সোহাগের বয়স ১১ বছর। মাদারীপুরের নয়াকান্দি থেকে তার মামার সঙ্গে এসে কেরানীগঞ্জ তানাকা টাওয়ারে একটি পোশাক কারখানায় সহকারীর কাজ করে। এক বছর আগে সে কাজ শুরু করে। সুতা কাটা, কাপড়ের বোঝা বহন (সিঁড়ি ভেঙে ছয়তলার ওপর থেকে নিচে নামানো), মেশিন চালাতে সহযোগিতা করে সে। কাপড় কাটা আর সেলাইও শিখছে।
নিউ রিফাত গার্মেন্টসের একজন সেলাইকর্মী ১৩ বছরের ইয়াসিন। বৈদ্যুতিক সেলাই মেশিন দিয়ে সে নিয়মিত কাপড় সেলাই করে। মাঝেমধ্যে হাতে সুঁইয়ের গুতা লেগে রক্ত ঝরে। শুরুর দিকে বেশি এমন হলেও এখন একটু কমে আসছে বলে জানায়। এখন তার বেশি হচ্ছে সর্দি-কাশি। কারখানার কাপড়, ধুলোবালুর স্তূপ আর অসহ্য গরমে ঘেমেই তার বেশি ঠান্ডা লাগে বলে জানায় ইয়াসিন। কেরানীগঞ্জ শিল্পাঞ্চলে আলো-বাতাস প্রবেশহীন কারখানাগুলোতে নানা রকম স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে ১১ হাজারের অধিক শিশু। ৮ থেকে ১৪ বছর বয়সের মধ্যে শিশুর সংখ্যাই বেশি বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। এমন অবস্থায় ‘জাস্টিস ফর অল, ইন্ড চাইল্ড লেবার প্রতিপাদ্য করে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস।
২০২৫ সালের মধ্যে সব ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধের লক্ষ্য নির্ধরণ করেছে সরকার। সেই অনুযায়ী এই অঞ্চলের শিশুশ্রম নিরসনের ২০২২ ও ২০২৩ দুই বছরের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। চলতি বছরের ডিসেম্বরে এই প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা। তবে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, সমস্যা সমাধানে তেমন অগ্রগতি নেই। ছয় মাস বাকি থাকলেও কেরানীগঞ্জে শিশুশ্রম নিরসনের কোনো লক্ষণ নেই।
কারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিচালক এ কে এম সালাউদ্দিন ইত্তেফাককে বলেন, ‘কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ চলছে। তবে ডিসেম্বরের মধ্যে শিশুশ্রম বন্ধ হবে না। আমরা মোটিভেশনের কাজ করছি। একদিকে বন্ধ হলে আবার তারা অন্যদিকে শিশুদের নিযুক্ত করে। গত ছয় মাসে মালিকদের বিরুদ্ধে ৪০টির মতো মামলা হয়েছে।’ তিনি বলেন, এখানে শিশুশ্রম নিরসন করতে হলে শিশুদের স্থায়ীভাবে পুনর্বাসন করতে হবে। তাদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করাসহ তাদের বাবা-মাকে আর্থিক সহায়তা দিতে হবে। আমরা এমন প্রস্তাব ওপরের মহলে দিয়েছি।
প্রায় বিনা পারিশ্রমিকে কত শত শিশুশ্রম
মো. মেরাজ। বয়স ১৩ বছর। বাবা মারা গেলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়া ছেড়ে বরিশাল থেকে ঢাকায় আসে। প্রথমে সাগরেতের কাজ করত। তখন তাকে শুধু খাওয়া আর রাতে থাকার সুবিধা দেওয়া হতো। সপ্তাহে শুক্রবারে তাকে ১০০ টাকা দেওয়া হতো। দুই বছরের মধ্যে সে কাপড় কাটা, সেলাই শিখে একজন কর্মী হয়ে ওঠে। কর্মী হিসেবে সে প্রতিটি কাপড় সেলাই বা কাটা অনুসারে ৩ টাকা করে আয় করছে। সপ্তাহে এই শ্রমিকদের কারো ৩ হাজার, কারো ৪ হাজার আবার কারো ৫ হাজার টাকা আয় হয়। তবে পুরো টাকা তারা পায় না। অর্ধেক টাকা তাদের দেওয়া হয়। অর্ধেক টাকা রোজার ঈদে বাড়ি যাওয়ার সময় হাতে পায়। মাদারীপুর বহুমুখী বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র ১৭ বছরের ইয়াসিন। এক বছর আগে সে চলে আসে। বাবা মারা যাওয়ার পর তাকে কাজে আসতে হয়। ফ্যান থাকলেও প্রচণ্ড গরমে কোনো কাজে আসে না। কারখানার শ্রমিকদের শরীর থেকে ঘাম ঝরতে থাকে সব সময়। কাজ শেষ হলে একপাশে কাপড় রেখে এখানেই ঘুমিয়ে পড়ে তারা। গোসলখানা আর টয়লেট এতটাই নোংরা যে সেখানে নাকে কাপড় না দিয়ে এক মিনিটও দাঁড়ানো সম্ভব নয়। প্রতি তলায় টয়লেট আছে, তবে দিনেও অন্ধকার। মনির নামে এক শিশু শ্রমিক জানায়, ভাঁজ করা, প্যাকেট করা—সবই করে তার মতো শিশুরা। তার মুজরি সপ্তাহে ১ হাজার টাকা। তার বাবা একজনকে বিয়ে করে চলে যান, মা অন্যত্র থাকেন। তাই তার কাউকে টাকা পাঠাতে হয় না। ১ হাজার টাকার ৭০০ টাকা সে ভাতওয়ালীকে দেয়, ৩০০ টাকা তার কাছে থাকে।
নানা রকম স্বাস্থ্যঝুঁকি
এখানে শ্রমিকদের তিনটি সংগঠন সক্রিয়। তার একটি গার্মেন্টস শ্রমিক কল্যাণ ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক বেল্লাল জানান, ছোটবেলা থেকে তিনি এখানে কাজ করছেন। কোমরে ব্যথা, সর্দি-কাশি, চুলকানি এখানকার শ্রমিকদের লেগেই থাকে। অনেকের হার্টেও সমস্যা হয়। ছোট বয়সে তিনি যখন কাজ করতে শুরু করেন, তখন তার হাতে কয়েক দফা সুঁই ফোটে। তিনি তার আঙুলটি দেখিয়ে বলেন, ‘আমার মতো এমন সুয়ের খোঁচা সব শিশু শ্রমিকেরই আছে।’
গবেষণা যা বলে
২০২২ সালে ৫ হাজার কারখানা ৩১৪টি টাওয়ারে করা বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশনের এক গবেষণায় দেখা যায়, এখানে ১৪ বছরের নিচে ১০ হাজার ২৫৬টি শিশু কাজ করে। এর মধ্যে ৯ হাজার ২২১টি ছেলে এবং ১ হাজার ৩৫টি মেয়ে। আগানগর ও শুভাড্ডা দুটি ইউনিয়নে কারখনাগুলো। ৫ থেকে ৮-১০ তলা ভবনে কখনো এক রুম নিয়েও কারখানা চলে। বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক এ কে এম আশরাফ উদ্দিন বলেন, কোনো রকম বেতনকাঠামো ও কর্মঘণ্টা ও ছুটি ছাড়া তারা কাজ করে। এই এলাকার শিশুশ্রমকে ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কাজ করলে মজুরি, না করলে নাই। এভাবে তারা কাজ শুরু করে। দুই বছর পর কর্মী হিসেবে উপযুক্ত হয়। গবেষণায় দেখা যায়, বৈদ্যুতিক যন্ত্রে দুর্ঘটনার শিকার হওয়াসহ কোমরে ব্যথা, সর্দি-কাশি, চর্মরোগ ও ফুসফুসে প্রদাহজনিত সমস্যায় ভোগে তারা।
You must be logged in to post a comment.