আসিফ কাজল।।
১৯৮৭ সাল। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের পারদ জমাট বেঁধে উঠছে। আমি কেবলই কোটচাঁদপুর সরকারী খোন্দকার মোশাররফ হোসেন কলেজে ভর্তি হয়েছি। থাকতাম কোটচাঁদপুর বলুহর বাসষ্ট্যান্ডের টিটো ছাত্রবাসে। দিন দিন আন্দোলন তুঙ্গে উঠলো। তখনও তরিকুল ইসলামের নামটি আমার কাছে অচেনাই। কারণ আমি তার দল বা ব্যক্তিগত আদর্শের সৈনিক নয়। কলেজ বা শহরে মিছিল মিটিং নিয়ে প্রায় এরশাদের ছাত্র সংগঠন ও প্রশাসনের সাথে বিরোধ তৈরী হতো। আমাদের মতো ছেলেরা গ্রাম থেকে শহরে গিয়ে এ সব ঝক্কি ঝামেলা এড়িযে চলতাম। তারপরও মামলায় ফাসিয়ে দেওয়া হলো। একদিকে পুলিশ ও অন্যদিকে পেটোয়া বাহিনীর দাপটে আমাদের মতো সাধারণ ছাত্র খেয় হারিয়ে ফেলে। সে সময় আওয়ামী ছাত্রলীগ, জাসদ ছাত্রলীগ, বিএনপির ছাত্রদল, বাসদ, ছাত্র ইউনিয়নসহ সবাই এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে শরীক। তাই এই সংগঠনের মধ্যে যে কেও হুইসেল দিলে সবাই ঝাপিয়ে পড়তেন। কোটচাঁদুপরের সে সময়কার ওসি সিরাজুল ইসলাম ম্যাচে ম্যাচে গিয়ে ছাত্রদের হয়রানী করতেন। কৃষক পিতার সন্তানরা কলেজে গেছেন পড়তে, পুলিশের ঠ্যাঙ্গানী খেতে তো নয়। যাই হোক এই কথা এক কান দুই কান করে চলে গেল যশোরে। দক্ষিানাঞ্চলের জনপ্রিয় বর্ষীয়ান রাজনীতিক নেতা তরিকুল ইসলাম জানতে পারলেন কোটচাঁদপুরের ছাত্র নেতারা পুলিশী হয়রানীর মুখে বাড়ি থাকতে পারছেন না। ল্যান্ড টেলিফোন দ্রুত যোগাযোগের মাধ্যম সে সময়।
এক বিকালে কোটচাঁদপুর বলুহর বাসষ্ট্যান্ডের নরম ঘাষের উপর গ্রাম থেকে যাওয়া ছেলেরা বসে আড্ডা দিচ্ছি। কোটচাঁদপুরের ওসি সাহেব একটি সিডিআই লাল রংয়ের হোন্ডায় চেপে ব্রেক কষলেন। তার মনটা দেখলাম নরম। তিনি কিছুই বললেন না। আড় চোখে তাকিয়ে চলে গেলেন। খোজ নিতে লাগলাম ওসি সাহেবের এই নমনীয়তার হেতু কি ? তখন থানায়ও আমাদের সোর্স ছিল। তার কাছে সংবাদ লাগানো হলো। খবর আসলো যশোর থেকে টি ইসলাম (তরিকুল ইসলাম) নামে একজন ওসি সাহেবকে ফোন করে বলেছেন, এই ফোনটা প্রেসিডেন্ট এরশাদ সাহেবের কাছে করলে তিনি এক্ষুনি আমার মন্ত্রী বানিয়ে যশোরে পাঠাবেন। আপনি ছাত্রদের হয়রানী ও বাড়ি বাড়ি তল্লাসী বন্ধ করুন। সেই দিন তরিকুল ইসলামের রণহুংকারে কোটচাদপুরের ছাত্র নেতারা হয়রানীর হাত থেকে বেঁচেছিলেন। কলেজ জীবন শেষ করে যখন সাংবাদিকতায় আসলাম। তখন দেখি তিনি সমাজ কল্যান মন্ত্রী। তার বহু অনুষ্ঠান ও জনসভা কাভার করেছি। আমি তখন দৈনিক ঝিনাইদহ পত্রিকার রিপোর্টার। পত্রিকার মালিক সম্পাদক শ্রদ্ধেয় আলী কদর পলাশ ভাই আমাকে মন্ত্রীর জনসভা কাভার করার জন্য পাঠালেন। সে দিন আমার হাতে ছিল দৈনিক ঝিনাইদহ। পত্রিকাটি দেখে তিনি যশোর ফিরে দৈনিক লোকসমাজের প্রকাশক হলেন। সে দিনের ওই অনুষ্ঠানে একটি গুরুত্বপুর্ন ছবি ওঠাতে পারিনি। আমি তরিকুল ভাইকে বল্লাম ভাই আরেকবার পোজ দেন। ধমক দিলেন। তারপর উনি মৃদু হেসে বললেন যুদ্ধের ময়দানে কি ভাবে ছবি উঠাবি ? বর্ষীয়ান রাজনীতিক নেতা ও দৈনিক লোকসমাজ পত্রিকার প্রকাশক তরিকুল ইসলামের মৃত্যুতে আজ সত্যই আমি ব্যাথিত। সাংবাদিক হিসেবে তার সাথে বেড়ানো স্মৃতিগুলো বড়ই বেদনা দিচ্ছে। ওপারে ভাল থাকবেন ভাই।
লেখক
সিনিয়র সাংবাদিক, ঝিনাইদহ।
You must be logged in to post a comment.