আর, আর চৌধুরী, নওগাঁ ।।
সাজানো-গোছনো পরিবারের সদস্য তিনি। সবায় যে যার মতো প্রতিষ্ঠিত জীবনে চললেও শুধূ পড়ে রইলেন মোঃ শফিকুর রহমান। বয়স চলছে তিপান্ন বছর। এ বয়সে কি আর সংসার পতা যায় ! জীবনের অর্থটা বোঝার সুযোগটা বা কই? ভাই বোন কেউ রাখেনা তাঁর খোঁজ-খবর। চিকিৎসক দুই ভাই সহ ৪ ভাই ও দুই বোন সবায় ধনী। বাবা-মা’র চতুর্থ ছেলে শফিকুর রহমান ও বি,কম পাশ। শফিকুর রহমান গ্রামে মাত্র এক শতক জমির (মাটির) উপড় বাশের বেড়ার টিনসেডের ভাঙ্গাচোরা একটি ঘর এই থাকেন। সেই ঘরে সোজা হয়ে দাাঁড়ানো পর্যন্ত যায়না। বাঁশের কাবাড়ির নামমাত্র একটি দরজা। এমনই একটি ভাঙ্গা ঘড়েই সাপ ও পোকা-মাকড়রের সাথেই দীর্ঘদিন ধরেই বসবাস তাঁর। তার ঘরের সংলগ্ন ভাই-বোনদের জমি থাকলেও সেটা যে তাঁর নয় একথা তিনি ভাল করেই বোঝেন।
অমানবিক এ ঘটনাটি বেড়িয়ে আসে ( মানবতায় আমরা, নওগাঁ) মানব সেবা মূলক সংগঠনটির সদস্যরা দরিদ্রদের মাঝে শাড়ি ও লুঙ্গি বিতরন করার সময় মহাদেবপুর উপজেলার চেরাগপুর ইউনিয়নের চৌমাশিয়া গ্রামে থেকে। এসময় প্রথমেই শফিকুর রহমান এর হাতে একটি লুঙ্গি তুলে দেন সংগঠনের আইন বিষয়ক সম্পাদক নজরুল ইসলাম (নূর)। লুঙ্গি হাতে পাওয়ার পরই শফিকুর রহমান আবেগের বশে তখনই তার জীবন কাহিনী তুলে ধরেন (মানবতায় আমরা, নওগাঁ) মানব সেবা মূলক সংঘঠনের সভাপতি ও নওগাঁ জেলা প্রেস ক্লাবের নির্বাহী সদস্য সাংবাদিক শহিদুল ইসলাম জি এম মিঠনের কাছে।

মৃত মহিউদ্দীন মুন্সির ছেলে শফিকুর রহমান বলেন, আমরা মোট ৬ ভাই ও ২ বোন। আমাদের বাবা বেঁচে থাকতেই সবার বড় ১ ও ২ নং ভাই দুজনেই ডাক্তারী লাইনে লেখাপড়া শেষ করে ডাক্তারী পেশায় জরিয়ে পড়েন। এছাড়া অপর ২ ভাই ও লেখাপড়া করে বিভিন্ন পেশায় জরিয়ে পড়েন। আমার লেখাপড়া চলার মথ্যেই আমার ২ বোনের ধনী পরিবারেই বিয়ে ও দেয়া হয়। এরই মধ্যেই আমার বাবা আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে যান। এছাড়া সামসুল আলম নামের আমার অপর এক ভাইও মৃত্যু বরন করেন। এরই মাঝে আমি বিকম পাশ করি। আমার বড় ভাই ডাঃ নিজাম উদ্দীন বর্তমানে ঢাকা কেন্দীয় রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালের পরিচালকের দ্বায়িত্বরত বলেও জানান তিনি। তার ছোট ডাঃ শোয়েব ও ভাল মানের একজন চিকিৎসক। এছাড়া অপর ২ ভাই আখতার ফারুক ও আব্দুস সালাম প্রতিষ্ঠিত বড় ব্যবসায়ী। আমাদের দুই বোন সাদিকা সুলতানা ও উম্মে হাবিবাসহ জামাইরা ও ভাল পজেশানে রয়েছেন। একবোন জামাইয়ের বগুড়ার সান্তাহারে একটি সিনেমা হল ও আছে।
এসময় এই প্রতিবেদকের প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো বলেন, আমার এখানে এসে কোন ভাই বা বোন খোঁজ-খবর নেয়না, তবে আমি তাদের কাছে গেলে আমাকে হাত খরচ দেন জানিয়ে তিনি আরো বলেন, আমি যেখানে আছি এখানে আমার ভাই ও বোনদেরও জায়গা আছে। আমি এখানে মাত্র এক শতক জমির মালিক বিধায় আমি এক শতকের উপর বাঁশের বেড়া ও বাঁশের চাটিয়ার দরজা বানিয়ে কোন রকমে বসবাস করছি।
বিয়ে করেননি কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি নিজেই খেয়ে না খেয়ে জীবন-যাপন করছি বিয়ে করে বউ ও সন্তানদের কি খাওয়াব।
এসময় শফিকুর রহমানের জীর্ন ঘড়ের ভেতর ঢোকার জন্য দরজায় গিয়ে দেখা যায়, ঘড়ের ভেতর ছোট ছোট আকারে ইঁদুরের গর্তে ভরে আছে ঘড়। ইদুর মাটি তোলায় বাশের কাবাড়ির দরজাটি খোলা যায়নি। তবে দরজা ঠেলে সামান্য যে ফাঁক হয়, সেইটুকু ফাঁক দিয়েই শফিকুর রহমান ভেতরে ঢোকেন ও বের হন। বাঁশের তৈরী ভাঙ্গা ঘড়টির বাইরে ঝোপ-জঙ্গল এ ভরা। ভাঙ্গা ঘড়ের ভেতরে উঁকি মেরে দেখা যায়, পোকা-মাকরের বাসা ও জঙ্গলে ভরা। সেই ঘড়েই বসবাস করছেন ধনী ভাই-বোনের র্নিজীব ভাই সাদামাটা মানুষ সংসারহীন দরীদ্র শফিকুর রহমান (৫৩)।
স্থানিয় মাসুদ রানা সহ কয়েকজন প্রতিবেদককে জানান, শফিকুর রহমান মনের কষ্ট চেপে রাখেন। কাউকে বা কারো কাছে তার কষ্টের কথা প্রকাশ করতে দেখেননি তাঁরা। স্থানিয় প্রতিবেশীরা পালাক্রমে তাকে খাবার দিতে শুরু করলেও মাত্র ১৫/২০ দিনের মত খাবার খাওয়ার পর তিনি আর প্রতিবেশীদের দেয়া খাবার ও খান না। এমনকি পোকা-মাকরের বাসা বা ঘড়ে খেয়ে না খেয়েই বছরের পর বছর পার করছেন শিক্ষিত শফিকুর রহমান।
গ্রামের মানুষের ব্যক্তিগত টিউবয়েলের পানি ও পান করেন না তিনি। নওগাঁ-মহাদেবপুর পাকা সড়কের ধনজইল মোড়ে থাকা সরকারী টিউবয়েলের এর পানি খাচ্ছিলেন দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে । একপর্যায়ে ওই টিউবয়েল নষ্ট হওয়ায় এখন পর্যন্ত চেরাগপুর ইউনিয়নের বাগধানা মোড়ে সরকারীভাবে স্থাপন করা টিউবয়েলের পানি প্রতিদিন বোতলে করে এনে রেখে সেই পানিই খেয়ে আসছেন ৩/৪ বছর ধরে। প্রতিবেদকের কাছে অনেক কথায় তুলে ধরলেও কেন তিনি এমন ধারা জীবন-যাঁপন করছেন সে বিষয়ে তিনি কিছুই জানাননি।
তবে স্থানিয়রা তাকে মাষ্টার হিসেবেই চেনেন বা মানেন। কারন পার্শ্বের বাগধানা হিন্দু পাড়া গ্রামের ৩ জন ছাত্রকে লেখাপড়া শেখান এবং সেখান থেকে যে সামান্য টাকা পান সেই টাকায় খাবার ও পড়নের কাপড় কিনেন বলেই জানিয়েছেন স্থানিয়রা।
অপরদিকে শফিকুর রহমান এর জন্য বসবাসের উপোযোগি একটি ঘড় ও একটি টিউবয়েলের ব্যবস্থা করার জন্য সহযোগীতা চান স্থানিয়রা। এসময় শফিকুর রহমান সম্মতি জানান প্রতিবেদকের সামনেই। অপরদিকে বর্তমানে ঢাকা কেন্দ্রীয় রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালের পরিচালকের দ্বায়িত্বরত ডাঃ নিজাম উদ্দীন এর বক্তব্য নেয়ার জন্য অফিসিয়াল ফোন নাম্বারে কল দিলেও রিসিভ না হওয়ায় তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি , তবে একই সময় ঢাকা কেন্দীয় রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালের ইমারজেন্সির ফোন নাম্বারে যোগাযোগ করা হলে, অপরপ্রান্ত থেকে জানানো হয় স্যার এর সাথে কথা বলতে চাইলে আগামীকাল অফিস টাইমে স্যারের অফিসের ফোনে কল দিয়েন বলে ও জানানো হয়।
You must be logged in to post a comment.