মোঃ সাইদুল হাসান সেলিম।।
সৃষ্টির ঊষালগ্ন থেকেই শিক্ষার আলো মানুষকে সামনে চলার পথে দেখিয়েছে। তাই তো মানুষের জীবন মানোন্নয়নে ও সভ্যতার বিকাশে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। আর শিক্ষার বিচ্ছুরণে প্রথমেই যে উপসর্গটি আসে তা হলো শিক্ষক, কেননা শিক্ষার প্রাণকেন্দ্রেই হলেন শিক্ষকগণ। শিক্ষকের দক্ষতা, নিষ্ঠা আর প্রচেষ্টার ওপরই নির্ভর করে শিক্ষার গুণগত উৎকর্ষতা। আর গুণগত মানের শিক্ষায় প্রয়োজন মেধাবী নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক।
শিক্ষা মানুষের জ্ঞান আহরণ ও বিতরণ প্রক্রিয়া মাধ্যমে সম্প্রসারিত হয়। যিনি ধারাবাহিক অনুশীলনের মাধ্যমে যে ধারণা ও জ্ঞান অর্জন করেন, তার অর্জিত জ্ঞান দ্বারা যখন সমাজকে জ্যোতির্ময় করেন তিনিই তো আদর্শ শিক্ষক। শিক্ষকের লব্ধ জ্ঞান যখন শিক্ষার্থীর আচার-আচরণের বাঞ্ছনীয় পরিবর্তন নিশ্চিত করে, এমন প্রক্রিয়াই শিক্ষা। শিক্ষক হচ্ছেন শিক্ষা প্রক্রিয়াকে উৎসাহিত ও অনুপ্রেরণা দানকারী মূল চালিকাশক্তি। শিক্ষকগণ সভ্যতার অভিভাবক, জাতির বিবেক ও সমাজ বিনির্মাণের বলিষ্ঠ প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তি।
শিক্ষক বলতে মূলতঃ একজন আলোকিত, জ্ঞানী, গুণী ও বুদ্ধিদীপ্ত প্রতিভাবান পণ্ডিত ব্যক্তিকে বোঝায়। যিনি শিক্ষার্থীর কাংক্ষিত আচরণ ও বাঞ্ছনীয় পরিবর্তনের গুরু দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষক শিক্ষাক্ষেত্রে নিরলস প্রাণ একজন সেবক মাত্র। একজন শিক্ষকের সাফল্যের মূলভিত্তি হলো পেশাগত জ্ঞান, দক্ষতা, চারিত্রিক সদগুণাবলি, জ্ঞান সঞ্চারণে আগ্রহ, সদিচ্ছা ও মানবিকতার সমষ্টি। তিনিই প্রকৃত শিক্ষক যার অনুসরণীয় চারিত্রিক গুণাবলী, অসাধারণ শিখন কৌশল, জ্ঞান অন্বেষণ, মানবিক গুণাবলি সম্পন্ন এবং সমাজ বিনির্মাণের শ্রেষ্ঠ কারিগর।
একজন শিক্ষকের কাছে সমাজের মানুষের প্রত্যাশার অন্ত নেই। তিনি হবেন জ্ঞানতাপস, মেধাবী, বুদ্ধিদীপ্ত, ব্যক্তিত্ববান, চৌকস, আন্তরিক পাঠদানকারী ও জ্ঞান বিতরণে আগ্রহী ও সুবিবেচক। শিক্ষক হবেন সরল, নির্মল হবেন অকুতোভয় সত্যবাদী, ব্যক্তিত্ববান, সমাজহিতৈষী, পরোপকারী, সমাজ সংস্কারক, পরিশ্রমী, হাস্যোজ্জ্বল, সুপরামর্শক ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী।
উল্লেখিত আলোচনার পর শিক্ষকদের সম্মান মর্যাদার বিষয়টি দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় অপরিণামদর্শী চিন্তা, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাব ও আমলাদের দুর্নীতিগ্রস্ত মানসিকতার কারণে শিক্ষার লক্ষ্য উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষানীতির বাস্তবায়নে উদাসীনতা, শিক্ষকদের বঞ্চনা বৈষম্য দূরীকরণে অনিহা, দ্বিমুখী শিক্ষানীতি, অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয়, শিক্ষা আইন প্রণয়নে স্থবিরতা, প্রশ্নফাঁস, অর্থের বিনিময়ে জিপিএ বিক্রি, বিতর্কিত জেএসসি-পিইসি পরীক্ষা পদ্ধতি, কোচিং বাণিজ্য, টিউশনি, সিলেবাসের ব্যাপকতা, ম্যানেজিং কমিটির সীমাহীন দৌড়াত্ব্য, শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা, সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি প্রবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে বিপর্যস্ত শিক্ষাব্যবস্থার। এ কথাটি সত্যি যে, সনদ নির্ভরতার সম্প্রসারণশীল শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার মানোন্নয়নে বহুলাংশে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে।
দেশের সরকারি এবং বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় একই শিক্ষাগত যোগ্যতা, পাঠ্যপুস্তক, কর্মঘন্টা, পাঠ্যক্রম, পাঠ্যসূচি, সিলেবাস, পরীক্ষা পদ্ধতি, সনদের মান এবং বিধিবিধান, এতদসত্ত্বেও শিক্ষকদের সম্মান মর্যাদা ও বেতন-ভাতায় ব্যাপক বৈষম্য বিদ্যমান। দেশের ৯৭ শতাংশ শিক্ষার দায়িত্ব পালন করেন বেসরকারি শিক্ষকগণ অথচ বেতন-ভাতা সহ বিভিন্ন বৈষম্যের কারণে বেসরকারি শিক্ষকরা সমাজে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে অর্থের সাথে সামাজিক সম্মান মর্যাদা নিবিড় সম্পর্কযুক্ত। বৃটিশ রাজ লর্ড কার্জনের বেসরকারি শিক্ষার ধারাপাতে আজকেও আমাদের শিক্ষার নিয়ন্ত্রণ ও দায়িত্ব রাষ্ট্র নিতে পারেনি।
শিক্ষকদের সম্মান মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ও শিক্ষার মানোন্নয়নে অনতিবিলম্বে শিক্ষার দায়িত্ব ও নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় নিতে হবে। বিশৃঙ্খল বেসরকারি খাতে ৯৭% শিক্ষার দায়িত্ব দিয়ে আর যাই হোক মানসম্মত শিক্ষায় প্রত্যাশা দুরাশা। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর গুণগত মানের শিক্ষায়, মেধাবী শিক্ষক অতীব প্রয়োজন। শিক্ষকদের যথাযথ সম্মান মর্যাদা ও আকর্ষণীয় বেতন-ভাতা প্রদানের মাধ্যমে মেধাবীদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে হবে। শিক্ষকদের অসম্মান অমর্যাদা ও অভুক্ত উদরে রেখে মানন্নোত শিক্ষার প্রত্যাশা অলীক কল্পনা।
দেশের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা নয়, সদিচ্ছার অভাবেই বিভিন্ন অজুহাতে বেসরকারি শিক্ষাকে উৎসাহিত করে, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব এড়ানো হচ্ছে। দেশটাকে ভালবেসে, দেশের মানুষকে ভালোবেসে, শিক্ষকতা পেশাকে মর্যাদাপূর্ণ ও আকর্ষণীয় করার লক্ষ্যে, শিক্ষকদের সতন্ত্র বেতন-ভাতা নির্ধারণ পূর্বক অনতিবিলম্বে ‘একযোগে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের’ ঘোষণার জোর দাবি জানাচ্ছি।
লেখক
সভাপতি
বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারি ফোরাম
You must be logged in to post a comment.