বোঁটা
-খন্দকার ফিরোজ আহম্মেদ
একটা শিয়াল সকাল বেলা খাবারের সন্ধানে বের হলো। বনের পাশে দেখলো একটা এঁড়েগরু ঘাষ খাচ্ছে। বেশ নাসুশ নুদুশ। ছাগল হলে চান্স নেয়া যেতো কিন্তু এঁড়েটাকে মারা তার পক্ষে সম্ভব না। চলে যাচ্ছিলো, হঠাৎ খেয়াল করলো যে এঁড়েটার পেছনের দুই পায়ের ফাঁকে চিকন বোটায় একখণ্ড মাংস ঝুলছে। এড়ে ঘাষ খাচ্ছে আর মাংস পিণ্ডটা দুলছে। শিয়াল ভাবলো, দূরে কষ্ট করে শিকারে গিয়ে কাজ নেই; এখনই এই মাংস খণ্ডটা ছিড়ে পড়বে, এটা খেলেই তার আজকের খাবারের সমস্যা মিটে যাবে।
এঁড়ে হাটছে, খাচ্ছে; মাংসপিণ্ডটা দুলে দুলে উঠছে। শিয়াল ভাবছে এই বুঝি ওটা ছিড়ে পড়লো। দূরে বসে শিয়াল অপেক্ষা করতেই থাকলো। অপেক্ষা করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো; কিন্তু ওটা ছিড়ে পড়লো না। সন্ধ্যায় এঁড়েটা যখন ফিরে যাচ্ছে, তখন শিয়াল মন্তব্য করলো- ওটা ঠিকই ছিড়ে পড়তো; কিন্তু ওর বোঁটাটা খুব শক্ত। আসলেই তো, শিয়ালের উপলব্ধিটা খুব শক্তিশালী। বোঁটা আসলে খুব শক্ত হয়। কতো বড়বড় ফল ধরে গাছে, কতো মোটা আর পরিপুষ্ট হয়, কতো ওজন হয়, কিন্তু বোটাটা হয় খুব চিকন আর শক্ত। না হলে এতোবড় ফলকে ধরে রাখবে কেমনে!
একটা ফজলি আমের কথাই চিন্তা করেন, এককেজি দেড়কেজি ওজনের হয় একেকটা। আর বোঁটাটা কতো চিকন! দিব্যি হেলছে দুলছে, অথচ ছিড়ে পড়ছে না। বোঁটা আসলে সব সময় চিকন আর শক্ত হয়। বোটার কোষগুলো অন্য কোষের চেয়ে আলাদা গঠনের হয়, এজন্য বোঁটা চিকন হয়েও অনেক শক্ত। আমাদের সমাজ, আমাদের পরিবার, রাষ্ট্র, আমাদের গোটা জীবন ব্যাবস্থা টিকে আছে এই বোঁটার মজবুতির উপর। বোঁটা হলো বন্ধন। পরিবারকে যদি আমরা গাছের সাথে তুলনা করি, তাহলে আমাদের পরিবারের সদস্যরা বিশেষ করে বাবা মা এই বোঁটার মাধ্যমে আমাদেরকে জীবনরস সরবরাহ করে যাচ্ছেন। বোঁটাটা এখানে অদৃশ্য, কিন্তু অদৃশ্য হলেও এতোই শক্তিশালী এই বোঁটা যে, শত ঝড় ঝঞ্ঝাতেও সেটা ছেড়ে না। মায়ের পেটে আমি যখন ছিলাম, তখনো একটা বোঁটায় মায়ের সাথে সংযুক্ত ছিলাম প্লাসেন্টার মাধ্যমে। এটা বোঁটাটা এতোই শক্তিশালী যে আজ পর্যন্ত কোনো শক্তি সেই বোঁটাকে ছিড়তে পারেনি। ছেলে মেয়ে হাজার মাইল দূরে থাকলেও মায়ের মনে টান লাগে এই বোঁটার মাধ্যমে।
আবার বোঁটার অন্য একটা দিকও আছে। সমাজের একশ্রেণীর মানুষ অন্য একটা বোটায় ঝুলে আছে। সেটা হলো নৈতিকতার বিপর্যয়; লোভ, হিংসা, ক্ষমতার লড়াই, দাপট, দুর্নীতি। আমরা অপেক্ষায় থাকি, এই বুঝি সকলের চেষ্টায় দুর্নীতির বোঁটা ছিড়ে মন্দরা ভালো হয়ে গেলো, এই বুঝি গারদে ঢুকে সংশোধন হয়ে গেলো, এই বুঝি নেশা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো, কিন্তু নীতিহীনরা প্রমাণ করে দেয় যে দুর্নীতির বোঁটাও অনেক শক্ত। দিন আসে দিন যায়, কিন্তু জনগণের আশায় ছাই ছিটিয়ে মন্দ মানুষেরা সমাজে সমাজে তাদের দাপট চালিয়েই যায়। কারণ তাদের বোঁটাও অনেক শক্ত।
সমাজ রাষ্ট্র নামক গাছ থেকে বোঁটার মাধ্যমে সমাজের মানুষদের মধ্যে যে রূপ রস পুষ্টি নীতি-নৈতিকতা নিরাপত্তা সুবিধা চালান হওয়ার কথা, সেটা না যাওয়ার কারণে এই বোঁটা অনেক দুর্বল হয়ে গেছে। গাছ দুর্বল হলে তো ফল দুর্বল হবেই!
আমাদের কাজ হলো আমাদের পারিবারকে, সমাজিকে বন্ধনকে শক্তিশালী করার জন্য বিশ্বাস, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, আস্থা নামক বোঁটাকে তরতাজা এবং পরিপুষ্ট রাখা, যাতে বোটার শক্তি আরো বেড়ে যায়; সমাজ থেকে রাষ্ট্র থেকে আমাদের মধ্যে আরো আস্থাশীলতা, দায়িত্বশীলতা প্রবিষ্ট হয়।
You must be logged in to post a comment.