পারভীন আক্তার।।
ইংল্যান্ড।
এক একটি এলাকায় আছে একটি মাত্র স্কুল। এলাকার শিশুদের নিজ এলাকার স্কুলেই পড়তে হয়,বাধ্যতামূলকভাবেই।স্কুল পছন্দ করবার কোনো সুযোগ নেই। মজার বিষয় হোলো,ওখানে আমাদের মতো ভালো স্কুল,নামকরা স্কুল বলে কিছু নেই।দেশ জুড়ে একই মানের স্কুল,একই রুটিন,একই বই,একই যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক।
এখানে স্কুল-কলেজে কোনো ranking system নেই।
প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির সময় পরীক্ষা? ওরা কল্পনাও করতে পারে না। ৬ বছর মেয়াদী প্রাথমিক শিক্ষাকালে শিক্ষার্থীরা প্রথম পরীক্ষা দেয় স্কুল ছেড়ে যাবার আগে। ৬ষ্ঠ বছরে এসে একটা প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা নেওয়া হয়,তাতে পাশ,ফেল বা গ্রেডিং কিছুই নেই। মাধ্যমিকে প্রবেশকালে একটি মাত্র পরীক্ষা।তাও পরীক্ষা পদ্ধতির সাথে পরিচিত হবার জন্য। এবং এটি বাধ্যতামূলকও নয়।পরীক্ষাটিতে অংশগ্রহণ না করেও মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তি হতে পারে ওরা সরাসরি। ইংল্যান্ডের শিশুদের কোনো স্কুল ব্যাগ নেই।লাগে না।পুরো প্রাথমিকই শেষ করা যায় স্কুল ব্যাগ ছাড়াই।
কোনো নির্দিষ্ট পাঠ্যবই-ই নেই যে বাসায় নিয়ে পড়তে হবে।বাসায় বই-খাতাতো দূরের কথা একটা রংপেন্সিলও থাকে না। ছুটির সময় অবশ্য আনা যায় স্কুল লাইব্রেরির কমিক বা গল্পের বইগুলো এবং অবশ্যই নিজের পছন্দমতো।পড়াশুনা যা স্কুলেই। বাসায় কোনো লেখাপড়া নেই,নেই কোনো হোমওয়ার্ক। কারণ,আমাদের মতো বিভিন্ন অযুহাতে স্কুল ছুটি দিয়ে দেয় না ওরা। সারা বছর একই সময়ে সকাল ৮ টা থেকে বিকেল ৩:৩০ পর্যন্ত সক্রিয় কার্যক্রম চলে।

সপ্তাহে একদিন হোমওয়ার্ক দেয়া হয় ছুটির দিনে,তাও বিভিন্ন কুইজ বা ছবি আঁকা জাতীয় কিছু। হোমওয়ার্কের জন্যও সকলের জন্য থাকে নানারকম মেডেল,উদ্দীপনা বৃদ্ধির জন্য।
স্কুল খোলা সপ্তাহে ৫দিন।আর প্রতি ছয় সপ্তাহ পর এক সপ্তাহ ছুটি ওদের। টিফিন নেবার সুযোগ নেই ওদের। স্কুলেই এক একদিন এক এক খাবার। সপ্তাহে একদিন রান্নাও শেখানো হয় ওদের। প্রত্যেককে কিছু না কিছু রান্না করতে হয়। কারণ, বড় হলে নিজের খাবার নিজেই রান্না করতে হয় ওদের। শুধু রান্না নয় কোন খাবারে কি পুষ্টিগুণ তাও শিখতে হয় ওদের।ক্লাস টু’তে পড়া একটি শিশুও খেয়াল রাখে কোন খাবারে কতটুকু ফ্যাট আর কতটুকু ক্যালরী।
শীত-গ্রীষ্ম বলে আলাদা সময় নেই ওদের।স্কুলে ২ঘন্টাই মাঠে খেলতে হয় ওদের।বিভিন্ন রকম খেলাধুলা।
মাধ্যমিকে কোচ যদি মনে করেন,কোনো শিশু বিশেষ কোনো খেলায় পারদর্শী, তাকে ভর্তি করা হয় স্থানীয় ক্লাবে।
প্রতিটি স্কুলে আছে ব্যায়ামাগার। সপ্তাহে একদিন সেখানে পাঠানো হয়।সাথে থাকে সুইমিং ড্রেস।সবার নিজের লকার আছে স্কুলে।
প্রতি কক্ষে ২৫ জন শিক্ষার্থী থাকে। একটি শ্রেণিতে শিক্ষক ১ জন।বৃটেনে একেবারে বিশ্ববিদ্যালয়ের আগ পর্যন্ত একমুখী শিক্ষা। অর্থাৎ সবাইকে সবকিছুই শিখতে হয়। বিজ্ঞান শিক্ষায় প্রাইমারী থেকেই ল্যাব, ব্যাবসা শিক্ষায় ছোট ছোট প্রজেক্ট,সমাজ বোঝাতে প্রায়ই মাঠ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয় শিক্ষার্থীদের।
শ্রেণিতে কোনো মেধাক্রম নেই,নেই খেলার মাঠে। সব দলীয় কাজ।’সবাই সমান’- মনোভাব নিয়ে বেড়ে ওঠে ওরা। স্কুলেই ওদের জন্মদিন উৎসব পালিত হয়,বছর জুড়ে বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানে আছে বিশেষ বিশেষ পোশাক। তার মধ্যে পছন্দের কার্টুনের চরিত্রের পোশাকে স্কুলে যাওয়া দারুণ ব্যাপার!
এতোসব উৎসব আয়োজনের মধ্যেই গল্পচ্ছলে শিক্ষকরা শিখিয়ে ফেলেন বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস, মিশরীয় সভ্যতার ইতিহাস।
এখানকার প্রাথমিক শিক্ষকদের মাস্টার্স পাশ হতে হয়। চাকুরী লাভের পর শিশুদের মনস্তত্ত্ব বুঝতে নিতে হয় দীর্ঘ প্রশিক্ষণ।
শিশুদের বাবা-মা’ই মারতে পারেন না। শিক্ষকতো দুরের কথা। যতই বিরক্ত করুক না কেন ন্যুনতম বিরক্তিও প্রকাশ করতে পারেন না শিক্ষক।
ওখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা পেশা অনেক সম্মানের। ১০ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন প্রাথমিক শিক্ষকের সম্মানী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সমান। আমাদের দেশে শিশুর আচার,ব্যাবহার পারিবারিক শিক্ষা হলেও ওখানে তা প্রাতিষ্ঠানিক।যাতে করে সকল শিশু অভিন্ন মূল্যবোধ ও আচরণ নিয়ে বেড়ে ওঠে।
স্কুলে অনুপস্থিতিতে অভিভাবকদের জবাবদিহিতার পাশাপাশি গুণতে হয় মোটা অংকের টাকা।
অসুস্থ হলেও শিক্ষার্থীকে স্কুলে যেতে হয়।স্কুলের নির্ধারিত চিকিৎসক তার চিকিৎসা সেবা দেয়।তিনি পরামর্শ দিলেই কেবল শিক্ষার্থী বাসায় বিশ্রামে থাকতে পারে।
আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয় শেষে যেমন সমাবর্তন হয়,ইংল্যান্ডে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় শেষেও করা হয় সমাবর্তন অনুষ্ঠান। বছর শেষে শেষ ক্লাসে শিক্ষকের জন্য উপহার নিয়ে যাওয়া হয়,একই সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয় পরবর্তী বছরের নতুন শিক্ষকের সাথে।
নতুন নতুন এরকম নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে চলছে ইংল্যান্ডের স্কুলগুলো। আমরাও…..!
লেখক :
সহকারি শিক্ষক, নজরুল নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, খুলনা।
তথ্য সূত্র :
শাত শামীম, শিক্ষানবিশ,মাস্টার্স। ইংল্যান্ড।
(সংক্ষেপিত)
You must be logged in to post a comment.