মোঃ সাইদুল হাসান সেলিম।।
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে অনেককিছুই পরিবর্তন হয়, পরিবর্তন করতে হয়। কিন্তু তাই বলে শিক্ষার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঘোষণা দিয়ে প্রশ্ন ফাঁস হবে, জিপিএ ফাইভ বাজারে বিক্রি হবে এটা মেনে নেওয়া খুবই কষ্টকর। সর্বোচ্চ ফলাফল যদি বাজারে কেনাবেচা সম্ভব হয় তাহলে শিক্ষার মান বলে কিছুই আর অবশিষ্ট থাকে না। রডের পরিবর্তে বাঁশ, ভূল চিকিৎসায় মানুষ হত্যা, প্রশাসনের দূর্নীতির স্বীকৃতি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের গতিপ্রকৃতির অন্তরায় নয় কি? দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে জনমনে সীমাহীন অসন্তোষ। এমন কোন দিন নেই যেদিন পত্র-পত্রিকা, ফেসবুক ও টেলিভিশন গুলোতে আমাদের শিক্ষার অব্যবস্থাপনা কিংবা ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা না হচ্ছে। কিন্তু আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা শিক্ষা সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকেরা তাতে থোড়াই কেয়ার বা কর্ণপাত করছেন। একটি নীতিনৈতিকতা বিবর্জিত অসুস্থ ধারার বিকলাঙ্গ শিক্ষাব্যবস্থায় ভর করে গোটা জাতি আগামীতে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? সে বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে এখনই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রণয়ন করা দরকার।
দেশে মানসম্মত শিক্ষালাভের সুযোগ নেই বললেই চলে। ফলে আধুনিক মানসম্মত শিক্ষা ও বৈশ্বিক সুবিধা লাভের আশায় প্রতি বছর লক্ষাধিক শিক্ষার্থীরা উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে চলে যাচ্ছে । এছাড়াও বিশ্বসেরা ২ হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকার মধ্যে বাংলাদেশের একটিরও নাম নেই। বাধ্য হয়ে ধনিক ও সম্পদশালীর সন্তানরা যুগোপযোগী মানসম্মত শিক্ষালাভের সন্ধানে পাড়ি জমাচ্ছে বিদেশে। অপরদিকে অবশিষ্টাংশরা দেশের নিম্ন মানের শিক্ষা গ্রহণে বাধ্য করা হচ্ছে। বেসরকারি শিক্ষা ব্যয় প্রান্তিক অসচ্ছল জনগোষ্ঠীর ক্ষমতা বাহিরে হওয়ায় প্রতি বছর ঝরে পড়ছে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সরকারি প্রতিষ্ঠানে শহরকেন্দ্রিক সরকারি কর্মকর্তা ও সম্পদশালীর সন্তানরাই স্বল্প খরচে শিক্ষালাভের সুযোগ পাচ্ছে। অন্যদিকে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অসচ্ছল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সন্তানদের অধিক খরচে লেখা পড়া করতে বাধ্য করা হচ্ছে। বেসরকারি শিক্ষকদের কম বেতন ভাতা প্রদানের মাধ্যমে মেধাবীদের শিক্ষকতায় প্রবেশকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। নিম্নমানের শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে উচ্চ মানের শিক্ষার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। লক্ষ ডলার মূল্যের প্লাটিনা এরোয়ানা মাছটি একজন পিয়ন দ্বারা রান্না করানো হলে তা খাবার অনুপযুক্ত হতে বাধ্য। তেমনি নিম্ন মানের শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে উচ্চ মানের শিক্ষার প্রত্যাশা পূরণ অসম্ভব।
বিদেশে লক্ষাধিক শিক্ষার্থীদের শিক্ষা খরচ বাবদ বছরান্তে চলে যাচ্ছে আনুমানিক ৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি। একদিকে লক্ষাধিক শিক্ষার্থীদের শিক্ষা খরচে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে, অন্যদিকে এইসব শিক্ষার্থীরা উচ্চ শিক্ষা শেষে আর দেশে ফিরে আসছে না। এইভাবেই আমাদের দেশের অর্থ ও মেধা উভয় পাচার হয়ে যাচ্ছে বিদেশে। অথচ আমরা মানসম্মত শিক্ষার্থীর অভাবে হাজার হাজার বিদেশি পরামর্শক ও ইংরেজি পারদর্শীদের অধিক বেতনে নিয়োগ দিতে হচ্ছে, এতেও বছরান্তে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে। আমাদের শিক্ষার মানোন্নয়নে যতটা গুরুত্ব দেয়া উচিত ছিল তা থেকে আমরা প্রচন্ড ভাবে অমনোযোগী। মেকি দেশ দরদী শিক্ষার বড়ো বুড়ো কর্তাদের ঘুম কখন ভাংগবে? দেশ যতোটা দ্রুততম সময়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হওয়ার কথা ছিল, তা আমরা পারিনি, আমাদের শিক্ষার নিম্নমান, সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাব, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণেই।
আমাদের শিক্ষার মান যে যাচ্ছেতাই অবস্থা, তা এখন আন্তর্জাতিক ভাবেও স্বীকৃত। যদিও আমাদের দুর্নীতিগ্রস্ত কর্তাব্যক্তিরা বরাবরই তা অস্বীকার করে আসছিলেন। প্রমাণ স্বরুপ বিগত ১৩/০৮/২০১৮ বিশ্ব ব্যাংক বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষার (দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত) মানোন্নয়নে ৫২০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। যদি আমাদের শিক্ষার নিম্নমান না হবে, তা হলে বিশ্ব ব্যাংক বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে হাজার হাজার কোটি ব্যয়ে সম্মত হয়েছেন কেন? এতেও প্রমাণিত হয় যে আমাদের যুগোপযোগী শিক্ষার সত্যিকারের মানোন্নয়ন জরুরি।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রকৃতপক্ষেই ঢেলে সাজানো দরকার এবং সরকারও সে কথা স্বীকার করে নেওয়া উচিত। যেহেতু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটি-বিচ্যুতি ও দুর্নীতি ধরা পড়েছে, সেহেতু এ বিষয়ে অবশ্যই সরকারের বিশেষ কার্যকর দৃষ্টি দেওয়া দরকার। যদি দেশের বিশিষ্টজনের পরামর্শ ও পর্যবেক্ষণ সঠিক হয় তাহলে সরকারের উচিত হবে জনপ্রত্যাশা ও মানসম্মত শিক্ষার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যাবলী সমাধানে গুরুত্বের সাথে তৎপর হওয়া।
শিক্ষা আদান-প্রদান একটি জটিল প্রক্রিয়া। শিক্ষা যদি জাতির মেরুদণ্ড হয়, তবে শিক্ষক শিক্ষার মেরুদন্ড। তাই বাস্তবতার নিরিখে শিক্ষার মানোন্নয়নে সর্বোচ্চ দৃষ্টি দিয়ে শিক্ষকদের আকর্ষণীয় বেতন-ভাতা, মর্যাদা ও নিরাপত্তার বিষয়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনা দরকার।
শিক্ষাক্ষেত্র সরাসরি সৎ-জ্ঞানী-গবেষক ও সৃজনশীল মেধাবী শিক্ষকের হাতে তুলে দেওয়া প্রয়োজন। শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার দিয়ে বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন। শিক্ষকদের সামাজিকভাবে মর্যাদাপূর্ণ ও আর্থিক নিরাপত্তা দেওয়া প্রয়োজন। দারিদ্র্যতা আর অভুক্ত উদরে থেকে কেউ সঠিক ভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে না। যে বা যারা বলেন তাই, শিক্ষকতা সেবা বা ব্রত, তাঁরাও এক সময় সেই কাজ করা থেকে বিরত থাকেন। একটি সরকারের ঐকান্তিক সদিচ্ছা থাকলে পাঁচ বছরেই একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করা সম্ভব। এই জন্য প্রয়োজন জনগণের যৌক্তিক পরামর্শ, সরকারের শোনার আগ্রহ, উদারতা আর সেই পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করার নৈতিক মানসিকতা।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক অবস্থায়ও, নিরব দুর্ভিক্ষ চলাকালীন সময়ে অসীম সাহস, দৃঢ় মনোবল ও শিক্ষার প্রতি দরদ ও ভালোবাসার কারণেই একত্রে ৩৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেছিলেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট বন্ধ করা গেলে এমপিও ভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা সম্ভব। প্রয়োজন সঠিক নীতিনৈতিকতা সম্পন্ন বলিষ্ঠ চিত্তের একজন শিক্ষামন্ত্রী ও একটি প্রকৃত শিক্ষাদরদী সরকার। বর্তমানে বাংলাদেশে যেভাবে শিক্ষাব্যবস্থা চলছে তাতে কিছু সংখ্যক শিক্ষা ব্যবসায়ী ছাড়া দেশের একজন মানুষও খুশি কিনা সন্দেহ। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে এবং খুব ভালো করেই চলছে একথা একজন রাতকানাও বিশ্বাস করবে না। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা অনেকটাই অটিজম শিশুর মতো, হয়তো কোন একটি বিশেষ বিষয়ে পারদর্শী। সচেতন অভিভাবক মহল আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে এখন মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছে। যেখানে অভিভাবকরা আশায় বুক বেঁধে থাকেন, আমাদের সন্তানেরা উচ্চ শিক্ষা লাভের পর ভালো কোন কর্ম বা পেশায় নিযুক্ত হবে। কিন্তু যখন অভিভাবকরা দেখেন তাদের সন্তানরা কোথাও প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না, তখন স্বভাবতই শিক্ষার প্রতি অভিভাবকদের মধ্যে একধরনের অনিহা প্রকাশ পায়। এমন একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয় যে, এই অথর্ব বিকলাঙ্গ লেখাপড়া শিখে কি হবে? শুধুমাত্র অর্থের অপচয় মাত্র।
বিগত দিনে দেশের বেসরকারি স্কুল-কলেজে ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগে ঘুষ লেনদেনের চিত্রে যে কোনো বিবেকবান মানুষই আঁতকে উঠবেন। শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেতে হলে লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ দিতে হতো। কোনো শিক্ষক যখন শিক্ষাদানের মতো পবিত্র পেশায় প্রবেশের আগেই মোটা অংকের টাকা ঘুষ দেন, তখন তিনি কিভাবে শিক্ষার্থীকে নীতি-নৈতিকতা শিক্ষা দিবেন? অবস্থাটা এমন পর্যায়ে ছিল যে, রাজনৈতিক দলীয় বিবেচনাকে প্রধান্য ও টাকার কাছে হারমানছিল মেধাবীরা। এনটিআরসিএ’র নিকট থেকে নিয়োগের ক্ষমতা পুনরায় ম্যানেজিং কমিটির হাতে দেয়ার সুপারিশ দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়ার সামিল। শিক্ষাব্যবস্থার দুর্নীতি সর্বোচ্চ পর্যায়েও সহনীয় মাত্রায় স্বীকৃত। শিক্ষা বিভাগের একটি মাত্র প্রকল্পে, স্কুল কলেজে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমে প্রজেক্টের ল্যাপটপ সরবরাহে দূর্নীতি অনিয়মের খপ্পরে পড়েছে ১,৩৫৩ কোটি টাকা মাত্র (দৈনিক সমকাল)। দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নে আমাদের অর্থনৈতিক অভাব নয়, আমাদের সদিচ্ছার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। আর শিক্ষা বিভাগের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব হলে, একযোগে সকল এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা সহজেই সম্ভব। শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষাব্যবস্থার জাতীয়করণই যৌক্তিক সমাধান। এতে শিক্ষাব্যবস্থার একক দায়িত্ব ও নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে চলে যাবে। সরকার দক্ষ ও গুনগত মেধাবীদের পিএসসির আদলে নির্বাচন করে শিক্ষকতায় নিয়োগ দিতে পারবে। সরকারের সকল নির্দেশনার বাস্তবায়ন ও সুষ্ঠু তদারকি করা সম্ভব হবে।
দেশের সর্বস্তরের মানুষের যৌক্তিক প্রত্যাশা পূরণ ও রূপকল্প’২০৪১ বাস্তবায়নে, শিক্ষাব্যবস্থার সকল অনিয়ম,অপচয়,দুর্নীতি অব্যবস্থাপনা রোধকল্পে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাকেই সরাসরি হস্তক্ষেপ সহ কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশ্ব মানবতার জননী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, “শিক্ষা ব্যয়কে আমি খরচ হিসেবে দেখিনা, বিনিয়োগ হিসেবে দেখি”। উক্ত বক্তব্যের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা রেখে আকুল নিবেদন, একযোগে সকল এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের ঘোষণা দিন। শিক্ষার মানোন্নয়নে বিরল অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে চির স্বরনীয় ও বরণীয় হয়ে থাকুন।
লেখক
সভাপতি
বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারি ফোরাম
ঢাকা বাংলাদেশ।
You must be logged in to post a comment.