সাবিনা ইয়াসমিন শিউলি।।
মানুষের বুদ্ধি বিকাশের জন্য শিক্ষা একটি অপরিহার্য বিষয়। দার্শনিক রুশো (১৭১২-৭৮) সাম্যবাদী সমাজের প্রত্যাশায় শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরেছেন। আর বিংশ শতাব্দীর শুরুতে দেশে দেশে শিক্ষা মানুষের মৌলিক ও জন্মগত অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে এবং নিরক্ষতা, অশিক্ষা, কুসংস্কার প্রভৃতির বিরুদ্ধে আন্দোলন বিস্তৃত হতে থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্তু সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক প্রভৃতি কারণে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা কাঙ্ক্ষিত মান অর্জন করতে পারেনি।
শিক্ষা বিষয়টি একটি সর্বজনীন, ব্যাপক ও বিস্তৃত প্রসঙ্গ। তাই একে কোনো সংজ্ঞা বা তত্ত্ব দ্বারা সার্বিকভাবে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। সাধারণত শিক্ষা বলতে মন-মানসিকতার উৎকর্ষ সাধন করে সাফল্যজনক অবদান রাখাকেই বোঝায়। একটি দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও সম্পদের সুষম ব্যবহারের জন্য শিক্ষা একটি মৌলিক অধিকার। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ঔপনিবেশিক ধাঁচে গড়া। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে তারা তাদের স্বার্থসিদ্ধির অনুকূল করে শিক্ষাব্যবস্থার বিন্যাস করেছিল। পাকিস্তান আমলেও এই শিক্ষাব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। স্বাধীনতার পর শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্বিন্যাসের লক্ষ্যে বিভিন্ন শিক্ষা কমিশন গঠন করা হলেও কোনো কমিশনই পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি এবং শিক্ষাক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার হয়নি। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান পরিস্থিতি খুবই হতাশাজনক। ঐতিহাসিকভাবে আমরা পেয়েছি একটি শিক্ষানীতিহীন শিক্ষাব্যবস্থা। ফলে অনিয়ম, দুর্নীতি ও বিশৃঙ্খলার মতো বিষয়গুলো আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অভ্যন্তরে ক্রমেই দানা বেঁধে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় পরীক্ষায় পাসের হার বৃদ্ধি পেলেও শিক্ষার গুণগত মানের ব্যাপক অবনতি ঘটেছে। বৈষম্যমূলক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলন, দুর্নীতি, ত্রুটিপূর্ণ পরীক্ষা পদ্ধতি প্রভৃতি কারণে অভিভাবকদের মনে হতাশা দেখা দিয়েছে।
তাই যে সব কারণে শিক্ষার গুণগত মানের অবনতি ঘটেছে সেগুলোকে চিহ্নিত করে শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করে তুলতে হবে। শিক্ষাক্ষেত্রে মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধান হলে সার্বিকভাবে শিক্ষার মান বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নৈতিক গুণাবলি অর্জন ও দেশের উন্নয়ন সম্ভব হবে।
মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক, সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় যে বৈষম্য যুগ যুগ ধরে অব্যাহত রয়েছে সে বৈষম্য এখন আকাশচুম্বী। বেসরকারি শিক্ষকসম্প্রদায় অষ্টম পে স্কেলে যে বেতন পান তার মূল বেতন স্কেল থেকে ৬% অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য কর্তন করা হতো। কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয় কতিপয় স্বার্থান্বেষী ব্যক্তির স্বার্থসিদ্ধর জন্য একধরনের প্রহসনের শিকার সাড়ে পাঁচ লক্ষ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী। অষ্টম পে স্কেলে সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারী ৫% বাৎসরিক প্রবৃদ্ধি পেলেও বেসরকারি শিক্ষক সমাজ তা থেকে বঞ্চিত হতে থাকে।দফাই দফাই আন্দোলন ও দাবীর প্রেক্ষিতে বেসরকারি শিক্ষকসম্প্রদায় ৫% প্রবৃদ্ধি পেয়েছেন।কিন্তু এটা শুভঙ্করের ফাঁকি।কারণ ৫% প্রবৃদ্ধি বেসরকারি শিক্ষকদের বেতন স্কেলের সাথে যোগ হওয়ার আগে থেকে অতিরিক্ত ৪% বেতন কর্তনের নীল নকসা তৈরি করা ছিলো। এবং এখন তার বাস্তবায়ন করার প্রক্রিয়া চলছে।আমি ৪% কর্তনের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
পূর্বে কর্তন করা হতো ৬% এবং নতুন করে ৪% কর্তনের ( ৬%+৪%) মোট ১০% কর্তনের প্রজ্ঞাপনের আলোকে এটাই প্রমাণিত হয় যে বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারীদের বার বার সরকার বৈষম্য সৃষ্টি করেই চলেছে।এই বৈষম্য কোন জাতির জন্যই শুভ ও মঙ্গলজনক নয়।২০% বৈশাখী ভাতা প্রজাতন্ত্রের সকল কর্মচারী পেলো বঞ্চিত হয়েছে বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী। উৎসব ভাতা মাত্র ২৫% যা বেসরকারি শিক্ষকদের বুকে শুধু যন্ত্রণার দাবানল সৃষ্টি করে।বাসা ভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা মিলে দেওয়া হয় ১০০০ টাকা। যা দিয়ে একটা খড়ের ঘরের একদিনের ভাড়া হয়।সরকার বেসরকারি শিক্ষক
দের এই বৈষম্য না দেখে অতি ব্যস্ত হয়ে পড়েছে অতিরিক্ত ৪% কর্তন নিয়ে।সরকার বাহাদুরের কাছে সাড়ে পাঁচ লক্ষ শিক্ষক কর্মচারীর প্রশ্ন ” আমাদের সাথে কেন এই প্রহসন? কেন এত উদাসীন বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে? সারা দেশে ৯৮% শিক্ষার্থী এই সব বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই লেখা পড়া করে।শুধু কি বেসরকারি শিক্ষকসম্প্রদায় বৈষম্যের শিকার? না এই বৈষম্যের শিকার হচ্ছে গ্রামের অতি মেধাবী শিক্ষার্থীরা ও? স্বল্প বেতনভুক্ত বেসরকারি শিক্ষকদের অতিরিক্ত ৪% কর্তনের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।এবং সেই সাথে দাবী জানাচ্ছি পর্যায় ক্রমে নয় এক সাথে সারা দেশের সকল বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারীর চাকুরী জাতীয়করণ করা হোক এবং অন্যান্য চাকুরীজীবীদের ন্যায় আমাদের ও পদন্নোতি ও বদলী ব্যবস্থা হোক।
মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী,
আপনার বুদ্ধি, বিচক্ষণতা ও দূরদর্শীতা দ্বারা বেসরকারি শিক্ষকসম্প্রদায়ের সমস্যা গুলো সমাধানের প্রত্যাশায় সাড়ে পাঁচ লক্ষ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী অপেক্ষমাণ।
লেখক
সহকারী শিক্ষক
নুরুল্লাবাদ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, নওগাঁ।
You must be logged in to post a comment.