মোঃ মমিনুল ইসলাম।।
বিশ্বের প্রায় সব দেশেই আমলাতন্ত্র শব্দের ধারণা স্পষ্ট।কারণ সরকারি কার্যাবলি সম্প্রসারণে সাথে সাথে সরকারকে বেসামরিক প্রশাসনিক কর্মকর্তার ওপর নির্ভর করতে হয়। নতুবা রাষ্ট্রীয় কার্যাবলি সম্পাদন করা তাদের জন্য বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।তবে একথা সত্য যে,অনিয়ন্ত্রিত আমলাতন্ত্র মানবাধিকারের শিক্ষাব্যবস্থা,রাজনীতিক তথা মানবাধিকারের প্রতিও হুমকীস্বরূপ।আমলাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণহীনতার কারণে এ তন্ত্রের সাথে কিছু কিছু নিন্দাসূচক শব্দও যোগ হয়েছে।এজন্য আমলাতন্ত্র অনেক সময় সাধারণ জনগণের কাছে খুব বিদ্রুপের বিষয় হিসেবেও চিহ্নিত হয়ে থাকে।আর রাজনীতিকেরাও অনেক সময় তাদের সুকৌশলে বাঁধা পড়ে যায়।
আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় আমলাতন্ত্র একটি শক্তিশালী সংগঠন।এই বিরাট সংগঠনকে ব্যতিরেকে কোনো প্রকার সরকারি কার্যাবলি সম্পন্ন করা বেশ দুরূহ ব্যাপার।তাই এটির প্রয়োজনীয়তাও অনস্বীকার্য।উদারপন্থি রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আমলাতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা সত্ত্বেও জনমনে এর বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দানা বেঁধেছে।সুতরাং একদিকে যেমন সুস্থ্য ধারার আমলাতন্ত্রের প্রসার ঘটানো প্রয়োজন অন্যদিক তেমনি একে নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়োজনীয়তাও দেখা দিয়েছে।
বিভিন্ন কারণেই অনিয়ন্ত্রিত আমলাতন্ত্র শিক্ষাব্যবস্থা,রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সর্বোপরি পুরো গণতন্ত্রের জন্য হুমকী হয়ে দাঁড়িয়েছে।তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
১.আমলাতন্ত্রের ত্রুটি:
অধ্যাপক পারকিন্সের মতে চূড়ান্ত কেন্দ্রিকতা আমলাতন্ত্রের প্রকৃতি।এর ফলে গণতন্ত্রের বিপদ দেখা যায়।অকারণে জটিলতা ও অচলাবস্থা সৃষ্টি করা আমলাতন্ত্রের স্বভাবধর্ম।অনিয়ন্ত্রিত আমলাতন্ত্রের একটি প্রধান ত্রুটি হলো দুর্নীতিপ্রবণ।
২.রাজনীতিবিদদের ওপর কৌশলগত প্রভাব:
আমলারা সব সময়ই রাজনীতিবিদদের ওপর প্রভাব খাটান।এ কাজ করতে গিয়ে তারা সংবিধান লঙ্ঘন করতেও দ্বিধাবোধ করেন না যা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য মোটেইই সমীচিন নয়।তারা জনগণের বিভিন্ন দাবী-দাওয়া ও আধিকারকে সম সময়ই দাবিয়ে রাখেন।বিভিন্ন সময় রাজনীবিদরাও এমনভাবে তাদের কৌশলগত ফাঁদে পড়ে যান যেখান থেকে নিজেদের মত করে বেরিয়ে আসতে পারেন না।জাতির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তেও তারা সক্রিয় থাকেন এবং দেশের বাঘা বাঘা রাজনীতিকরাও তাদের কাছে নীরব থাকেন।এমনকি রাষ্ট্রপ্রধানও তাদের সিদ্ধান্ত ঘুরাতে রীতিমত হিমসিম খান।কারণ সব সচিবালয়ের আমলা প্রধানরা এখানে কৌশলগত কিছু দিক অবলম্বন করেন।বিশেষ করে সব আমলাপ্রধানই জাতীয় নির্বাচনের আগে তাদের সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করে যান।ফলে জনগণের অনেক আশা আকাঙ্খাকে বেশির সময়ই জলাঞ্জলি দিতে হয়।
৩.স্বৈরাচারিতা:
জনগণের ঘামের টাকায় দেশ পরিচালিত হয়।তাদের টাকায়ই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের মধ্য দিয়ে পড়াশোনা করে আমলারা ক্ষমতা পেয়ে থাকেন।তাই জনগণের কল্যাণে তাদের উচিৎ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা।কিন্তু জনগণের মঙ্গল ও কল্যাণ সাধনের পরিবর্তে তারা জনগণের ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে থাকে।তারা সাধারণ জনগণকে তাদের অধীনস্ত এবং নিজেরা তাদের অভিভাবক হিসেবেই মনে করে।যখন যেটা ভালো তখন সেটাই মনে কর।সরকারকে চাপে রাখে বহুলাংশে।অনিয়ন্ত্রিত আমলাতন্ত্রই নব্য অধুনা স্বৈরাচারিতার রূপ পরিগ্রহ করে কিন্তু অনেকাংশে বেঁধে যায় রাজনীতিবিদেরা।আর এটি প্রভাব পড়ে গণতন্ত্র তথা সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার ওপর।
৪.জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি:
আমলারা হলেন রক্ষণশীলতার রক্ষক।দেশের বিভিন্ন দিক নিয়ে ভালোমন্দ ভাবনা ভাবা ও প্রয়োজনীয় নীতি প্রণয়ন ইত্যাদি কাজ তারা করতে পারেন।রাজনৈতিক ও আইনের দিক থেকে তারা নিজেদেরকে সাধারণ জনগণের অভিভাবক মনে করেন।দেশে অস্থিতিশোল পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেও তারা মাথা ঘামান না।জনগণের বিশেষ প্রয়োজনেও তারা নির্লিপ্ত থাকেন যা সাধারণ জনগণের কাম্য নয়।জনগণের ক্ষমতাকে সুকৌশলে খর্ব করে থাকেন।ফলে জনগণের কাছে তাদের জবাদিতার পাত্র হতে হয় না।জনগণের রক্ষক না হয়ে তারা অনেকাংশে ভক্ষক হিসেবেই কাজ করেন।আমলাতন্ত্রের উদাসীনতা,আনুষ্ঠানিকতা,দীর্ঘসূত্রীতা, গড়িমসি প্রচেষ্টা ইত্যাদি দূরীভূত করার ব্যবস্থা অতীব জরুরী।রাজনীতিকদের জনতার মঞ্চে দাঁড়াতে হলেও তাদের হয় না।ফলে তারা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।আর ফেঁসে যায় বা বাঁধা পড়ে যায় রাজনীতিকেরা যা জাতির জন্য কাম্য নয়।দেশে বিরাজমান ত্রুটিযুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে তারা হাজারো প্রশ্নবিদ্ধ হলেও জনগণের কাছে জবাবদিহিতার পাত্র হতে হয় না।ফলে যুগ যুগ ধরে শিক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারছে না।
৫.বাঁকা পথে কাজের অভ্যাস:
যেকোনো সাধারণ কাজই খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা আমলাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য।কারণ তারা বিবেকবান হবেন এটাই জনগণের প্রত্যাশা।তারা সরকারি নিয়মে সাধারণ কাজগুলো লিপিবদ্ধ করেন।কিন্তু যে সাধারণ কাজটি দ্রুত সময়ের মধ্যে করা সম্ভব সেটি দীর্ঘ সময়ের পরিক্রমায় করে থাকেন।একটি কাজের শুদ্ধ ফাইল তাদের অফিসে জমা পড়লেও নানা কারণ দেখিয়ে মাসের পর মাস সেই ফাইল ফেলে রাখেন।বলতে গেলে সব ফাইলের নিচেই সেটির স্থান হয়।কারণ তারা আনুষ্ঠানিকতার বাইরে তারা যেতে চান না।শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের বিষয়টি লক্ষ্য করলেই তাদের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠে।এজন্য আমলাতান্ত্রিক কাজকর্মের দীর্ঘসূত্রিতা প্রকট হয়ে উঠে।সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার ওপরও একইভাবে রয়েছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা যার কারণে বেঁধে যায় রাজনীতিকেরা।
৬.ক্ষমতা লিপ্সা:
জনগণই রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার উৎস।কিন্তু আমলাদের মধ্যে জনগণের ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার প্রবল আকাঙ্খা লক্ষ্য করা যায়।জনগণের মৌলিক আধিকারিক তারা হরণ করে।ক্ষমতার আপব্যবহার করে তারা জনগণকে সুকৌশলে জিম্মি করে রাখেন ফলে সাধারণ জনগণ তাদের ভয়ে প্রতিবাদ করতে পারে না।আমলাতান্ত্রিক এ ক্ষমতা লিপ্সা ও দলীয় মনোভাব গণতন্ত্র তথা শিক্ষক সমাজকে কুলষিত করে তোলে।ক্ষমতার এ মোহ মানবিক মূল্যবোধকে বাঁধাগ্রস্থ করে।মানবিক সম্পর্কের স্থানে তাদের পদাধিকারটাই বেশি প্রাধান্য পায়।ফলে সাধরণ জনগণ বা শিক্ষক সমাজের সাথে তাদের মানবিক সম্পর্ক কখনই শক্তিশালী হয় না।এর ফলে সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত উন্নয়ন ব্যাহত হয়।
৭.ব্যক্তিস্বাধীনতার পরিপন্থী
৮.অবিবেকী কার্যকলাপ
৯.লাল ফিতার দৌড়াত্ম্য
১০.দায়িত্ব এড়ানোর প্রবণতা
১১.কাজের বিভাগ সৃষ্টিজনিত ত্রুটি
১২.আমলারা স্বতন্ত্র শ্রেণি
১৩.বিভাগবাদ
১৪.রক্ষণশীলতা
১৫.প্রশাসনিক ব্যয় বৃদ্ধি
১৬.শিক্ষকদের নীরবতা
১৭.সংসদে শিক্ষকদের অনুপস্থিতি
১৮.যোগ্য শিক্ষামন্ত্রীর অভাব
১৯.শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে স্বতন্ত্র না করা
২০.শিক্ষক নিয়োগে আমলাদের প্রাধান্য দেওয়া।
চলবে…
লেখক
সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ টিচার্স কাউন্সিল।
You must be logged in to post a comment.