হোসনে আরা পারভীন।।
ঘটনাটা ২০১১ সালের। খুব খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। ছেলেটা আমাদের কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছিলো। এসএসসিতে গোল্ডেন পাওয়া, শান্ত-শিষ্ট, ভদ্র একটা ছেলে। আমার দিকনির্দেশনায় বিভিন্ন এক্সট্রা কারিকুলাম অ্যাক্টিভেটিসে অংশগ্রহণ করতো। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কর্তৃক আয়োজিত নানা দিবস উপলক্ষে সারা বছর ৭টা রচনা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। আমার ছেলে, ওর বন্ধু-বান্ধব, আমিসহ আমাদের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন গ্রুপে অংশগ্রহণ করাই। আসলে এই প্রতিযোগিতাগুলোই আমাকে সাহিত্য অঙ্গনে প্রবেশ করিয়েছে। অনেকটা গাইতে গাইতে গায়েনের মতো। ছেলেটাও প্রায় সবগুলোতে অংশগ্রহণ করে একাধিকবার প্রথম হয়েছে। এদের উদ্বুদ্ধ করতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। কারণ এর ফল যে সুদূর প্রসারী এটা অভিভাবকরা বুঝতেই চায় না। ভাবে পড়াশুনার ক্ষতি হচ্ছে। কারণ তারা যে গোল্ডেন পাওয়ার ইঁদুর দৌড়ে সামিল!
এই প্রতিযোগিতাগুলোয় পুরস্কার হিসাবে সবসময় বই দেয়া হয়। একবার শহরের নামকরা সরকারি স্কুলের এক প্রতিযোগীর মা বললো, ‘এই বই দিয়ে কি হবে? এটা কি ওর পড়ার সময় আছে? তারচেয়ে যদি থালা-বাটি দিত তাও কাজে লাগতো। ‘ভাবলাম সত্যিই এখনো এদেশের মায়েরা সন্তানের জন্য চায়-“আমার সন্তান যেনো থাকে দুধে-ভাতে”। সেই দুধ-ভাত কিভাবে আসছে সেটা দেখার কোনো প্রয়োজন নাই! সন্তান মানুষ হওয়ার কোনো প্রয়োজন নাই! তাই বোধহয় সমাজটা এতো দূর্নীতিতে ভরে যাচ্ছে!
ছেলেটাকে বই পড়া প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করিয়েছিলাম। আমি নিজেও সর্বসাধারণ গ্রুপের প্রতিযোগি ছিলাম। তাই প্রতিযোগিতার নিয়ম-কানুন অন্য প্রতিষ্ঠানের কোঅর্ডিনেটরদের চেয়ে হয়ত একটু বেশিই জানতাম। অনেক শ্রম দিয়েছি। উপজেলায় এক থেকে পাঁচের মধ্যে সব আমাদের স্টুডেন্ট! শুনতে হলো আমি প্রশ্ন আউট করে তাদের দিয়েছি। হা হা হা! সত্যি বিচিত্র এই দেশ! প্রশ্ন দিয়ে কোনো পরীক্ষাই হয়নি। ওরা বই পড়ে তার সারমর্ম লিখেছে, উল্লিখিত পৃষ্ঠা থেকে গুরুত্বপূর্ণ বাক্য চিহ্নিত করেছে। ছেলেটা জেলাতে প্রথম হয়ে, বিভাগেও ভালো করলো।
কিন্তু এইচএসসিতে জিপিএ-৫টা পর্যন্ত পেলো না! সব দোষ এসে পড়লো আমার ঘাড়ে। আমি ওকে নিয়ে খালি নাকি নেচে বেড়িয়েছি! কেউ ভেবে দেখলো না ২৪টা মাসের মধ্যে সে খুব বেশি হলে দুইটা মাসে এর পেছনে ব্যয় করেছে বাকি মাসগুলো সে কি করেছে! খুব খারাপ লেগেছে, মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আর এসবের মধ্যে যাবো না।
একদিন প্রথম বর্ষের ক্লাস শেষ করে দ্বিতীয় বর্ষের ক্লাসে যাবো বলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি। দেখলাম ছেলেটা অফিসরুমের দিকে যাচ্ছে। ওকে দেখে সেই কষ্টগুলো বুকে মোচড় দিয়ে উঠলো। ক্লাস শেষে দেখি অপেক্ষা করছে। আমাকে দেখে এগিয়ে এসে সালাম দিয়ে বললো, ‘ম্যাম কেমন আছেন?’ কথা বলতে ইচ্ছা হচ্ছিলো না। চুপ করেছিলাম, আবার বললো ‘আপনার মন কি খারাপ?’
কেমন যেনো কর্কশ কন্ঠে বলে উঠলাম, ‘তুমিই তো আমাকে ডুবিয়েছো…!’ আমার কন্ঠ ধরে এলো।
ও কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো, ‘ এইসব কথা যারা বলে তাদের বলবেন আজিজুল তিনটা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটা ইউনিটে চান্স পেয়েছে, ভর্তি পরীক্ষায় সাহিত্যের যে অংশটুকু ছিলো তার অনেক উত্তর সে বই পড়া প্রতিযোগিতায় পেয়েছে…!
ইচ্ছে হচ্ছিলো আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার করে বলি-“তোমরা এসে দেখে যাও আমি চাই-
”আমার সন্তান যেনো থাকে দুধে-ভাতে নয়আমার সন্তান যেনো আলোকিত মানুষ হয়!”
You must be logged in to post a comment.