বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার অচ্ছুত পরিক্রমা

মোঃ সাইদুল হাসান সেলিম।
রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২০, ১২:৫০ অপরাহ্ন
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার অচ্ছুত পরিক্রমা

আমার ত্রিশটি বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতায় অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়িয়েছি। ক্ষুদ্র প্রচেষ্টায় কতেক সমাধান করতে পেরেছি বাকি কিছু স্মৃতি। তথাপি সমাধান খুঁজি একাকী বাঁ সম্মিলিতভাবে। একথাটি ইদানিং সবাই একবাক্যে স্বীকার করে নিয়েছেন যে আমাদের দেশের শিক্ষার মানোন্নয়ন করতেই হবে। কিন্তু কিভাবে?

সমাধানের পথ বাতলে দিতে চান না কেউ। আর যারা যেচে এসে পথ বাতলায় তাদের কথা শুনতে চায় কেউ। শিক্ষা প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা এসি রুমে বসে শিক্ষার মানোন্নয়নের গবেষণা করেন আর নির্দেশনা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেন। তাঁরা শিক্ষার মানোন্নয়ন বলতে বোঝেন অত্যাধুনিক ভবন, বৈদ্যুতিক লিফট, নতুনত্ব শিক্ষা পদ্ধতি, নতুনত্ব শিক্ষা পদ্ধতির আমদানিতে বিদেশ ভ্রমন ইত্যাদি। এসবের সাথে কী শিক্ষকদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের দিকে একটু মনযোগ দেয়া যায় না? এতো এতো শিক্ষা গবেষণা, পদ্ধতির প্রয়োগ পরীক্ষা নীরিক্ষা করলেন, লাভটা কী হলো? দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশর শিক্ষার গুণগত মান সর্বনিন্মে। যে কথাটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১০০ বছর পূর্বেই বুঝতে পেরেছিলেন, সে কথাটি আমাদের কর্তারা ভুলেই বসে আছেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর উক্তি- ‘ঘুরিয়া ফিরিয়া যেমন করিয়াই চলি না কেন, শেষকালে এই অলঙ্ঘ্য সত্যে আসিয়া ঠেকিতেই হয় যে, শিক্ষকের দ্বারাই শিক্ষার বিধান হয়, প্রণালীর দ্বারা নয়।

আমাদের দেশের শিক্ষকতা পেশা এতো এতো বৈষম্য বঞ্চনার শিকার হয়ে রয়েছে তো শিক্ষার মানোন্নয়ন হবে কিভাবে? প্রথাগত ভাবে শিক্ষা বেসরকারিকরণ এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনে সদিচ্ছার অভাবেই মূলত শিক্ষার মানোন্নয়নের অন্তরায়। এতদসত্ত্বেও শিক্ষকদের সম্মান মর্যাদা রক্ষায় খুঁজে ফিরি অজানা কিছু প্রশ্নের।

১। ২০১৫ পরবর্তী সময় থেকে সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রধানদের মধ্যে বেতন স্কেলের বৈষম্য তৈরি করা হলো কেন?

২। পূর্বের বছরান্তে এমপিওভুক্তির ধারাবাহিকতা ভঙ্গ করে স্বীকৃতি প্রাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি নয় বছর ধরে বন্ধ ছিল কেন?

৩। প্রচলিত নীতিমালা উপেক্ষা করে কোন কারণ ব্যাতিরেকে শিক্ষকদের ৮ বছরের অভিজ্ঞতায় টাইম স্কেল বন্ধ করা হলো কেন?

৪। ২০১৫ সালের জাতীয় পে কমিশনের আইন উপেক্ষা করে এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের দুই বছর বার্ষিক প্রবৃদ্ধি দেয়া হলো না কেন?

৫। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা সত্ত্বেও, নির্দেশনা উপেক্ষা করে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের দুই বছর বৈশাখী ভাতা দেয়া হয়নি কেন?

৬। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিক সদিচ্ছায় প্রণীত জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ সংসদে অনুমোদন দেয়া সত্ত্বেও জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন অসম্ভব কেন?

৭। প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত এবং শিক্ষকদের সতন্ত্র বেতন স্কেল নির্ধারণের প্রস্তাবই কী শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের অন্তরায়?

৮। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের টাইমস্কেল বাঁ উচ্চতর স্কেল প্রাপ্তিতে পূর্বের ৮ বছরের পরিবর্তে ১০ বছরের নীতিমালা প্রণয়ন কেন? প্রভাষকদের দুই বছরের পরিবর্তে ১০ বছরে একটি উচ্চতর বাঁ টাইমস্কেল কোন কারণে?

৯। এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীরা জাতীয় পে-স্কেলে অন্তর্ভুক্তি স্বত্তেও বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা শতভাগ প্রাপ্য হবেন না কেন?

১০। ২০১৮ এমপিও নীতিমালায় শিক্ষকদের বদলীর নীতিমালা প্রণয়ন করেও তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেই কেন?

১১। একটি স্বাধীন দেশে উনপন্চাশ বছরেও শিক্ষাব্যবস্থার একটি স্বীকৃত শিক্ষা আইন নেই কেন?

১২। শিক্ষক কর্মচারীদের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও অবসর কল্যাণ ট্রাস্টে বাড়তি সুবিধা না দিয়ে অতিরিক্ত কর্তন কেন? কোন আইনে?

১৩। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের কেন পদোন্নতির ব্যবস্থা নেই? শিক্ষা প্রশাসনের কোন স্তরেই কেন তাদের কোন প্রতিনিধি  নেই?

১৪। শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নে প্রতিভাবান শিক্ষকের বিকল্প নেই। তা সত্ত্বেও এতো দিনেও কেন পিএসসির আদলে শিক্ষক নিয়োগ কমিশন গঠন করা হয়নি?

১৫। ষোলটি বছর ধরে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের উৎসব ভাতা ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে শতভাগ করা হয়নি কেন?

জানি এতো প্রশ্নের সদুত্তর পাওয়া যাবে না, তা জেনেও লিখছি এই আশায় যে যদি কখনো কোন শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্তাদের নজরে আসে সেই আগ্রহে। সর্বোপরি একটি কথা বলতে চাই, ধারাবাহিক সরকারের শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক অবদান রয়েছে যা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। তথাপি শিক্ষকদের বঞ্চনা বৈষম্য দূরীকরণের আগ্রহ নিয়ে নজর দেয়া হয়নি। অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিদেশে ভ্রমণ, গবেষণা অনেক হয়েছে, এবার শিক্ষকদের অভাব অভিযোগ দূরীকরণে শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ ঘোষণা করুন। শিক্ষকদের সকল বৈষম্য দূরীকরণ করতেই, শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের মাধ্যমে মর্যাদাশীল করুন। শিক্ষকগণ প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে গুণগত মানের শিক্ষা প্রদানের, এতে জাতি দাঁড়িয়ে যাবে। শিক্ষকদের পেছনের অভাব অনটনে রেখে মানসম্মত শিক্ষার ধারণা অমূলক। এ বোধ যতো দ্রুত জাগ্রত হবে এ জাতির জন্য ততোই মঙ্গল।

লেখক

সভাপতি, বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী ফোরাম

Facebook Comments
সংবাদটি শেয়ার করুন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

আরো সংবাদ