মো:জসীম উদ্দিন,বরগুনা প্রতিনিধি ||
আজ ১৫ নভেম্বর। ২০০৭ সালের এই দিনে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়ংকর, প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়, সুপার সাইক্লোন ‘সিডর’ ভয়ংকর রুপে আঘাত হানে বরগুনার তালতলী উপকূলীয় এলাকায়। ভয়াবহ সেই কাল রাত্রির একযুগ অতিবাহিত হলেও আজও সেই ভয়ানক স্মৃতি তাড়িয়ে বেড়ায় উপকূলের মানুষদের। সিডরের দুঃসহ স্মৃতি যা আজও ভুলতে পারেনি পায়রা পারের মানুষ।
এখনো উপকূলীয় মানুষের কাছে একটি পরিচিত নাম জয়দেব দত্ত। ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি)র মৃত্যুর আগ পর্যন্ত একজন স্বেচ্ছাসেবক ছিলেন তিনি। ২০০৭ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডর আঘাত হানার আগেই পূর্বাভাস প্রচারের মাধ্যমে অন্তত ৫ হাজার মানুষের জীবন বাঁচিয়েছিলেন ‘সিডরম্যান’ খ্যাত জয়দেব দত্ত।
সিডরের দিনে উপকূলের লাখো মানুষ মুহুর্তেই সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছিল। প্রাণ হারিয়েছিলেন ২৬৪ জন। ভয়াবহ বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় মানুষের বসতবাড়ি, ফসলের ক্ষেত। বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ, নৌ ও সড়ক পথসহ আধুনিক সভ্যতার সার্বিক অবকাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পরে তালতলী উপজেলা। গোটা বিশ্ব প্রকৃতির এ ভয়াল রুপ দেখে বাড়িয়ে দেয় সহযোগিতার হাত।
সে সময় তালতলীতে বেশ কয়েকদিন ধরেই ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস দিচ্ছিলেন সেচ্ছাসেবক জয়দেব দত্ত। ঝড়ের পূর্বদিন থেকেই মহাবিপদ সংকেত ১০ নম্বরে উঠে যায়। ১৫ নভেম্বর দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যায় হালকা বাতাস। রাতের আধারে তালতলী উপকূলীয় এলাকায় ভয়ংকর রুপে আঘাত হানে সুপার সাইক্লোন ঘুর্ণিঝড় সিডর। মুহূর্তেই পায়রা নদী ফুঁসে ওঠে রাত সাড়ে ৯টায়। প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড়টির গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২২০ থেকে ২৫০ কিলোমিটার। রাত ১০টায় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের তাণ্ডব শুরু হয়। এ সময় পায়রার পানি ১৫ থেকে ২০ ফুট উচ্চতায় প্রচণ্ড শক্তি নিয়ে আছড়ে পড়ে উপকূলের এ জনপদে। তালতলীর আশার চর, তেতুল বাড়িয়ার, নিদ্রা, ছকিনা, ফকিরহাট, অংকুজানপাড়া খোট্টার চর, ছোটবগি, এসব এলাকার বেঁড়িবাঁধের বাইরের ঘরবাড়ি, গবাদি পশু, হাঁস-মুরগিসহ শত সহস্র মানুষকে মুহূর্তের মধ্যে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। নদীর পানি তালতলী শহর রক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে পানি চলে আসে শহরের ভেতরে। ২/৩ ফুট পানির নিচে তলিয়ে যায় তালতলী বাজার। পরদিন দূর্যোগের মাত্রা থেমে গেলে ভেসে উঠে প্রকৃতির ধ্বংসলীলার প্রতিচ্ছবি। যে দিকে দু চোখ যায়, সে দিকেই ধ্বংসস্তূপ। আর বাতাসে ভেসে আসে স্বজন হারানোর হাহাকার।
তালতলীর (সাবেক) বড়বগী ইউনিয়নের এবং বর্তমান নিশান বাড়িয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান দুলাল ফরাজি জানান। সিডরে নিহত হয়েছেন ১৫০ জন, নিখোঁজ ১১৪ ও আহত হয়েছেন ২ হাজার ৫শ জন। তবে জয়দেব দত্তের প্রাণপণ চেষ্টার কারণে তালতলীতে হতাহতের সংখ্যা কমেছে।
জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’তে প্রচারিত হয়েছিল জয়দেবের সে প্রচেষ্টার কথা। পূর্ব সংকেত প্রচারের জন্য ইত্যাদির পক্ষ থেকে একটি মোটরসাইকেলও পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল তাকে। এছাড়াও জাতীয় রেড ক্রিসেন্ট অ্যাওয়ার্ড ২০০৮ পেয়েছেন তিনি।
আজ উপকূলের সেই ভয়াল সিডরের এক যুগ পূর্ণ হলো। বেঁচে নেই জয়দেব দত্ত তবে তিন বেঁচে আছেন উপকূলীয় এ এলাকার লাখো মানুষের হৃদয়ে।
You must be logged in to post a comment.