অভিনন্দন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী

অন্যদৃষ্টি অনলাইন
বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২০, ৬:০৬ অপরাহ্ন

মোঃ মনিৱুজ্জামান মনি।।

বিকেল প্রায় পাঁচটা। আমিও ৱাজু আহমেদ নামে একজন সহকর্মী চিড়িয়াখানার প্রবেশদ্বারের সামনাসামনি দুই রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে দেশের করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করছি।

এসময় পঞ্চাশোর্ধ এক রিক্সাচালক আমাদের সম্মুখভাগের রাস্তায় রিক্সা থামিয়ে তার রিক্সাটির উপরেই বসে পড়লেন।

এক থেকে দুই মিনিটের ব্যবধানে একসাথে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তিনটি গাড়ি এসে সেখানেই থামলো এবং আমাদের দুজনের দিকেই বার বার তাকাচ্ছিল।

আমরা দুজন আলোচনা কৱেই যাচ্ছি আৱ ভাবছি, এই বুঝি দায়িত্বরত সেনা সদস্যগণ এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করবেন, এসময় আমরা বাইরে ঘোরাঘুরি করছি কেনো?

কিন্ত না দীর্ঘ সময় কেটে যাচ্ছে কিন্ত তারা আমাদেরকে কোনকিছু জিজ্ঞেস করলেন না। আমি আর ৱাজু  দুজন অপেক্ষাকৃত ফাঁকা ফাঁকা হয়ে দাড়িয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি আর আঁড়চোখে সেনাসদস্যদের দিকে খেয়াল রাখছি।

হঠাৎ চিড়িয়াখানার মসজিদের মাইকে আসরের আজানের শব্দ ভেসে আসলে সামনের ওই পঞ্চাশোর্ধ রিক্সাচালক তার রিক্সা থেকে নেমে এসে কাধের গামছাটি চিড়িয়াখানার সামনের ফুটপাতে বিছিয়ে নামাজ আদায় করতে দাড়িয়ে গেলেন।

ঠিক তখনই নজরে আসলো একজন সেনা সদস্য খুব দ্রুততার সাথে তাদের একটি গাড়ি থেকে একটি কার্টুন নামিয়ে রিক্সার উপরে রেখে ফের গাড়ির দিকেই ফিরে যাচ্ছেন। কার্টুনটির গায়ে লেখা রয়েছে ১০ কেজি চাল, ৫ কেজি আলু, ২ কেজি ডাল, ১ কেজি তেল, ১ কেজি পেঁয়াজ, ১ কেজি তেল ও ২ টি সাবান। সৌজন্যে – ৬ স্বতন্ত্র এডিএ ব্রিগেড।

কৌতুহল মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। দ্রুত পায়ে রিক্সাটির কাছাকাছি এগিয়ে এসে ওই সেনাসদস্যকে  তার পেছন থেকেই ডাকলাম। সালাম বিনিময় শেষে সংবাদকর্মী পরিচয় দিয়ে বিষয়টি জানতে চাইলাম। কিন্ত তিনি কোনো কথা বলতে রাজি না হয়ে বললেন, এবিষয়ে আমি কিছু বলতে পারবো না। আপনার একান্তই যদি কিছু জানার থাকে তাহলে আমাদের মেজর স্যার আছেন তার কাছ জেনে নিতে পারেন। বলেই দ্রুত সরে পড়লেন। আমি এগিয়ে গিয়ে মেজর সাহেবকে সালাম দিয়ে নিজের পরিচয় দিলাম। জানতে চাইলাম আসলে ব্যপারটি কি?

মেজর সাহেব মুচকি হেসে সাবলীলভাবে জবাবে জানালেন, আমি মেজর মাহমুদুর রহমান। দেশের এই মহাদুর্যোগে  করোনা ভাইরাস সংক্রমণ রোধে শাহ আলী থানা এলাকায় ৬ -সতন্ত্র এডিএ ব্রিগেডে দায়িত্বরত আছি। দেশে চলমান মহামারির বিস্তার ঠেকাতে সরকার দেশের সকল স্তরের জনগণকে বাড়ির বাইরে না বেরোতে কিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। এতে করে কর্মহীন এক শ্রেনীর মানুষ খেয়ে না খেয়ে থাকলেও আত্মসম্মান বজায় রাখতে কাউকে কিছু শেয়ারও করেননা। ফলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ব্যতিক্রমভাবে এই ত্রাণসামগ্রী পৌছে দেয়া হচ্ছে।

তিনি ফের মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে বললেন,আসলে ওই রিক্সায় যে কার্টুনটি দেখছেন ঐ টা আমাৱ এই টিমেৱ সদস্যদেৱ নিজস্ব ৱেশনেৱ একটি অংশ। আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করে নামাজরত রিক্সাচালককে দেখিয়ে বললেন, ওই দেখছেন রিক্সাওয়ালা নামাজ পড়ছেন-আমরা বেশ কিছুক্ষণ তাকে পর্যবেক্ষণ করেছি।

আসলে তিনি সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে এই সময়ে কেনো রিক্সা নিয়ে বের হয়েছেন তা তিনি না বললেও বস্তুত আমরা সবাই বুঝতে পারি। তাই তিনি নামাজে দাড়ানোর পর আমরা তার রিক্সায় ত্রানের কার্টনটি পৌছে দিলাম।

এদিকে ঠিক তখনই রিক্সাচালক নামাজ শেষ করে রিক্সার কাছে এসে রিক্সার উপরে কার্টুনটি দেখে কিছুটা হতবাক এবং কোনো কিছু না বুঝে সে বার বার আমাদের দিকে তাকাচ্ছিলেন। হয়তো তার রিক্সার উপরে কার্টুনটি কে রাখলো বা কার্টুনটি কার তা বোঝার চেষ্টা করছিলেন।

এমন সময় আমিও আমাৱ সহকর্মী এগিয়ে গিয়ে রিক্সাওয়ালার অনুভুতি সম্পর্কে জানলাম এবং সেটা গোপন ক্যামেৱায় ভিডিও কৱলাম,সেনাবাহিনীৱ পক্ষ থেকে  মেজর মাহমুদুর রহমান  ছবি না তুলতে অনুৱোধ কৱলেন এবং বললেন,এভাবে প্রতিদিনই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষে নিজেদেৱ উদ্দেগে বহুসংখ্যক মানুষকে আমৱা সহযোগিতা করে  যাচ্ছি।

ৱিক্সাওয়ালা বরিশাল গৌরনদী উপজেলার গোবরদান গ্রামের আব্দুল করিমের ছেলে তিনি। নাম মোঃ ইউনুস। স্ত্রী সন্তান নিয়ে অদূরেই বক্সনগরে একটি ভাড়া বাসায় থাকেন তিনি। বেশ কয়েকদিন কর্মহীন থাকায় বাসায় মুখে তোলার মতো কিছু নেই বিধায় রিক্সা নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন।

এবার রিক্সাচালক ইউনুস হয়তো গভীর আনন্দেই নিজেকে সামলাতে না আবেগে নিজেৱ অজান্তেই কেঁদে ফেললেন। বললেন, দেশের এই দুঃসময়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অসহায় গরীব মানুষরে নানান ভাবে সহায়তা করতাছে শুনছি।আজ নিজের চোখেই দ্যাখলাম।  তাগো দেওয়া এই ত্রাণসামগ্রীতে  আমার সংসার এক সপ্তাহ চলবো। আমি কথা দেতে আছি, আগামী এক সপ্তাহ আমি বাসার বাইরে বাইর হমু না।

ঘটনাটি সচোক্ষে দেখে কিছু সময়ের জন্যে হলেও স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। শরীরের প্রতিটি লোম দাড়িয়ে গিয়েছিলো। আনমনে কি যেন ভাবছিলাম। হঠাৎ একটি কণ্ঠে ভেসে আসলো ভাই ভালো থাকবেন, আসি। শুনেই সামনে তাকিয়ে দেখি সেনাবাহিনীর তিনটি গাড়ি সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে আর মেজর সাহেব হাত ইশারা করে বিদায় সম্ভাষণ জানাচ্ছেন।

আমিও হাতের ইশারায় তাকে বিদায় সম্ভাষণ জানালেও একজন সেনা পরিবারের সদস্য হিসেবে মনে মনে খুব গর্ববোধ করছিলাম। সাবাস বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। স্যালুট তোমাদের। স্যালুট মেজর মাহমুদুর রহমানকে।

Facebook Comments
সংবাদটি শেয়ার করুন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

আরো সংবাদ