প্রদীপ কুমার দেবনাথ ।।
বর্বর, মূর্খ, অমানুষ, বিবেকহীনদের জয়জয়কার সর্বত্র। অন্যায়, অত্যাচার, অনাচার, অরাজকতা, ঘুষ, দূর্ণীতি, রাহাজানি, সন্ত্রাসবাদ, নৈরাজ্য, মানবতা বিবর্জিত মানুষের আস্ফালন চতুর্দিকে। হিংসা-বিদ্বেষ, হানা-হানি, মারা-মারি, কাটা-কাটির প্রতিযোগিতা এমন যেন নব্য আইয়ামে জাহিলিয়া যুগ শুরু। মিথ্যা, প্রতারণা, শঠতা, কপটতা, বেইমানি, নিষ্ঠুরতা যেন আজ নিয়মে পরিণত হয়েছে।
ন্যায়, ন্যায্য, নৈতিকতা, সততা, ভদ্রতা, নম্রতা, মানবিকতা যেন আজ আবর্জনার স্তুপে ছুঁড়ে ফেলা মূল্যহীন বস্তু। অনিয়ম আজ নিয়ম হয়ে গেছে, অন্যায়টাকে ন্যায়ের সারিতে দাড় করানো হয়েছে, নিষ্ঠুরতা আজ ভালবাসার স্থানে উপনীত হয়েছে, অসামাজিকতাকে সামাজিকতা হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছে।
ফলে অপসংস্কৃতি, অপশাসন, অপবাদ, অপব্যবহার আজ প্রতিষ্ঠিত। গুটিকয়েক অর্থ – বিত্ত – প্রাচুর্যে সমৃদ্ধ মানুষ নামক আধুনিক হায়েনারা অপকর্ম করছে আর হাজার হাজার মানুষ তা দাঁড়িয়ে দেখে। কেউ কেউ আবার হাততালি দেয়, কেউ কেউ সরাসরি সমর্থন দেয়, কেউ কেউ নিরবে দাঁড়িয়ে দেখে আবার কেউ কেউ নিরবে গৃহকোণে নিজেদের লুকিয়ে রাখছে। বৃহৎ একটা অংশ দীর্ঘশ্বাসের সাথে নিরবে চোখের জল ফেলছে। আর ভুক্তভোগীরা বুক – পিঠ পেতে দিয়ে হায়েনার রাক্ষুসে ছোবল প্রতিহতের ব্যর্থ চেষ্টা করে পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।
কয়েকদিন ঘটা করে সংবাদ সম্মেলন হচ্ছে, বড় বড় প্রতিশ্রূতি, বিশাল বিশাল তদন্ত কমিটি, আদালতে যাওয়া আসা এক পর্যায়ে নিরব নিস্তব্ধ, সবকিছু শান্ত। ওদিকে শোষিতের রক্ত বিক্রির টাকায় কোটপরা আইনওয়ালাদের বাড়িতে বড় বড় মাছ, গরু-খাসি-দেশি মোরগ মুরগির বাহারী আয়োজন। এ দফা ভুক্তভোগী নিঃস্ব হয়ে এলাকাছাড়া। ফলে আইন হায়েনার পক্ষে হায়েনারা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে একদম দুধে ধোওয়া খাঁটি মানুষ।
বর্তমানে অফিস – আদালত, সামাজিক, রাজনৈতিক সকল প্রতিষ্ঠান অর্থের মানদণ্ডে বিচার্য। ফলে মনুষ্যত্ব, বিবেক, মানবিকতা নির্বাসিত। আজকাল পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক প্রত্যেকটি স্থানে মানুষ মূল্যায়িত হয় অর্থ প্রাচুর্যের মাধ্যমে। তাই প্রকৃত পারিবারিক বন্ধন, সামাজিকতা, সুস্থ সংস্কৃতি ও রাজনীতি চর্চা লোহার সিন্দুকে আবদ্ধ। এর ফলে সাম্রাজ্যবাদ, পেশি ও অস্ত্রের ঝনঝনানি, জুলুমবাজ, দূ্ণীতিবাজ চরমভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তাইতো শোষিতের নিরব আর্তনাদ আকাশ – বাতাস ভারী করে তুলছে।
প্রতিভা, সৃজনশীলতা, সৃষ্টিশীলতা শোষকদের রক্তচক্ষুর আড়ালে লুকিয়ে পড়ছে। ফলে সার্টিফিকেটধারী শিক্ষিতদের ভীড় বাড়লেও মেধা – মননে পরিপূর্ণ মানুষের অভাবে দেশের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন এখন অধরা অলিক বস্তুতে পরিণত হচ্ছে। যে প্রতিষ্ঠান থেকে মানুষ মূল্যবোধ, প্রকৃত শিক্ষা, ন্যায় নীতি, সংস্কৃতি চর্চা, আচার – আচরণ, সামাজিকতা, নৈতিকতা শিখবে সে প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিষ্ঠানের কর্মরতদের নিয়মিত অবহেলা, অবজ্ঞা, অবমূল্যায়ণের কারণে হিতে বিপরীত হচ্ছে।
নামধারী, মূল্যবোধহীন নীতি – নৈতিকতা, উগ্র অসামাজিক ব্যক্তিরা সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হয়ে অতি লোভে, ক্ষমতার মোহে সমাজকে করছে কলঙ্কিত, রাজনীতিকে করছে কলুষিত, আর ধর্মকে করছে হেয় পতিপন্ন, প্রশ্নবিদ্ধ।
এতে বেড়ে যাচ্ছে অসামাজিকতা, চলছে অপরাজনীতি, বাড়ছে অপসংস্কৃতি, মাথাচাড়া দিচ্ছে মৌলবাদী চক্র, সুযোগ নিচ্ছে ধর্ম ব্যবসায়িরা। ফলে, সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়ছে, নিবেদিতপ্রাণরা রাজনীতি ছাড়ছে, মৌলবাদী ও ধর্ম ব্যবসায়িরা একটির পর একটি গুজব ও উস্কানির মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করে সুযোগ খুঁজছে রাষ্ট্রের সিংহাসন দখল করার।
এহেন পরিস্থিতিতে বিবেকবানরা মহাবিপদে নিজেদের লুকিয়ে রাখতে বাধ্য হচ্ছে কারণ তাদের উপর বিবেকহীনরা কড়া নজর রাখছে। এককথায়, বিবেকবান সুশীলরা আজ গৃহবন্দী। এ অবস্থা চলতে থাকলে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলা মোটেও সম্ভব নয়।
সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে সুস্থতা ফিরাতে, রাজনীতিকে কুচক্রী হায়েনা মুক্ত করতে, সংস্কৃতিতে প্রাণ ফিরাতে নিবেদিত, পরীক্ষিত, দক্ষ ও অভিজ্ঞদের স্থান দিতে হবে, বিভিন্ন কারণে অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তি প্রয়োগের মাধ্যমে আইনের শাসন প্রয়োগ করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
You must be logged in to post a comment.