শিক্ষায় এ কেমন বৈষম্য?

অন্যদৃষ্টি অনলাইন
মঙ্গলবার, ২৭ নভেম্বর, ২০১৮, ৩:৩৫ অপরাহ্ন

মোঃ মমিনুল ইসলাম।।

দেশের জাতীয় স্বার্থে তো একজন শিক্ষকই বেশি বেশি কথা বলবেন।সেখানে কথাটি কার বিপক্ষে গেল কি গেল না সেটা মূখ্য নয়।
গত তিন বছর যাবৎ এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগে গড়িমসি। শিক্ষক নিয়োগে একদিকে ঠেলে এনটিআরসিএ আরেক দিকে ঠেলে পরিচালনা পরিষদ।ঠেলাঠেলির এই রাজত্বের শিকার হচ্ছে শিক্ষা ও শিক্ষক। এনটিআরসিএ সনদধারী লক্ষ লক্ষ প্রার্থী যোগ্যতা থাকা স্বত্বেও নিয়োগ পায়নি।অবশ্য কিছু পেয়েছে তবে সেটা চাহিদার তুলনায় খুমই নগণ্য।ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডি দ্বারা যে প্রক্রিয়ায় নিয়োগ হয় তার চেয়েও কঠিন প্রক্রিয়ায় এনটিআরসিএ নিয়োগ পরীক্ষা নেয়।তাহলে এদের নিয়োগ হলো না কেন? এদের বৃহৎ অংশ বেকার আছেন।আবার একটি শ্রেণি এনটিআরসিএ সনদধারী হয়ে বছরের পর বছর ধরে এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কৃতিত্বের সাথে শিক্ষকতা করে গেলেও এনটিআরসিএ এর যাতাকলে পিষ্ট হয়ে তারা এমপিও হতে পারেনি।তাঁদের কী দোষ ছিলো?কী অযোগ্যতা ছিলো? যদি এমনটিও হতো যে, সনদধারী এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষকের প্রথম ধাপে এমপিও করা হতো তবুও সারা বাংলাদেশে বেসরকারি শিক্ষকদের শূণ্য পদের আসনগুলো পূর্ণ হয়ে যেত। এতে শিক্ষার মান বেশ ভালো থাকতো।বাকিদের চাহিদাভিত্তিক পিএসসির মত একটি পদ্ধতি নিয়ে দেশের অন্যত্র চাকরি দেওয়া সম্ভব হতো।কিন্তু সেটা আমরা আজও পেলাম না।কিছু প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা ননএমপিও আছেন ঠিকই কিন্তু তারা স্থায়ী শিক্ষক, তারা পিএফ পান, বৈশাখী উৎসব বোনাস পান, ইদ বোনাস পান।নাই শুধু এমপিও।যদি তারা যোগ্যই না হবেন তাহলে তাঁদের এসব সুবিধা দেওয়া হয় কেন? শিক্ষকদের যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ দিলে আজ আর এই সমস্যা থাকতো না।

২০০০ সাল থেকে দেশে লক্ষ লক্ষ শিক্ষক মাত্র দুই বছর বা তিন বছরের নামমাত্র ডিগ্রী পাস কোর্সের সনদ নিয়ে আজ তারা এমপিও সুবিধা পাচ্ছেন।এমনকি ২০১০ -২০১৫ সালেও এদের চাকরি হয়েছে ও এমপিও হয়েছে।কিন্তু ২০১৫ সালের ২০ অক্টোবর হতে সরকার এনটিআরসিএ কে ক্ষমতা দিলে শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ হয়ে যায়।সৃষ্টি হয় চরম বৈষম্য।এক দিকে শিক্ষকরা পরিচালনা পর্ষদের মাধ্যমেও এমপিও পায় না, অন্যদিকে এনটিআরসিএও কাঙ্খিত নিয়োগদানে ব্যর্থ হয়।অথচ এনটিআরসিএ সনদপ্রাপ্ত অনার্স মাস্টার্স ডিগ্রীধারী হাজার হাজার শিক্ষক এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বল্প বেতনে কৃতিত্বের সাথে এমপিও শিক্ষকদের চেয়ের বেশি পরিশ্রম করে দেশের জাতীয় স্বার্থে শিক্ষকতা করে আসছেন। ডিগ্রী পাস কোর্সের সেই সব শিক্ষক যদি আজ একই প্রতিষ্ঠানে এমপিও সুবিধা পেয়ে থাকেন তবে তুলনামূলক অধিক যোগ্যতার শিক্ষকদের এমপিও কেন নয়? এমনও প্রতিষ্ঠান আছে যেখানে একজন প্রধান শিক্ষক তাঁর শিক্ষা জীবনে একাধিক তৃতীয় বিভাগ থাকা স্বত্বেও আজ শিক্ষানীতির সমস্যার কারণে বা শিক্ষায় ব্যাপক বৈষম্য থাকায় সরকারের কোষাগারের লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।অথচ যোগ্যতার বিচারে তারা কিন্তু পিছিয়ে আছেন।যদি শিক্ষানীতিতে এসব অযোগ্য শিক্ষকদের সুযোগ দেওয়া না যেত তবে বর্তমান যোগ্য শিক্ষকরাই সেই আসন পূরণ করতেন এবং যোগ্য শিক্ষকদেরই আজ আলাদা মূল্যায়ণ হতো।

কোনো কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি শিক্ষক নিয়োগের এরুপ বিধান না থাকে তবে প্রাইমারী ও মাধ্যমিক স্তরে কেন এমন বিধান প্রযোজ্য হবে? শিক্ষক শব্দটিই কমন বা সাধারণ।তাই যোগ্যতার বিচারেও কমন কিছু নিয়মনীতি থাকা আবশ্যক যেন স্তরভিত্তিক কখনই শিক্ষকের মূল্যায়ণ না হয়।শিক্ষকের মূল্যায়ণ হবে তাঁর যোগ্যতায়।যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক যদি ইচ্ছে করেন তিনি প্রাইমারীতে চাকরী করবেন তবে তিনি যেন শিফট্ করে সেখানে যেতে পারেন।এক্ষেত্রে অবশ্যই তাঁর সকল সুযোগ সুবিধা একই থাকতে হবে।আবার প্রাইমারী থেকেও মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে কোনো শিক্ষক আসতে চাইলে সে সুযোগ থাকা দরকার।এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে একজন শিক্ষক দীর্ঘদিন প্রাইমারী স্তরে শিক্ষকতা করে সেই অভিজ্ঞতা কেন মাধ্যমিক লেভেলে লাগাবেন।আমি এটার বিপক্ষে নই।তবে সে ক্ষেত্রে যোগ্যতার মাপকাঠি কাছাকাছি থাকতে হবে যেন স্তরভিক্তিক শিক্ষকের মূল্যায়ণ করা না হয়।

একজন শিক্ষক যদি ডক্টরেট ডিগ্রীধারী হন তবে সে কোন স্তরে পাঠ দান করছেন সেটা মূখ্য হওয়া ঠিক নয়।তাঁর যোগ্যতাকে মূল্যায়ণ করতে হবে।এক্ষেত্রে তাঁর যোগ্যতাভিত্তিক সরকারি স্কেল বেঁধে দিতে হবে যেন মানুষ বুঝতে পারেন তিনি কোন শ্রেণির বা পদ মর্যাদার শিক্ষক।বাস্তবে আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এমনটি নাই।এজন্যই শিক্ষায় এত এত বৈষম্য আমার মোকাবেলা করতে হয়।যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ করে উপযুক্ত বেতন ও পদ মর্যাদাসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা দিতে পারলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচুু করে দাঁড়ানো যেত।শিক্ষকদের মাঝেও আর এত ভেদাভেদ থাকতো না।

 

লেখক

সাধারণ সম্পাদক

বাংলাদেশ টিচার্স কাউন্সিল (BTC)

Facebook Comments
সংবাদটি শেয়ার করুন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

আরো সংবাদ