শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধে সমস্যা, সংকট ও সমাধান

সিদরাতুল মুনতাহা প্রান্ত
বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২০, ৮:৫৪ অপরাহ্ন
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধে সমস্যা, সংকট ও সমাধান

করোনাকালীন সময়ে সারা বিশ্ব একটি দুর্যোগপূর্ণ অবস্থার মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যেখানে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অবস্থা আরও করুণ। স্বাস্থ্যখাত পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে যে, সেখানে যে সেবা দেওয়া হয় তা মানসম্মত নয়।

কিন্তু এই বছরে মোট বাজেটের ৭.২ শতাংশ অর্থাৎ ২৯ হাজার কোটি টাকা স্বাস্থ্যখাতে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা গত অর্থ বছরের তুলনায় ৩ হাজার কোটি টাকার মতো বেশি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরীর ভাষ্যমতে, আমাদের দেশে যে রোগগুলো বেশি হয় তা ক্রোনালজিকালি সাজিয়ে সেগুলার চিকিৎসায় কি ধরনের যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনশক্তি দরকার সেই বিষয়টা মাথায় রেখে বাজেট প্রণয়ন করা হয় নি। [তথ্য:বিবিসি নিউজ-১১ই জুন,২০২০]

এবার দুর্নীতির বিষয়ে কিছু কথা বলা যাক। প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে  দুর্নীতির ধারণা সূচক প্রকাশ করে থাকে বার্লিন ভিত্তিক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই)। বিশ্বের দুর্নীতিগ্রস্থ দেশগুলোর মধ্যে এবারও বাংলাদেশের নাম রয়েছে। শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্থ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান বর্তমানে ১৪তম [তথ্য:যুগান্তর নিউজ-২৩শে জুন,২০২০], যা করোনাকালীন সময়ে আরও বেড়েই চলেছে।

করোনাকালীন সময়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ক্রমশ ভয়াবহতা ধারণ করেছে। বিশ্বব্যাংক তাদের এক জরিপে বলেছে, করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৮% নেমে দুই কিংবা তিন শতাংশ হতে পারে [তথ্য:বিবিসি নিউজ]। এছাড়াও, নানান ধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগ তো রয়েছেই। এবারের বন্যায় দেশের ২১ জেলার ৭৫ লাখ ৩০ হাজার মানুষ বন্যার কবলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিলো [তথ্য:প্রথম আলো নিউজ-২০ই জুলাই,২০২০]।

অন্যদিকে, চলমান পরিস্থিতিতে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার কথা না বললেই যেন নয়। গত ১৭ মার্চ থেকে ৫ মাসেরও অধিক সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয় উদ্ভুত করোনাভাইরাস মহামারির কারণে, যা নিঃসন্দেহে জাতির জন্য অশুভ অঙ্গুলিসংকেতেরই নামন্তর। দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের দরুণ শিক্ষার্থীদের পড়াশুনা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনিভাবে তারা মানসিকভাবেও হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়ছে। আমাদের সকলের মনে রাখা উচিৎ যে, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শুধু পড়াশুনা শেখার জায়গা না, উপরন্তু সামাজিকতা শেখার জায়গাও বটে। করোনাভাইরাসের অস্তিত্ব থাকা সত্ত্বেও সব কিছু উন্মুক্ত করে দেওয়া হলেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার ব্যাপারে নেই তেমন অগ্রগতি। অনলাইন ক্লাস আমাদের সকল শিক্ষার্থীদের জন্য উপযোগী নই তা হয়তো আমরা অনেকেই জদনি। ফলশ্রুতিতে, শিক্ষার্থীরা নানান ক্ষেত্রে দিনদিন পিছিয়ে যাচ্ছে, প্রতিভা হচ্ছে বহুবিধ প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন। যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম “টেলিগ্রাম”- এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, করোনা মহামারির পর প্রায় এক কোটি শিশু আর স্কুলে যেতে পারবে না। শিক্ষা তহবিল কাটছাঁট ও দারিদ্র্যতা বেড়ে যাওয়ার কারণেই এমনটি ঘটবে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাজ্য ভিত্তিক দাতব্যসংস্থা “সেভ দ্য চিলড্রেন”। এদিকে,  বাল্যবিবাহ এবং শিশুশ্রম বেড়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়তই। ইউনিসেফের চাইল্ড স্পেশালিষ্ট সাবনাজ জেহেরিন এ বিষয়ে বলেছেন, করোনাকালীন সময়ে শিশুদের উপর ডমেস্টিক ভায়োলেন্স বেড়ে গেছে।“মানুষের জন্য” ফাউন্ডেশনের জরিপে বলা হয়, শুধু জুন মাসে ৫৩টি জেলায় ১২ হাজার ৭৪০ জন নারী ও শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি জরিপে দেখা গেছে, দারিদ্র্যতার হার বেড়ে ২২ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা করোনাকালীন সময়ে অতি মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউএনএফপিএ বলছে, এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বাল্যবিবাহ হয়। এর মূল ও মোক্ষম কারণও দারিদ্র্যতা।

আবার ২০১৭ সালের উপাত্তে উল্লেখ করা হয় যে, ৮১ দশমিক ৪ শতাংশ বাল্যবিবাহ সংঘটিত হয় দরিদ্র পরিবারে। করোনা সংকটের কারণে ৩ কোটি ৬৭ লাখ ছেলে-মেয়ে স্কুলে যেতে পারছে না। মাধ্যমিক পর্যায়ে ৪১ ভাগ মেয়ে এবং ৩৩ ভাগ ছেলে। ব্রাকের গবেষণায় বলা হয়েছে যে, ৮৫ শতাংশ বাল্যবিবাহ হয়েছে মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণে আর ৭১ শতাংশ সংঘটিত হয়েছে মেয়েদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের কারণে।

তাছাড়াও, দুর্বার গতিতে বেড়েছে শিশুশ্রম! ইউনিসেফ ও আইএলও ১২ জনু বিশ্ব শিশু শ্রম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে জানান, ২০০০ সাল থেকে শিশু শ্রমের সংখ্যা ৯ কোটি ৪০ লাখ কমে `কোভিড-১৯’- এর কারণে সেই অর্জন এখন ঝুঁকির মুখে পড়তে বসেছে। `কোভিড-১৯’- এর ফলে ৬ কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্যতায় পড়বে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয় যে, দারিদ্র‍্যতা এক শতাংশ বাড়লে শিশুশ্রম অন্তত দাশমিক ৭ শতাংশ বাড়বে। এমতাবস্থায়, শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। ওষুধ বা ভ্যাক্সিনের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা উচিত না বলে আমার ব্যক্তিগত মতামত। আর মানুষের মাঝে আরও বেশি সচেনতা সৃষ্টি করে সীমিত পরিসরে শিক্ষা  প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হোক।

লেখক

শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ,

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বশেমুরবিপ্রবি), গোপালগঞ্জ।

Facebook Comments
সংবাদটি শেয়ার করুন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

আরো সংবাদ