স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ ক্রমাগত উন্নতির দিকে ধাবিত হচ্ছে, তবে তা চিতার গতিতে না হয়ে এগুচ্ছে কচ্ছপের গতিতে। বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৪৭ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে কিন্তু সময়ের সাথে সমান্তরালে পাল্লা দিয়ে জাতির কাংখিত ও আশানুরূপ অগ্রগতি তেমন হয়নি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ধারাবাহিক উন্নয়নের ব্যপকতায় জাতি আজ সত্যিই অভিভূত ও উৎফুল্ল। আন্তর্জাতিক ভাবেও উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি, এটি আজকে আর কথার কথা নয়। ১৯৭২/৭৩ অর্থবছরে মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকার বাজেট থেকে যাত্রা শুরু করে ২০১৮/১৯ অর্থবছরে জাতীয় বাজেটের আকার দাড়িয়েছে ৪ লক্ষ ৪৬ হাজার কোটি টাকায়, এটি একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন। দেশের রাস্তাঘাট পুল কালভার্ট অবকাঠামো ও শিক্ষা সংস্কৃতি বিস্তারে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। আজকে দেশের মানুষের যেমনি সামাজিক জীবন মানের উন্নয়ন ঘটেছে, তেমনি সামাজিক বাস্তবতায় আশাআকাঙ্ক্ষা এবং চাহিদার পরিধিও বৃদ্ধি পেয়েছে।
তথ্য প্রযুক্তির অভাবনীয় সাফল্যে সমগ্র পৃথিবী আজকে একটি গ্রামে পরিনত হয়েছে এবং নতুন নতুন কর্মসংস্থান এবং প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। আমাদের আগামী প্রজন্মকে যুগোপযোগী মানসম্মত শিক্ষা এবং আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মানুষের সাথে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে হবে। আর এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে টিকে থাকতে হলে মানন্নোত শিক্ষায় আগামী প্রজন্মকে দক্ষ ও যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে। আমাদের স্বাধীনতার প্রায় সমসাময়িক স্বাধীন দেশ মালয়েশিয়া। মালয়েশিয়ায় আজকে শুধুমাত্র গুনগত শিক্ষার মানোন্নয়নে আত্মনিয়োগ করে পৃথিবীতে গৌরবময় ঐতিহ্য সৃষ্টি করতে পেরেছে। বাংলাদেশ থেকে আজকে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের জন্য অসংখ্য শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দেশ সহ মালয়েশিয়া যাচ্ছে। বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিয়ে অনেকেই আর দেশে ফিরে আসেনা। ফলে আমারা একদিকে প্রতিভাবান মেধাবীদের হারাচ্ছি অন্য দিকে এই বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ব্যয় নির্বাহ করতে দেশের অর্থনীতির ব্যপক ক্ষতি হচ্ছে। মালদ্বীপ ছোট্ট একটি দেশ, অথচ তাদের শতভাগ শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর শুধুমাত্র বৈদেশিক রেমিট্যান্স দিয়েই তাঁরা জাতীয় বাজেট প্রনয়নে সক্ষমতা অর্জন করতে পেরেছে। অথচ আমরা এখনো শিক্ষাকে বেসরকারি করণের পুরাণো ধারনাকে আকড়ে ধরে শিক্ষাকে বাণিজ্যিকীকরণের পরিকল্পনায় সন্তুষ্ট।
বাংলাদেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়েছে ঠিক। উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রেই আমরা সফলতা অর্জনে সক্ষমতাও দেখিয়েছি। সেই সফলতার ধারাবাহিকতা রক্ষায় এখনই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নের উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। শিক্ষা ব্যয় অসচ্ছল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সক্ষমতার বাহিরে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় শিক্ষার সুযোগ সহজলভ্য করতে হবে। ঝরে পড়া রোধের উপায় উদঘাটন করতে হবে। বিপুল পরিমাণ ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মূল শ্রোতধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে। দ্রুত শিক্ষা আইন প্রণয়ন করে, শিক্ষার মানোন্নয়নে আত্মনিয়োগ করতে হবে। ব্রিজ রাস্তাঘাট পুল কালভার্ট ইমারত অট্টালিকা ক্ষণস্থায়ী কিন্তু জ্ঞান অবিনশ্বর। যে কোন জাতির উন্নতির মূল উপাদান নিঃসন্দেহে মানসম্মত শিক্ষা।
পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই শিক্ষকদের সম্মান মর্যাদা সবার উপরে সমুন্নত। তাই তাঁরা উন্নতিতে দ্রুত এগিয়েও গেছে। দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতার শিক্ষকদের বঞ্চনা বৈষম্যের দূরীকরণে শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ জরুরি। আর জাতীয়করণে দেশের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা নয়, সরকারের সদিচ্ছার অভাব। বিষ্ময় প্রকাশের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটান শিক্ষক। অথচ সেই শিক্ষকতা পেশাই শিক্ষকদের কাছে একটি অভাবনীয় বিষ্ময়। ওস্তাদের কদরের আশায় এবং যারা শিক্ষা গুরুর সম্মান মর্যাদার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে শিক্ষকতায় প্রবেশ করেছিলেন, তাঁরাই আজকে নিজেদের অদূরদর্শিতা জন্য অনুতপ্ত এবং ক্ষুব্ধ। বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্যে বৈষম্য এবং ক্ষোভের সৃষ্টি করে শ্রেনী কক্ষের বাইরে টেনে আনা সঠিক নয়। শিক্ষকরা শ্রেণীকক্ষে পাঠদান করতেই সাচ্ছন্দ্য বোধ করে।
১৯৭২ সালে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে, একত্রে সাইত্রিশ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেন। তাঁরই ধারাবাহিকতায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ২৬,১৮৩টি রেজিঃ প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক সদিচ্ছায় আমরা একটি জাতীয় শিক্ষানীতি পেয়েছি। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় শিক্ষানীতির বাস্তবায়নে ব্যপক প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছে। মূলত শিক্ষানীতি একটি নীতি, ইহার আইনি কোনো কাঠামো নেই। একটি জাতীয় শিক্ষা আইনের অভাবে শিক্ষানীতির মূল উদ্দেশ্যগুলো সম্পূর্ণ পরতে পারেনি সরকার। অথচ এই ব্যর্থতার জন্য কাউকে কখনো জবাবদিহিতা করতে হয়েছে এমনটিও শুনা যায়নি।
ইতিপূর্বে বিশৃঙ্খল বৈষম্যের অবসান, শিক্ষা মানের গুনগত পরিবর্তন এবং শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের লক্ষ্যে ব্যখ্যা বিশ্লেষণ করণীয় বিষয়, সুবিধা, শিক্ষাক্রম, শিক্ষক ও প্রশিক্ষণ বিষয়ে, বিভিন্ন কলামে যৌক্তিক পরামর্শ মতামত প্রকাশ করেছিলাম। দীর্ঘ ২৮ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার আলোকে বিভিন্ন কলামে শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্পর্কে অনেক ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ পরামর্শ প্রদান করেছি। কিন্তু সরকার বা শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কুম্ভ কর্ণকুহরে সামান্যতম প্রবেশ করেছে, এমনটা মনে হয় না। তারপরও বলবো, দেশটা আমাদের সকলের । প্রতিটি দিন প্রাত্যহিক সমাবেশে “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি” এই প্রাণের স্পন্দনের মাধ্যমে শুরু হয় শিক্ষকদের দৈনন্দিন কর্মযজ্ঞ। কোন পেশাজীবী আছেন কি? যারা প্রতিদিন কাজের শুরুতে হ্রদয়ে পরম মমতায় দেশটাকে ভালবাসি বলে কাজ শুরু করেন?
আমাদের আগামী প্রজন্ম নিকট ভবিষ্যতে দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করবে। সুতরাং তাদেরকে মানন্নোত শিক্ষা, মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন যোগ্য দক্ষ জনশক্তি হিসেবে তৈরির ক্ষেত্র সৃষ্টি করে দেয়া আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব এবং কর্তব্য। শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়ন এবং জাতীয়করণের দাবিতে বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারি ফোরাম জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে প্রচন্ড শীত বৃষ্টি উপেক্ষা করে সারা দেশ থেকে পর্যায়ক্রমে লক্ষাধিক শিক্ষকরা নিয়মতান্ত্রিক অনশন কর্মসূচি পালন করেছেন। সেই সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহান সংসদে মানদণ্ডের ভিত্তিতে জাতীয়করণ করার কথা বলেন। সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুই সচিববৃন্দঅনতিবিলম্বে শিক্ষকদের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ও বৈশাখী ভাতা প্রদানের অংগীকার করে ছিলেন। বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারি ফোরাম মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিশ্বাসী একটি অরাজনৈতিক পেশাজীবী সংগঠন, এখানে কারো রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্য নেই। ফোরাম শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নে ও বঞ্চিত বৈষম্যে নিমজ্জিত বেসরকারি শিক্ষকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। দেশের সর্বস্তরে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা এখন সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে রাষ্ট্র যন্ত্রের কারোর উপরেই এখন আর সাধারণ মানুষের আস্থা বিশ্বাস বলতে অবশিষ্ট নেই।
বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারি ফোরাম দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, মহান সংসদের চলতি অধিবেশনেই মানবতার জননী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ঐতিহাসিক ঘোষণা দিবেন। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের মাধ্যমে সকল বিশৃঙ্খলা এবং বৈষম্য দূরীকরণের একমাত্র সঠিক পন্থা। দেশের সমগ্র শিক্ষাবিদ, শিক্ষানুরাগী এবং বেসরকারি শিক্ষক সমাজের দৃষ্টি নিবদ্ধ এখন সরকারের মেয়াদের শেষ সংসদ অধিবেশনের শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সকলের শুভবুদ্ধির উদয়ের প্রত্যাশায়।
মোঃ সাইদুল হাসান সেলিম
সভাপতি
বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারি ফোরাম
ঢাকা বাংলাদেশ।