নুরদের গ্রেফতার দাবিতে অনশনে অসুস্থ ঢাবি ছাত্রী, দেয়া হল স্যালাইন

ঢাবি প্রতিনিধি
শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২০, ১১:০২ অপরাহ্ন
নুরদের গ্রেফতার দাবিতে অনশনে অসুস্থ ঢাবি ছাত্রী, দেয়া হল স্যালাইন

ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেছেন ভুক্তভোগী। প্রকাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে অভিযুক্তরা। অংশ নিচ্ছেন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে। করে বেড়াচ্ছেন সভা সমাবেশ, মিছিল মিটিং। এতে ক্ষুদ্ধ শঙ্কিত ওই ঢাবি শিক্ষার্থী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে অভিযুক্তদের গ্রেফতার দাবিতে বৃহস্পতিবার (০৮ অক্টোবর) আমরণ অনশন করছেন তিনি। অভিযুক্তরা গ্রেফতার না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি থেকে না সরার ঘোষণা দিয়েছেন।

ভুক্তভোগী ছাত্রী গত ২০ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে রাজধানীর লালবাগ থানায় ধর্ষণ মামলা করেন। মামলায় নুরের বিরুদ্ধে ধর্ষণে সহযোগিতার অভিযোগে করা হয়। পরে ২১ সেপ্টেম্বর তিনি কোতোয়ালি থানায় একই অভিযোগে আরেকটি মামলা করেন।

মামলায় প্রধান আসামি বা ধর্ষণকারী হিসেবে অভিযুক্ত করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী হাসান আল মামুনকে। মামলার অন্য আসামিরা হলেন, নাজমুল হাসান, মো. সাইফুল ইসলাম, নাজমুল হুদা ও আবদুল্লাহ হিল বাকি।

আমরণ অনশনে বসা সেই ছাত্রী শুক্রবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাৎক্ষণিক তাকে স্যালাইন দেওয়া হয়। হাসপাতালে নেওয়ার কথা বললেও তিনি যেতে রাজি হননি।

ওই ছাত্রী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘শুক্রবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে অসুস্থ বোধ করি। তখন বমি হয় আমার। অনশনের কারণে শারীরিকভাবে কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছি। কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু আসামিরা গ্রেফতার না হওয়া পর্যন্ত অনশন ভাঙবো না। আমার সঙ্গে যা হয়েছে, তা যেন অন্য কারও সঙ্গে না হয় সে জন্যই এই ত্যাগ স্বীকার করছি।’

ভুক্তভোগী ছাত্রী তার অভিযোগে বলেন, ‘আমার সঙ্গে হাসান আল মামুনের পরিচয়ের সূত্র ধরে বিভিন্ন সময়ে ম্যাসেঞ্জার, ইমো ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে কথোপকথন হয়। সেখানে আমাকে শারীরিক সম্পর্কের ইঙ্গিত দেওয়া হয়। গত ৩ জানুয়ারি দুপুরে হাসান আল মামুন আমাকে তার রাজধানীর নবাবগঞ্জ, মসজিদ রোড, ১০৪ নম্বর বাসায় যেতে বলে। সেখানে আমাকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ করে সে।’

শনিবার (১০ অক্টোবর) আন্দোলনরত ভুক্তভোগী ওই ছাত্রী সময় সংবাদকে বলেন, “যে আসামি, তাদের হচ্ছে সস্তা জনপ্রিয়তা। তারপর হচ্ছে তাদের পেছনে কোনো অদৃশ্য শক্তি কাজ করছে কিনা বা আসামি যে প্রভাবশালী, সেটার প্রভাব পড়ছে কিনা, সে জায়গা থেকে আমার শঙ্কা। সেই শঙ্কা থেকে আমার এই অবস্থান কর্মসূচি।”

অন্যদিকে ডাকসু ভিপি নুর তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত দাবি করে আসছেন। এবং এটিকে তিনি ফেসবুক লাইভ এবং স্ট্যাটাসে ‘স্বাভাবিক’ ঘটনা এবং রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা হিসেবে উল্লেখ করেন। ২১ সেপ্টেম্বর ফেসবুক লাইভে এসে নুর নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। মামলার ঘটনায় তিনি তীব্র ক্ষোভও প্রকাশ করেন। এ বিষয়ে নুরের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি এড়িয়ে যান।

গত ২৬ সেপ্টেম্বর সময় সংবাদে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সাবেক ভিপি নুর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক লাইভ ভিডিওতে দাবি করেন, টাকার বিনিময়ে ছাত্র অধিকার পরিষদকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে ওই শিক্ষার্থী এ মামলা করেছেন। নুরের এমন বক্তব্যের জবাবে ভুক্তভোগী ওই ছাত্রীও পাল্টা ভিডিও প্রকাশ করেন সামাজিক মাধ্যমে। এতে ভুক্তভোগী বলেন, নুর তার অভিযোগ প্রমাণ না করতে পারলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

৪ অক্টোবর নুরসহ ৬ আসামিকে গ্রেফতারের নির্দেশনা চেয়ে আদালতে আবেদন করেছেন সেই ছাত্রী। ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদা আক্তারের আদালতে এ আবেদন করেন তিনি। বিচারক শুনানি শেষে নথি পর্যালোচনা করে পরে আদেশ দেবে বলে জানান।

শনিবার (১০ অক্টোবর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণ বিরোধী এক কর্মসূচিতে অংশ নেন ছাত্রলীগ নেতারা। এসময় তারা ভিপি নুরসহ এ ঘটনায় অভিযুক্ত কেউই গ্রেফতার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

এতে ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় বলেন, ‘ধর্ষক যারা তাদের বিরুদ্ধে আমরা প্রতিবাদ করেছি। কিন্তু আমরা কি দেখতে পাই? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। কই সেই মামলায় আমরা কাউকে গ্রেফতার হতে দেখিনি।’

সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য্য বলেন, দুঃখের বিষয় একটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে। সেই মামলায় অভিযুক্ত কাউকে তো গ্রেফতার হতে দেখিনি।

এর আগে গত ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনায় ডাকসুর সাবেক ভিপি নুর ও ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে ছাত্রলীগ।

উল্লেখ্য, মামলার অভিযোগ পত্রে ভুক্তভোগী উল্লেখ করেন, ‘২০ জুন বিষয়টি ভিপি নুরকে মৌখিকভাবে বিষয়টি জানাই। সে বলে মামুন আমার পরিষদের, আমার সহযোদ্ধা। তার সঙ্গে বসে একটা সুব্যবস্থা করে দেবো। এরপর ২৪ জুন মীমাংসার আশ্বাস দিয়ে তিনি আমার সঙ্গে নীলক্ষেতে দেখা করতে আসেন। কিন্তু মীমাংসার বিষয়টি এড়িয়ে আমাকে এ বিষয়ে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেন। আমি যদি বাড়াবাড়ি করি তাহলে তার ভক্তদের দিয়ে ফেসবুকে আমার নামে উল্টাপাল্টা পোস্ট করাবে এবং আমাকে পতিতা বলে প্রচার করবে বলে হুমকি দেয়।’

মামলার পর ২১ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৮টার দিকে শাহবাগ থেকে সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরসহ ৭ জনকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ। রাজধানীর মিন্টুরোডে গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে নিয়ে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়।

ছেড়ে দেয়ার পর নুর বলেন, আমাকে মুচলেকা নিয়ে তারা (ডিবি) ছেড়ে দিয়েছে। সেখানে (ডিবি কার্যালয়ে) আমাদের সাথে ভাল ব্যবহার করা হয়েছে। নুরুল হক নুর বলেন, আমাকে কেন গ্রেফতার করা হলো? কেন ছাড়া হলো? আর কেনই বা আক্রমণ করা হলো? কিছুই বুঝলাম না। আমরা এরকম বিভিন্ন সময় হামলা-মামলার শিকার হই।

এদিকে ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরুসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহারের দাবীতে দেশের বিভিন্নস্থানে ছাত্র অধিকার আন্দোলনের কর্মীরা প্রতিবাদ ও মানববন্ধন করেন। এসময় তারা বলেন, ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা মিথ্যা ভিত্তিহীন। তাকে হয়রানি করার জন্য মামলা করা হয়েছে। মামলা প্রত্যাহার ও হয়রানি বন্ধের দাবী জানান তারা।

মামলা হাওয়ার একদিন পর গত ২২ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সাংবাদিকদের বলেন, নুরের বিরুদ্ধে তরুণীর দায়ের করা মামলা নিয়ে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মামলা হওয়ার পর ফেসবুক লাইভে নুর বলেন, “আমার বিরুদ্ধে কোনো মেয়ে লালবাগ থানা নাকি লালবাগ কেল্লায় মামলা করেছে, এগুলো আমি জানি না। বিশেষ করে আমাদের নামে এর আগেও অনেক মামলা রয়েছে। এইসব স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে যাচ্ছি, ভারতের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছি সেখানে মামলা হবে না, এটা অস্বাভাবিক। মামলা এক না শতাধিক হবে। এসময় নূর বলেন, বিএনপিকেই দেখেন, তারা তো একটি বড় দল তাদেরও শতাধিক মামলা রয়েছে। তাহলে ভিপি নূর আর কি? তার বিরুদ্ধেও মামলা হবে। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মামলা করেছে, তাও আবার চুরির মামলা! ভিপি নূর চুরি করেছে! ধর্মীয় অনুভূতি নিয়েও মামলা করেছে। টাকা পাচারের মামলাও হতে পারে ভবিষ্যতে। এখনও টাকা পাচার নিয়ে মামলা হয়নি এটা হাস্যকর। মামলা করছে করবে, হামলা করছে করবে, এসব নিয়েই আমাদের চলতে হবে।”

এর আগে ২০১৯ সালে ডাকসু নির্বাচন চলাকালীন রোকেয়া হলের প্রভোস্টকে লাঞ্ছিত ও ভাঙচুরের অভিযোগে নুরুল হকসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়।

Facebook Comments
সংবাদটি শেয়ার করুন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

আরো সংবাদ