পারভীন আক্তার।।
পোষাক হলো বাইরের আবরণ, মানুষের আসল সৌন্দর্য হচ্ছে তার জ্ঞান। শিক্ষকের কাজ হচ্ছে কোনো ব্যক্তিকে প্রশ্ন করে তার কাছ থেকে উত্তর জেনে দেখানো যে জ্ঞানটা তার মধ্যেই ছিল।আর বিস্ময় হল জ্ঞানের শুরু।
বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের মাঝে বিস্ময় সৃষ্টি করাটাই বড় কথা।
শিক্ষায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিষয়ে ক্লাসে শ্রদ্ধেয় আব্দুর রাজ্জাক স্যার( সহযোগী অধ্যাপক, টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, খুলনা) যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার তুলনামূলক আলোচনা করছেন কিছুদিন হোলো।
উপর্যুপরি সমস্যাগুলো তুলে ধরে প্রশ্নোত্তরের মধ্য দিয়ে স্যারকে ব্যাপক আলোচনায় সহযোগিতা করে থাকি আমরা।
* বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা যেখানে পাবলিক পরীক্ষা নিয়ে আতংকগ্রস্ত থাকে এবং তাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ পরিস্থিতি পুরোটাই পরীক্ষার ফলাফলের ওপর প্রভাব ফেলে পরোক্ষভাবে। অতঃপর এই ফলাফলই অবৈজ্ঞানিকভাবে শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের পথ নির্ধারণ করে দেয় যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ওদের শিক্ষা ও পেশাগত জীবনকে ভুল পথে পরিচালিত করে।
পাবলিক পরীক্ষায় অকৃতকার্যতার গ্লানি নিয়ে অনেক শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় অথবা ভর্ৎসনার শিকার হয়ে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। কেউ কেউ যোগ্যতা ও ধারালো মেধা থাকা সত্যেও ভুল পন্হায় চরমভাবে অযোগ্য প্রমাণিত হয়।
শ্রদ্ধেয় রাজ্জাক স্যারের নিজের পুত্র সন্তনটিও যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা সেবার আওতায় রয়েছে।
অনেক তথ্য বিনিময়ের এক পর্যায়ে স্যার জানান তাঁর এক আত্মীয় সেখানে Software Engineering পড়ছেন। তিনি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ায় তার প্রমোশন না হবার সম্ভাবনা দেখা দেয়। তার বড় বোন যিনি ওখান একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন,বিষয়টি নিয়ে রীতিমত মুষড়ে পড়েন।
তিনি ভাইয়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তার গ্রেড পয়েন্ট জানতে চাইলে উক্ত বিষয়ের সুপারভাইজার বোনটিকে রেজাল্ট জানাতে অসম্মতি জানান।
অর্থাৎ প্রমোশনটা না হলেই শুধুমাত্র অভিভাবক জানতে পারবেন যে সে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে।
১৮ বছরের পর ওঁরা একজন শিক্ষার্থীকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করেন।তার রেজাল্ট ওঁরা তাকেই শুধু জানাবেন। অভিভাবককে নয়।
ওঁরা শিক্ষার্থীর বা অভিভাবকের ওপর কোনো প্রকার অনর্থক চাপ সৃষ্টি করেন না।
* উন্নত দেশগুলোতে পাবলিক পরীক্ষাই নেয়া হয় না। বিদ্যালয়গুলোতে class test,class marks, class works, assignment এর উপর ভিত্তি করে যে গ্রেড নির্ধারণ করে থাকে ইউনিভার্সিটিগুলো স্কুলের ঠিক সেই রেজাল্টের ওপর ভিত্তি করেই শিক্ষার্থীর আর্থিক,পারিবারিক অবস্থা বিবেচনা করে ভর্তি যোগ্যতা নির্ধারণ করে থাকে।
* বিদ্যালয়গুলোই শিক্ষা লাভের একমাত্র আলয় হওয়ায় প্রতি বিদ্যালয়েই councilor guide থাকেন। যিনি শিক্ষার্থীদের সাথে কাউন্সিলিং করে থাকেন এবাং উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীর উপযুক্ত বিষয় নির্বাচনে সহযোগিতা প্রদান করে থাকেন।ফলে অভিভাবকের বাড়তি দুশ্চিন্তা করার বা দায়িত্ব নেবার কোনো প্রয়োজনই পড়ে না।
অথচ আমাদের শিক্ষা পরিবেশে অভিভাকদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং পেশাগত সকল কর্ম পন্ড হয়ে যায় সন্তানের লেখাপড়ার পেছনে সময় অর্থ ও শ্রম ব্যয় করতে করতে। দুশ্চিন্তা আর অনিশ্চয়তা গ্রাস করে রাখে চরম মাত্রায়।
* আমাদের দেশে ইন্টারমিডিয়েট মানেই শিক্ষার্থী আর অভিভাবকদের সারা বাংলাদেশ ভ্রমণ, সময় ও অর্থের বেশুমার অপচয়….।
যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে ঘরে বসেই অনলাইনে SAT score বা application systemএ ইউনিভার্সিটিগুলোতে admission নেয়ার সুযোগ রয়েছে।
* আমাদের দেশে কিছু কিছু সচেতন স্কুল,কলেজ ব্যতীত অধিকাংশ বিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত ক্লাস হয়না বা শিক্ষার্থীরা স্কুলে বা কলেজেই যায় না। অভিভাকগণ স্কুলটাইমেই ওদের নিয়ে বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে ছুটে বেড়ান।শিক্ষক,অভিভাবকগণ এটাকে খুবই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বলে মনে করতে শুরু করেছেন।
অথচ উন্নতবিশ্বে বিদ্যালয়গুলোই পঠন-পাঠনের একমাত্র আলয়।তবে ওখানে কিছু কিছু learning center আছে,ওগুলোতে পিছিয়ে পড়া বিষয়ে কিছু শিক্ষার্থীর জন্য কর্মঘন্টার বাইরে সরকারের পৃষ্ঠ পোষকতায় অতিরিক্ত পরিচর্যা দেয়া হয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যে শিশু যে বিষয়গুলোতেই দুর্বল তাকে সে বিষয়গুলোতে সম্পৃক্ত করে দক্ষতা বৃদ্ধি করা হয়।
* শিক্ষার্থীদের শাস্তি প্রদান বিষয়ে জানতে চাইলে স্যার বললেন, বিশ্বের কোনো দেশে লেখাপড়া শেখাতে শাস্তির প্রচলন ছিল বা আছে বলে কোনো তথ্য তাঁর জানা নেই বা শিশুদের শারীরিক বা মানসিকভাবে শাস্তি না দেয়ার জন্য সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করতে হয়েছে বলেও শোনেননি।
দেশের কিছু কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানতো পেরে যাচ্ছে। তবে সবাই নয় কেন?
রাজশাহী কলেজ আজ দেশের মধ্যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
ওঁরা অভিভাবককে তথ্য প্রমাণ ছাড়া কলেজে প্রবেশ করতে দেন না।” No class, no exam”,
” No class,no marks” নীতিতে চলছে ওঁরা।শিক্ষার্থীরা ক্লাস করতে বাধ্য।
কই, অভিভাবকগণতো অখুশি নন।বরং তারা ভীষণ খুশি ও আশ্বস্ত।
সবমিলিয়ে ‘হয়না,হবেনা’ শ্লোগান থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গী ও গবেষণাকে জীবনমুখী ও রাষ্ট্রীয় আর্থসামাজিক চাহিদাভিত্তিক হতে হবে।
চলবে।
লেখক
সহকারি শিক্ষক
নজরুল নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
খুলনা।
You must be logged in to post a comment.