মোহাম্মদ মহসিন মিয়া।।
প্রথমে একটু আলোচনা করে নেই-অ্যাম্বাসেডর কী? অ্যাস্বাসেডর হচ্ছেন কোনো একটি রাষ্ট্রের একজন উচ্চপদস্থ ব্যক্তি বিশেষ, যিনি ঐ দেশের সরকারের পক্ষ থেকে অন্য কোনো স্বাধীন দেশ, সরকার কিংবা আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নে কূটনৈতিক কার্য সম্পাদনের উদ্দেশ্যে প্রেরিত হন। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে কোন দেশের প্রতিনিধিত্ব করে রাষ্ট্রীয় যাবতীয় কার্যাদি সম্পন্ন করেন।
অন্যদিকে ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হচ্ছে বাজারজাতকরণে একটি দল বা ব্যক্তি যার একটা ইতিবাচক ব্যক্তিত্ব আছে (সেলিব্রেটি), যিনি একটা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্ত হন, এবং যার কাজ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পণ্য বা সেবার প্রচার ও প্রসারে ভূমিকা রাখা।
আইসিটি মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিচালিত এটুঅাই প্রকল্প কর্তৃক ICT4E(Information and Communication Technology For Education) অ্যাম্বাসেডর মানে হচ্ছে কোনো শিক্ষক যিনি আইসিটিতে দক্ষ এবং নির্দিষ্ট যোগ্যতা অর্জন করেছেন, যিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অাইসিটি ভিত্তিক ক্লাশ পরিচালনায় অন্য শিক্ষকদেরকে সহায়তা প্রদান করে থাকেন এবং শিক্ষকদেরকে অাইসিটি সম্পর্কে দক্ষ করে তোলতে যে কোনো প্রতিষ্ঠানে স্ব-ইচ্ছায় শিক্ষকদের ইন হাউজ প্রশিক্ষণ প্রদান করে থাকেন, শিক্ষক বাতায়ন, মুক্তপাঠ ও কিশোর বাতায়নে শিক্ষকদেরকে সক্রিয় রাখতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকেন৷ এসডিজি এর লক্ষ্য অর্জনে শতভাগ আইসিটি ভিত্তিক শিক্ষা প্রদানে সেচ্ছায় কাজ করতে ইচ্ছুক কিছু শিক্ষকদেরকে শিক্ষায় অবদান রাখতে এটুআই শিক্ষকদের আরো উৎসাহিত করতে একটি সম্মানজনক পদবি দিয়েছেন৷ প্রথম দুই প্রকারের অ্যাম্বাসেডর এবং এটুঅঅই কর্তৃক নিযুক্ত অ্যাম্বাসেডরের মধ্যে লক্ষ্য, উদ্দিশ্য এবং কার্যাবলীর বিরাট ব্যবধান হলেও শিক্ষকদেরকে এ পদবিতে এক অমূল্য সম্মান প্রদান করা হয়েছে৷
অনেক শিক্ষকই বিগত দিনগুলোতে নিজ খরচে মাইলের পর মাইল পাড়ি দিয়ে অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শ্রম দিয়ে শিক্ষকদেরকে অাইসিটিতে দক্ষ করে তোলতে ও প্রতিষ্ঠানে আইসিটি ভিত্তিক ক্লাশ পরিচালনায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছেন৷
কিন্তু কাতলা মাছের সাথে পুটি মাছ থাকার সুযোগ পেলে পুটি মাছ কাতলার মতই লাফ দিতে চায় এবং নিজকে কাতলা বলে দাবীও করতে চায়৷ পরিশ্রমীদের পরিশ্রম প্রশ্ন বিদ্ধ করে ভূয়া নামধারী দলে থাকে কিছু লোক৷ কিছু ICT4E অ্যাম্বাসেডরদের বেলায়ও তার ব্যতিক্রম নয়৷ একজন নিজ খরচে ইন হাউজ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন, অন্যজন গোপনে গোপনে যখন সুযোগ পান তখনই অাইসিটির কাজে নিজকে উৎসর্গ করেন৷ কিন্তু তৃতীয় জন বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে, ইলিশ মাছ কিনতে গিয়ে কিংবা বিয়ে বাড়ির দাওয়াতে গিয়ে ফেইসবুক বন্ধুকে পেয়ে কয়েকটি দৃশ্যের ছবি তোলে অাইসিটি ফরই এর নামে জাহির করার রেওয়াজও দেখা যায়৷
স্কুল থেকে প্রতিনিধি হিসেবে শিক্ষককে স্কুলের কাজে কোনো অফিসে পাঠালেন তিনি সেখানে গিয়ে তার পরিচিত কয়েকজনকে একসাথে করে চায়ের দোকানে অাড্ডা করে জাহির করতে থাকেন-”আইসিটির কাজে বিশেষ মিটিং করেছেন৷”
ফেইসবুক প্রেমিক এক অ্যাম্বাসেডর শিক্ষক শুক্রবারে শ্বশুর বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে অন্য শিক্ষকের সাথে দেখা হলে এক সাথে চায়ের অাড্ডা শেষে ছবি তোলে ফেইসবুকে জাহির করলেন – ”শুক্রবার বন্ধের দিনে বাতায়ন ও মুক্তপাঠের সদস্য করলাম৷” আবার পাঁচ বছরের পূর্বের স্কুল বাগানের ছবি তোলে বলেন- ”স্বপ্নের স্কুল গড়ি, নিজেকে দিয়ে শুরু করি৷” প্রকৃত পক্ষে এ স্বপ্নের বাগান পূর্বের জনেরা তৈরি করে গেছেন এখন তিনি ফেইসবুক ও ক্যামেরা পেয়ে অন্যের করা কাজ দিয়ে নিজের কৃতিত্ব জাহির করছেন৷ নিজ মাদরাসায় ১৮-২০ জন শিক্ষার্থী দাখিল পরীক্ষা দেয়, নেই কোনো প্রজেক্টর তিনি সাজ-সজ্জা করে অন্য স্থানে ঘুরে শতশত পোস্ট দেন আইসিটির নামে৷ নিজ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী বাড়ানো, ফলাফল উন্নয়নের খবর নাই, একটি পদবি পেয়ে নিজ কর্ম ফাঁকি দিয়ে অন্যের উপর নিজের জবরদারি দেখাতে পছন্দ করেন৷
অাবার কখনো কখনো চায়ের অালাপ শেষে অ্যাম্বাসেডর মিটিং বলে সেটিকে ভারী করা হয়৷ কিন্তু প্রশ্ন হলো- ”কতিপয় শিক্ষকদের এক সাথে শিক্ষার মানোন্নয়নের ব্যাপারে অালাপ-অালোচনা৷” এ কথাটি লিখতে কি লজ্জা লাগে? কেউ কেউ এ্যাম্বাসেডর নামে আইডি কার্ডও চাইলেন৷ শিক্ষক হিসেবে অাইডি কার্ড কি কখনো চেয়েছেন নাকি সঙ্গে রাখেন?
অভিযোগ শোনা যায়, অ্যাম্বাসেডর হওয়ার দাপটে প্রতিষ্ঠানে ঠিকমত ক্লাশ নেন না৷ অাবার কেউ কেউ তেলবাজি করে ঘুরে বেড়ান৷ অাত্ম-অহংকারে নিজেই নিজকে অনেক উপড়ে রাখেন৷ অাবার কোনো কোনো অ্যাম্বাসেডর নিজের অবস্থান অারো উচ্চে দেখাতে এবং নিজকে সবার মধ্যে নেতা জানান দিতে অন্য অ্যাম্বাসেডরদের নিয়ে গ্রুপিং করার অভিযোগও শোনা যায়৷
এক জেলার অ্যাম্বসেডর ফোরাম গ্রুপের সেক্রেটারী ও এডমিনের অনুমতি ছাড়া অন্য অ্যাম্বাসেডরকে গ্রুপে যুক্ত করার রিকুয়েস্ট পাঠালে সেক্রেটারী সাহেব ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে গ্রুপ থেকে লিভ(Leave) করে দেন৷
সরকারের এ পদক্ষেপটি শিক্ষকদের জন্য মঙ্গলজনক এবং এর মধ্যে অধিক সম্মান নিহিত রয়েছে৷ কিন্তু কিছু কল্যাণ পদক্ষেপ অকল্যাণে পরিণত হয় অতিকথন ও অতি বাড়াবাড়িতে৷ যদি কেউ নিজ মুল পদবির চেয়ে প্রেষণ কিংবা নামসর্বস্ব পদবি অতি গুরুত্ব দিয়ে নিজ মুল দায়িত্ব অবহেলা করেন তখন তাকে কোনো একদিন একুল-ওকুল দু’কুলই হারাতে হয়৷ ময়ূরের মত হাঁটতে গিয়ে কাক যেমন নিজ হাঁটা ভুলে গেছেন তেমনি শিক্ষক অ্যাম্বাসেডর পরিচয় ও ক্ষমতা দেখাতে গিয়ে নিজ কর্ম-শিক্ষকতাকে এবং নিজ পদবি অাড়াল করছেন!
পরিশেষে, বৃহৎ উদ্দেশ্যে প্রকৃত পক্ষে কর্মঠ ও দক্ষ শিক্ষকদেরকে অ্যাম্বাসেডর বানাতে হবে ও অযোগ্যদের বাদ দিতে হবে৷ যাদের প্রকৃত লক্ষ্য হবে এসডিজি লক্ষ্য অর্জনে অাইসিটি ভিত্তিক পাঠদান অারো ত্বরান্বিত করতে শিক্ষায় বিশেষ কার্যকর ভূমিকা রাখা৷
লেখক
সহকারি শিক্ষক, ইংরেজি
বড় গোবিন্দপুর এএমবি উচ্চ বিদ্যালয়, চান্দিনা, কুমিল্লা৷
You must be logged in to post a comment.