পাকিস্তানের রাজনীতিতে সামরিক ছদ্মাবরণে ‘গণতন্ত্র গণতন্ত্র’ খেলার নতুন বলি হলেন ইমরান খান। একদা সেদেশের ক্রিকেট জগতের ভুবনজয়ী অধিনায়ক নব্বইয়ের দশকে ক্রিকেট পিচ ছেড়ে পা রেখেছিলেন রাজনীতির কঠিন পিচে।
২০ বছরের একটানা কষ্ট, মেধা ও শ্রমের বিনিয়োগে দেশের প্রধানমন্ত্রীও হলেন একসময়। ভেবেছিলেন পাকিস্তানকে দুর্নীতিমুক্ত করবেন। দেশটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিদেশি প্রভুর আজ্ঞায় পরিচালিত হয়ে এসেছে। এবার তিনি সেদেশের জন্য নতুন একটা পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করবেন। তার হাত ধরে শুরু হবে নতুন যুগ।
কিন্তু এই চাওয়াই কাল হলো ইমরানের। পারলেন না তিনিও। জাতীয় পার্লামেন্টের অনাস্থা ভোটের রায়ে গত শনিবার রাতে পূর্বসূরি প্রধানমন্ত্রীদের মতো মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই অকালে গদি ছেড়ে বিদায় নিতে হলো তাকেও।
কিন্তু কী কারণে ঘটল তার এই অকালপতন? এক্ষেত্রে পাঁচটি বিষয়কে মুখ্য হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। প্রথমত, পাকিস্তানের জন্য তার স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের আকাক্সক্ষা। বৈশ্বিক শক্তিবলয়ে বিরুদ্ধ মেরুর দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা। পাকিস্তান দেশটি প্রায় ৭৫ বছর আগে তার জন্মের পরমুহূর্ত থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের আজ্ঞাবহ হিসেবে পরিচালিত হয়ে এসেছে। ষাট ও সত্তর দশকের স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালে ওয়াশিংটনের পরম মিত্র।
আবার ভারত বিরোধিতার জেরে চীনের সঙ্গেও রয়েছে তার সুসম্পর্ক। এই সম্পর্ক কাজে লাগিয়েই একদা বাংলাদেশকে বলি দিয়ে চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সেই পাকিস্তানের সাম্প্রতিক রুশপ্রীতি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি ওয়াশিংটন।
ইউক্রেন যুদ্ধের প্রথম দিনেই পুতিনের সঙ্গে ইমরানের মোলাকাত দৃষ্টিকটু ঠেকেছে তার কাছে। তাও এমন এক সময়ে যখন ইউক্রেন যুদ্ধের মঞ্চ-আয়োজনে বিশ্বজুড়ে রুশবিরোধী শিবির গড়ে তোলার কাজে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। পশ্চিমা অনেক দেশ এ ঘটনায় রাশিয়াকে দোষী বললেও ইমরান সে পথে হাঁটেননি। রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞায়ও শামিল হননি।
দ্বিতীয়ত, তার মাত্রাতিরিক্ত চীনপ্রীতি। যুক্তরাষ্ট্র সবসময় চেয়েছে বিশ্বজুড়ে তার যে কোনো কূটনৈতিক অবস্থানে বিনা প্রশ্নে সমর্থন দিয়ে যাবে পাকিস্তান। কিন্তু বিগত সময়ে চীনবিরোধী বহুমাত্রিক মার্কিন তৎপরতায় লক্ষণীয়ভাবেই ‘নীরবতা’ অবলম্বন করে এসেছে ইমরান খানের পাকিস্তান। যেহেতু নিকটতম বৃহৎ প্রতিবেশী হিসেবে চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় কোনো রাখার বিকল্প নেই ইসলামাবাদের সামনে। তৃতীয়ত, আফগান তালেবানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পক্তৃতা। মার্কিন বাহিনী যখন লড়াইয়ে লিপ্ত রয়েছে, তখন পাকিস্তানে আশ্রয়-প্রশ্রয়সহ সব ধরনের সুযোগসুবিধা পেয়ে গেছে আফগান তালেবানের জঙ্গি সদস্যরা।
২০ বছরের যুদ্ধ শেষে আফগানিস্তানের মাটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অধোবদনে বিদায়ের’ পেছনেও পাকিস্তানের ভূমিকা থাকার অভিযোগ রয়েছে মার্কিন নীতিনির্ধারণী মহলে। আফগানিস্তানের তালেবানের সঙ্গে পাকিস্তানি তালেবানের যোগসাজশের পুরনো ইতিহাস টেনে ইমরানের দিকে একাধিকবার অভিযোগের তর্জনী তুলেছে ওয়াশিংটন।
চতুর্থত, পাকিস্তান এমন এক দেশ যেখানে সামরিক বাহিনীর আশীর্বাদ ছাড়া কারো পক্ষে ক্ষমতায় আরোহণ সম্ভব নয়। সর্বশেষ দুর্নীতির অভিযোগে কলুষিত নওয়াজ শরিফের বিদায়ের পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ইমরান খানের তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দলের দিকেই ছিল এ বাহিনীর সমর্থন। কিন্তু সম্প্রতি সামরিক বাহিনীর শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই প্রধানের নিয়োগ নিয়ে সেনাপ্রধান কামার জাভেদ বাজওয়ার সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে যান তিনি। ফলে দৃশ্যত দূরত্ব তৈরি হয়ে যায় তার এতকালের নেপথ্য রক্ষক ও অভিভাবক হিসেবে হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসা সেনাশক্তির। এ পর্যায়ে (ইমরানের অভিযোগ অনুসারে) মার্কিন কূটনীতিকের মাধ্যমে একটি চিঠি পাঠানো হয় পাকিস্তান সরকারের কাছে যেখানে হুমকি দিয়ে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে চলতে হলে অবিলম্বে সরকার প্রধানের পতন ঘটাতে হবে।
অন্যদিকে অনেক দিন ধরেই পার্লামেন্টে ইমরানের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনার প্রস্তুতি চলছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় সমর্থকের অভাবে নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার সুযোগ পাচ্ছিল না তারা। আন্তর্জাতিক মহলে ইমরান খানের আস্থাহীনতার পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দেশটির বিরোধী রাজনীতিকরা ক্ষমতাসীন জোটে ইমরানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী বেশ কয়েকজনকে নিজেদের পক্ষে ভিড়িয়ে নিতে সমর্থ হন। এবং এ শক্তির বলে তারা বলীয়ান হয়ে পার্লামেন্টে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করে ইমরানের বিরুদ্ধে।
গত চারদিন বিস্তর নাটকীয়তার পর গত শনিবার রাতে পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোট অনুষ্ঠিত হয়। অনাস্থা ভোটে হেরে ক্ষমতা থেকে বিদায় নেন ইমরান। ইমরানের এই ক্ষমতাচ্যুতি বিষয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স লিখেছে, সদ্য ক্ষমতা হারানো তার সরকারকে মনে রাখা হবে মূলত দেশের অর্থনীতির অবস্থা আরো সঙ্গীন করে তোলার জন্য।
তারা যে একই সঙ্গে দেশটির রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাবশালী সেনাবাহিনীর আস্থাও হারিয়ে ফেলেছিল, তার ইঙ্গিতও ছিল স্পষ্ট। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, ক্রমবর্ধমান ঘাটতি আর নির্বাচনী প্রচারে দেয়া দুর্নীতি নির্মূলের প্রতিশ্রæতি ইমরান রাখতে পারছেন না এমন ধারণায় তাকে ঘিরে অনেক পাকিস্তানির ঘোর সাম্প্রতিক সময়ে কেটে যাচ্ছিল। ক্ষমতাসীন জোটে ভাঙনে তেমনই মনে হয়েছে অনেকের কাছে।
You must be logged in to post a comment.