা জেলার সামরিক আইন প্রশাসক। ১৯৮৪ সালের শেষ দিকে আমি তাঁর ষ্টাফ অফিসার হিসেবে নেত্রকোনা সার্কিট হাউজে অবস্থান করি । একদিন আমাকে অধিনায়ক নির্দেশ দিলেন যে, পরের দিন ভোরে দুর্গাপুর উপজেলার বিরিশিরিতে নবনির্মিত সাংস্কৃতিক কেন্দ্র উদ্বোধন করার জন্য জেনারেল এরশাদ আগমন করবেন। আমি যেন ভোরে সেখানে হাজির হই। জেলা প্রশাসনই সকল কিছু আয়োজন করবে । আমি সকাল সকাল সেখানে হাজির হই । হেলিকপ্টারে করে প্রেসিডেন্ট এরশাদ আগমন করলেন । ডিসি সাহেবের পাশে আমিও দাঁড়িয়ে ছিলাম । তিনি যখন কাছে আসলেন অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে বিগলিত হয়ে স্যালুট দিয়ে নিজের পরিচয় দিলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “How are you ?” আমি উত্তর দিলাম, “Fine, thank you Sir.” একজন সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট দেশের প্রেসিডেন্টকে এত কাছে পেয়ে যে আনন্দ পেয়েছিলাম, তা কখনো ভুলে যাবার নয়।

☆☆ একটি মাত্র সিদ্ধান্ত, বদলে যায় দেশ ও মানুষের ভাগ্য :
☆ ১৯৮৮ সালের পূর্বে স্বপ্নেও ভাবিনি যে, সেনাবাহিনী থেকে বিদেশ বিভুঁয়ে কখনো যাওয়া যাবে এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা ‘ডলারের’ মাধ্যমে সৈনিকদেরও বেতন দেয়া হবে! সে অদেখা ও অভাবনীয় স্বপ্নেরই বীজ বপন করা হয় ১৯৮৮ সালে তৎকালীন মহামান্য রাষ্ট্রপতি জেনারেল হোসাইন মুহাম্মদ এরশাদের একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। অনেকের নেতিবাচক মতামতকে অগ্রাহ্য করে তিনি প্রথম উপসাগরীয় (ইরাক-ইরান) যুদ্ধের ক্রান্তিকালে জাতিসংঘের সামরিক পর্যবক্ষেক গ্রুপে (United Nations Iran-Iraq Military Observer Group (UNIIMOG) বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণের জন্য অনুমতি দেন । যা তাঁর গভীর দেশপ্রেম ও দূরদর্শিতারই পরিচয় বহন করে । যার ফলে বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফজলে এলাহি আকবরের নেতৃত্বে পনেরো জন চৌকস অফিসারকে UNIIMOG-এ প্রেরণ করার মাধ্যমে জাতিসংঘ শান্তি মিশনে সামরিক বাহিনী প্রেরণের শুভ সূচনা হয়েছিল । এর পরের ইতিহাস সবার জানা ।

☆ এ ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া খুব সহজ কাজ ছিল না । আমরা তখন জুনিয়র অফিসার ছিলাম । শুনেছি স্বয়ং সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এম আতিকুর রহমান থেকে শুরু করে অনেক নীতি নির্ধারকগণও জাতিসংঘ বাহিনীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অংশ গ্রহণের বিরোধিতা করেছিলেন । তবে তখনকার প্রেক্ষাপটে তাঁদের বিরোধিতারও যৌক্তিক কারণ ছিল । যেমন- স্বল্প সংখ্যক অফিসার ধনীক শ্রেণীতে পরিণত হবে, বৈষম্য বাড়বে, পেশাগত দক্ষতা কম্প্রমাইজ করা হবে, বেশি অর্থ হলে অফিসারগণের সেনাবাহিনী ছাড়ার প্রবণতা দেখা দিবে ইত্যাদি ।

☆☆ সময়ের ব্যবধানে নেতিবাচক চিন্তাসমূহ ইতিবাচক প্রমাণিত হয়েছে । ১৯৮৮ সালে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজ তাহা সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশের জন্য মহীরূহতে পরিণত হয়েছে । অফিসার ও সকল পদবীর সামরিক বাহিনী ও পুলিশ সদস্যদের জাতিসংঘ মিশনে অংশ গ্রহণের দ্বারা বিশ্ব দরবারে দেশের সুনাম-সুখ্যাতি বৃদ্ধি পাবার পাশাপাশি সকলের আর্থিক স্বচ্ছলতাও অনেক গুনে বেড়েছে । জাতীয় অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে বিশাল অঙ্কের রেমিটেনস। তাছাড়া আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বহু দেশের সামরিক বাহিনীর সাথে কাজ করে সামরিক বাহিনীর দক্ষতা ও পেশাগত মানও অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে । সুতরাং কালজয়ী সে সিদ্ধান্তের জন্য প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে দেশের সশস্ত্রবাহিনী ও বাংলাদেশ পুলিশ চিরদিন কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে ।

☆☆ সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়ে সশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিকায়ন ও শক্তিশালী করার সাথে সাথে এর শৃংখলাকে অটুট রাখার প্রতি মনোযোগী হন । তাঁর সময়ে অফিসারগণের বৈদেশিক প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি পায় । তিনি সশস্ত্রবাহিনীর সুযোগ সুবিধাও বৃদ্ধি করেন এবং বাস্তব সমস্যাসমূহ দূরীভূত করার চেষ্টা করেন । একই সাথে বহুবিধ সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করে বেসামরিক প্রশাসনকেও তিনি ঢেলে সাজানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। তাঁর সময়ে মেধা ও যোগ্যতার মাপকাঠিতেই পদোন্নতি ও পদায়ন করা হতো ।

☆☆☆ এদেশে অসংখ্য ভালো কাজের সাথে জেনারেল এরশাদের নাম জড়িত । যেমন উপজেলা প্রথা, বিচারকে জনসাধারণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া, শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো, সেতু, কালভার্ট, সড়ক নির্মাণ, রেল, আকাশ পথে যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন ইত্যাদি যুগোপযোগী পদক্ষেপ তিনি নিয়েছিলেন । তাঁর সময়ে জাতীয় ঐক্য ও সংহতি বজায় ছিল। দেশের জনগণের মধ্যে কোনো বিভক্তি ছিল না । ছিল না তেমন হিংসা বিদ্বেষ, হানাহানি, মারামারি, কাটাকাটি । প্রশাসন ছিল রাজনীতির উর্ধ্বে । সরকারি চাকরিতে নিয়োগে রাজনীতিক বিবেচনা ছিল না ।

☆ পররাষ্ট্র নীতি ও বহির্বিশ্বের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সফল । মুসলিম বিশ্বের সাথে তো বটেই, প্রাচ্য, পশ্চিমা বিশ্ব, পাকিস্তান ও ভারতের সাথেও যুগপৎ অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ সুসম্পর্ক বজায় রাখার প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে গেছেন । যার ফলশ্রুতিতে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি আমাদের যে কোনো বিপদে- আপদে সকলে পাশে এসে দাঁড়াতো । ১৯৮৮ সালের শতাব্দীর ভয়াবহ বন্যার সময় ব্যাপক বৈদেশিক সাহায্য সহযোগিতার মাধ্যমে দেশের অগণিত দুর্যোগ কবলিত মানুষ প্রাণে রক্ষা পান । তাঁর আরেকটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত ছিল, দেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর প্রাণের আকুতি অনুযায়ী পবিত্র ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া।

☆ তাঁর সময়ে দেশের উন্নয়নমূলক কার্যক্রম ব্যাপক পরিসর লাভ করে । এখনকার মতো সে সময়ে বাজেট প্রণয়নও এতো সহজ ছিল না । এখন তো শুধু মোবাইল কোম্পানি ও এর তের কোটি গ্রাহকের মাধ্যমেই সরকারের দৈনিক আয় হয় শত কোটি টাকা । তাছাড়া হাজার হাজার কোটি টাকার ভ্যাট, ট্যাক্সের পাশাপাশি সরকারি আয়ে আরো লক্ষ কোটি টাকার ছড়াছড়ি । অথচ, সে আর্থিক দৈনতার মধ্যেও বিশাল যমুনা নদীর উপরে সর্ববৃহত্ সেতু নির্মাণের মাধ্যমে তিনি নদী বিভক্ত দেশকে সংযুক্ত করে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল করেছেন ।

☆☆☆ পৃথিবীর কোন মানুষই দোষ-ত্রুটির উর্ধ্বে নয়, ভালো-মন্দ নিয়েই মানুষ । জেনারেল এরশাদেরও অসংখ্য ভালো গুণাবলীর পাশাপাশি অনেক দোষ-ত্রুটি ছিল ও আছে । কিন্তু তিনি এদেশ ও দেশের মানুষকে যে খুব ভালবাসেন এতে কোন সন্দেহ নেই । তাঁর নয় বছরের শাসনামলে দেশ অন্ততঃ বিভক্ত ছিল না । দেশের আনাচে কানাচে তিনি ঘুরে বেড়াতেন, দুখী মানুষের পাশে দাঁড়াতেন । তাঁর কৃতিগাঁথার ইতিহাস অস্বীকার করারও কিছু নেই । নব্বই বছর বয়সে তিনি আজ রোগ-শোকে ভারাক্রান্ত ও মুহ্যমান । তিনি এখন জীবন সায়াহ্নে, খুবই অসুস্থ । গত ২৫শে মার্চ হতে সামরিক হাসপাতালে ভর্তি আছেন । দোয়া করি, মহান আল্লাহ্ সুবাহানু ওয়াতায়ালা যেন তাঁকে সুস্থতা ও নেক হায়াত দান করেন ।

☆☆☆ পুনশ্চঃ এটা একেবারেই আমার ব্যক্তিগত অভিমত । দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়েই এ লিখা । ভুল-ভ্রান্তি হলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন । দয়া করে কেউ এতে কোন রাজনীতির রঙ লাগাবেন না ।

Facebook Comments
সংবাদটি শেয়ার করুন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

আরো সংবাদ