আওয়ামী লীগের নতুন শুরু, নাকি কফিনে শেষ পেরেক?

অনি আতিকুর রহমান
বুধবার, ১৬ জুলাই, ২০২৫, ১০:০২ অপরাহ্ন

এনসিপির মাসব্যাপী পদযাত্রা কর্মসূচির ১৬তম দিন। গতকাল শেষ হয়েছে প্রথমার্ধ। আজ দ্বিতীয়ার্ধের শুরু। এতদিনে ‘পদযাত্রা কর্মসূচি’ দলটির প্রায় ‘রুটিনওয়ার্কে’ পরিণত হয়েছে। ক্যালেন্ডার কর্মসূচি হিসেবে কেন্দ্রীয় নেতারা এক জেলায় শেষ করে আরেক জেলায় যাচ্ছে।

পূর্বঘোষণা অনুসারে আজকের ভেন্যু গোপালগঞ্জ। এখানকার কর্মসূচিও আর দশটা জেলার মতোই ছিল। অন্তত এনসিপি নেতাদের ফেসবুক পোস্টে তেমনই ক্যাম্পেইন দেখা গেছে। কিছু উস্কানি এলেও তারা পাল্টা শান্তির বার্তা দিয়েছে। তারপরও এই গান্ধিবাদী কর্মসূচিকেও আওয়ামী লীগের থ্রেট মনে হলো কেন? কারণ পুরনো খাসলত। ভিন্নমত সহ্য না করতে পারার অভ্যাস।

আজকের ঘটনা এমন হতে পারত, নাহিদ-আখতাররা ওখানে যেত, সড়কে কিছুক্ষণ হাঁটত, মঞ্চে বক্তৃতা করত, চলে আসত। কিন্তু দিনের শুরুটা হলো ভিন্নভাবে। সড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগ। এরপর আগ বাড়িয়ে পুলিশ ও ইউএনওর গাড়িতে হামলা। এরপর মঞ্চে ভাঙচুর। এতকিছুর পরও সমাবেশ আটকানো গেল না। উপস্থিতি কিছুটা কম হলেও সমাবেশ কিন্তু সফল। কেন্দ্রীয় নেতারা পূর্ণ বক্তব্য রেখেই মঞ্চ ছেড়েছে। আওয়ামী লীগের উদ্দেশ্যে ছিল যেহেতু সমাবেশ পন্ড করা ফলে সমাবেশ সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে রচিত হয় তাদের আজকের দিনের প্রথম ব্যর্থতা। এ পর্যন্তও ঠিক ছিল। কিন্তু ওই যে- পিপীলিকার পাখা গজে মরিবার তরে।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এবার কী করলো- তারা গিয়ে সমাবেশফেরত গাড়িবহরে হামলা চালাল। কত দুর্বল কাজ চিন্তা করেন। এটাকে আবার বীরত্ব বলে প্রচার করছে! কী পরিমাণ দেউলিয়া হলে এমন করা যায়! অথচ এটা কাপুরুষতা ছাড়া আর কিছু না। সমাবেশ আটকাতে না পেরে পেছন থেকে গাড়িতে হামলা।

এই হামলার প্লট অবশ্য আগে থেকেই করা। গতকাল রাত থেকে স্যোশাল মিডিয়ায় এই ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়। গোপালগঞ্জের পদযাত্রা থেকে টুঙ্গিপাড়ায় আক্রমণ করা বলে আগাম প্রচার শুরু করে ফ্যাসিবাদী এক্টিভিস্টরা। মজার ব্যাপার হলো এরা সবাই পয়সাওয়ালা এবং পলাতক। কিন্তু আজ জীবন দিল সাধারণ পা-ফাটা আওয়ামী লীগার। যারা হৈ-চৈ ছাড়া কিছুই বোঝে না। কোনো বড় নেতাকে আজ সেখানে দেখেছেন? দেখেন নাই। ইভেন দেশে লুকিয়ে থাকা কোনো নেতাকে সাহস করে বাইর হতে দেখেছেন। দেখেননি। তাহলে তারা কেন এই আলাভোলা কর্মীদের হত্যাযোগ্য করে তুলল? এই দায় আসলে কার?

টুঙ্গিপাড়া নিয়ে যে এনসিপির কোনো পরিকল্পনা ছিল না তা গতকালই বোঝা গেছে। আজ তার প্রমাণও মিলেছে। ওইরকম ইনটেনশন থাকলে রিজার্ভ লোকজন নিয়েই মুভ করত গোপালগঞ্জ। বাট ওদের বহর ছিল অ্যাজ-ইউজ্যুয়াল।

ফেরার পথে যখন হামলার শিকার হয়, তারপরও এনসিপি পাল্টা প্রতিরোধ না করে আত্মরক্ষামূলক অবস্থান নেয়। পোলাগুলো কী পরিমাণ ধৈর্য্যের পরীক্ষা দিয়েছে চিন্তা করেন। এরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের সেইভ করতে আসলে; তাদের সঙ্গেও সংঘর্ষে জড়ায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। সেখানে অন্তত চারজন নিহত হয়। এই লাশগুলো আওয়ামী লীগের পলাতক হাইকমান্ড চাচ্ছিল। তারা এটাকে ক্যাশ করতে চাইবে।

কিন্তু ছাগলের তিন নম্বর যেই বাচ্চারা এই ফাঁদে পা দিল তাদের কী লাভ? কিছুই না। ভবিষ্যতে কোনোদিন যদি তারা ফিরে এদের ভাগ্যের উন্নয়ন হবে? হবে না। আবার একটি পরিবার এবং পরিবার ঘনিষ্ঠরাই ফুলে ফেঁপে উঠবে।

নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। আওয়ামী লীগের এই নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রায় অবম্ভব। আর এবার নির্বাচনে না যেতে পারলে দল হিসেবে স্মরণকালের সেরা সংকটে পড়বে। জনগণের পকেট থেকে মারা অর্থও ফুরিয়ে আসছে। দশ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকলে এক এক বেলুন চুপসে যাবে। ফলে এই ধরনের গ্যাঞ্জাম দিয়ে তারা রেলেভেন্ট হইতে চাচ্ছে এবং দেশে থাকা অবুঝ কর্মীদের এনাবল করার পথ খুঁজছে। বাট সে গুড়ে বালি পড়ল।

সারাদেশের কোথাও প্রতিরোধ গড়তে পারেনি আওয়ামী লীগ। বিশেষ কোনো জেলায় প্রতিরোধ গড়ার নামে নেতাকর্মীদের জনরোষ ও গুলির সামনে ঠেলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে দলটির পুরাতন চরিত্রই ফুটে উঠল আবার। অন্যদিকে তরুণ নেতৃত্ব এনসিপির নেতাকর্মীরা তাদের প্রায় ফুল বডি নিয়ে এই সংকট মোকাবিলা করল। তরুণরা যে নতুন রাজনীতির কথা বলছে, এটাই সেটা। হামলার শিকার হওয়ার পর যখন রেস্কিউ করার জন্য আর্মি-পুলিশ এগিয়ে আসে। তখন নাহিদ-হাসনাতরা সাফ জানিয়ে দেয় বেছে বেছে কাউকে রেস্কিউ করতে চাইলে তারা প্রয়োজনে প্রাণ দিবে তবু যাবে না। ভাবতে পারেন? হাসনাত একটা নেমেও গেছে। পরে তাকে বুঝিয়ে আবার এপিসিতে তোলা হয়। আর আওয়ামী লীগ? তারা কোনো তৃতীয় স্তরের নেতা নিয়েও মাঠে নামেনি। ফলে আজকের ঘটনা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের আরেকটা লজ্জাজনক পরাজয়।

এতকিছু পরও এই সংঘাতকে কি আওয়ামী লীগ ক্যাশ করতে পারবে? উত্তর হচ্ছে- না। বিএনপির শীর্ষ দুই নেতা যখন বিদেশে ও জেলে ছিল। তখন অন্য শীর্ষ নেতারা ছিল দেশে। আন্দোলনে তারা মাঠে ছিল। জেলে গেছে, নির্যাতন সহ্য করেছে। দুর্বল অবস্থান হলেও মাঠের রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তারা ছিল। জামায়াতও তাই। বাম দলগুলোসহ তৎকালীন অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলো একইভাবে কাজ করেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের অবস্থা দেখেন। শতভাগ নেতা পলাতক। এভাবে হয়?

ছোটবেলা থেকে একটা কথা শুনে বড় হয়েছি- আওয়ামী লীগ নাকি সরকারের চেয়ে বিরোধী দলে বেশি শক্তিশালী। কই সেই আওয়ামী লীগ? ফেসবুক না থাকলে তো বুঝতামই না। আরেকটা উপায় আছে… বিএনপি কখনো আওয়ামী লীগ হয়ে উঠলে আরেকটা গণঅভ্যুত্থান হলে ফিরবে তারা। এটা আবার কেমন ফেরা!

আওয়ামী লীগের নেতারা বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। উপরন্ত দলটির ভয়াবহ প্রোপাগান্ডায় লিপ্ত। এতে তাদের নিজ নেতাকর্মীরাই বিভ্রান্ত হচ্ছে। এভাবে সংগঠিত হওয়া আদৌ সম্ভব না। নেতা ছাড়া কোনো আন্দোলন গড়ে তোলা যায় না। ফলে এই ঘটনাকে ক্যাশ করার কোনো সুযোগ আওয়ামী লীগের নাই।

দ্বিতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাম্প্রতিক অবস্থান আওয়ামী লীগকে তওবা করার একটা সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছিল। কিন্তু তারা তওবা তো পড়েই নাই উল্টো নতুন পাপ শুরু করেছে। আর আজকের এই ঘটনা তাদের তওবার পথও সংকুচিত হলো। এনসিপির মতো দলের ওপর হামলার কারণে স্বাভাবিকভাবেই সরকারের ওপর চাপ বাড়বে। তীব্র চাপ সামাল দিতে সরকারও কঠোর হবে। ফলে, যারা এতদিন ‘ছাড় দাও’ নীতির কারণে যারা সেইভ ছিল; তারাও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টার্গেটে পরিণত হবে।

আইনিভাবে মূল লাঠিয়ালবাহিনী ছাত্রলীগ ইতোমধ্যে নিষিদ্ধ, আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর চেপেছে নিষেধাজ্ঞা। ফলে তাদের দমন করার বৈধতা সরকারের হাতে অলরেডি আছে। অ্যাকশন শুরু হলে আরও সংকুচিত হয়ে আসবে ফেরার পথ। ফলে নতুন শুরুর সুযোগ তো নেই, বরং এটিই হতে পারে কফিনে শেষ পেরেক। কারণ এই ঘটনার পর যারা ইনক্লুসিভ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে আনার চেষ্টা করছিলেন তাদেরও মুখ বন্ধ হলো। ফলে নিজের কফিনে নিজেই পেরেক ঠুকলো আওয়ামী লীগ।

তৃতীয়ত, রিফাইন্ড আওয়ামী লীগের উত্থানও শঙ্কার মুখে পড়ল। মানুষের মনে কিছু লোকের প্রতি হয়ত সিম্প্যাথি ছিল। সেটা এই ঘটনার মধ্যে দিয়ে উবে গেছে। আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনকে এখন মানুষ সিম্প্যাথি তো দেখাবে না বরং তাদের প্রতি কঠোর হওয়ার জন্য জুলাইপন্থীদের ওপর চাপ বাড়াবে।

এনসিপির লাভ: জুলাই অভ্যুত্থানের স্পিরিট থেকে গড়ে ওঠা দলটির নেতৃত্ব শতভাগ অর্গানিক। এদের মধ্যে পরিবর্তনের প্রবল ইছ্ছা আছে। তবে বয়সের কারণে অভিজ্ঞতার ঘাটতিও আছে। যদিও ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বাকবদলের নায়ক এরা। ফলে এদের সাহস নিয়ে কোনো সংশয় নেই। এরা যত বাধার সম্মুখীন হবে; দল হিসেবে ততই লাভবান হবে। বাধা টপকে গেলেই সাহস ও শক্তি দ্বিগুণ হয়ে যায়। হচ্ছেও তাই। গত ১৫ দিনের পদযাত্রা অন্তত তারই প্রমাণ। গোপালগঞ্জ পরিস্থিতি মোকাবিলা করে অক্ষত হয়ে ফেরা এনসিপির মুকুটে নতুন পালক। আওয়ামী লীগের কফিনে শেষ পেরেক।

Facebook Comments
সংবাদটি শেয়ার করুন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

আরো সংবাদ