মোঃ মমিনুল ইসলাম।।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০১৮ জারি করেছে। অর্থ বিভাগের শর্ত ও পর্যবেক্ষণের আলোকে এই নীতিমালা প্রণীত হয়েছে। মাধ্যমিক স্তরে স্কুল ও কলেজের বাইরে মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ দুই ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা শিক্ষা বিভাগ এবং সেখানে প্রতিমন্ত্রী ও সচিব পদমর্যাদার দায়িত্ববান ব্যক্তিরা আছেন। তবে কি মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা নীতিমালা প্রণীত হবে?
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষক সংগঠন ‘নন এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশন’ এ নীতিমালা জারির প্রতিক্রিয়ায় যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এই নীতিমালা জারির পর স্থাপিত হবে তাদের ক্ষেত্রে এই নীতিমালা প্রয়োগ এবং এখন যেসব নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির অপেক্ষায় আছে, তাদের ক্ষেত্রে আগের নিয়মে অর্থাৎ স্বীকৃতিকে মানদণ্ড ধরে এমপিওভুক্তির দাবি জানিয়েছে। প্রস্তাবিত এই নীতিমালায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির নিরিখে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দু’ধরনের উপাদানই রয়েছে। এ রকম কতিপয় বিষয়ের ওপর আলোকপাত করতে এই লেখার অবতারণা।
এমপিওভুক্তির ন্যূনতম মানদণ্ড নির্ধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান নির্ধারক প্রস্তাবিত এ নীতিমালায় একাডেমিক স্বীকৃতি, শিক্ষার্থী, পরীক্ষার্থী এবং পাসের হারের ওপর গ্রেডিং করা হয়েছে। প্রতিটি সূচকে ২৫ নম্বর। বেতনভাতাদির সরকারি অংশ প্রাপ্তির জন্য স্বীকৃতিপ্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে সংখ্যক ন্যূনতম শিক্ষার্থী থাকার শর্ত দেয়া হয়েছে, অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ওই সংখ্যক শিক্ষার্থী নেই। আর যথেষ্ট শিক্ষার্থী না থাকলে কাম্য পরীক্ষার্থী মেলার কথা নয়। এ রকম পরিস্থিতিতে পাসের হারও আসবে পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থীর ভিত্তিতে।
কোনো নিয়মনীতি প্রবর্তন করতে হলে তার একটি সর্বজনীন বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার। বর্তমানে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে ২৭ হাজারের মতো। জরিপ করলে দেখা যাবে, এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতর অন্তত ৫ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রস্তাবিত এমপিওভুক্তির শর্ত পূরণে সক্ষম নয়। তবে কি ওইসব এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিও স্থগিত করা হবে? এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকারি বেতনভাতার শতভাগ পেয়ে থাকেন। পক্ষান্তরে নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা দীর্ঘ ১৫-২০ বছর বিনা বেতনে চাকরি করছেন। স্বাভাবিকভাবেই এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাই এখান থেকে প্রত্যাশিত মান আশা করা সঙ্গত নয়। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে এমপিওভুক্তির পর অন্তত ৩-৪ বছর সময় লাগবে। প্রসঙ্গত যেসব স্বীকৃতিপ্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্ধারিত মানে পৌঁছাতে পারবে না, তাদের ভাগ্যে কী ঘটবে? সেগুলো কি বন্ধ করে দেয়া হবে? নাকি বিকল্প কোনো ব্যবস্থা রাখা হবে?
এমপিদের ডিও লেটার লাগবে কি?
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির নীতিমালা এবং গ্রেডিং নিয়ে যাবতীয় আলোচনাই বৃথা, যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করতে মন্ত্রী-এমপিদের ডিও লেটার লাগে এবং তার ওপর ভিত্তি করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির তালিকা তৈরি করা হয়। কারণ তারা নীতিমালার বিচারে নয়, নিজস্ব বিবেচনায় ডিও লেটার দেবেন। ২০১০ সালেও নীতিমালা এবং গ্রেডিংয়ের ভিত্তিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিও করতে চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে মন্ত্রী-এমপিদের নিজস্ব বিবেচনার ডিও লেটারের ভিত্তিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিও করা হয়। এতে করে অনেক যোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হতে না পারলেও কম যোগ্যতার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এমনকি স্বীকৃতি নেই এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও এমপিওর তালিকায় স্থান পায়।
আবেদন না নিয়ে ব্যানবেইস থেকে তথ্য নেয়া দরকার
১৫নং শর্তে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির জন্য কাম্য শর্তাদি পূরণ সাপেক্ষে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে অনলাইনে আবেদন করতে বলা হয়েছে। যে চারটি সূচকের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি করতে চাওয়া হয়েছে তা সংখ্যা মাত্র। প্রতিবছর ব্যানবেইসে অনলাইনের মাধ্যমে এসব তথ্য ছাড়াও অন্যবিধ তথ্য দেয়া হয়ে থাকে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ইআইআইএন (Education Institution Identification Number) ধরে অনুসন্ধান করলে এসব তথ্য মিলবে। এমপিওভুক্তির আবেদন চাওয়া হলে ওই আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের প্রসঙ্গ আসবে। তাতে দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে। এ প্রক্রিয়া শেষ করতে এই সরকারের মেয়াদ পার হয়ে যেতে পারে। কোনো স্বীকৃতিপ্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিও না চাইলে তা হবে এক ব্যতিক্রমী ঘটনা। বড় বড় শহরে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে উঁচু বেতন নিয়ে পাঠদানকারী স্বীকৃতিপ্রাপ্ত স্বল্পসংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয়তো এমপিও না-ও চাইতে পারে। এ সংখ্যা হবে হাতেগোনা। কাজেই ‘স্বীকৃতিপ্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতর কারা এমপিও চাই না’ এমন আবেদন আহ্বান করলে আবেদন সংখ্যা কমে যাবে। এতে করে তালিকা নির্ধারণ প্রক্রিয়া সহজ হবে। তখন ধরে নেয়া যাবে উল্লিখিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া আর সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওর জন্য আবেদন করেছে।
একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একীভূতকরণ
প্রস্তাবিত এমপিও নীতিমালায় বর্তমানে অনুমোদিত সব স্কুল-কলেজের ভৌগোলিক দূরত্বভিত্তিক ম্যাপিং করা এবং ভৌগোলিক দূরত্বে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলে তা প্রশাসনিকভাবে একীভূত করার বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে পূর্ববতী একাধিক স্কুল ভবন-কাঠামো একীভূত স্কুলের বিভিন্ন ক্যাম্পাস হিসেবে বিবেচিত হবে। এটি একটি বাস্তবসম্মত প্রস্তাব। উচ্চশিক্ষিতদের কর্মসংস্থানের তাগিদ, প্রভাবশালীদের নাম জাহিরের আকাক্সক্ষা, রাজনৈতিক প্রভাব প্রভৃতি কারণে অতিরিক্ত কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন শাখা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের প্রক্রিয়ায় যুক্ত থেকেছে। কাজেই অতিরিক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার দায় উভয় পক্ষের ওপর বর্তায়।
যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিু মাধ্যমিক পর্যায়ে আটকে আছে সেগুলোর সামর্থ্যরে ঘাটতি রয়েছে। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের দরুন এখন মেয়েরা কেবল বালিকা বিদ্যালয় কী মহিলা কলেজে পড়ছে না। অনেকেই সহশিক্ষার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হচ্ছে। ফলে মেয়েদের জন্য স্থাপিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছাত্রী স্বল্পতা বিরাজ করছে। এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একীভূতকরণের উদ্যোগ নিলে এ জাতীয় এমপিও, নন-এমপিও নির্বিশেষে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একীভূতকরণের আওতায় আনতে হবে।
বদলির বিবেচনা
নীতিমালার ১২ ধারায় বলা হয়েছে, সরকার এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রয়োজনবোধে নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে বদলি করতে পারবে। শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরি বদলির চাকরিতে পরিণত করা হলে সে সিদ্ধান্ত হবে যথাযথ। কোনো প্রতিষ্ঠানে ভালো শিক্ষক থাকা এবং সেই সুবাদে ভালো পাঠদান হলে সেখানে অধিকসংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি হয়ে থাকে। কাজেই ভালো এবং কম ভালো শিক্ষক সমভাবে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে দিলে সর্বত্র মোটামুটি একই মানের শিক্ষার পরিবেশ বিরাজ থাকবে। অনেকের সুবিধাজনক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার ইচ্ছা থাকে। বদলি হতে না পারায় সেটা হয়ে ওঠে না। কয়েক বছরের ব্যবধানে বদলি ব্যক্তির জীবনে গতিশীলতা আনবে। এমপিও নীতিমালায় প্রতিষ্ঠান সমন্বয়ের যে প্রস্তাবনা রাখা হয়েছে সেটা করতে হলেও শিক্ষক-কর্মচারীদের বদলির ব্যবস্থা করা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়াবে। বদলির মাধ্যমে অতিরিক্ত বিবেচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অন্য প্রতিষ্ঠানে সহজেই আত্তীকরণ করা সম্ভব হবে।
অতিরিক্ত পদ সৃষ্টি
নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক স্তরের জনবল কাঠামোতে অতিরিক্ত দুটি সহকারী শিক্ষকের পদ সৃষ্টির প্রস্তাব করা হয়েছে। এ পদ দুটি হল সহকারী শিক্ষক (তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি) এবং সহকারী শিক্ষক (চারু ও কারুকলা)। আর সরকারপ্রদত্ত কম্পিউটার ল্যাব চালু থাকলে কম্পিউটার অপারেটর। এ সৃজিত পদের ভেতর দিয়েও অতিরিক্ত বিবেচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের একটি অংশকে ৩-৬ মাসের প্রশিক্ষণ দিয়ে আত্তীকরণ করা সম্ভব।
অন্যদিকে মাধ্যমিক ও নিু মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অফিস সহায়ক (দফতরি) পদ বিলোপের বিপরীতে নিরাপত্তকর্মী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পদ সৃজনের প্রস্তাব করা হয়েছে। অফিস সহায়ক বিদ্যালয়ের শুরুতে খোলা ও শেষে বন্ধ করার দায়িত্ব পালন ছাড়াও ঘণ্টা বাজানো এবং নোটিশ প্রদানের কাজ করে থাকে। কাজেই তার কাজটা বেশ গুরুত্ব বহন করে। শহর এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাকর্মীর প্রয়োজন হতে পারে, তবে মফস্বলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তকর্মী না রাখলেও চলে।
শেষ কথা
স্বীকৃতিপ্রাপ্ত নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা দীর্ঘ ১৫-২০ বছর ধরে বিনা বেতনে চাকরি করছেন। অনেকের চাকরি আছে মাত্র ৫-১০ বছর। দুঃখ-কষ্টে জর্জরিত জীবনে তাদের পক্ষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক পাঠদান কঠিন হয়ে পড়েছে। অগত্যা দীর্ঘদিন তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমপিওভুক্তির দাবিতে আন্দোলন করছেন। জানুয়ারিতে অনশন কর্মসূচি চলাকালে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে তারা এমপিওভুক্তির প্রতিশ্রুতি পেয়েছিলেন। কিন্তু বাজেটে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি খাতে বরাদ্দ না থাকায় বঞ্চিত শিক্ষক-কর্মচারীরা রোজার ভেতরেই রাজপথে নেমেছেন। ঈদের দিন পরিবার-পরিজন ছেড়ে প্রেস ক্লাবের সামনে ভুখা মিছিল করেছেন। এখন তারা আবারও অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়নি, অথচ গত অর্থবছরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অব্যবহৃত সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা ফেরত গেছে।
শিক্ষামন্ত্রীর এ আচরণ নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য বৈরীসুলভ। চলতি বাজেটে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত না হলে অনেকেরই বিনা বেতনে চাকরির মেয়াদ শেষ করতে হবে। কাজেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সমন্বয়, বদলি এসব নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা যত পারেন করুন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রাখুন আর নাইবা রাখুন, বিশ লাখের অধিক শিক্ষার্থীর পাঠদানকারী ৭০-৮০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর এমপিও দিয়ে তাদের জীবনে স্বস্তি দিন।
You must be logged in to post a comment.