মোঃ সাইদুল হাসান সেলিম।।
শিক্ষা নিঃসন্দেহে যে কোন জাতির অগ্রগতি, সমৃদ্ধি এবং উন্নয়নের মূল উপাদান। আধুনিক যুগোপযোগী মানসম্মত শিক্ষার জন্য প্রয়োজন গুনগত মানের মেধাবী শিক্ষক। শিক্ষকদের বঞ্চনা বৈষম্যে রেখে, মানন্নোত শিক্ষার প্রত্যাশা কাল্পনিক। মেধাবীদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে শিক্ষকতা পেশাকে আকর্ষণীয় করা প্রয়োজন।
শিক্ষকরা হচ্ছেন জাতির বিবেক, সম্মানীয় ও বরেণ্য ব্যক্তিত্ব, এমনি রসালো কিছু কথা, বক্তব্য, বিবৃতি সরকার বা রাজনীতিকরা বিভিন্ন প্রসঙ্গেই বলে থাকেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে শিক্ষকরা অবহেলিত, বঞ্চিত এবং অনেক ক্ষেত্রেই অবজ্ঞার পাত্র। বেতন-ভাতার কথা চিন্তা না করে শিক্ষা প্রদানে মনোনিবেশ করুন। অবিবেচনাপ্রসূত এমন উক্তি প্রায়শই শোনা যায়। সরকারের সাম্প্রতিক কতিপয় সিদ্ধান্তের ফলে শিক্ষকতা পেশায় জড়িতরা হতাশ ও বিক্ষুব্ধ। সমাজের অনেকেই মনে করেন শিক্ষকগণ খুব ভালো ভাবেই জীবন অতিবাহিত করেন। শিক্ষকদের প্রতি সরকারি নীতিনির্ধারকদের অবহেলার মূল কারণ শিক্ষকদের কোনো অভিভাবক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা নেই। প্রায় প্রত্যেক শিক্ষকই মুক্ত চিন্তায় বিশ্বাস করেন, অনেকে রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে খোলা মেলা কথা বলেন ও লিখেন। অধিকাংশ শিক্ষকদের এসব বক্তব্য বিবৃতি ও লেখা হয় সরকারি সিদ্ধান্তের সমালোচনামূলক ও বাস্তবতার নিরিখে। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে রয়েছেন অসীম ক্ষমতাশালী আমলারা। এখানেও শিক্ষকদের নেই কোন প্রতিনিধি এবং নেই তাদের মতামতের গুরুত্ব। ফলে শিক্ষকরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বঞ্চনা, বৈষম্য ও অবহেলার শিকার হচ্ছেন। শিক্ষকদের জন্য অনেককিছুই আছে বক্তৃতা বিবৃতি ও শিক্ষানীতিতে কিন্তু বাস্তবতা সম্পুর্ন ভিন্ন। অনেক আগে থেকেই মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকতাকে করা হয়েছে অপ্রয়োজনীয় এবং অনাকর্ষণীয়। ফলে মেধাবীরা শিক্ষকতায় আকৃষ্ট হতে পারছে না। শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রয়োজন গুনগত মানের মেধাবী শিক্ষক। এই বিষয়ে সরকারের নেই, শিক্ষকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কোন সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ বা পরিকল্পনা।
বিগত ২০১৫ পে-স্কেল প্রদানের সময়ই শিক্ষকরা পরিষ্কারভাবে বুঝেছন, তারা ব্যাপক বঞ্চনা বৈষম্যের শিকার। দিনে দিনে যে এই বৈষম্য বেড়েই চলবে এর কোনো সমাধান হবে না, তা শিক্ষকদের কল্পনায়ও ছিল না। তাই একান্ত নিরুপায় হয়েই শিক্ষকরা নিজেদের বঞ্চনা বৈষম্য ও কষ্টের কথা জাতি এবং সরকারের জ্ঞাতার্থে রাজপথে আন্দোলন সংগ্রাম করছেন। বেসরকারি শিক্ষকদের সমাজের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপের পাকাপোক্ত বন্দোবস্ত করা হয়েছে জাতীয় বেতনস্কেল নির্ধারণ এবং বিভিন্ন প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে। আমলাদের বিদ্বেষী মনোভাবে বেসরকারি শিক্ষকদের শুরুতে পে-স্কেলের অন্তর্ভুক্ত না করা। অনেক লেখালেখি প্রতিবাদ সমাবেশ ও আন্দোলনের জাতীয় স্কেলের অন্তর্ভূক্ত করা। অদ্যাবধি জাতীয় পে-কমিশনের শুপারিশকৃত বার্ষিক প্রবৃদ্ধি শিক্ষকদের দেওয়া হচ্ছে না।
শিক্ষকরা গৃহঋণ পাবেন না, সরকারের এরকম একটি সিদ্ধান্তে শিক্ষকরা হতবাক করেছে। এতদিন জানতাম শিক্ষকদের পদোন্নতি, বৈশাখী ভাতা, বাড়ি ভাড়া উৎসবভাতা, চিকিৎসা ভাতা, সন্তানদের শিক্ষা ভাতা, উচ্চতর স্কেল, টাইমস্কেল, বিনোদন ভাতা, অফিস, পিয়ন, এসি, ড্রাইভার, পাচক, গাড়ি এসব কিছুরই প্রয়োজননেই।
এখন নতুন করে জানলাম- আসলে শিক্ষকদের গৃহেরও প্রয়োজন নেই। শিক্ষকরা বিস্মিত! কি আশ্চর্য শিক্ষকদের প্রতি রাষ্ট্রের এই অনুগ্রহে! মূলত ভালো মানের মেধাবী শিক্ষার্থীরাই অনেক আশা নিয়ে, স্বপ্ন নিয়ে মহান পেশা শিক্ষকতায় আসেন। অনেকে বিদেশে শিক্ষকতার চাকরি, দেশে বিসিএস সহ অন্যান্য আকর্ষণীয়চাকরি ছেড়ে অনার্স মাস্টার্স, বিএড, এমএড, এমফিল, পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে মহান শিক্ষকতা পেশায় এসেছেন। কিন্তু এই মেধাবী শিক্ষকদের স্বপ্ন আজ চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গিয়েছে। তারা চোখের সামনে দেখছেন কেমন করে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে এই পেশাটিকে বঞ্চনা বৈষম্যে শৃঙ্খলিত ও বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
একদিকে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের কাছে শিক্ষকদের হেয় প্রতিপন্ন করার পাকাপোক্ত ব্যবস্থা করা হচ্ছে। অপরদিকে সেই শিক্ষকদেরই বলা হচ্ছে উঁচু মানের জাতি গঠন ও মানবসম্পদ তৈরি করতে। শিক্ষকদের সামাজিক ভাবে আর্থিকভাবে দূর্বল রেখে, মনে ক্ষোভ সৃষ্টি করে, তাদের দিয়ে সনদ নির্ভর কিছু শিক্ষার্থী তৈরি করা সম্ভব, কিন্তু সুশিক্ষিত মাথা উঁচু জাতি নয়। শিক্ষকরা আজ বুঝতে পারছে তাদেরই কিছু সাবেক ছাত্র-ছাত্রী নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় শিক্ষকদের স্বার্থের বিরোধিতা করছে। সরকার ও তাদের দ্বারাই বিভ্রান্ত হয়ে নিরস্ত্র ও ক্ষমতাহীন এই মানুষগুলোকে অবহেলা ও বঞ্চিত করছে।
রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরের সুযোগ সুবিধাদির মধ্যে কিছু কিছু পার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু বৈষম্য এমন হওয়া উচিত নয় যাতে আর্থিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে এক বিশাল ব্যবধান সৃষ্টি হয়। তাই মমতাময়ী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নিকট অনুগ্রহ পূর্বক নিবেদন, চলতি অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে শিক্ষকদের দেওয়া প্রতিশ্রুতির ঘোষণা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের মাধ্যমে জাতিকে মেধাহীন করার অপপ্রয়াস বন্ধ করুন।
লেখক
সভাপতি
বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারি ফোরাম
ঢাকা বাংলাদেশ।
You must be logged in to post a comment.