মোঃ সাইদুল হাসান সেলিম।।
শিক্ষার মান উন্নয়ন, যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন এবং বিশ্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে আমরা পিছিয়ে যাবো এটা নিশ্চিত। যুগোপযোগী শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের অবদান রাখতে হবে। শিক্ষা আদান-প্রদান একটি জটিল প্রক্রিয়া, আর এই কর্মকান্ডের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষকরা সভ্যতার অভিভাবক, সমাজের বিবেকবান বলিষ্ঠ প্রতিনিধি। তারা শিক্ষার্থীর চরিত্র গঠন, নৈতিক ও মানবিক গুণাবলি বিকাশ এবং সমাজ পরিবর্তনের অনুঘটক ও সুশীল সমাজ তৈরিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিনম্র শ্রদ্ধা শিক্ষকদের যাঁরা শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে নিরলস পরিশ্রম করেন এবং এই দেশটাকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করেন, ভালোবাসেন। অথচ সীমাহীন বৈষম্যে ক্ষুব্ধ দেশের বেসরকারি শিক্ষকরা। সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্যে বৈষম্যের প্রাচীর টেনে দিয়ে শিক্ষার মানোন্নয়ন অসম্ভব। শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা শুধুমাত্র লৌকিকতা সুবিন্ন্যস্ত বাক্যগাঁথার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে প্রকৃত সম্মান মর্যাদা দেয়া হয় না।
শিক্ষকতা মহান পেশা। পৃথিবীর যেকোন প্রান্তে শিক্ষকদের সম্মান মর্যাদা সবার উপরে। শিক্ষকরা জাতি গড়ার নিপুণ কারিগর, জাতির সুর্য সন্তান ও বিবেক। যে কোন জাতির আদব কায়দা, সততা, মানবিকতা, মূল্যবোধ দেশপ্রেম তার উপর ভিত্তি করে ঐ দেশের শিক্ষার মান মূল্যায়ন করা হয়। জাপানে শিক্ষকদের উচ্চ আদালতে সম্মানের সঙ্গে চেয়ারে বসার অনুমতি আছে। বাংলাদেশের বেসরকারি শিক্ষকদের বিভিন্নভাবে বৈষম্যের শিকার করে ঠকানো হচ্ছে। শিক্ষাক্ষেত্রে বিরাজমান বঞ্চনা বৈষম্য ও নির্যাতন- এটা মানবিক কারনেই মেনে নেয়া উচিত নয়। দেশের বাস্তবতায় একজন পিয়নের চেয়ে একজন শিক্ষককের বেতন-ভাতা কম, এই বাস্তবতা মেনে নেয়া খুবই কষ্টকর ও লজ্জার। বেসরকারি শিক্ষকগণ দেশের ৯৭ শতাংশ শিক্ষার মূখ্য ভুমিকা পালন করছেন- এ সত্যিটা সবারই উপলব্ধিতে থাকা প্রয়োজন।
স্বাধীনতার ৪৭ বছর পেরিয়েও বহুধা বিভক্ত দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা। দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মাত্র ৩% সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বল্প ব্যয়ে পড়াশুনা করছে সরকারি কর্মকর্তা, পুঁজিপতি ধনিক শ্রেণীর মানুষের সন্তানেরা। অবশিষ্ট ৯৭% বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা করছে, সুবিধাবঞ্চিত,নিম্নবিত্ত , নিম্ন মধ্যবিত্ত ও প্রান্তিক অসচ্ছল জনগোষ্ঠীর মানুষের সন্তানেরা। যাদের সামর্থ্য সীমিত অথচ শিক্ষা ব্যয় অনেকেরই সামর্থ্যের বাইরে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসেবেই প্রাথমিক হতে উচ্চ শিক্ষা স্তরে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের মধ্যে থেকে প্রতিবছর ৬৩% শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ছে। এই শিক্ষা বঞ্চিত ঝরে পড়া শিক্ষার্থীরা কোথায় যাচ্ছে? পরবর্তীতে এরাই সামাজে নানাবিধ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। ঝরে পড়া রোধের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করে সরকারের যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন ছিল বহু পূর্বেই।
আমাদের মানসম্মত শিক্ষা ও সার্বজনীন শিক্ষার বিষয়ে গুরুত্ব সহকারে ভাবনা চিন্তা করার সময় এসেছে। নিম্নমানের শিক্ষায় নানাবিধ অন্যায় অপরাধে জড়িয়ে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে আমাদের যুবসমাজ। শিক্ষা বঞ্চিত ঝরে পড়া শিক্ষার্থীরা সামাজে নানাবিধ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। সকলের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিতকরণে, শিক্ষার দায়িত্ব ও নিয়ন্ত্রণ সরকারকেই নিতে হবে। অবৈতনিক শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টিতে বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের মাধ্যমে শিক্ষা বঞ্চিত ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মূল শ্রোতধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে। চলতি বছরেই বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা লাভ করছে আড়াই কোটির বেশী শিক্ষার্থীরা। এসডিজি এবং এমডিজি লক্ষ্য অর্জন করতে হলে, শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করা জরুরি। সংসদে অনুমোদিত জাতীয় শিক্ষানীতি-১০ এর নীতিবাক্য গুলো শুধুমাত্র কালো কালির আঁচড়েই আছে, বাস্তবায়নে নেই। দীর্ঘ ১০ বছরে শিক্ষানীতির ২০ শতাংশও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। শিক্ষাব্যবস্থায় ক্ষুদ্র কোন সমস্যা মহামারী আকার ধারণ করা পর্যন্ত, কেউই গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা করে না। মূলতঃ আমাদের শিক্ষার লক্ষ্য উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করা নিয়ে সরকার, শিক্ষানুরাগী, শিক্ষাবিদ কারোরই তেমন কোন গরজ নেই। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসচ্ছল জনগোষ্ঠীর মানুষের বাস্তবতা এবং শিক্ষকদের জীবনযাত্রা মূল্যায়ণ করা দরকার। শিক্ষার লক্ষ্য উদ্দেশ্য পূরণে প্রয়োজন গুনগত মানের, যুগোপযোগী, মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন ও প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ জনশক্তি, কেবল মাত্র তা হলেই টেকসই উন্নয়নের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে।
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার বৈষম্য দূরীকরণের একমাত্র পন্থা, সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা। দেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য জনিত কারণে শিক্ষকদের মাঝে যে প্রচন্ড ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে, এতে শিক্ষার মানের উপর ব্যাপকপ্রভাব ফেলছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মানের ত্রুটি বিচ্যুতি নিয়ে ইতিমধ্যেই দেশ বিদেশে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ব ব্যাংকের বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাথমিক সমাপনী ১১ বছরের শিশু লেখা পড়ায় সাড়ে চার বছর পিছিয়ে থাকছে। তাহলে শিক্ষা শেষে শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক মান কোথায়? এই নিম্ন মানের সনদ নির্ভর শিক্ষা সমাপনকারী জনগোষ্ঠী সমাজের কোন কাজে আসবে? দেশের শিক্ষার্থীদের অনেকেই উচ্চমাধ্যমিকের পর আর উচ্চ শিক্ষায় যাচ্ছে না। তাদের ক্ষেত্রে কী হবে? এদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ।
দেশের বিপর্যস্ত শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে হবে সরকার সহ সকলকেই। সরকারের মন্ত্রী এমপিদের সদিচ্ছা থাকলেও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দূর্নীতি এতটুকুও কমেনি। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা ও নিজ দায়িত্ব পালনে বিশ্বস্থ না হলে সরকার যত ভাল উদ্যোগ গ্রহণ করুকনা কেন, সুফল পাওয়া অসম্ভব। শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। নকল প্রশ্ন ফাঁস, জিপিএ বিক্রি সহ নানাবিধ দুর্নীতিতে বিপর্যস্ত শিক্ষাব্যবস্থা। শিক্ষার দায়িত্ব ও নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের হাতে নিতে শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ জরুরি। শিক্ষকরা আজকে পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় বাস্তবতায় সকলের কাছে অবহেলা আর অমর্যাদার পাত্র। বৈষম্যের কারণে শিক্ষকদের মধ্যে বিরাজ করছে চরম ক্ষোভ আর হতাশা। সর্বোচ্চ নজরদারি বাড়ানো উচিত শিক্ষকদের জীবন মানোন্নয়নে।
পরিশেষে বলবো, সকল নাগরিকের শিক্ষার সমান অধিকার নিশ্চিত করতে এখনই একযোগে এমপিওভূক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের ঘোষণা দিন। বিশ্বাস করি এতে শিক্ষাক্ষেত্রে ঐতিহাসিক অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ইতিহাসে চিরকাল স্মরনীয় ও বরণীয় হয়ে থাকবেন।
লেখক
সভাপতি
বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী ফোরাম
You must be logged in to post a comment.