আবদুল মান্নান
-এল এল বি।।
একদিন সন্ধ্যায় একজন উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বাংলোতে গেলে তিনি কয়েকজন উপস্থিত শিক্ষককে ডাইনিং রুমে বসালেন। নিজের হাতে শিক্ষকদের জন্য চা ও উন্নত মানের বিস্কুট নিয়ে আসলেন।
এক পর্যায়ে তিনি শিক্ষকদের লক্ষ্য করে বললেন; আমার বাবা এমপিওভূক্ত কলেজের একজন শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষকদের কষ্ট আমি বুঝি। কোন ঈদে আমার বাবা আমাদের নতুন কাপড় কিনে দিতে পারতেন না! আমরা পুরাতন কাপড় নিয়ে ঈদ পালন করতাম! বিশ্ববিদ্যালয়ে টিউশনি করে পড়া-লেখার খরচ চালিয়েছি। আল্লাহ্ পাকের রহমতে আমরা ৪(চার) ভাই এখন বিসিএস ক্যাডার। সবাই প্রশাসন ক্যাডারে চাকরি করি!
একদিন সেই উপজেলায় একজন অপরিচিত ব্যক্তির আগমন ঘটলেন। তিনি বিভিন্ন লোকদের কাছ থেকে জানতে চাইলেন , এই এলাকার ইউ এন ও কেমন?তিনি মানুষের কাছ থেকে ঘুষ নেন কিনা?
স্থানীয় মানুষরা ইউ এন ও এর প্রশংসা করলেন। তিনি তাদের বললেন, আমি হলাম এই ইউ এন ও এর বাবা! যদি শুনতাম যে আমার ছেলে ঘুষ খায় তাহলে আমি তার সাথে দেখা না করে বাড়িতে ফিরে যেতাম। এখন আমি আমার ছেলে আপনাদের ইউ এন ও এর সাথে দেখা করতে যাব।
শিক্ষকরা এমনই হয়। যারা অভাবের মাঝেও স্বচ্ছ জীবন-যাপন করে। অন্যায় ও অনিয়মের ছোঁয়া নিজেদের গায়ে মাখতে চায় না। হাজারো আর্থিক অনটনে নিজের নৈতিকতা বিসর্জন দিতে প্রস্তুত নয় মোটেও।
কিন্তু কিছু দুষ্কৃতীকারি শিক্ষকের লেবাস ধারণ করে শিক্ষক সমাজকে কলঙ্কিত করেছে! তা অস্বীকার করার উপায় নেই। যারা শিক্ষক ও শিক্ষা ব্যবস্থাকে কলুষিত করেছে তারা নগণ্য। তাদের অপরাধ প্রবণতার পেছনে বিশাল এক শক্তির ইন্ধন রয়েছে। সেই ইন্ধনদাতা শিক্ষক সমাজের কেউ নয়।
আজ সেই শিক্ষকদের দুরবস্থার কথা ভাবার,তাদের আর্থিকভাবে উন্নত করার মানসিকতা সম্পন্ন লোক কতজন পাবেন! সুযোগ পেলে সবাই তাদের চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করে ফেলে! শিক্ষকরা নীরবে সবকিছু সহ্য করে লোকচক্ষুর আড়ালে অশ্রু বিসর্জন করেন। হাজারো বঞ্চনার দেয়াল টপকিয়ে হাসি-খুশি মনে পাঠদান করে জাতি গড়ার মহান দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
এসি রুমে বসে সেই শিক্ষক সমাজের বেতনের টাকা কর্তন করার কালো প্রজ্ঞাপন জারি করতে বুকে কাঁপন ধরে না! একটি বারের জন্য ও চিন্তা করেনা যে, অল্প বেতনভোগী শিক্ষক সমাজ। বেতনের টাকায় সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে আজীবন! সারা জীবনের শিক্ষকতার টাকায় একটি টিনের বাড়ি করতে পারে না! নিজের সন্তানদের ঈদে কাপড় কিনে দিতে পারেনা! পারে না কোরবানি করতে! ঈদ বোনাস পায় ২৫%।
সেই জাতি গড়ার কারিগর শিক্ষকদের বেতন থেকে অতিরিক্ত চাঁদা কর্তন করার আদেশ জারি করে দিলাম! ক্ষমতার চেয়ারে বসিয়ে! এই শিক্ষকরা আমাকে লেখা-পড়া শিখিয়ে আজ বড় পদে বসার যোগ্য করে তুলেছে। তারা আমার সন্তানদের শিক্ষক। আমার ভাইয়ের শিক্ষক।আমার মা-বাবার শিক্ষক।
সেই শিক্ষক সমাজ আজ তাদের কাছে শিক্ষা লাভ করে ক্ষমতাবান চেয়ারের মালিকদের দরজায় দরজায় গিয়ে অবনত মস্তকে আর্জি করে যাচ্ছেন। আমাদের বেতনের টাকা থেকে আরো অতিরিক্ত চাঁদার বোঝা সইতে পারবনা। আমাদের উপর আরোপিত অন্যায় ও বেআইনি চাঁদার প্রজ্ঞাপন বাতিল করুন। কিন্তু ক্ষমতাবান চেয়ারের মালিকদের এদিকে কর্ণপাত করার সময় একেবারে নেই। হতাশায় শিক্ষক সমাজ আজ রাজপথে! পাঠশালা ছেড়ে! অধিকার আদায়ে!
জাতি গড়ার কারিগর আজ অধিকার আদায়ে রাস্তায় কেন যাবে! তারা তো আমাদের শিক্ষক! এই বোধোদয় কেন আজ কারো হয়না! আজ বাদশাহ আলমগীরের বড্ড অভাব! আব্রাহাম লিঙ্কনের মত মানসিকতা সম্পন্ন লোকের অভাব! কেন জানি শিক্ষকদের হুমকি দেওয়া হয় ?পাইকারি হারে গালিগালাজ করা হয়!
শিক্ষকদের চাকরিচ্যুতির ধমকে নরম করা একটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। শিক্ষকদের যে যত গালি দিতে পারে কিংবা হয়রানি করতে পারে তখন নিজেকে সুখী মনে করে! ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ মনে করে! কেন বুঝতে চায় না আজ আমি ক্ষমতার এই চেয়ারে বসলাম শিক্ষকদের কাছে শিক্ষা অর্জন করে; তাই নয় কি ?
এভাবে চলতে থাকলে এ দেশে শিক্ষক আর শিক্ষক থাকবে না! একদিন গালিতে পরিণত হবে। যা আমরা কোন দিন প্রত্যাশা করিনা! এ টি কোন জাতির জন্য মঙ্গলজনক নয়। আমরা কি পারিনা বাদশা আলমগীরের উপদেশ কিংবা আব্রাহাম লিঙ্কনের অমিয় বাণি থেকে শিক্ষা অর্জন করতে? শিক্ষকদের শ্রদ্ধা করার মানসিকতা অর্জন করতে ?
You must be logged in to post a comment.